খুনের পর খুন-এখনো সময় আছে লাগাম টানার

দুই সন্তান ও স্ত্রীকে টুকরো টুকরো করে খুন করেছে খুনি। ময়নাতদন্তের জন্য কাটাছেঁড়া হচ্ছে তিনজনের শরীর। বাবার আর্তি, 'আমার কলিজাছেঁড়া সোনাদের গায়ে আর কোপ দিয়ো না তোমরা।' কিন্তু আইন চলে নিজ গতিতে।


ময়নাতদন্ত হয় চট্টগ্রামে দুর্বৃত্তের হাতে নিহত দুই শিশু আর তাদের মায়ের। স্ত্রী-সন্তান হারানো আনোয়ার হোসেনের আর্তনাদের কথা প্রকাশ হয় পত্রিকার পাতায়। ঠিক এক দিন আগে নরসিংদীতে সাংবাদিক খুন হন দুর্বৃত্তদের হাতে। সেটিও প্রচারমাধ্যমে স্থান করে নেয়। নড়েচড়ে ওঠে নরসিংদীর প্রশাসন। থেমে থাকে না দুর্বৃত্তদের দল। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের শিক্ষক রবীন্দ্রকুমার সিংহ প্রাণ হারান গুলিবিদ্ধ হয়ে। প্রাণ হারান পূজামণ্ডপ থেকে ফেরার পথে। স্পষ্টত বোঝা যায়, ছিনতাইকারীর কাজ এটা। কারণ হত্যাকারীরা তাঁর কাছ থেকে অর্থ ও স্বর্ণালংকার নিয়ে যায়।
চট্টগ্রামের আলভী, আদিবা কিংবা ডলি দিয়েই খুনখারাবির শুরু নয় কিংবা কমলগঞ্জের রবীন্দ্রকুমার সিংহ দিয়েই শেষ নয়। এটা কি চলমান থাকবে? কে জানে, কার মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে ঘুরছে খুনিরা। সেই খুনের তালিকায় কার নাম যে লেখা আছে, কেউ বলতে পারে না। অথচ একটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধীন রাষ্ট্রে এমন হওয়ার কথা নয়। রবীন্দ্র, আদিবা, ডলিরা বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করা এবং স্বাভাবিক মৃত্যুবরণের অধিকার রাখে। সাংবিধানিকভাবে এই অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব সম্পূর্ণ সরকারের। সুতরাং সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির মতো নিজগৃহে খুন হলেও এমন কথা বলার কোনো সুযোগ নেই যে কারো বসতঘরে কিংবা শোবার ঘরের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের নয়। কারণ এসব ঘটনা ঘটাতে দুর্বৃত্তরা উৎসাহী হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্লিপ্ততা থেকে; দেশে আইনের শাসন অনুপস্থিত থাকলে দুর্বৃত্তদের যথোচিত শাস্তিবিধানে রাষ্ট্র ব্যর্থ হচ্ছে। যখন মানুষ দেখে, দেশে খুন করলেও বেঁচে যাওয়া সম্ভব, যখন দুর্বৃত্তরা দেখে রাজনীতির ছাতা তাদের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তারা প্রভাবশালী, বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়। রাজনীতি কলুষিত করা তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হওয়ার পরও আমাদের দেশের ক্ষমতাসীনরা তাদের সহযোগিতা গ্রহণ করে। প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়। সেখানেও রাজনৈতিক অবৈধ ও অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ চলে দুর্বৃত্তদের বাঁচানোর জন্য। প্রশাসনও তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকে। একের পর এক এভাবে খুনখারাবি চলতে থাকলে দেশের উন্নয়নের গতি স্থবির হয়ে যেতে পারে। এমনটা জানার পরও দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশের সরকার ও প্রশাসন মোটেও আন্তরিক হয় না।
ঈদের ছুটিতে স্বাভাবিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছু অবনতি ঘটতে পারে। তবে সাংবাদিক হত্যা, চট্টগ্রামের ট্রিপল মার্ডারের ঘটনার মতো ঘটনা ঘটছে অন্য কারণে। দেশের সাধারণ মানুষকে নিরাপদে জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দিতে হলে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডগুলোর প্রতিটিরই সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। চিহ্নিত খুনিদের বাঁচানোর জন্য ক্ষমতার অপব্যবহার যাতে না হয় সেদিকেও তীক্ষ্ন দৃষ্টি দিতে হবে সরকারকেই। তা না হলে সাংবিধানিকভাবে দায়িত্ব লাভকারী সরকারের এই ব্যর্থতার দায় থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো পথ নেই।