আইনের শাসন যেনো বিঘিœত না হয়

যুদ্ধাপরাধের বিচারের আন্দোলনের নামে দেশে সভা-সমাবেশ করে ট্রাইব্যুনালের রায়কে প্রত্যাখ্যান করে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ঘোষিত যাবজ্জীবন সাজা পরিবর্তন করে তাকে ফাঁসি দেয়ার আলটিমেটাম ঘোষণা করা হয়েছে শাহবাগ চত্বরের সমাবেশ থেকে।
তা ছাড়া বিচারাধীন মানবতাবিরোধী মামলার অন্যান্য আসামিদের ফাঁসি ছাড়া অন্য কোনো রায় মেনে নেয়া হবে না বলেও এ সমাবেশ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। সমাবেশ থেকে আরো ঘোষণা দেয়া হয়েছে, ‘দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরব না।’ এর মাধ্যমে  রাজপথে হাজার হাজার মানুষ নামিয়ে বিচার বিভাগকে সরাসরি প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। এর ফলে ন্যায়বিচার বিঘিœত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তা ছাড়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যতাড়িত হয়ে মহলবিশেষ জাতিকে বিভক্ত করে ভিন্ন মত দমনের জন্য উসকানি দিচ্ছে। যার সাথে ক্ষমতাসীন দল ও বুদ্ধিজীবীদের একাংশ যোগ দিয়েছে।

বিশ্বের কোনো দেশে সমাবেশ করে আদালতের রায় পরিবর্তনের দাবির নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না।  দুর্ভাগ্যজনক দিক হচ্ছে, এ ধরনের দাবি জানানোর মধ্য দিয়ে তরুণদের একাংশকে উগ্রতার দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা না করে দমনের জন্য উসকানি দেয়া হচ্ছে।

সম্প্রতি রাজধানীর শাহবাগে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে আয়োজিত সমাবেশে নয়া দিগন্ত, দিগন্ত টেলিভিশন, আমার দেশসহ বিভিন্ন সংবাদপত্র বয়কট ও বন্ধ করে দেয়ার দাবি জানানো হয়েছে। দাবি করা হয়েছে একটি রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের নাগরিকত্ব বাতিলের। ব্যাংক, বীমা, আর্থিক ও সেবামূলক কিছু প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেয়ারও দাবি জানানো হয়েছে। গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার কিংবা ন্যূনতম মানবাধিকারের ধারণা রয়েছে এমন কোনো নাগরিক এ ধরনের দাবি করতে পারেন না। কারণ, এ ধরনের দবি কার্যত স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর যেমনি আঘাত, তেমনি স্বাধীনভাবে ব্যবসায়-বাণিজ্যিক উদ্যোগ নেয়ার ওপর হস্তক্ষেপ।

আমরা লক্ষ করছি, কার্যত এই সমাবেশ হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের উদ্যোগে। সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও এমপি সেখানে গিয়ে সংহতি প্রকাশ করেছেন। সরকার সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা গিয়ে বক্তব্য রেখেছেন, তাদের মুখে এসব দাবি উচ্চারিত হয়েছে। এ থেকে ধরে নেয়া যায় সরকারের সমর্থনে এ সমাবেশ হয়েছে। এই সমাবেশের উপস্থিতি দেখিয়ে বলা হচ্ছে, এগুলো গণদাবি। কথিত এই গণদাবির ধারণা রাষ্ট্রযন্ত্র ও বিচার বিভাগের মাধ্যমে বাস্তবায়নের চেষ্টা হবে আরো বিপজ্জনক। কারণ বিরোধী রাজনৈতিক দলের ওপর নিপীড়ন বাকস্বাধীনতা হরণের পদধ্বনি শাহবাগের এই সমাবেশে শুনতে পাচ্ছি।

আমরা আশা করব, ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল এই সমাবেশ থেকে উচ্চারিত অগণতান্ত্রিক দাবির এই বিপদ সম্পর্কে সতর্ক হবেন। যে কোনো অপরাধী শাস্তির মুখোমুখি হোক, এ চাওয়া সবার। কিন্তু জোরজবরদস্তির মাধ্যমে আদালতের ওপর প্রভাব বিস্তার করে কিংবা বিচারকদের মনে ভীতি সৃষ্টি করে ন্যায়বিচার বিঘিœত হোক তা কেউ চায় না। কার্যত আজ সে প্রবণতারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এর মাধ্যমে অতি উৎসাহীরা প্রকারান্তরে দেশকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। ক্ষমতাসীন দল সাময়িক রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্য ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক, এর সাথে জড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু এর দায়দায়িত্ব সরকারকেই বহন করতে হবে। একই সাথে  ফ্যাসিবাদী ধরনের তৎপরতার বিরুদ্ধে বিরোধী দল যদি নির্লিপ্ত ভূমিকা পালন করে, তার জন্য তাদের মূল্য দিতে হবে। আমরা আশা করব, আইনের কণ্ঠরোধ ও জোর করে নিজের মত অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়ার মতো সহিংসপ্রবণ কর্মকাণ্ডের লাগাম টেনে ধরা হবে। দেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সব মহল আন্তরিকভাবে চেষ্টা করবেন।