বাংলাদেশিদের শিরশ্ছেদে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন ক্ষুব্ধ, ব্যথিত

সৌদি আরবে গত শুক্রবার আট বাংলাদেশিকে শিরশ্ছেদ করার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ ও নিদারুণ বেদনার কথা জানিয়েছে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন। মানবাধিকার বিষয়ে বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানটি একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড প্রথা বাতিল করতে আরব দেশটির প্রতি আহবান জানিয়েছে। উল্লেখ্য, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ একাধিক মানবাধিকার সংস্থা আট বাংলাদেশির শিরশ্ছেদের পরপরই তার তীব্র নিন্দা জানায়।এদিকে আট বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ ঠেকাতে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ গ্রহণে বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা যথাযথ ছিল কি না, তা জানতে আদেশ চেয়ে গতকাল হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়েছে।


জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন অফিস থেকে আট বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের মুখপাত্র রুপার্ট কোলভিল বলেছেন, 'সৌদি আরবে গত শুক্রবার আট অভিবাসী কর্মীসহ মোট ১০ জনকে প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদের ব্যাপারে আমরা তীব্র ক্ষোভ ও কষ্টের অনুভূতি জানাচ্ছি।'
রুপার্ট কোলভিল বলেন, সৌদি আরব চলতি বছর এ পর্যন্ত ২০ জন অভিবাসী কর্মীর শিরশ্ছেদ করেছে বলে জানা গেছে। গত শুক্রবার শিরশ্ছেদের শিকার হওয়া বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে আইনজীবী ও বাংলাদেশ দূতাবাসের দেওয়া সেবা নেওয়ার সুযোগ ছিল। তবে সৌদি আরবের প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে অভিবাসী কর্মীদের আইনি সেবা পাওয়ার ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই ত্রুটিপূর্ণ।
রুপার্ট আরো বলেন, সৌদি আরবসহ যেসব দেশে এখনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যবস্থা রয়েছে সেসব দেশকে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ব্যক্তিদের মানবাধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন আহ্বান জানাচ্ছে। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ শাস্তির বিকল্প নির্ধারণের জন্য জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন সৌদি আরবের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে।
প্রসঙ্গত, ঢাকায় গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে সৌদি রাষ্ট্রদূত ডা. আবদুল্লাহ নাসের আল-বুসাইরি বলেছেন, আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা করতেই সৌদি আরব ওই আট বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ করেছে। মানবাধিকার সংগঠনের মতকে সৌদি আরব আল্লাহর বিধান কার্যকরের ঊধর্ে্ব স্থান দিতে পারে না।

সরকারের ভূমিকা জানতে রিট
সৌদি আরবে আট বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ ঠেকাতে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ গ্রহণে সরকারের ভূমিকা যথাযথ ছিল কি না, তা জানতে হাইকোর্টে আদেশ চেয়ে রিট আবেদন করেছেন 'হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ'-এর পক্ষে অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান সিদ্দিকী। আবেদনকারীর আইনজীবী মনজিল মোরশেদ সাংবাদিকদের বলেন, বিচারপতি ফরিদ আহম্মেদ ও বিচারপতি শেখ হাসান আরিফের বেঞ্চে আজ বুধবার এ আবেদনের শুনানি হতে পারে।
এক মিসরীয়কে হত্যার দায়ে শুক্রবার রিয়াদে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত আট বাংলাদেশির প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ করা হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এর তীব্র সমালোচনা করে আসছে। সৌদি সরকার ও বাংলাদেশ দূতাবাস বলছে, এ মৃত্যুদণ্ড ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলেও হত্যাকাণ্ডের শিকার মিসরীয় ব্যক্তির স্বজনরা ক্ষমা করতে রাজি না হওয়ায় কিছু করা যায়নি।
হাইকোর্টে দায়ের রিট আবেদনে ওই বাংলাদেশিদের জীবন রক্ষায় পর্যাপ্ত পদক্ষেপ গ্রহণে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তার কারণ জানাতে সরকারের প্রতি আদেশ চাওয়া হয়েছে।
মনজিল মোরশেদ বলেন, 'পত্র-পত্রিকায় আমরা দেখছি, ওই আট বাংলাদেশি সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে কার্যকর সাহায্য এবং আইনগত সহায়তা পাননি। এ জন্য রিট আবেদনটি দায়ের করা হয়েছে। রিট আবেদনে বিবাদী করা হয়েছে পররাষ্ট্রসচিব, বৈদেশিক কর্মসংস্থানসচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিভাগের পরিচালক, সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত ও লেবার কাউন্সিলরকে।'
রিট আবেদনের আর্জিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে দুটি কমিটি গঠনের আবেদন জানিয়ে বাংলাদেশিদের জীবন রক্ষায় সৌদি আরবে বাংলাদেশি দূতাবাসের ভূমিকা তদন্ত করে চার সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশিদের জীবন রক্ষায় কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তা জানিয়ে দুই সপ্তাহের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে।