মিসর আবার অন্ধকার সুড়ঙ্গে? by শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া

প্রভাবশালী সেনাবাহিনীর বিচারবুদ্ধির বলি হলেন মোহাম্মদ মুরসি। শেষ পর্যন্ত তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে মুরসি জনগণের দাবি মেটাতে ব্যর্থ হয়েছেন, কাজেই তাঁকে যেতে হবে। এটা কোনো ভালো সমাধান কি না, সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন।
বস্তুত দেশের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা প্রেসিডেন্টকে যেভাবে এক বছরের মধ্যে বিদায় নিতে হলো, তা বেশ কিছু কঠিন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আগামী কয়েক দিন মিসরবাসী—এবং আগ্রহী পর্যবেক্ষকেরাও—সেই প্রশ্নের জবাব খুঁজবেন ব্যগ্র হয়ে।
‘আরব বসন্তের’ ঝড়ে হোসনি মোবারকের পতন হওয়ার পর থেকে অস্থিরতা ছাড়েনি মিসরকে। সেনাবাহিনী ও বিচার বিভাগের মোবারক সমর্থক ও বিরোধী আর ইসলামপন্থীদের দড়ি টানাটানি চলছেই। সর্বশেষ এই সেনা অভ্যুত্থান দেশকে কোন দিকে নিয়ে যাবে, সেটাই এখন দেখার। মোহাম্মদ মুরসির বিরুদ্ধে বিরোধীদের অভিযোগের শেষ নেই। সরকার পরিচালনায় অস্বচ্ছতা, প্রশাসনে ব্যাপক দুর্নীতি, ক্ষমতা নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা, অর্থনৈতিক সংস্কারে মনোযোগ না দিয়ে ধর্মভিত্তিক কর্মসূচিতে বেশি আগ্রহ—এসব অভিযোগ তুলে বিরোধী দলগুলো চাইছিল, মুরসি সরে দাঁড়ান। কিন্তু মুরসি তাঁর আসনে আরও শক্ত হয়ে বসে বলেছেন, ৫১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। তাহরির স্কোয়ারে জড়ো হয়ে দাবি তুললেই তিনি যাবেন না। সরকারে থেকেই দেশের জন্য কাজ করে যাবেন।
মুরসি অবশ্য কিছু ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তবে জোর দিয়ে জানান, তিনি তা শুধরে প্রয়োজনীয় সংস্কার করবেন। ঝেঁটিয়ে দূর করবেন দুর্নীতিও। কিন্তু বিরোধী পক্ষ তা মানতে নারাজ। তারা বলেছে, এর মধ্যে মুরসির ক্ষমতায় আরোহণের এক বছর হয়ে গেছে। এই ১২টি মাসে তিনি ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টা ছাড়া সরকার পরিচালনায় আশাব্যঞ্জক কিছু দেখাতে পারেননি, কাজেই তাঁকে সময় দেওয়ার কোনো মানে হয় না।
এই প্রেক্ষাপটে গত রোববার থেকে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ক্রমে ফুঁসে উঠতে থাকে। মুরসি চরম বেকায়দায় পড়ে যান। হাজার হাজার সাধারণ মানুষ যোগ দেয় বিরোধী পক্ষের সমর্থনে। বিরোধীদলীয় জোট ন্যাশনাল স্যালভেশন ফ্রন্ট উদারপন্থী, নিরপেক্ষ ও বামপন্থীদের এক করে ফেলতে সক্ষম হয় এবার। রাজধানী কায়রো, দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর আলেকজান্দ্রিয়াসহ বড় বড় শহরে চলতে থাকে মুরসিবিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভ। মুরসির সমর্থক ও প্রতিপক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এই সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
মুরসির ক্ষমতা গ্রহণের পর এক বছরের একটি লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো মিসরীয় সমাজের বিভাজন। সমান না হলেও দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে দেশটি। বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে এমনকি পারিবারিক পর্যায়েও। ঘরে ঘরে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, এক ভাই মুরসিকে সমর্থন জানাচ্ছে তো আরেক ভাই বিক্ষোভকারীদের পক্ষে। এ নিয়ে বাগিবতণ্ডার জের ধরে ঘরের ভেতরেই বেধে যাচ্ছে তুলকালাম। কথা বলা, এমনকি মুখ দেখা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
গত সোমবার বিরোধীরা জোট বেঁধে মুরসিকে সময় বেঁধে দেয়, মঙ্গলবারের মধ্যে তিনি পদত্যাগ না করলে সরকারের চূড়ান্ত পতনের জন্য দুর্বার আন্দোলন শুরু করবে তারা। এর পরই মাঠে নামে সেনাবাহিনী। নিন্দুকেরা জানান, তাঁরা এ রকম সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিলেন। সেনাবাহিনীও সময় বেঁধে দেয় মুরসিকে, যা অমান্য করায় তাঁকে সরে যেতে হয়েছে।
মুরসির পতনের মধ্য দিয়ে একটা বিষয় স্পষ্ট। মিসরের রাজনীতি থেকে সেনাবাহিনীর ছায়া সহজে সরানোর নয়। আরব বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশটির জন্য গণতন্ত্রের পথ যতটা ভাবা হয়েছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি বন্ধুর হবে। মিসরের সেনাবাহিনীর প্রভাব দেশের রন্ধ্রে। তাদের রয়েছে বহু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। সেনাবাহিনীর ব্যবসাপাতি কেউ বলেন জিডিপির ৮, কেউ বলেন ৪০ শতাংশ। সেই স্বার্থ অক্ষুণ্ন থাকে, এমন ব্যবস্থার পক্ষেই পদক্ষেপ নেবে সেনাবাহিনী।
মুরসি ক্ষমতায় আসার প্রাক্কালে তাঁকে হাতের পুতুল বানাতে ফন্দিফিকির কম করেনি সেনাবাহিনী। নিজেদের পছন্দমতো ডিক্রি ও আইন জারি করে সেনাবাহিনীকে কলকাঠি নাড়ার সব ক্ষমতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। সেই সময় মুরসির শক্ত অবস্থান আর তাঁর প্রতি জনগণের বিপুল সমর্থনে সে চেষ্টা শেষ পর্যন্ত হালে তেমন পানি পায়নি। কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারলেন না মুরসি।
সেনাবাহিনীর তরফ থেকে এর মধ্যে একটি ‘রোডম্যাপ’ বা রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের খসড়া হিসেবে এই রোডম্যাপে নতুন করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সেনাবাহিনীর একজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা জানান, চলমান পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীও হাঁপিয়ে উঠেছিল। তারা এখন চায়, শিগগিরই একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করতে। নিজেদের ক্ষমতায় আসার কোনো ইচ্ছা নেই। তারা চাইছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে একটি সরকার গঠন করতে। সংশোধিত সংবিধান প্রণয়নে যে কয়েক মাস লাগে, এই সরকার তত দিন ক্ষমতায় থাকবে।
মুরসি দৃশ্যত শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে গেছেন। মঙ্গলবার রাতে টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ৪৫ মিনিটের ভাষণে তিনি বেশ আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে জানান, জীবন দিয়ে হলেও এ সরকারকে রক্ষা করবেন তিনি। অন্যদিকে, দেশের জন্য জীবন দেওয়ার ঘোষণা দেয় সেনাবাহিনীও।
পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বিশ্লেষকেরা জানান, স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের পতনের পর গণতন্ত্রের নতুন সূর্য ওঠার যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল, তা আবার এক অন্ধকার সুড়ঙ্গের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এবারের সেনা অভ্যুত্থান ভবিষ্যতের জন্য এক খারাপ নজির সৃষ্টি করল। মিসরে নিযুক্ত এক সাবেক পশ্চিমা রাষ্ট্রদূত জানান, এখন গণবিক্ষোভের দোহাই দিয়ে যে আগামী প্রেসিডেন্টকেও মেয়াদের আগে টেনে নামানো হবে না, তার নিশ্চয়তা কী? আর আজ মিসরে যা ঘটছে, তার পরাঘাত অনুভূত হবে দেশটির সীমানা ছাড়িয়েও বহু দূর পর্যন্ত।