রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং উত্তর-দক্ষিণ পারস্পরিক দৃষ্টিপাত by সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক

২০১৩ সালের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ চলছে, জাতি ও সমাজ উৎকণ্ঠিত। এরূপ উৎকণ্ঠা প্রসঙ্গেই এই নাতিদীর্ঘ কলাম। প্রথমেই একটি অপ্রিয় বক্তব্য এবং সেটি হল এই যে, অতীতেও অনেকবার বাংলাদেশের মানুষ এবং সমাজ এরূপ উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তাপূর্ণ সময়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছে এবং এর জন্য যারা দায়ী, তারা কোনো দিনই এ প্রসঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করেন না। অতীতের কিছু আলোচনা করলে আজ বুকের ওপর চেপে থাকা ভার একটু হালকা মনে হতেও পারে। 
প্রথম অস্থিরতা ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫
১৯৭৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বরের কথা উল্লেখ করছি। মানুষ শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে সময় কাটিয়েছিল। কেন? ১৯৭২-এর জানুয়ারির ১০ তারিখ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে ফেরত এসেছিলেন। সরকারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। সরকারি দল ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। মুক্তিযোদ্ধারা বঙ্গবন্ধুর প্রতি অবিচল ও একনিষ্ঠ ছিল। এতদসত্ত্বেও ১৯৭২-এর অক্টোবরে বিরোধী দল হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিল জাসদ। জাসদ সরকারবিরোধী আন্দোলনে নামে। ১৯৭২ সালে সব ধরনের শিল্প জাতীয়করণ করা হয় এবং সেই জাতীয়করণ করা শিল্পগুলো লুটপাটের মাধ্যমে ধ্বংস হয়। কারণ, জাতীয়করণকৃত শিল্পগুলো পরিচালনার জন্য আন্তরিকতা ও অভিজ্ঞতার ভীষণ অভাব ছিল। ১৯৭৩-৭৪ সালে বাংলাদেশ থেকে বাইরে ও ভেতরে চোরাচালান মহামারী রূপ নেয়। চোরাচালান রোধ করার জন্য সরকারি হুকুমে সীমান্তে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বহু সেনা কর্মকর্তা তখনকার সরকারি দলের নেতাদের রোষানলে পড়েন এবং অনেকেই চাকরি হারান। জাতীয় অঙ্গনে দুর্বলতা ও আন্তর্জাতিক অসহযোগিতার কারণে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ হয় এবং অগণিত মানুষ মারা যায়। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের সংবিধানে মারাত্মক রকমের সংশোধনী আনা হয় অর্থাৎ বহুদলীয় গণতন্ত্রের বদলে একদলীয় গণতন্ত্র কায়েম করা হয়। সামরিক বাহিনীসহ সরকারি কর্মকর্তা ও পেশাজীবীদের একমাত্র রাজনৈতিক দলের সদস্য বানিয়ে পুরো সমাজকে একদলীয় রাজনীতিকরণ করা হয়। আইন-শৃংখলা রক্ষার নিমিত্তে জাতীয় রক্ষীবাহিনী নামক একটি নতুন বাহিনী সৃষ্টি করা হয়েছিল, যারা যে কোনো কারণেই হোক না কেন, জনমনে আতংকের কারণ হয়, নিপীড়নকারী হিসেবে পরিচিত হয়। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের পর ধ্বংসপ্রাপ্ত ভৌত কাঠামো, দুর্বল অর্থনীতি ইত্যাদি বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল দুর্নীতি এবং আংশিকভাবে আন্তর্জাতিক অসহযোগিতা। ফলে বঙ্গবন্ধু শত আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও সাফল্যের সঙ্গে দেশ শাসন করতে পারেননি। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ আওয়ামী লীগের কতিপয় জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতার মদদে সেনাবাহিনীর একটি অংশ বিদ্রোহ বা অভ্যুত্থান ঘটায়। ওই ঘটনায় বঙ্গবন্ধু নিহত হন। আড়াই মাস পর, ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ তারিখে সেনাবাহিনীর আরেকটি অংশ ১৫ আগস্টের বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে আরেকটি বিদ্রোহ বা অভ্যুত্থান ঘটায়। ৩ নভেম্বরের বিদ্রোহীরা জেনারেল জিয়াকে গ্রেফতার করেছিলেন। এরূপ ঘন ঘন বিদ্রোহ বা প্রতি-বিদ্রোহের কারণে সেনাবাহিনী তো বটেই, দেশের জনগণও সাংঘাতিক উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ে। এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতেই ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ তারিখে সৈনিকরা একটি বিপ্লব সাধন করে এবং জেনারেল জিয়াকে মুক্ত করে। জেনারেল জিয়ার চেষ্টা ও সাহসিকতায় ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে।
জিয়া হত্যার আগে ও পরে অস্থিরতা ১৯৭৮ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমান নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান হন। তিনি তার আমলে সংবিধানে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ, সুদূরপ্রসারী ও তাৎপর্যপূর্ণ সংশোধনী আনেন। ১৯৭৫-এর জানুয়ারিতে হারিয়ে যাওয়া বহুদলীয় গণতন্ত্র আবার বহাল করেন। নিজে নতুন দল সৃষ্টি করেন। পুরনো দলগুলো পুনরুজ্জীবিত করেন, যার মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে কোণঠাসা হয়ে পড়া আওয়ামী লীগও পুনরুজ্জীবিত হয়। তিনি লেফটেনেন্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে সেনাবাহিনীপ্রধান বানান। ১৯৮০ সাল থেকে সেনাবাহিনীপ্রধান ইশারা-ইঙ্গিতে তার রাজনৈতিক অভিলাষ প্রকাশ করতে থাকেন, তথা ওই সময়ের ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে তার সমালোচনা প্রকাশ করতে থাকেন। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে মুক্তিযোদ্ধা ও অমুক্তিযোদ্ধা বা পাকিস্তান ফেরত অফিসারদের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠেছিল। জিয়াউর রহমান বীরউত্তমের সরকারে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের সংশ্লেষের কারণে তার সমালোচনা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এরূপ প্রেক্ষাপটে ৩০ মে ১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম অঞ্চলের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর বীরউত্তমের নেতৃত্বে একদল সেনা অফিসার এবং তাদের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম ডিভিশনের একটি অংশ বিদ্রোহ বা ক্যু সাধন করে। জেনারেল মঞ্জুর মনে করতেন, দক্ষ ও জ্যেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা অফিসার হিসেবে তারই সেনাপ্রধান হওয়া উচিত এবং অন্য মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের অধিকতর মূল্যায়ন হওয়া উচিত। সেই বিদ্রোহের প্রক্রিয়ায় জেনারেল জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে নিহত হন। বিদ্রোহকারীদের বিচার হয়। অনেকের ফাঁসি হয়, অনেকের জেল হয়। জিয়া হত্যার পরও সাংবিধানিকভাবেই বিএনপি সরকার চালাতে থাকে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টির চেষ্টা চলে। চূড়ান্ত পর্যায়ে সরকার অদক্ষ, দেশ বিপদে আছে ইত্যাদি অভিযোগে ২৪ মার্চ ১৯৮৪ তারিখে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ একটি রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। তৎকালীন আওয়ামী লীগ এই প্রক্রিয়াকে পরোক্ষভাবে স্বাগত জানিয়েছিল।
এরশাদ আমলের আগমন, প্রস্থান এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সামরিক শাসক লে. জেনারেল এরশাদ নিজেকে এবং তার শাসনকে রাজনৈতিক শাসনে পরিণত করতে প্রচেষ্টা নেন। জাতীয় পার্টি সৃষ্টি করেন। সংসদ নির্বাচনের প্রয়োজন ছিল। এই সব কিছুই তিনি করান। তৎকালীন আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি একমত হয়েছিল যে, তারা কেউই এরশাদের জাতীয় পার্টির সঙ্গে নির্বাচনে যাবে না। কারণ, নির্বাচনে গেলেই জাতীয় পার্টি এবং এরশাদের সামরিক সরকার বৈধতা পাবে। ১৯৮৬ সালে সংসদ নির্বাচনটি ঐতিহাসিক ছিল। কারণ, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সরকারকে বৈধতা দেয়। এরশাদ আমলে অনেক ভালো কাজ হয়েছিল; বিশেষত প্রশাসনিক সংস্কার ও উন্নয়ন খাতে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি এরশাদ রাজনৈতিক অঙ্গনের মন জয় করতে পারেননি। অতএব, বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তার বিরুদ্ধে লেগেছিল। ১৮ অক্টোবর ১৯৯০ থেকে এরশাদ সরকারের পতনের লক্ষ্যে আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। হরতাল, ধর্মঘট, আন্তঃনগর বা আন্তঃজেলা যাতায়াত ইত্যাদি ভীষণভাবে বিঘ্নিত হতে থাকে। আমি ব্যক্তিগতভাবে তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদর দফতরে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্বে নিয়োজিত, যথা সামরিক অপারেশন্স পরিদফতরের পরিচালক বা ডাইরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশন্স। ১৮ অক্টোবর ১৯৯০ থেকে ক্রমান্বয়ে অবনতিশীল আইন-শৃংখলা পরিস্থিতিতে এবং রাষ্ট্রপতিকে সহায়তার নিমিত্তে সেনাবাহিনী ক্রমান্বয়ে নিয়োজিত হচ্ছিল। বিচ্ছিন্ন কয়েকটি স্থানে সেনা সদস্যরা জনগণের আক্রমণের শিকার হয়। জনগণ কর্তৃক সেনা সদস্যকে আক্রমণের কারণ ছিল অনেকটা এরকম- ‘তোমরা কেন স্বৈরশাসক এরশাদকে সমর্থন দিয়ে এখনও টিকিয়ে রাখছ?’ এরূপ পরিস্থিতিতে নভেম্বর ১৯৯০-এর একেবারে শেষদিকে ডাক্তার মিলন নিহত হওয়ার কারণে ঢাকা মহানগরে হঠাৎ করেই আন্দোলন তীব্রতা পায়। সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। কার্ফ্যু বা সান্ধ্য আইন জারি করা হয়। এ প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি এরশাদকে আর ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা সমীচীন কি-না, সেনাবাহিনীর মধ্যে এ প্রশ্ন দেখা দেয়। সেনা কর্তৃপক্ষ নীরব সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, সেনাবাহিনী নিজেদের বিতর্কিত ও জনবিরোধী করবে না। ঘটনাবলীর প্রত্যক্ষ সাক্ষী এবং সামরিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় বহুলাংশে সংশ্লিষ্ট একজন ব্যক্তি হিসেবে আমি আমার মূল্যায়ন আমার লেখা সর্বশেষ বই ‘মিশ্র কথন’-এ লিপিবদ্ধ করেছি ইতিহাসের স্বার্থে। গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনার স্বার্থে ওই আমলের সেনাবাহিনী পরবর্তী তিন মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করে এবং বাংলাদেশে আবার নির্বাচিত সরকার ফিরে আসে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের নবযাত্রায় সরকার গঠন করে বিএনপি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবিতে আওয়ামী আন্দোলন ১৯৯৪ সালের শেষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি উত্থাপিত হতে থাকে। ১৯৯৫ সালে দাবি জোরালো হয়। আন্দোলন কঠোর হয়। ১৯৯৬ সালের শুরুটা জ্বলন্ত ছিল। আন্দোলনকারীরা ছিল আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতে ইসলামী। আন্দোলনের তীব্রতার ফল হচ্ছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে মোট ১৭৩ দিন হরতাল হয়েছিল, ঢাকা-চট্টগ্রাম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এবং চট্টগ্রাম বন্দর সাময়িকভাবে অচল হয়ে গিয়েছিল। ২৫ ডিসেম্বর ১৯৯৫ থেকে মেজর জেনারেল র‌্যাংকে আমি যশোর অঞ্চলের জিওসি ছিলাম। অতএব, আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির সঙ্গে পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলাম অন্য জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের মতোই। সরকারে ছিল বিএনপি। ১৫ ফেব্র“য়ারি ১৯৯৬ নতুন করে বিএনপি সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার পর বিএনপি মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে সংবিধান সংশোধন করে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার অবসান ঘটায়। ১৯৯৬ সালের মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে বিএনপি ক্ষমতা ছেড়ে দেয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়। কিন্তু একটি অঘটন ঘটে। ১৯৯৬ সালের মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস এবং তৎকালীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান লে. জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম বীর বিক্রমের মধ্যে ঘোরতর মতপার্থক্য দেখা দেয়। এই মতপার্থক্যের প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কমান্ডার হিসেবে রাষ্ট্রপতি বিশ্বাস এবং সেনাপ্রধান হিসেবে জেনারেল নাসিম সেনাবাহিনীর ওপর কর্তৃত্ব বহাল বা অব্যাহত রাখতে নিবিড় চেষ্টা করেন। কিন্তু সেনাবাহিনী প্রধানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি অংশ এমন কিছু কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করে যেগুলোকে বিদ্রোহমূলক বা সরকার উৎখাতমূলক বলা যায়। সেনাবাহিনীর বৃহদাংশ সেনাপ্রধানের হুকুম মানতে অস্বীকার করায় সেনাবাহিনী আনুগত্য ও শৃংখলার আঙ্গিকে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। এরূপ উত্তপ্ত ও বিপদসংকুল পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর দুটি অংশ প্রায় পরস্পরের মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছিল। যা হোক, বহুমাত্রিক চেষ্টার ফলে বিদ্রোহী অংশ শান্ত হয় এবং সেনাবাহিনী ও দেশে শান্তি ফিরে আসে। ১০ জুন ১৯৯৬ অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থান পায়। তারা সরকার গঠন করে। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ বীর উত্তমের নেতৃত্বাধীন ৩ নভেম্বর ১৯৭৫-এর সেনা বিদ্রোহের মতো লে. জেনারেল নাসিম বীর বিক্রমের নেতৃত্বাধীন ২০ মে ১৯৯৬-এর ঘটনাবলীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে চিন্তাশীল ব্যক্তিদের একটি অংশ মনে করে।
অক্টোবর ২০০৬-এর রাজনৈতিক সাইক্লোন ২০০১ থেকে অক্টোবর ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি ক্ষমতায় ছিল। ক্ষমতা ছাড়ার আগে থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবে এই নিয়ে প্রচণ্ড মতবিরোধ চলছিল। ২৮ অক্টোবর ২০০৬ ঢাকার রাজপথ রাজনৈতিক রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যেই কর্মীদের লগি-বৈঠা হাতে নিয়ে রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়েছিল। ২৮ অক্টোবর ঢাকা মহানগরে যে রক্তাক্ত সংঘর্ষ হয়েছিল, সেই স্মৃতি এখন পর্যন্ত বিশেষ কেউই ভোলেনি। তার দায়-দায়িত্ব একাধিক রাজনৈতিক দলের ওপর পড়ে। তিন মাস পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তৎকালীন প্রধান লে. জেনারেল মইন ইউ আহমেদের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনী কর্তৃক তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে উৎখাত করা হয় এবং নতুন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সৃষ্টি করা হয়। ২০০৭ সালের প্রথম মাসের ১১তম দিনে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। এই ঘটনাটিকে ওয়ান-ইলেভেন বলা হয়। সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থদের দ্বারা বিএনপি-সংশ্লিষ্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার এটা দ্বিতীয় ঘটনা। প্রচুর সংখ্যক সেনা অফিসার জরুরি অবস্থা বাস্তবায়ন এবং একাধিক সংস্কারমূলক ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নে জড়িত হয়ে পড়েন। রাজনৈতিক অঙ্গন তথা রাজনৈতিক নেতাদের ওপর মারাত্মক অত্যাচার নেমে এসেছিল। তুলনামূলকভাবে বিএনপি ও বিএনপিপন্থীরা চাপ ও অত্যাচারের শিকার হয়েছিল বেশি। তারপরও বলতে হয়, মধ্যম ও কনিষ্ঠ পর্যায়ের সেনা অফিসাররা প্রচুর পরিশ্রম করেছিলেন জাতীয় স্বার্থে। প্রথমদিকে তারা জনগণের প্রচুর প্রশংসা পান। কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রশংসা কমে আসতে থাকে। সাধারণভাবে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী মহল ১/১১-কে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছিল। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা বলেছিলেন, তাদের আন্দোলনের ফসল ১/১১-এর সরকার।
১/১১-এর দুই বছর
১/১১ সম্পর্কে জেনারেল মইন ইউ আহমেদের লেখা নিজের বইয়ে যে বিবরণ আছে, সেটাকে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা যায়। সাক্ষ্যটা সম্পূর্ণ সত্য নাও হতে পারে। ক্রমান্বয়ে আরও সাক্ষ্য উপস্থাপিত হতেই থাকবে। ২৪ মার্চ ১৯৮২ জেনারেল এরশাদের মার্শাল ল’-এর মাধ্যমে অপসারিত হয়েছিল একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার। দলের নাম ছিল বিএনপি এবং রাষ্ট্রপতির নাম ছিল বিচারপতি আবদুস সাত্তার। ১১ জানুয়ারি ২০০৭ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হয়নি, কিন্তু সদ্য সাবেক রাজনৈতিক সরকার তথা বিএনপির মনোনীত রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে উৎখাত করা হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটা (অর্থাৎ ১/১১) বিএনপির বিরুদ্ধেই বিপ্লব ছিল। ২৪ মার্চ ১৯৮২-এর পর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল এরশাদ স্বাভাবিকভাবেই বিএনপি থেকে কোনো সহযোগিতা আশা করেননি। তাই কৌশলে তিনি আওয়ামী লীগ থেকে সহযোগিতা নিয়ে ১৯৮৬ সালে সংসদ নির্বাচন করিয়েছিলেন।
উৎকণ্ঠিত কিন্তু দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বাংলাদেশ
এখন অক্টোবর ২০১৩। অক্টোবর ২০০৬-এর কথা উপরের অনুচ্ছেদেই বললাম। এ মুহূর্তে আমাদের চিন্তা ও দুশ্চিন্তা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিয়ে। সাংবিধানিক সংকট নিয়ে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার বলছেন, তিনি বর্তমান সংবিধানের বাইরে যাবেন না এবং সংবিধানের ভেতরে থেকেই আগামী নির্বাচন করবেন বা করাবেন। অপরপক্ষে বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের বক্তব্য হচ্ছে, আওয়ামী লীগের নিজস্ব সুবিধার জন্যই অর্থাৎ আগামী নির্বাচনে যেন জিততে পারে সেই অন্তর্নিহিত লক্ষ্য সামনে রেখে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। বিরোধী দলের মতে, নিরপেক্ষ-নির্দলীয় সরকার ছাড়া নির্বাচনকালে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। অতএব, বিরোধী দল কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না। এ মুহূর্তের সংকট কঠিন। সংকটের উৎপত্তি ২০১১ সালের জুন মাসে সংসদ কর্তৃক পঞ্চদশ সংশোধনী আনার মাধ্যমে। সংকট সৃষ্টিতে বর্তমান বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের কোনো ভূমিকা নেই। তারপরও বিরোধী শিবির যথাসম্ভব শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করে সরকারকে বোঝাতে চেষ্টা করেছে যে, তাদের দাবি ন্যায্য এবং তা বাস্তবায়ন করা হোক। বিরোধী শিবিরের দাবিটা এমনই একটা দাবি যেটা মূলত ১৯৯৪-৯৬ সময়ে বর্তমান সরকারি দলেরই দাবি ছিল। এ প্রেক্ষাপটে মানুষ যখন উৎকণ্ঠিত, আতংকিত, তখন ১৮ অক্টোবর ২০১৩ প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন এবং একটি প্রস্তাব দেন। ২১ অক্টোবর ২০১৩ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়া একটি প্রস্তাব দিয়েছেন; তথা নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের রূপরেখা দিয়েছেন। উভয় নেত্রীর প্রস্তাবের বিবরণ বা মূল্যায়ন আমি এখানে স্থানাভাবে করছি না। বিজ্ঞ পাঠক নিজেই সিদ্ধান্ত নেবেন কোন প্রস্তাবটি ভালো বা কোন প্রস্তাবটি মন্দ। পূর্ণাঙ্গ না হলেও আংশিকভাবে। অথবা দুটি প্রস্তাবের ভালো অংশ নিয়ে একটি তৃতীয় ভালো প্রস্তাব প্রস্তুত করা যায় কি-না সেটা ভেবে দেখা যেতে পারে।
উপসংহার
সবশেষে আমি এই কলামের শিরোনাম নিয়ে একটু কথা বলি। শিরোনামের শেষাংশ হচ্ছে উত্তর-দক্ষিণ পারস্পরিক দৃষ্টিপাত। উত্তর বলতে আমি ঢাকা মহানগরের উত্তর অংশকে বুঝিয়েছি। দক্ষিণ বলতে সেনানিবাস ছাড়া অবশিষ্ট ঢাকা মহানগরকে বুঝিয়েছি। প্রতীকী অর্থে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের বা জনসমষ্টির মধ্যে সামরিক ও বেসামরিক সম্পর্কের কথা, সহযোগিতার কথা, অসহযোগিতার কথা সবকিছুকেই বুঝিয়েছি। ১/১১-এর একদিন আগে, ১০ জানুয়ারি ২০০৭-এ প্রথম আলো পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার অষ্টম কলামে একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল। এতে ১০ জন অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তার পক্ষ থেকে দেশের বিদগ্ধ রাজনৈতিক সমাজের প্রতি একটি আবেদন ছিল। এ মুহূর্তে অবসরপ্রাপ্তরা কী চিন্তা করছেন জানি না, কিন্তু সমাজের সবাই যে উদ্বিগ্ন এটুকু জানি।
মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি

No comments

Powered by Blogger.