সংলাপের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে নাগরিক সমাজ by সিরাজুস সালেকিন

দেশের রাজনৈতিক সঙ্কটের টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে তৎপরতা শুরু করেছিলেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা। জাতীয় সংলাপের মাধ্যমে একটি জাতীয় সনদ প্রণয়ন করে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার জন্য দুই জোটের কাছে আহ্বান জানিয়েছিলেন তারা। এজন্য ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ নামে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। এর মধ্যে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ায় দৃশ্যত নাগরিক সমাজের তৎপরতায় কিছুটা ভাটা পড়েছে। তবে এ উদ্যোগের সঙ্গে জড়িতরা দাবি করেছেন, বিষয়টি নিয়ে কিছু লোক বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা তাদের উদ্যোগ থেকে পিছপা হবেন না। মান্নার বিষয়টি রাজনৈতিক। এর সঙ্গে নাগরিক সমাজের কোন সম্পর্ক নেই।
৭ই ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সেমিনার হলে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নাগরিকরা ‘জাতীয় সংকট নিরসনে জাতীয় সংলাপ’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় মিলিত হয়েছিলেন। সেমিনারের উদ্যোক্তা ছিলেন সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ড. কামাল হোসেন। ওই সভা থেকে প্রেসিডেন্টকে জাতীয় সংলাপের উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছিলেন বিশিষ্ট নাগরিকরা। এরপর ৯ই ফেব্রুয়ারি দেশে চলমান সঙ্কট নিরসনে প্রেসিডেন্টকে জাতীয় সংলাপের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য লিখিত অনুরোধও জানিয়েছিলেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এ টি এম শামসুল হুদা। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সংলাপে বসার অনুরোধ জানিয়ে একই রকম চিঠি দিয়েছিলেন ড. হুদা। ওই চিঠির সঙ্গে কিছু প্রস্তাবনাও উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়, রাজনৈতিক বিরোধ বা সঙ্কট নিরসনের শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক রীতি হচ্ছে সংলাপ। এর কোন বিকল্প নেই। সংলাপ হতে হবে দেশের সকল সক্রিয় রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধিদের কার্যকর অংশগ্রহণের ভিত্তিতে। সংলাপের উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য আমরা প্রথমেই সরকারকে অনুরোধ করছি এবং এ ব্যাপারে মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য অনুরোধ করছি।
বিএনপি এ উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও আওয়ামী লীগ নেতারা এর বিরোধিতা করেন। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বৈঠক থেকে নাগরিক সমাজের দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়। এরপর আবারও ১৩ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সংলাপে সহায়তা দিতে সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন ড. এ টি এম শামসুল হুদা। ওইদিন ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ নামে ১৩ সদস্যের একটি নাগরিক কমিটির ঘোষণা দেন তিনি। ড. এ টি এম শামসুল হুদা নিজেই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন। এ কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান, এ এস এম শাহজাহান, ড. আকবর আলি খান, সিএম শফি সামী, রাশেদা কে চৌধুরী, রোকেয়া আফজাল রহমান, ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, ড. শাহদীন মালিক, সৈয়দ আবুল মকসুদ, আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী, ড. আহসান মনসুর, ড. বদিউল আলম মজুমদার। গত বৃহস্পতিবার এ কমিটির একটি গোলটেবিল বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরে তা বাতিল করা হয়। এ প্রসঙ্গে কমিটির সদস্য এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, বৃহস্পতিবারের বৈঠক আমরা করিনি। আমাদের উদ্যোগ চালিয়ে যাব। আমাদের নিজেদের মধ্যে বৈঠক চলছে। এ বিষয়ে ড. এ টি এম শামসুল হুদার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে জানান। মান্নার ফোনালাপের ঘটনা নাগরিকদের উদ্যোগে প্রভাব ফেলবে কিনা- জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের সম্পাদক ও ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের’ সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, জাতীয় সংলাপ নিয়ে কিছু লোক বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছে। সেটা অনাকাঙ্ক্ষিত। মাহমুদুর রহমান মান্নার গ্রেপ্তারে আমাদের কাজে কোন প্রভাব পড়ার প্রশ্নই ওঠে না। তারা রাজনৈতিক সমাজের লোক। আমরা নাগরিক সমাজের লোক। তাদের কর্মকাণ্ডের দায় আমাদের ওপর আসতে পারে না। তিনি আরও বলেন, আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। আমাদের দাবি সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ করতে হবে। সে সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান করতে হবে। আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্যে পৌঁছতে হবে। বিষয়গুলো খুব জটিল। আমরা সবকিছু নিয়ে কাজ করছি। একদিনে তো সমাধান সম্ভব নয়। এটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।