আনন্দ উচ্ছ্বাসে উদীচী ঢাকা মহানগর সম্মেলন শুরু- সংস্কৃতি সংবাদ

শুক্রবার সকাল ১০টা। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। শরতের ঝকঝকে রোদে এখানেই শুরু হয় বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ঢাকা মহানগর শাখার নবম সম্মেলন। সকাল নয়টার পর থেকেই উদীচীর কর্মীদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস ও কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে এ প্রাঙ্গণ।


ঊষার দুয়ারে হানি আঘাত/আমরা আনিব রাঙা প্রভাত স্লোগানে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতার শুরু হয় সম্মেলক কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে। জাতীয় সঙ্গীতের সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তুলে ধরা হয় জাতীয় ও সংগঠনের পতাকা। নীলাকাশে উড়িয়ে দেয়া হয় বর্ণিল বেলুন। আত্মপ্রত্যয়ে উদ্দীপ্ত কর্মীদের মুখে ধ্বনিত হয় জয় জয় জয় উদীচী। এরপর ছিল সংক্ষিপ্ত সঙ্গীতানুষ্ঠান। গাওয়া হয় দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়ার গান। অনেক কণ্ঠ এক হয়ে গেয়ে যায়- আমারই দেশ সব মানুষের/ছোটদের বড়দের সকলের। এরপরে গীত হয় সংগঠনের গান- কে বলেছে হয় না/এসো এ মঞ্চে উদীচী এমনই এক আয়না। নেই নেই মুক্তি, অর্থনৈতিক, শুভঙ্করের এ যে ফাঁকি-এই পরিবেশনার মাধ্যমে শেষ হয় গানের পালা।। দেশপ্রেমের সঙ্গে উৎসবের রং মিশিয়ে শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া দু’দিনের এ সম্মেলনের উদ্বোধন করেন প্রখ্যাত গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী খাদেমুল ইসলাম বসুনিয়া। এ সময় বিশেষ অতিথি ছিলেন ভাস্বর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী ও কার্টুনিস্ট শিশির ভট্টাচার্য। উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বের করা হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রাটি মৎস্য ভবন, প্রেসক্লাব, পল্টন ঘুরে পুনরায় ফিরে আসে শিল্পকলায়। একাডেমীর জাতীয় সঙ্গীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তনে বসে সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশন। এতে বক্তব্য রাখেন শিল্পী খাদেমুল ইসলাম বসুনিয়া, উদীচীর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি গোলাম মোহাম্মদ ইদু, সহ-সভাপতি আশরাফুজ্জামান সেলিম ও বদিউর রহমান, সাধারণ সম্পাদক হাবিবুল আলম প্রমুখ। সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ শীষ। এ পর্বের আলোচনায় উঠে আসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যুসহ চলমান রাজনৈতিক নানা বিষয়।
উদ্বোধকের বক্তব্যে খাদেমুল ইসলাম বসুনিয়া বলেন, ‘উদীচী এমনই এক সংগঠন, যারা জাতির বিবেক হিসেবে কাজ করে। আমাদের এই সংগঠনের কাছে মানুষের আকাক্সক্ষা অনেক। আর তাই মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে এ সংগঠন। বক্তব্য শেষে পরপর দুটি গান পরিবেশন করেন এ শিল্পী। দেশের কথা বলে যাওয়া গান দুটি হলো- বাংলাকে আজ প্রশ্ন করি/বাঙালী আজ কোথায় ও দেশটা নিয়ে ভাবনা কার। এর মাধ্যমে শেষ হয় উদ্বোধনী অধিবেশনের পর্ব।
মধ্যাহ্ন বিরতি শেষে বসে সম্মেলনের প্রথম অধিবেশন। এতে সম্প্রতি প্রয়াত প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শোক প্রস্তাব আনা হয়। সংগঠনের বার্ষিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ঢাকা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে। দিনভর সম্মেলনের সাংগঠনিক তৎপরতা শেষে সন্ধ্যায় ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। উদীচীর নৃত্য বিভাগের শিল্পী পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ অনুষ্ঠান। তাঁরা কবিগুরুর ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’ গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করেন। এরপর ঢাকা মহানগর শাখার শিল্পীরা সম্মেলক কণ্ঠে গান শোনান। তাদের কণ্ঠে পরিবেশিত হয় ‘আমাদের একটাই দেশ’ ও ‘ছোটদের বড়দের সকলের’। এরপর ঢাকা মহানগরের অন্তর্গত মিরপুর, গে-ারিয়া, পল্লবী, সাভার ও তেজগাঁও শাখার শিল্পীরা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেন। অনুষ্ঠানে সব শেষে ছিল বিশেষ আকর্ষণ উপমহাদেশের প্রখ্যাত গণসঙ্গীত শিল্পী তুষার দের গানের পরিবেশনা। শুরুতেই শিল্পী দরাজ গেয়ে শোনান ভূপেন হাজারির বিখ্যাত সেই গান ‘গঙ্গা আমার মা/পদ্মা আমার মা’। দ্বিতীয় পরিবেশনা ছিল ‘বিস্তীর্ণ দু’পারে অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনি’। মাঝে শোনান এপার বাংলা-ওপার জনপ্রিয় কিছু আধুনিক গানের কম্পোজিশন। আর শেষ করেন ‘মানুষ মানুষের জন্য/জীবন জীবনের জন্য’ গান দিয়ে।
আজ শনিবার সম্মেলনের শেষ দিনে কাউন্সিল অধিবেশন ও নতুন কমিটির হাতে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হবে। সন্ধ্যায় থাকছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে অন্যতম আর্কষণ হিসেবে থাকছে যুদ্ধকলা বিষয় নৃত্য পরিবেশনা রায়বেশে নৃত্য। অতীতকালে মূলত যুদ্ধকৌশল হিসেবে এ শৈলীর উদ্ভব হলেও কালের পরিক্রমায় তা নৃত্যশৈলীতে পরিণত হয়। বিলুপ্তপ্রায় এ নৃত্যশৈলীকে পুনরুজ্জীবনের প্রয়াসে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন উদীচীর নৃত্যশিল্পীরা। এটি পরিবেশন করবে উদীচীর নৃত্য বিভাগের শিল্পীরা। রায়বেশে নৃত্য শেষে সমবেত জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে পরিসমাপ্তি ঘটবে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ঢাকা মহানগর সংসদের নবম সম্মেলনের।
গানে গানে সুবীর নন্দীকে সম্মাননা
গানে গানে দেশের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী সুবীর নন্দীকে সম্মাননা জানাল সিটি ব্যাংক এনএ। শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলে গানে গানে গুণীজন সংবর্ধনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এই সম্মাননা দেয়া হয় শিল্পীকে। অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী কনক চাঁপা।
শুরুতে বক্তব্যে সিঙ্গার বাংলাদেশ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মাহবুব জামিল বলেন, আমাদের দেশে বাংলা আধুনিক গানের এক অসামান্য শিল্পী সুবীর নন্দী। তিনি আমাদের দেশের গৌরব। দেশে ও দেশের বাইরে তিনি সঙ্গীত পরিবেশন করে অনেক সুনাম অর্জন করেছেন। ছোটবেলা থেকেই রাগসঙ্গীতে তিনি তালিম নিয়েছেন, যার প্রতিফলন আজকের এই সুবীর নন্দীকে এতদূর এগিয়ে নিয়ে এসেছে। ওস্তাদ বাবর আলীর কাছে রাগ সঙ্গীতে তালিমপ্রাপ্ত এ শিল্পী দেখিয়েছেন বাংলা গানের সুর মাধুর্যের গ্রহণযোগ্যতা। তাঁর কণ্ঠে রয়েছে ঈশ্বরপ্রদত্ত এক অসীম ক্ষমতা। সুর ও গানের প্রতি ভালবাসাই তাঁকে এতদূর এগিয়ে নিয়ে এসেছে। তিনি অনেক সম্মানে ভূষিত হয়েছেন, যা এই রকম একজন অসামান্য শিল্পীর জন্য প্রাপ্য। শুভেচ্ছা বক্তব্যের পরে শিল্পী সুবীর নন্দীর হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট ও পোর্ট্রটে তুলে দেন সিটি ব্যাংক এনএ বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদ মাকসুদ।
শিল্পী সুবীর নন্দী সম্মাননা পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এ সম্মাননা পেয়ে আমি খুব গর্বিত। আমাকে সঙ্গীত জগতের আলো যাঁরা দেখিয়েছেন তাঁদের কথা এই মুহূর্তে আমার বার বার মনে পড়ছে। আমার মায়ের হাত ধরেই আমি এই সঙ্গীত জগতে এসেছি। মনে পড়ছে আমার সঙ্গীত শিক্ষক ওস্তাদ বাবর আলী খানের কথা, যাঁর কাছে আমি উচ্চাঙ্গসঙ্গীতসহ বিভিন্ন আঙ্গিকের গানে তালিম নিয়েছি। আমার বড় ভাই আমাকে শিখিয়েছেন কীভাবে সত্যিকার সঙ্গীত অর্জন করা যায়। এছাড়া আমি বিভিন্ন সময়ে যাঁদের কাছে সঙ্গীতে তালিমসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা পেয়েছি তাঁদের সবার কথা আমার খুব মনে পড়ছে। এই সম্মাননায় যে সকল শিল্পীর সঙ্গে আমাকে যুক্ত করা হলো তাঁরা আমার চেয়ে অনেক বড় মাপের শিল্পী। আমাকে ভালবেসে ও উৎসাহিত করার জন্য সিটি ব্যাংকসহ সবাইকে অনেক ধন্যবাদ। আজ আমার জীবনের একটা স্মরণীয় দিন।
সবশেষে সঙ্গীত পরিবেশন করে সবাইকে মন্ত্রমুগ্ধ করেন দেশের জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী কনক চাঁপা। তাঁর জনপ্রিয় কিছু গান পরিবেশন করার পাশাপাশি তিনি সুবীর নন্দীর সঙ্গে নিজের কিছু স্মরণীয় মুহূর্তের কথা স্মরণ করেন। তাঁর পরিবেশিত গানগুলোর মধ্যে ছিল ‘চোখের ভিতর স্বপ্ন থাকে স্বপ্ন বাঁচায় জীবনটাকে’, ‘ছোট্ট একটা জীবন নিয়ে পৃথিবীতে কেন বল আসা’, ‘তুমি মোর জীবনের ভাবনা হৃদয়ে সুখের দোলা’, ‘তুমি বুকে নিয়ে নাড়া দিয়ো আমাকে আমি ভালবাসি তোমাকে,’ ‘রঙ্গিলা রঙ্গিলা রে আমারে ছাইড়া বন্ধু কই গ্যালারে’ ও ‘এত সুন্দর পৃথিবী দেখিনি তো আগে।’ সিটি ব্যাংকের এনএর পক্ষ থেকে ২০০৪ সাল থেকে নিয়মিত গুণীজন সংবর্ধনা দেয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত সম্মাননাপ্রাপ্তরা হলেন- প্রয়াত শিল্পী নিলুফার ইয়াসমিন, ফরিদা পারভীন, ফিরোজা বেগম, সন্জীদা খাতুন, সোহরাব হোসেন, ফেরদৌসী রহমান, সাবিনা ইয়াসমিন ও রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা।

No comments

Powered by Blogger.