ইরাক ছেড়েছে সব মার্কিন সেনা

যুক্তরাষ্ট্র গতকাল রোববার ইরাক থেকে তাদের সব সেনা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এর ফলে নয় বছরের ইরাক যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটল। কিন্তু পড়ে রইল রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও জাতিগতভাবে বিভক্ত অনিশ্চিত এক ইরাক। প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ২০০৩ সালের মার্চে ইরাকে অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক মাসের মধ্যে সাদ্দাম হোসেনের পতন ঘটলেও যুদ্ধের ইতি টানেনি ওয়াশিংটন।


গত নয় বছরের যুদ্ধে প্রায় সাড়ে চার হাজার মার্কিন সেনা ও হাজার হাজার ইরাকি নাগরিক নিহত হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৮ লাখ ইরাকি।
মার্কিন বাহিনীর প্রায় ১১০টি গাড়ির একটি বহর গতকাল স্থানীয় সময় রাত আড়াইটার দিকে দক্ষিণাঞ্চলীয় নাসিরিয়া শহরের ইমাম আলী ঘাঁটি থেকে বের হয়। ওই বহরে ছিল মার্কিন ফাস্ট ক্যাভালরি ডিভিশনের থার্ড ব্রিগেডের প্রায় পাঁচ শ সেনাসদস্য। মরুভূমির ভেতর দিয়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টার পথ পেরিয়ে সকাল সাড়ে সাতটার দিকে গাড়ি বহরটি ইরাক সীমান্ত অতিক্রম করে কুয়েতে ঢোকে। তবে অল্প কিছু সেনাসদস্য রয়ে গেছে ইরাকে মার্কিন দূতাবাসের নিরাপত্তায়।
গাড়িবহর কুয়েত সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছার পর মার্কিন বাহিনীর সদস্য রোডলফো রুইজ বলেন, ‘ফোন করে স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে কথা বলার জন্য আমার আর তর সইছে না। আমি তাদের বলতে চাই, আমি নিরাপদ আছি।’
গাড়িবহর কুয়েতে ঢোকার পর মার্কিন বাহিনীর সার্জেন্ট ডন অস্টিন বলেন, ‘ভালো লাগছে, ইরাক থেকে বের হতে পেরে সত্যিই ভালো লাগছে। অনেক বছর হয়ে গেল, এখন ঘরে ফেরার সময়।’
সেনা প্রত্যাহার শেষ হওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রতিশ্রুতি পূরণ হলো। ২০০৯ সালে ক্ষমতা নেওয়ার পরপরই ওবামা ঘোষণা দিয়েছিলেন, ২০১১ সালের শেষ নাগাদ ইরাক থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে।
মার্কিন বাহিনী শেষ পর্যন্ত ইরাক ছেড়ে চলে যাওয়ায় ইরাকি জনগণ স্বাধীনতার স্বাদ পেতে শুরু করেছে। রাজধানী বাগদাদসহ দেশের বিভিন্ন অংশে তারা উল্লাসে মেতে ওঠে। কিন্তু এর মধ্যে তাদের মনে উঁকি দিচ্ছে শঙ্কা—২০০৬-০৭ সালের মতো আবার জাতিগত সংঘাত শুরু হয়ে যেতে পারে।
বাগদাদের বাসিন্দা ২৭ বছর বয়স্ক সাফা বলেন, ‘আমি গর্বিত, সব ইরাকিই গর্বিত অন্য সব স্বাধীন দেশের নাগরিকের মতো।’ তিনি আরও বলেন, ‘মার্কিন বাহিনী সাদ্দাম হোসেনের পতন ঘটিয়েছে, কিন্তু এর পর থেকেই আমাদের জীবনও পিছিয়ে গেছে অনেক।’
তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, ‘রাজনীতিবিদরা যদি দুর্নীতি দমন করতে পারেন এবং সংস্কারের দিকে মনোযোগী হন, তাহলে এখন থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’
উম্মে মোহাম্মদ নামের ৫০ বছর বয়স্ক এক নারী বলেন, ‘আমেরিকানরা আমাদের দেশে হত্যা-সন্ত্রাস থেকে শুরু করে যা যা করেছে আমার মনে হয়, আমরা কোনো দিন তাদের ক্ষমা করতে পারব না। তারা শুধু নিজেদের কথা ভেবেছে, একবার তাদের কাজের পরিণতির কথা চিন্তা করেনি।’
মার্কিন বাহিনীর চলে যাওয়াকে ‘দখলদারী থেকে মুক্তি’ অভিহিত করে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল আমির বলেন, ‘এখন নিজেদের দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও পুনর্গঠনের জন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’
শিয়া, সুন্নি ও কুর্দিদের মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্বে প্রতিনিয়ত লড়ছে প্রধানমন্ত্রী নূরী আল-মালিকির শিয়া নেতৃত্বাধীন সরকার। সহিংসতা ও আত্মঘাতী বোমা হামলার মাত্রা সম্প্রতি একটু কমলেও অনমনীয় সুন্নি বিদ্রোহী ও শিয়া জঙ্গিরা এখনো হুমকি। সরকার ও ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর প্রতিনিয়তই ঘটছে ছোটখাটো হামলার ঘটনা। এএফপি, রয়টার্স।