শ্রমজীবীদের স্বার্থেই জিএসপি জরুরি by মো. আতিকুর রহমান

ওভেন ও নিটওয়্যার গার্মেন্ট অর্থাৎ তৈরি পোশাকশিল্প হলো বাংলাদেশের প্রধান রফতানি খাত। এই রফতানি খাতের প্রায় অর্ধেক ক্রেতাই যুক্তরাষ্ট্রের, যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশাল বাজার আমরা অর্জন করেছি মূলত স্বল্পমূল্যে তাদের মানসম্মত পোশাক রফতানি করার সক্ষমতা ও তাদের উৎপাদিত পণ্যে অধিক মুনাফা অর্জনের সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার মাধ্যমে। মূলত শ্রমজীবী স্বার্থ রক্ষার চাইতে স্বল্প মজুরির কারণেই বিশেষ করে উন্নত দেশগুলো এ দেশের গার্মেন্ট শিল্পের প্রতি অধিক আকৃষ্ট হয়েছে। আজ আমরা পোশাক রফতানিতে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছি মূলত আমাদের এই শক্তির জন্যই। বিশ্বের অন্যান্য দেশের চাইতে এত অল্প সময়ের মধ্যে শিল্পে আমাদের এমন সাফল্য সত্যিই ঈর্ষণীয় এবং অবাক করার মতো, যা ইতিমধ্যেই অনেক দেশকে ভাবিয়ে তুলেছে। ফলে এই শিল্প ঘিরে অনেক শত্রুও সৃষ্টি হয়েছে। এই রূপ পরিস্থিতিতে একে অপরকে দোষারোপ না করে এ শিল্পকে বাঁচাতে সবাইকে যার যার জায়গা থেকে আরও অধিক সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। এমনিতেই দেশে শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গার স্বল্পতা, উদ্যোক্তাদের আর্থিক অসচ্ছলতা, শিল্পে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, বিশেষ করে রাজনৈতিক অস্থিরতার নানা কারণে এ শিল্পটি এমনিতেই নানাবিধ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। সম্প্র্রতি এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মার্কিন প্রশাসনের জিএসপি স্থগিতের ঘোষণা, যা শিল্প সংশ্লিষ্টরাসহ সরকারকে এ বিষয়ে ভাবিয়ে তুলেছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রে নয়, ইউরোপসহ অন্যান্য দেশেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে অনেকে ধারণা করছেন, যা শিল্পের অগ্রগতির পথে প্রধান অন্তরায় বলে মনে করি। যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি সুবিধা স্থগিতের যে ঘোষণা দিয়েছে, তাতে বাংলাদেশের শ্রমমান নিয়ে বিশ্বজুড়ে ভাবমূর্তির সংকট তৈরি হবে।
শিল্পে বিরাজমান সংকট মোকাবেলায় বর্তমান সরকার ও বিজিএমইএ যার যার সাধ্যমতো কাজ করে যাচ্ছে। যদিও এ কথা সত্য, দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত নানামুখী সমস্যা একেবারে রাতারাতি সমাধান করা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে সম্মিলিতভাবে সমস্যাগুলো সমাধানে উদ্যোগী হলে সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব। আশা করব, সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ একে অপরের ওপর দোষ না চাপিয়ে কীভাবে এ সংকট নিরসন করে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ওই সুবিধা বহাল রাখা যায়, সে লক্ষ্যে কাজ করবেন। যুক্তরাষ্ট্র সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে এ দেশের পোশাকশিল্পকে আরও অধিক টেকসই করতে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করবে বলে আশা রাখতে চাই। বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণ এবং এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সবাইকে অধিক ফলপ্রসূ ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, এ শিল্পে ধস নামলে তা হবে দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ। যে কোনো ভুলের ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে এবং নিজেদের সংশোধন করতে হবে। তা যদি আমরা করতে না পারি তবে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ।
যেহেতু নিরাপদ কর্মপরিবেশ আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের অনুষঙ্গ। তাই শ্রমিক অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক শ্রমমানের ওপর অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। যদিও এ লক্ষ্যে সরকার শ্রম আইন যুগোপযোগীকরণ, শ্রমিক কল্যাণ তহবিল গঠন, ব্যক্তিমালিকানাধীন সড়ক পরিবহন শ্রমিক কল্যাণ বোর্ড গঠন, শ্রম আদালত পুনর্গঠন, জাতীয় ও শিশু শ্রমনীতি, পেশাগত স্বাস্থ্য ও সার্বিক নিরাপত্তানীতি প্রণয়নে নানাবিধ কাজ করে যাচ্ছে। এখন শুধু প্রয়োজন মালিকদের অধিক সদিচ্ছা। যদি কারখানায় মালিক-শ্রমিকের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব হয় তবে এ শিল্পের সব বাধা অতিক্রম করে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। বহির্বিশ্বেও এ শিল্পের দ্বারা ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। আশা করি, শিল্পে শ্রমবান্ধব কাজের পরিবেশ গড়ে তুলতে ও জিএসপি সুবিধা বহাল রাখতে সবাই সম্মিলিতভাবে এ সংকট মোকাবেলায় এগিয়ে আসবেন।
য় লাইব্রেরিয়ান, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউএফটি)