রাজনৈতিক আলোচনা- 'আওয়ামী লীগে মিলন ও বিচ্ছেদের নাটক' by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই, এ তো অনেক পুরোনো প্রবাদ। উপদলীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে এই প্রবাদ যে আরও বড় বাস্তবতা হয়ে ওঠে, তা আরেকবার প্রমাণিত হলো চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক মেরুকরণের মধ্য দিয়ে। এ অঞ্চলের আওয়ামী রাজনীতির খবর যাঁরা রাখেন, তাঁরা এক মঞ্চে সাবেক মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী, পদবঞ্চিত নেতা আ জ ম নাছির উদ্দিন ও সাংসদ এম এ লতিফকে দেখে চমকে উঠবেন সন্দেহ নেই। অন্যদিকে তাঁদের জন্য সমান বিস্ময়ের সংবাদ মন্ত্রী আফছারুল আমীন, সাংসদ নুরুল ইসলাম বিএসসি ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামের একাত্মতাও। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, এভাবে বাঘে-মোষে এক ঘাটে পানি খাওয়াল কে?
দেরিতে হলেও আওয়ামী লীগ চট্টগ্রামে দলের বিবদমান গ্রুপগুলোকে এক করার ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছে। বিরোধী দলের আন্দোলনের কর্মসূচি মোকাবিলার বিষয়টি মাথায় রেখে এ উদ্যোগ। দলের মধ্যে বিভক্তির ব্যাপারটি আগেই জানতেন দলের নীতিনির্ধারকেরা। বিশেষ করে সংসদ নির্বাচনের সময় স্থানীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে দলের মনোনীত প্রায় সব প্রার্থীরই টানাপোড়েনের ব্যাপারে তাঁরা ওয়াকিবহাল ছিলেন। কিন্তু নির্বাচনে এই প্রার্থীদের বিপুল বিজয় আপাতত স্বস্তি এনেছিল তাঁদের মনে। বিরোধ মেটানোর কোনো বড় উদ্যোগ তাই দেখা যায়নি তখন। পরবর্তীকালে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় এই বিরোধ ওঠে তুঙ্গে। সংসদ নির্বাচনে মহিউদ্দিন চৌধুরীর ইট নিক্ষেপে আহত হয়েছিলেন যাঁরা, তাঁরা পাটকেল ছোড়ার এই মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া করেননি। তখন স্থানীয় নেতাদের ঢাকায় ডেকে নিয়ে একটি সমঝোতার প্রয়াস চালিয়েছিলেন খোদ দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা। নেত্রীর উপস্থিতিতে মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ-বিক্ষোভ জানিয়ে বিষোদ্গার এমনকি অশ্রুপাতও করেছিলেন ব্যথিত, অপমানিত কয়েকজন নেতা। শেখ হাসিনা সব শুনে উভয় পক্ষের জন্য ‘শান্তির ললিত বাণী’ শুনিয়েছিলেন, সব ভুলে দলীয় মেয়র প্রার্থীর (মহিউদ্দিন চৌধুরী) পক্ষে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর ওই বাণী যে শেষ পর্যন্ত ‘ব্যর্থ পরিহাস’ হয়ে উঠেছিল, সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল তারই প্রমাণ।
মেয়র নির্বাচনে মহিউদ্দিন চৌধুরীর পরাজয় তাঁর মধ্যে কতটা বোধোদয় ঘটিয়েছে জানি না, তবে দলের স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব যে অনেকটাই খর্ব হয়েছে, তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই।
এখন দেরিতে হলেও দলে ঐক্য ও সংহতি ফিরিয়ে আনার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা নিশ্চয় ইতিবাচক। জানা গেছে, কিছুদিন আগে হজে যাওয়ার সময় মহিউদ্দিন চৌধুরী দেখা করেছেন শেখ হাসিনার সঙ্গে। নেত্রী তাঁকে দলের সবাইকে নিয়ে কাজ করার পরামর্শ দেন। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে গিয়ে মহিউদ্দিন তাঁর বিরোধী শিবিরে অবস্থানরত সাংসদ এম এ লতিফ এবং আ জ ম নাছিরকে একত্র করে প্রাথমিক সাফল্যও দেখিয়েছেন। কিন্তু ঐক্য-উদ্যোগের খাটো কাঁথাটি দিয়ে মাথা ঢাকলে পা বেরিয়ে পড়ে, পা ঢাকলে মাথা। মহিউদ্দিন যখন বিরোধী শিবিরের দুই নেতাকে এক মঞ্চে এনেছেন, তখন তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের কেউ কেউ ভিড়েছেন অন্য পক্ষে। যেমন তাঁর দীর্ঘদিনের সহমর্মী মন্ত্রী আফছারুল আমীন যদি সাংসদ নুরুল ইসলাম বিএসসির সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেন, তাতে হয়তো অবাক হওয়ার কিছু থাকে না। কারণ, সেই বীজ উপ্ত হয়েছিল সংসদ নির্বাচনের সময় থেকেই। কিন্তু যাঁকে তিনি দলীয় প্রার্থী করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন এবং তাতে ব্যর্থ হয়ে পরবর্তীকালে সিডিএর চেয়ারম্যান পদে নিয়োগের তদবির করে সফল হয়েছিলেন, সেই আবদুচ ছালামই যদি বিরোধী শিবিরে অবস্থান নেন, তা বিস্ময়কর বৈকি!
দেখা গেল, মহিউদ্দিন চৌধুরী যখন লতিফ ও নাছিরকে নিয়ে তাঁর বাসায় বৈঠক করে কর্মীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টির চেষ্টা করছেন, তখন সার্কিট হাউসে আফছারুল আমীন, নুরুল ইসলাম, আবদুচ ছালামেরা অন্য একদল কর্মীকে উজ্জীবিত করছেন, যেখানে সাবেক ও বর্তমান অনেক ওয়ার্ড কাউন্সিলরও উপস্থিত ছিলেন। দুটি বৈঠকই ঐক্য-প্রক্রিয়ার অংশ, কিন্তু একটি অন্যটির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগে সোচ্চার। অর্থাৎ ঐক্যের গল্পটি ‘শেষ হয়েও হইল না শেষ’।
আসলে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সংগঠনে কোন্দলের ইতিহাস দীর্ঘকালের। সেই আজিজ-জহুরের আমলেও ছিল, এখনো আছে। কোন্দলের কারণে কত যে সাংগঠনিক কর্মসূচি পণ্ড হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই; প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে অনেক। একসময় মহিউদ্দিন-আখতারুজ্জামান চৌধুরী গ্রুপের মধ্যে রেষারেষি এখানকার রাজনীতিতে প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল। সময়ের স্রোতে সেই দ্বন্দ্বের অবসান হয়েছে। চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে একচ্ছত্র হয়ে উঠেছেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। নগর আওয়ামী লীগে দীর্ঘকাল পর্যায়ক্রমে সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। পাশাপাশি প্রায় ১৭ বছর ছিলেন নগরপিতা। সব মিলিয়ে যত বড় দায়িত্ব দল তাঁর কাঁধে দিয়েছে বা তিনি অর্জন করেছেন, তার প্রতি পুরোপুরি সুবিচার তিনি করতে পেরেছেন, তা বলা যায় না। তাঁর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার মতো কণ্ঠ যখন দলে ছিল না, তখন তিনি তৈরি করতে পারতেন নতুন ও যোগ্য নেতৃত্ব, যাঁরা এমনকি কেন্দ্রেও দলের প্রতিনিধিত্ব করতে পারতেন। তাঁর আশপাশে সে রকম সম্ভাবনাময় তরুণের সংখ্যাও বড় কম ছিল না। অথচ এম এ আজিজ, জহুর আহমদ চৌধুরী, এম এ মান্নান, আতাউর রহমান খান কায়সার, আখতারুজ্জামান চৌধুরী বা মোশাররফ হোসেনের পর সে রকম কাউকেই তো দেখি না, যাঁরা চট্টগ্রাম থেকে গিয়ে কেন্দ্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। তরুণ নেতৃত্ব সৃষ্টির ক্ষেত্রে এই যে দৈন্য, তার দায় কার বা কাদের?
যা-ই হোক, ঐক্যের যে প্রক্রিয়া আজ শুরু হয়েছে, তা অর্থবহ করে তুলতে হলে খোলামনে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে। সার্কিট হাউসের কর্মিসভায় আফছারুল আমীন বলেছেন, ‘আমি মনে করেছিলাম আমাদের নেতা (মহিউদ্দিন চৌধুরী) দীর্ঘদিন অনেক সংগ্রাম করেছেন, আমাদের তৃণমূল থেকে তুলে এনেছেন, তিনি সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে দলের জন্য কাজ করবেন। কিন্তু তাঁর কাছে আমরা এখনো সেটা দেখছি না। আমরা কোনো দিন তাঁকে অসম্মান করব না...’ ইত্যাদি। এই বক্তব্যের মধ্যে ক্ষোভ যেমন আছে, তেমনি আছে আবেগ-অভিমানও। এখানেই একটি সম্ভাবনার সূত্র তৈরি হয়। যাঁদের সঙ্গে দীর্ঘকালের বিরোধ (আ জ ম নাছির উদ্দিন), যাঁদের সঙ্গে প্রায় অহি-নকুল সম্পর্ক (সাংসদ এম এ লতিফ), তাঁদের সঙ্গে যদি মিলনের পথ তৈরি করা যায়, দীর্ঘ সুসম্পর্কের পর যাঁদের সঙ্গে স্বল্পদিনের বিরোধ (আফছারুল আমীন, নুরুল ইসলাম, এম এ ছালাম), তাঁদের সঙ্গে বিচ্ছেদ তৈরি করা কি অনিবার্য?
আমাদের ধারণা, উভয় পক্ষ এগিয়ে এলে বিভক্তির কারণগুলোকে সামান্য ও তুচ্ছ মনে হবে। এতে সেই কর্মীদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে, যাঁরা দল থেকে পদ-পদবি বা অন্যান্য সুবিধার জন্য লালায়িত নন। এ ক্ষেত্রে মহিউদ্দিনকেই নিতে হবে অগ্রগামীর ভূমিকা। নইলে ঐক্য-প্রক্রিয়ার নামে নতুন নতুন মেরুকরণই শুধু হবে, কাজের কাজটি হবে না। মিলনের গান বেসুরো বাজতেই থাকবে।
========================
খবর- উইকিলিকসের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র  রাজনৈতিক আলোচনা- 'প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ সমাজের প্রত্যাশা আলোচনা- 'পায়ে পড়ি বাঘ মামা, বেঁচে থাকো'  আন্তর্জাতিক- 'পুরনো বন্ধুকে ত্যাগ করতে প্রস্তুত চীন  আমরাই পারি 'দ্বিতীয় রাজধানী' গড়তে  খবর- পুলিশি হরতাল  যুক্তি তর্ক গল্পালোচনা- 'উপদেশের খেসারত'  গল্প- 'স্বপ্নভঙ্গের ইতিবৃত্ত'  স্মরণ- 'জগদীশচন্দ্র বসুর কথা বলি'  যুক্তি তর্ক গল্পালোচনা- 'প্রধানমন্ত্রী কি হরতাল চান?  ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা রাজনীতির নতুমাত্রা  খবর, বিএনপি কর্মীদের দাঁড়াতে দেয়নি পুলিশ  গল্প- 'আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসারে'  গল্প- 'মহামানুষের গল্প' by রাসেল আহমেদ  গল্পালোচনা- 'যেভাবে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়!' by আলী হবিব  জলবায়ু সম্মেলনঃ আমি কেন কানকুনে যাচ্ছি? by মেরি রবিনস  ভ্রমণ- 'মেঘনায় যায় মেঘনা রানী' by সালেক খোকন  ভ্রমণ- 'গন্তব্য নাফাখুম' by জাকারিয়া সবুজ  আলোচনা- 'এখনো একটি গ্রেট গেইম অস্বস্তিকরভাবে প্রাসঙ্গিক' by এম আবদুল আজিজ  গল্পসল্প- জীবন ঢেকে যাচ্ছে বালুতে  প্রকৃতি- কোপেনহেগেন থেকে কানকুনঃ সময় এসেছে মুহূর্তটিকে কাজে লাগানোর by জেমস এফ মরিয়ার্টি  আলোচনা- দরিদ্র মানুষের পাঁজরের ওপর দুর্দান্ত পাজেরো  বিএনপির মিছিলে পুলিশ ও সরকার সমর্থকদের পিটুনি


দৈনিক প্রথম আলো এর সৌজন্যে
লেখকঃ বিশ্বজিৎ চৌধুরী
কবি, লেখক ও সাংবাদিক।


এই খবর'টি পড়া হয়েছে...
free counters

No comments

Powered by Blogger.