রঙ্গব্যঙ্গ-টোটালি সৎ মন্ত্রীর কাল্পনিক সাক্ষাৎকার by মোস্তফা কামাল

সৈয়দ আবুল হোসেন আমাদের যোগাযোগমন্ত্রী। অনেকে বলেন আবুল মন্ত্রী। সম্প্রতি একটি বেফাঁস উক্তি করে ধরা খেয়েছেন। জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের সেই বহুল আলোচিত 'উই আর লুকিং ফর শত্রুস' উক্তির মতোই বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে তিনি বলেছেন, 'আমি টোটালি সৎ মন্ত্রী।' তাই 'টোটালি সৎ মন্ত্রী' মানেই আবুল হোসেন।


আবুল হোসেনকে নিয়ে অনেক দিন ধরেই পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হচ্ছে। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তাঁর যোগ্যতা-দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তিনি সারা দেশের ভাঙাচোরা সড়ক সংস্কারের পরিবর্তে বড় বড় প্রকল্প নিয়ে বেশি ব্যস্ত। কারণ ওগুলোতে অর্থ এদিক-সেদিক করার সুযোগ বেশি। ঈদের আগে ঘরেফেরা মানুষের নিদারুণ বিড়ম্বনার কারণেও যোগাযোগমন্ত্রীর কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে তাঁর একটি কাল্পনিক সাক্ষাৎকার আমরা পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরছি।
প্রশ্ন : আপনি মি. আবুল...আবুল...
আবুল হোসেন : দেখুন, আমি আবুল নই। আমার নাম সৈয়দ আবুল হোসেন।
প্রশ্ন : ও আচ্ছা। আপনার পেশা?
আবুল হোসেন : ব্যবসা। আমাকে একজন সফল ব্যবসায়ী বলতে পারেন।
প্রশ্ন : হুম, ব্যবসায়ী থেকে রাজনীতিক আবুল হোসেন?
আবুল হোসেন : আমি রাজনীতিক নই। ব্যবসায়ীই আছি।
প্রশ্ন : মানে!
আবুল হোসেন : মানে বুঝলেন না? সাকো ইন্টারন্যাশনাল দেশের একটি অন্যতম ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। আমি নিজে এর দেখাশোনা করি। নিজের ব্যবসা নিজে না দেখলে চলে? আজ মন্ত্রী আছি, কাল তো নাও থাকতে পারি! লাভজনক না হলে তো আপনারাই লিখবেন, মন্ত্রীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানই তো রুগ্ণ। তিনি মন্ত্রণালয় চালাবেন কী!
প্রশ্ন : মন্ত্রণালয়ও চালাচ্ছেন, ব্যবসাও দেখছেন এই তো? এর আগেও তো আপনি আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন, তাই না?
আবুল হোসেন : জি, ছিলাম।
প্রশ্ন : আপনি তখন লাল পাসপোর্টধারী হয়েও ব্যবসায়িক কাজে সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে গিয়েছিলেন?
আবুল হোসেন : হুম, তখন আপনারাই আমাকে ডুবিয়েছিলেন। তার শাস্তিস্বরূপ আমাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। সেই অতীত থেকে আমি শিক্ষা নিয়েছি।
প্রশ্ন : কী শিক্ষা নিয়েছেন?
আবুল হোসেন : তখন ছিলাম হাফ মন্ত্রী। আর এখন ফুল মন্ত্রী। এবার আমাকে যাতে কেউ বরখাস্ত করতে না পারে, সেই ব্যবস্থা নিয়েছি।
প্রশ্ন : ঠিক বুঝলাম না।
আবুল হোসেন : আমি ব্যর্থ হলেও যাতে কেউ আমাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিতে না পারে সে জন্য শক্ত খুঁটি ধরেছি।
প্রশ্ন : তাই? শক্ত খুঁটি...
আবুল হোসেন : বলা যাবে না। বুঝে নেন। দেখছেন না, কী দাপটের সঙ্গে আছি! আপনারা লেখালেখি করে কিছু করতে পারছেন? হা হা হা! পারবেন না। চেষ্টা করে কিছু করতে পারবেন না।
প্রশ্ন : তা তো দেখছিই! আচ্ছা, আপনাকে নিয়ে এত লেখালেখি হয়, আপনার তাতে মন খারাপ হয় না? লজ্জা লাগে না?
আবুল হোসেন : কেন মন খারাপ হবে? মন খারাপ করলে তো হাত গুটিয়ে ঘরে বসে থাকতে হবে। আর লজ্জা? মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার আগেই ভ্রূ কেটে ফেলেছি। কাজেই এখন আর লজ্জা নেই।
প্রশ্ন : আপনাকে নিয়ে উইকিলিকসের রিপোর্টটা দেখেছিলেন?
আবুল হোসেন : হ্যাঁ। ফালতু কথাবার্তা লিখছে। এ জন্য তো বললাম, আমি টোটালি সৎ। আমাকে নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। মরিয়ার্টির কাছে সহযোগিতা চেয়ে কি দোষ করেছি? আসলে আমার ভালো কেউ দেখতে চায় না। এ জন্যই আমার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যমূলকভাবে লেখানো হয়। আমার মতো ভালো কাজ কে করেছে?
প্রশ্ন : আপনি কি কি ভালো কাজ করেছেন?
আবুল হোসেন : রেলওয়ের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। উড়াল সেতু, পাতাল রেল, মনোরেল_এসব নিয়ে কাজ করছি। যোগাযোগ ব্যবস্থা এমন আধুনিক করব, লোকে যাতে বলে, এ তো ঢাকা শহর নয়, যেন সিঙ্গাপুর!
প্রশ্ন : আধুনিকায়ন করুন, ভালো কথা। কিন্তু রাস্তাঘাটে তো গাড়ি চলাচলই দায়! এগুলো ঠিক করছেন না কেন?
আবুল হোসেন : বিএনপি-জামায়াত জোট আমলের পাঁচ বছর এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলের দুই বছর তো রাস্তা মেরামতের কোনো কাজই হয়নি। এ জন্য রাস্তার অবস্থা এত খারাপ! এখন এগুলো ঠিক করে ফেলব।
প্রশ্ন : আপনি কি আগে জানতেন না, রাস্তাঘাটের অবস্থা খারাপ?
আবুল হোসেন : জানতাম।
প্রশ্ন : তাহলে আগে ঠিক করেননি কেন?
আবুল হোসেন : ফান্ড পাইনি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ধরনা দিয়েছি। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। এখনো ধরনা দিয়ে যাচ্ছি।
প্রশ্ন : কিন্তু অর্থমন্ত্রী তো আপনাকেই দায়ী করলেন! আপনি নাকি কোনো ফান্ড চাননি?
আবুল হোসেন : তিনি মুরবি্ব মানুষ। তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করতে চাই না। তবে সমস্যা হচ্ছে, তাঁর বয়স হয়েছে তো! তাই তিনি সব কিছু ভুলে যান। এটা তাঁর দোষ নয়, বয়সের দোষ!
প্রশ্ন : তিনি না হয় বয়সের দোষে ভুলে যান, আপনি কী করলেন? আপনি তো প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেতে পারতেন?
আবুল হোসেন : আসলে আমি বড় বড় প্রকল্প নিয়ে বেশি ব্যস্ত ছিলাম তো, তাই এই ছোটখাটো কাজের দিকে নজর দেওয়া হয়নি।
প্রশ্ন : এগুলো ছোটখাটো কাজ?
আবুল হোসেন : হ্যাঁ। আপনারা সাংবাদিকরা ইস্যুটাকে বড় বানিয়ে ফেলেছেন। তিলকে তাল বানিয়েছেন। আচ্ছা ভাই, আমার আচার-ব্যবহার তো অত খারাপ না। আমার বিরুদ্ধে এভাবে আপনারা লাগলেন কেন?
প্রশ্ন : আপনার বিরুদ্ধে লাগার কী আছে? সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ। সেগুলো নিয়েই রিপোর্ট করা হচ্ছে।
আবুল হোসেন : আরে না, না। এর মধ্যে কিন্তু আছে। আপনিই বলেন, মন্ত্রী রাস্তাঘাট ঠিক করবে, নাকি বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে? রাস্তাঘাট মেরামত তো সড়ক ও জনপথ বিভাগ করবে! তারা কেন করে না? আসলে আমার কথা কেউ শোনে না।
প্রশ্ন : আপনি একজন পাওয়ারফুল মন্ত্রী। আপনার কথা শোনে না মানে?
আবুল হোসেন : কী আর বলব ভাই! সব কথা তো বলাও যায় না। আসলে আমি খুব বিপদে আছি।
প্রশ্ন : তার মানে আপনি পারছেন না, আপনি ব্যর্থ?
আবুল হোসেন : না, না, আপনি কী বলেন! আমি টোটালি সফল! হা হা হা! আমার মতো সফল মন্ত্রী একটা খুঁজে বের করেন! পাবেন না! কিছুদিন পর আপনারাও আমার পক্ষে লেখা শুরু করবেন! হা হা হা!
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক