দুর্নীতি ও ভুলনীতির কারণে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ছে -আলোচনা সভায় বক্তারা

সরকারের দুর্নীতি ও ভুলনীতিকে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির পেছনের কারণ হিসেবে দেখছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ব্যাপারে সরকার রেকর্ড করেছে। সরকারের ভুলনীতি আর দুর্নীতির দায়ভার পড়বে বিশাল দারিদ্র্য জনগোষ্ঠীর ওপর। সরকার তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে না এলে পাড়ায় পাড়ায় প্রতিরোধ কমিটি গড়ে তোলা হবে। আর ভবিষ্যতে ট্রাইব্যুনাল করে জ্বালানি অপরাধীদের বিচার করা হবে। গতকাল সকালে রাজধানীর পল্টনে মুক্তি ভবনের প্রগতি সম্মেলন কক্ষে ‘গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত: ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া’ শীর্ষক আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন। গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির চক্রান্তের প্রতিবাদে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) উদ্যোগে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সভায় অংশ নিয়ে তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, এ সরকার ধনীদের স্বার্থেই কাজ করে যাচ্ছে। কারণ, এই ধনীরা সরকারকে তার লুটপাটে সহযোগিতা করেন। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের মাথা ব্যথা নেই। আইএমএফ’র কাছে নেয়াকে সরকারের ভুলনীতি আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণে দাম বাড়লে কোন সমস্যা ছিল না। কিন্তু সরকার দাম বাড়িয়ে বাড়তি টাকা কোন খাতে ব্যয় করছে তা কেউ জানে না। আইএমএফ’র শর্ত পূরণ করতেই সরকার বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়াচ্ছে। সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, আমরা শুধু কথা বলেই ক্ষান্ত হবো না। গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এলে প্রতিরোধের আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। পাড়ায় পাড়ায় ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ কমিটি গড়ে তোলা হবে। গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি এডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, জ্বালানি খাতকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র চলছে। ভবিষ্যতে জ্বালানি অপরাধীদের ট্রাইব্যুনাল করে বিচার করা হবে। দুর্নীতির এ মহোৎসবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে পাবলিক এনকোয়ারি কমিশন গঠন করা হবে। দেখা যাবে সরকার কত অপকর্ম করতে পারে। দেশের স্বার্থে সবাইকে এ জন্য ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেন, বর্তমান সরকার জনমত যাচাইয়ের প্রাথমিক পথ পরিহার করে জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে উঠে আছে। একদিকে শাসক দল জনগণের ওপর দ্রব্যমূল্যের ছুরি বসাচ্ছে, অন্যদিকে ভাগবাটোয়ারা নিয়ে নিজেদের মধ্যে খোনাখুনি করছে। সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর জন্য অহেতুক যুক্তি দিচ্ছে। জনগণকে ধোঁকা দিয়ে লুটপাটের চক্রান্ত করা হচ্ছে। লুটপাটের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ করা দরকার।
কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, গ্যাস ব্যবহারকারী ৮৭ ভাগ মানুষ নিম্ন আয়ের। গ্যাসের দাম বাড়লে এদের কেউই সুবিধাভোগী হবে না। বরং তাদের জীবনযাত্রা বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। এর আগে গ্যাস তহবিল গঠন করা হলেও সে অর্থ কোন কাজে লাগেনি। ৫৫ শতাংশ গ্যাস বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। কম দামে গ্যাস ব্যবহার করে শিল্পপতিরা লাভবান হচ্ছেন। অন্যদিকে বেশি দামে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ক্ষুদ্রশিল্প ধ্বংসের পথে। এ বৈষম্য দূর করা দরকার। সব ক্ষেত্রে সমতা আনতে হবে। সরকারের অব্যবস্থাপনার দায় জনগণ নিতে পারে না উল্লেখ করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যার মূল কারণ অব্যবস্থাপনা। বাপেক্স গ্যাস অনুসন্ধানে সক্ষম হলেও নানাভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে দাঁড়াতে দেয়া হয়নি। বাপেক্সকে সরিয়ে বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দেয়া হয়েছে। অন্ধকার করিডরে চুক্তি করে গ্যাসফিল্ডগুলো ধ্বংস করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ বলেন, সরকারের কোন কোন মহল আইন মানছে না। শুনানির আগেই বিইআরসি সিদ্ধান্ত দিচ্ছে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়বে। সরকার দাম বাড়ানোর জন্য খোঁড়া যুক্তি দিচ্ছে। সরকার রাজস্ব তহবিল বৃদ্ধির জন্য এ কাজ করছে। বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। এ বিপুল অঙ্কের টাকা উদ্ধার না করে সরকার নজর দিয়েছে নিম্নমধ্যবিত্তের ওপর। বর্তমানে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নাভিশ্বাস উঠেছে। গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, গ্যাসের দাম বাড়লে এর চাপ পড়বে শ্রমজীবী মানুষের ওপর। সরকার প্রাইভেট কারে সিএনজি সরবরাহ করছে কম দামে। অনুৎপাদনশীল এ খাতে সে রকম দাম বাড়াচ্ছে না। বর্তমান সরকার একেবারেই দায়বদ্ধতার জায়গায় নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনকে আদর্শ হিসেবে দেখছে সরকার। ভবিষ্যতে তারা ৩০০ আসনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। আলোচনা সভা থেকে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে আজ সারা দেশে ও ২৪শে নভেম্বর ঢাকায় বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয় সিপিবি ও বাসদ।