অপর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতায় আত্মপ্রেরণাই পাথেয় by শাহজাহান কবির

কসময় মেয়েরা ছিলেন পুরোপুরি অন্তঃপুরবাসিনী। সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে ধীরে ধীরে জয় করে লেখাপড়া, সংস্কৃতিচর্চা, চাকরি, খেলাধুলায় নিজেদের সম্পৃক্ত করেছেন সেটা বেশ দূরের অতীত। তাই বলে প্রতিবন্ধকতা কি একেবারেই নেই? থাকলে কতটুকু আছে? সেগুলো সঙ্গে নিয়ে কতটা এগিয়েছে বাংলাদেশে মহিলাদের ক্রীড়াঙ্গন? আরো এগোতে হলে কী কী করার আছে, করা হচ্ছে কতটুকু? এসব জানতে আর জানাতেই তিন পর্বের এই ধারাবাহিক। আজ শেষ পর্বে থাকছে বর্তমানের সম্ভাবনা ও আশা-নিরাশার কথা।আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শতবর্ষ উদ্যাপিত হয়েছে গত বছর।


বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দিবসটিতে মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু করা হয়েছিল উদ্বাস্তু নারীদের সীমাহীন দুঃখ-যাতনার বিষয়টিকে। কিন্তু সে বছর বাংলাদেশে ঘটে গেছে বড় ঘটনা, নারীদের উন্নয়নে যা বড় প্রেরণা হিসেবেই বিবেচনা করা যায়। নারী উদ্যোগ কেন্দ্রও সুযোগটা হাতছাড়া করতে চায়নি। তারা সম্মানিত করে দেশকে সর্বোচ্চ সম্মান এনে দেওয়া এসএ গেমসের সোনাজয়ী মেয়েদের।
কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক মাসুদা বেগম শেফালী, সংসদ সদস্য মাহবুব আরা গিনি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বা বিশেষ অতিথি হয়ে আসা দাবার মহিলা আন্তর্জাতিক মাস্টার রানী হামিদ, সাবেক মহিলা ক্রীড়াবিদ ডলি ক্রুজ, কামরুন নাহার ডানারা তাঁদের বক্তব্যে একই সুরের অনুরণন তুলেছিলেন, মেয়েদের খেলাধুলাকে স্রেফ বিনোদন বা সংস্কৃতি হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এটা বরং মূল্যায়িত হোক নারীদের শারীরিক ও মানসিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে, যা পুরুষের সঙ্গে তাদের বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে হবে বড় হাতিয়ার।
এসএ গেমসে সোনাজয়ী শারমিন আক্তার রত্না, সাদিয়া সুলতানা, তৃপ্তি দত্ত, জঅপ্রু মারমা, ওসাইনু মারমা, মুনি্ন খানম, মরিয়ম খাতুন বিপাশা, শারমিন ফারজানা রুমি, শাম্মি আক্তার, ইতি ইসলামরা এই দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্নির্মাণে কৃতিত্ব পাবেন। কিন্তু তাতে পরিবর্তন কতটুকু হবে? সাফল্যের এ ধারা কি একই গতিতে ছুটবে? সম্ভাবনা জাগিয়ে নিভে যাওয়ার অসংখ্য গল্প আমাদের ক্রীড়াঙ্গনে পুরনো। উসাইনু, জঅপ্রু, ইতি, শাম্মী, রুমিরা জানেন না তাঁদের পরবর্তী গন্তব্য কী? এসএ গেমসের পর উশুতে ইতি ইসলামের নাম আর শোনা যায়নি। উশু নামে যে একটা খেলা আছে, বাংলাদেশে সেটাই হয়তো এখন গবেষণা করে বের করার বিষয়। কারাতেকা জঅপ্রু, বিপাশারা এখনো একটা টুর্নামেন্টের জন্য চাতক পাখির মতো অপেক্ষায় থাকেন। অথচ এই খেলাগুলোতে আরো বড় কিছু অর্জনের সম্ভাবনাই দেখিয়েছেন তাঁরা। রত্না-সাদিয়াদের পূর্বসূরি সাবরিনা সুলতানার কণ্ঠে তবুও হতাশার সুর, 'দেশকে অনেক অর্জন এনে দেওয়ার পরও বাস্তবিকপক্ষে আমাদের প্রাপ্তি তো কিছু নেই।' এসএ গেমস, কমনওয়েলথ শুটিংয়ে সোনা জেতার পর অলিম্পিকেও কিছু করে দেখানোর স্বপ্ন দেখা রত্নাকে উদ্যমহীন করে দেওয়ার জন্য এমন বাস্তবতাই হয়তো যথেষ্ট।
মেয়েদের ক্রিকেটে কিন্তু দারুণ সম্ভাবনার দ্বার খুলে গেছে। এশিয়ান গেসসের রুপাজয়ী দলটিকে নিয়ে আশার ভেলা ভাসানোই যায়। জাতীয় দলে শুরু থেকে সাথিরা জাকিরও তাঁদের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া আর খুব দূরে নয় বলেই বিশ্বাস করেন। পিছিয়ে রাখা যাবে না ফুটবলের মেয়েদেরও। গত পাঁচ বছরে অনিয়মিতভাবে দুটো জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় তারা কিন্তু সেরা তিন দলের একটি। সম্ভাবনা দেখিয়েছেন কাবাডির মেয়েরাও। দাবায় এক রানী হামিদ তো অনেক দিন থেকেই সামর্থ্য-সম্ভাবনার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন, পাশাপাশি আক্ষেপেরও। কারণ ২৫ বছরে আরো একজন রানী হামিদ বেরিয়ে আসেনি, তিনি নিজেও গ্র্যান্ড মাস্টার (জিএম) হতে পারেননি। এ জন্য তিনি দায় দেন কর্তাব্যক্তিদেরই, 'দাবার মেয়েরা কখনোই কোনো সুযোগসুবিধা পায়নি। ছেলেদের জন্য যা-ও কিছু কোচিং প্রোগ্রাম হয়েছে, মেয়েরা তা-ও পায়নি। মেয়েদের সমান গুরুত্ব দিলে শুধু আমার মতো আইএম কেন, জিএমও বেরোতে পারত।' তাঁর এই আক্ষেপ ক্রিকেট-ফুটবলের মতো এখনকার সম্ভাবনাময় খেলাগুলোতেও যে সত্যি হয়ে যেতে পারে_এ শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
প্রায় এক দশক ধরে মেয়েদের ট্র্যাকে দ্রুততম মানবীর খেতাব জেতা নাজমুন নাহার বিউটি ক্যারিয়ার শেষে কোনো একটা স্কুলে ক্রীড়া শিক্ষকের চাকরি পেলেও বর্তে যান। অথচ এই অঙ্গনে শুরুর দিকের অনুপ্রেরণার জায়গাটা ছিল বড়। হামিদা বেগম, রওশন আক্তার ছবি, জ্যোৎসনা আফরোজ, রাজিয়া সুলতানা অনু, শামীমা সাত্তার মিমু, নাজমা শামীমরা ব্যাংকের ডিজিএম, বিজেএমসি বা বিটিএমসির মিলে উপমহাব্যবস্থাপক, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের উপসচিব বা বিকেএসপির পরিচালকের মতো গুরুত্বপূর্ণে পদে আসীন ছিলেন দীর্ঘদিন, কেউ কেউ এখনো আছেন। লেখাপড়া করলেও ক্রীড়া ক্ষেত্রের সাফল্যই মূলত তাঁদের এমন সুযোগ করে দিয়েছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট ভিন্ন। বিটিএমসির মতো বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ক্রীড়াঙ্গন থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। বিজেএমসিও তাদের পৃষ্ঠপোষকতার পরিধি কমিয়েছে, সমানতালে ক্রীড়াঙ্গনে কমেছে 'শিক্ষিত' মেয়েদের পদচারণাও। টানা ছয়বারের সাবেক দ্রুততম মানবী সুফিয়া খাতুন মনে করেন, 'স্কুল-কলেজ পর্যায়ে খেলাধুলার চর্চা কমে যাওয়াই এর প্রধাণ কারণ। দেখুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন খেলোয়াড় কোটা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। অভিভাবকরা তাহলে কোত্থেকে আগ্রহী হবেন তাঁদের মেয়েকে খেলাধুলায় দেওয়ার জন্য?'
আমাদের দেশে এখনো অসুস্থ নারী একজন নারী চিকিৎসকের কাছে যেতেই স্বস্তি বোধ করে। এমন বাস্তবতায় ক্রীড়াঙ্গনে যদি দৃষ্টি দেওয়া যায়, সেখানে কতটা স্বস্তিদায়ক পরিবেশ আছে মেয়েদের জন্য? নারী ক্রীড়াবিদরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে বিভিন্ন সময়ই খবর বেরিয়েছে। কদিন আগেও এক মহিলা সাঁতারুকে যৌন হয়রানির দায়ে বহিস্কার হয়েছেন আনসারের সাঁতার কোচ। হ্যান্ডবল ও ফুটবলে সমানভাবে নিজের নামটাকে পরিচিত করা ডালিয়া আক্তার এ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তাই তীব্র হতাশাই প্রকাশ করলেন, 'এখন এতগুলো খেলায় মেয়েরা অংশ নিচ্ছে; কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখুন মহিলা কোচ নেই বললেই চলে। ফুটবল, হ্যান্ডবল, ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিসের কথা বাদই দিলাম। কাবাডির মতো 'বডি কন্টাক্ট' গেমেও আমাদের মহিলা কোচ নেই, সাঁতারে তো নেই-ই।' জাতীয় মহিলা পরিষদের সভানেত্রী আয়শা খানমও মনে করেন পরিবর্তন আনতে হবে এমন জায়গাগুলোতে, 'আমাকে অনেকে জিজ্ঞেস করে খেলাধুলায় যে যৌন হয়রানি হচ্ছে তা নিয়ে আপনারা কতটা সোচ্চার? আমি বলি এতে সোচ্চার হয়ে অভিভাবকদের কেবল আতঙ্কিতই করা হবে। বরং পরিবর্তনটা আনতে হবে মূল জায়গায়। মেয়েদের খেলায় মহিলা কোচ, নিদেনপক্ষে দলের সঙ্গে মহিলা ম্যানেজার থাকা উচিত। ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোতেও মেয়েদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই, থাকলে মেয়েরা আরো স্বস্তিকর একটা পরিবেশ পেত।'
জাতীয় মহিলা ক্রীড়া সংস্থাও এ পরিবর্তনটাকে অগ্রাধিকার দেয় বলে জানিয়েছেন সম্পাদক মাহফুজা আক্তার কিরণ, 'আমরা এ বছর সাঁতার, বাস্কেটবল, আর্চারিতে কোচেস কোর্স করিয়েছি, যা আগে কখনো হয়নি। তবে শুধু আমরা না, ফেডারেশনগুলোরও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসা উচিত।' তবে শুধু ফেডারেশনই বা কেন, দেশে নারী ও শিশুবিষয়ক একটি মন্ত্রণালয়ও আছে। সেই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শিরিন শারমিন চৌধুরী 'ক্রীড়া ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ ও অর্জনটাকে আমরা সব সময়ই গুরুত্বের চোখে দেখি' বলে মন্তব্য করলেও পরে স্বীকার করতে হয়েছে, 'না, মেয়েদের খেলাধুলা নিয়ে আমাদের আলাদা কোনো কার্যক্রম নেই। ক্রীড়া বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে আমরা আমাদের চাহিদাগুলো জানাই। তবে যৌথভাবে এখনো আলাদা করে কোনো কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়নি।'

No comments

Powered by Blogger.