সূর্য-পাথর সত্যিই আছে!

ভাইকিংদের নাম শোনা আছে নিশ্চয়। জনশ্রুতি আছে, ভাইকিং নাবিক ও জলদস্যুদের কাছে থাকত এক বিশেষ ধরনের 'সূর্যপাথর', যা দিয়ে মেঘলা দিনে কিংবা রাতেও সূর্যের অবস্থান নির্ণয় করতে পারত তারা। জনশ্রুতির সেই সূর্যপাথরটি অবশ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু আইসল্যান্ডের অলডারনি উপকূলের কাছে ডুবে যাওয়া এলিজাবেথীয় যুগের একটি জাহাজ থেকে ১৫৯২ সালে উদ্ধার করা 'আইসল্যান্ড স্পার' নামের একটি খনিজ পাথরের মধ্যে পাওয়া গেছে অবিকল সেই বিস্ময়কর ক্ষমতা। ভাবা হচ্ছে, এটিই হচ্ছে ভাইকিংদের হারানো সেই সূর্যপাথর।


স্ক্যান্ডিনেভীয় অঞ্চলের নাবিকদের ডাকা হতো ভাইকিং নামে। তবে জাহাজি হিসেবে তারা যত না বিখ্যাত, ইতিহাসে তার চেয়েও বেশি কুখ্যাতি অর্জন করেছিল জলদস্যুতার কারণে। খ্রিষ্টীয় অষ্টম থেকে ১১ শতক পর্যন্ত উত্তর-পূর্ব ইউরোপের সাগর পারে বসবাস করত তারা। সমুদ্রেও তাদের অভিযাত্রাগুলো হতো উত্তেজনাপূর্ণ ও রোমাঞ্চকর। সাগরে দস্যুবৃত্তি করার কারণে মধ্যযুগের পুরো ইউরোপ তাদের ভয়ে তটস্থ থাকত। ইংরেজ, ফরাসি, স্পেনীয় জাহাজ দেখলেই পিছু নিত ওরা। স্টিম ইঞ্জিন আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে তাদের ছিল দোর্দণ্ড প্রতাপ। এমনকি ইতিহাসে এ-ও বলা আছে, ক্রিস্টোফার কলম্বাসের উত্তর আমেরিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ আবিষ্কারের আগে ভাইকিং জলদস্যুরাই সেই অঞ্চলটি আবিষ্কার করে সেখানে গোপন ঘাঁটি করেছিল। সাগরের লুটের মাল সেই অঞ্চলের কোথাও লুকিয়ে রাখত তারা। আটলান্টিক মানেই ঝড়ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ বিশাল মহাসাগর। এর মধ্যে জেগে আছে বিশাল বিশাল ডুবো পাহাড়, শীতে সেই সাগরের পানি হিম হয়ে আসে। মেঘলা আবহাওয়ায় সূর্যের মুখ দেখা যায় না প্রায় সময়েই। অথচ ভাইকিং জলদস্যুরা সাগরে ছুটত ক্লান্তিহীন। সেটা সম্ভব হতো কী করে?
লোকশ্রুতি বলে, সূর্যের অবস্থান শনাক্ত করার মতো বিশেষ পাথর ছিল তাদের। মেঘলা আবহাওয়াই হোক অথবা রাতই হোক, তাদের পাথরে বিশেষভাবে প্রতিফলিত হতো সূর্যের অবস্থান। ফলে দিক নির্ণয়ে তাদের কখনো ভুল হতো না। বিশেষ পাথরে অদৃশ্য সূর্যের অবস্থান নির্ণয় করে রাতের আঁধারেই তারা চালিয়ে যেত দ্রুতগতির জাহাজ_তা ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা জলদস্যুতা, যে উদ্দেশ্যেই হোক না কেন। ভাইকিংদের লোকগাথা অনুযায়ী, এক অন্ধকার মেঘাচ্ছন্ন রাতে রাজা ওলাফ সিগার্ডের সঙ্গে আলাপ করছিলেন। এ সময় সিগার্ড রাজার কাছে ওই মুহূর্তে সূর্যের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চান। রাজা সূর্যপাথরটি বের করে রাতের আকাশে মেলে ধরেন। আকাশের মৃদু আলোতেই ওই পাথরে সূর্যের অবস্থান দিব্যি শনাক্ত করেন তাঁরা।
সূর্যের অবস্থান নির্ণয়কারী এই পাথরটির কথা অন্য নাবিকদের শোনা থাকলেও ভাইকিংদের কাছ থেকে সেটা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ১৫৯২ সালে ভাইকিংদের দ্বারা ডুবিয়ে দেওয়া একটি এলিজাবেথীয় যুগের জাহাজ থেকে ঘটনাচক্রে প্রথম উদ্ধার করা সম্ভব হয় 'আইসল্যান্ড স্পার' নামের একটি বিশেষ স্বচ্ছ খনিজ পদার্থ। এত দিন এর গুণাগুণ না জানা থাকলেও সম্প্রতি রেনে ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক এই পাথরটি নিয়ে গবেষণার করে রীতিমতো বিস্মিত হয়ে যান। গবেষক দলের প্রধান ড. গাই রোপার্স জানান, দিগন্ত রেখায় সূর্য ডুবে যাওয়ার পরেও এই পাথরে কয়েক ডিগ্রি পর্যন্ত সূর্যের অবস্থান চমৎকারভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে। এ বিষয়ে আরো গবেষণা চলছে। তাঁরা ধারণা করছেন, এটিই হচ্ছে রূপকথার সেই 'ভাইকিং স্টোন'।
ভাইকিং স্টোন আসলে কী? সঠিক উত্তর এখনো জানা নেই। তবে ধারণা করা হয়, এটি হচ্ছে ক্যালসিয়াম কার্বনেট দিয়ে তৈরি এক ধরনের খনিজ পদার্থ, যেটি মূলত আইসল্যান্ড অঞ্চলেই পাওয়া যায়। চুনাপাথরের গঠনে তৈরি হলেও এটি স্বচ্ছ এবং কাচের মতো। এতে সূর্যের কিরণ প্রতিফলিত হতে পারে। এলিজাবেথীয় জাহাজটি থেকে খুঁজে পাওয়া আইসল্যান্ড স্পারের গঠনও কিন্তু প্রায় একই রকম। এ বিষয়ে আরো গবেষণা চলছে। সূত্র : দ্য টেলিগ্রাফ অনলাইন।