চীন শরীরে ডাঙর হলেও মনে শিশু?-আন্তর্জাতিক by আবু এন. এম. ওয়াহিদ

দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নিয়ে চীনের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেনদরবার অনেক দিনের। এ টানাপড়েনে যে দুটি বিষয় সবসময়ই কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে তা হলো, চীন তার বাজারকে মার্কিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পুরোপুরি খুলে দিচ্ছে না। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, চীন তার মুদ্রা ইউয়ানের মূল্যমান খোলাবাজারে নির্ধারিত হতে বাধা দিচ্ছে। অন্যভাবে বলতে গেলে, চীন নানা ধরনের অশুল্ক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে মার্কিন দ্রব্যসামগ্রীকে অবাধ চীনের বাজার থেকে দূরে


সরিয়ে রাখছে এবং বাণিজ্যে অযাচিত সুবিধা আদায়ের জন্য তার মুদ্রাকে কৃত্রিমভাবে অবমূল্যায়িত করে রেখেছে। যার ফলে মার্কিন অর্থনীতি চীনের বিপরীতে বছরের পর বছর শত শত বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতির চাপ সামলে উঠতে পারছে না। এ জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনবরত চীনের ওপর চাপ দিয়ে যাচ্ছে। এ দু'ব্যাপারে আমেরিকার আবদার, দাবি এবং চাপের মুখে যখন যা সুবিধা চীন তাই বলছে। কিন্তু কার্যত কোনো বিষয়ে আমেরিকাকে একটুও ছাড় দিচ্ছে না।
তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলতে গেলে চীন তার মনের কথাটি বলে এভাবে_ 'আমরা এখনও গরিব। আমাদের বার্ষিক মাথাপিছু গড় আয় ৫ হাজার ডলারেও ওঠেনি। আমেরিকার মতো মুক্ত বাণিজ্যনীতি মেনে চলার মতো সময় আমাদের এখনও হয়নি।' কথাটা একেবারে ফেলে দেওয়ার মতোও নয়।
গত বছর আমি একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে তাইওয়ান গিয়েছিলাম। এয়ারপোর্টে আমাকে রিসিভ করতে এসেছিল ট্যামক্যাং ইউনিভার্সিটির কয়েক তরুণ ছাত্র। কথা প্রসঙ্গে তাদের বলেছিলাম, 'তোমরা মূল চীনের সঙ্গে এক হতে চাও না কেন?' তারা জবাব দিল, 'আমরা উদার গণতন্ত্র ও ব্যক্তিস্বাধীনতাকে বিসর্জন দিতে চাই না।' আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম, 'তোমরা স্বাধীন, কিন্তু দুর্বল। তোমাদের স্বাধীনতা কি আমেরিকার হাতে বন্দি নয়? চীনের সঙ্গে মিশে গেলে তোমরা হবে একটি উদীয়মান পরাশক্তির অংশ।' ছেলেগুলো সমস্বরে উত্তর দিল, 'তাদের শক্তি আছে, কিন্তু তারা গরিব, আমরা ধনী। আমাদের আয় যেখানে ২০ হাজার ডলার, তাদের আয় ৫ হাজারও না।' গরিবি অপবাদ দূর করতে হলে চীনকে আরও অনেক পথ হাঁটতে হবে অনেক দিন ধরে।
কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ততদিন অপেক্ষা করতে নারাজ। এই সেদিন প্রেসিডেন্ট ওবামা চীনের ওপর অধৈর্য এবং বিরক্ত হয়ে কথা বলেছেন। চীন এখন পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। তার জিডিপি জাপান ও জার্মানিকে অতিক্রম করে ৫ হাজার বিলিয়ন ডলারের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক সাহায্য এবং আন্তর্জাতিক সংস্থায় চীনকে এখন একজন প্রাপ্তবয়স্ক ও পরিপকস্ফ খেলোয়াড়ের মতোই খেলতে হবে। আন্তর্জাতিক সব ক্ষেত্রে তাকে তার যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে।
ওবামার এ কথার সূত্র ধরে জনৈক সাংবাদিক ও অনলাইন ব্লগার ডেনিয়েল গ্রস সম্প্রতি চীন সফর করে এসে ইন্টারনেটে একটি রিপোর্ট পোস্ট করেছেন। ডেনিয়েল লিখেছেন, তার চীন সফরকালে তিনি সে দেশের অনেক সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, শিল্প-কলকারখানা ঘুরে দেখেছেন, জিয়ান শহর থেকে একটু দূরে পাড়াগাঁয়ের মানুষদের সঙ্গেও থেকেছেন। তার মতে, চীনে এখন প্রচুর বিলাসবহুল দোকানপাট গড়ে উঠেছে, নামিদামি হোটেল হয়েছে, উঁচু উঁচু দালান আছে। তৈরি হয়েছে চওড়া ও চকচকে রাস্তাঘাট। সাংহাই, বেইজিং এবং কোস্টাল বেল্টের কিছু জায়গায় মানুষের জীবনমান ও চাকচিক্য দেখলে যে কারও চোখ ঝলসে যাবে। কিন্তু দেশের ৫০ শতাংশেরও বেশি মানুষ এখনও গরিব। অনেক গরিব। তারা এখনও লাঙ্গল-জোয়াল ছাড়া কিছুই চেনে না।
ডেনিয়েলের মতে, প্রতিরক্ষাতেও চীন আমেরিকার চেয়ে অনেক পেছনে। তিনি বেইজিংয়ে চীনা সেনাবাহিনীর ষষ্ঠ সাঁজোয়া ইউনিটের সদর দফতরে গিয়েছিলেন। সেখানে যেসব ট্যাঙ্ক দেখেছেন সেগুলো আমেরিকায় গত শতাব্দীর সত্তর দশকে ব্যবহৃত হতো। চীন প্রতিরক্ষা খাতে খরচ করে তার জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র করে তার জিডিপির (আমেরিকার জিডিপি চীনের ৩ গুণ) প্রায় ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। এটা ঠিক, চীন এখনও সমরসজ্জায় আমেরিকার কাছাকাছি আসতে পারেনি। তাই বলে চীন এ প্রতিযোগিতায় কোনো হিসাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র্র থেকে ৪০ বছর পেছনে নয়। ষষ্ঠ সাঁজোয়া ইউনিটে ডেনিয়েল যেসব পুরনো ট্যাঙ্ক দেখেছেন, এগুলোই যে চীনের সব_ তা তাকে কে বলল?
ডেনিয়েলের মতে, চীনে গণতন্ত্র নেই। কমিউনিস্ট পার্টিকে নির্বাচনের জন্য ৪-৫ বছর পরপর জনগণের সামনে হাজির হতে হয় না। আপাতদৃষ্টিতে সরাসরি তাদের কোনো জবাবদিহিতাও নেই। তথাপি সে দেশের কমিউনিস্ট পার্টি এবং সরকারি প্রশাসন সাধারণ জনগণ ও এলিট শ্রেণী থেকে ভীষণ চাপের মুখে আছে। ডেনিয়েলের আশঙ্কা, অর্থনীতিতে ক্রমাগত প্রবৃদ্ধি দেখাতে না পারলে, পিছিয়ে পড়া জনগণের অবস্থার দ্রুত উন্নতি করতে না পারলে চীনা কমিউনিস্ট সিস্টেম যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। ডেনিয়েলের এ উপসংহারের সঙ্গে আমি একমত হতে পারি না। পশ্চিমা সাংবাদিক ও বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে চীন সম্পর্কে এমন ধারণার কথা আমরা ৩০ বছর ধরেই শুনে আসছি। তা সত্ত্বেও চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা আজও অটুট আছে এবং তাদের অর্থনীতিও উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির দিকেই যাচ্ছে।
তবে ডেনিয়েলের সর্বশেষ একটি মন্তব্যের সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করি। চীনের অর্থনীতি যতই শক্তিশালী হোক, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যতই জোরদার হোক; আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনীতি ও সমরনীতিতে চীন এখনও এক পা এগোলে তিন পা পেছায়। কোনো কিছুতেই যেন মনস্থির করতে পারে না। চীনের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রায়ই দেখা যায় সাহসের অভাব, আস্থার অভাব, দৃঢ়তার অভাব। চীনের এ দৈন্যদশার পরিবর্তন হতে অনেক দেরি বলে মনে হয়। আর তাই ডেনিয়েলের সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমারও বলতে দ্বিধা নেই যে, চীন সাম্রাজ্য শরীরে ডাঙর হলেও মনের দিক থেকে এখনও শিশুসুলভ।

আবু এন. এম. ওয়াহিদ :অধ্যাপক
টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি
এডিটর_ জার্নাল অব ডেভেলপিং এরিয়াজ
awahid@tnstate.edu