কোকোর জানাজা : আমার অনুভূতি by প্রফেসর ড. সুকোমল বড়ুয়া

আরাফাত রহমান কোকোর জানাজায় গিয়ে আমি অভিভূত হয়েছি। কোনো বড় নেতা কিংবা বেশি পরিচিত মুখ না হয়েও তার জানাজায় লাখো জনতার উপস্থিতি সবাইকে অবাক করে দিয়েছে। শুধু বিএনপি নয় কিংবা ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মী নয়, তার জানাজায় নানা দলমত ও পেশাজীবী মানুষের সমাগমে মনে হয়েছে তিনি খেতাবি কোনো বীর কিংবা নামকরা কোনো জাতীয় নেতা না হয়েও তার জানাজা হয়েছে স্মরণীয় ও ঐতিহাসিক। এ থেকে বোঝা যায়, কোকোর প্রতি মানুষের কত ভালোবাসা, কত দরদ, জনতার কত আবেগ আর কত অনুভূতি। এটা তো শুধু বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের জানাজার কথাই বললাম। দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা আর গ্রাম-গঞ্জের পাড়া-মহল্লায় যে গায়েবানা জানাজা হয়েছে, তার চিত্র তো আরো ভিন্ন। বড় বড় জেলা শহর যেমন চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা কিংবা বগুড়ার কথা বাদই দিলাম; একেবারে দেশের  দণি-পূর্বের পর্যটন জেলা শহর কক্সবাজারে নাকি ২৫ থেকে ৩০ হাজারের মতো মানুষ জমায়েত হয়েছে।
এখানে একটি প্রশ্ন জাগে। যে প্রশ্নটির কথা আমি আপ একটু করে ইঙ্গিত দিয়েছি। জানাজায় আমার মতো সবাই বলছে, আরাফাত রহমান কোকো কোনো জাতীয় নেতা নন, কোনো রাজনীতিবিদও নন; এমনকি কোনো নামীদামি কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীও নন। তার পরও তার মৃত্যুতে জনতার এত আবেগ এবং সর্বস্তরের মানুষের এত শোক, ভালোবাসা ও সমবেদনা কেন? সমবেদনা একটি কারণে, তিনি জিয়া পরিবারের সন্তান। তা হলে বোঝা যায় জিয়া পরিবারকে এখনো মানুষ কত ভালোবাসে, কত ভালো জানে। 
প্রতিপরা বলেন জিয়া পরিবার শেষ। জিয়া পরিবারের রাজনীতিও শেষ। এমনকি বিএনপি এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ারও রাজনীতি শেষ হওয়ার পথে। বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক  রহমানের কথা বাদই দিলাম। কোকোর জানাজা সেই ধারণা পাল্টে দিয়েছে। চোখে দেখিয়ে দিয়েছে, যা বলা হচ্ছে তা সত্যি নয়। বহির্বিশ্বের কাছেও এ সংবাদ চলে গেছে। এখনো তাদের বিপুল সমর্থন আছে। এমনকি সরকারকেও তাক লাগিয়েই দিলো। সেদিন জানাজায় জনতার ঢল দেখে মনে হলো বিএনপির ভিত অনেক শক্ত এবং তাদের নেতাকর্মীদের মনে এখনো শক্তি-সাহস আছে। বিপুল জনসমর্থনও আছে। নতুবা দেশের এ প্রতিকূল ও বৈরী পরিবেশে এতকিছু হওয়ার পরও এত মানুষের সমাগম হতো না। অবরোধ আর সরকারের ভয়ভীতি না থাকলে আশপাশের লোকের সমাগম হতো আরো বেশি। এমনকি জেলা-উপজেলা ও গ্রাম থেকেও দলীয় কর্মী ও নানা পেশাজীবী ঢাকায় চলে আসত।
নানা দোষে বিএনপি বর্তমান অভিযুক্ত এবং ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা ভয়ে কাতরও। তাদের বলতে গেলে করার কিছুই নেই। নানা ঘাত-প্রতিঘাতে তারা খুবই অসহায়। তার পরও সেদিনের জনতার সমাগম ও সমর্থন দেখে তারা কোকোর এই শোককে শক্তিতে পরিণত করতে চায়। বায়তুল মোকাররম মসজিদের জানাজায় বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নেন। আমিও মসজিদের ভেতরে মরদেহের পাশে ছিলাম বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীদের সাথে। সেখানে জাতীয় বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীও ছিল। বায়তুল মোকাররম  মসজিদের ভেতরে আমি কখনো যাইনি। যাওয়ার কথাও নয়। জানাজাতে তো কখনো যাওয়ার সুযোগ হয়নি। সেখানেও যেই প্রচণ্ড ভিড় দেখেছি তা বলার মতো নয়। আমিও জানাজার নামাজে দাঁড়িয়েছিলাম। কেউ আমাকে মানা করেনি। বাইরে আমার মতো হয়তো আরো অনেকে ছিল ভিন্ন সম্প্রদায়ের। সেও যেন এক অভূতপূর্ব ধর্মীয় মূল্যবোধের নিদর্শন। এতে আমি অবাক হয়েছি।
সেদিন মসজিদের ভেতরে বাইরে এবং দণি গেট থেকে মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়াম, মহানগর নাট্যমঞ্চ, জিপিও মোড় পর্যন্ত সাধরণ শ্রেণীর মানুষেরা সড়কে অবস্থান নেন। অন্যদিকে উত্তর গেট থেকে পল্টন মোড়, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এবং দৈনিক বাংলার মোড় থেকে জনতা ব্যাংক ভবন পর্যন্ত মানুষের ভিড় ছিল চোখে দেখার মতো। এ ছাড়া জাতীয় প্রেস কাব, তোপখানা রোড, বিজয়নগর সড়কে অনেক মানুষের ভিড় ছিল।
গত শনিবার মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে হৃদরোগে কোকো মারা যাওয়ার পরদিন প্রথম জানাজা সেখানকার জাতীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেও দেখেছি বাংলাদেশীদের প্রচণ্ড ভিড়। তিন দিন পর তার লাশ ঢাকায় আসার পর হজরত শাহ্ জালাল বিমানবন্দর থেকে বিএনপির চেয়ারপারসনের গুলশানের অফিস পর্যন্ত যে মানুষের ভিড় এবং আবেগ দেখা গেছে তা অভাবনীয়। এদিকে তার জানাজা অনুষ্ঠানকে ঘিরে বিমানবন্দর থেকে বায়তুল মোকাররম মসজিদ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনী বিশেষ সতর্ক অবস্থায়ও ছিল। বেলা দেড়টার দিকে কোকোর লাশ বহনকারী গাড়ি যখন খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে পৌঁছায় নিষেধ থাকা সত্ত্বেও সেখানে হাজার হাজার নেতাকর্মীদের ভিড় জমে। মায়ের চোখের জল আর স্বজনদের কান্না ও আবেগ সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি করে। আর বাইরে ছিল বিপুল জনতার ঔৎসুক্য ও আবেগ। পরিবারের সদস্যরা শেষবারের মতো দেখার পর আরাফাতের লাশ গুলশান কার্যালয় থেকে বায়তুল মোকাররম মসজিদের দিকে রওনা হয় বেলা আড়াইটার দিকে। সেই লাশবাহী গাড়ির সাথে দেখা গেছে হাজার হাজার নেতাকর্মী, যারা শোভাযাত্রা করে তাকে নিয়ে আসছে।
তার মৃত্যুতে দেশের নানা পেশাজীবী শ্রেণী ও ধর্ম-বর্ণের মানুষ শোক ও সমবেদনা জানিয়েছে। এমনকি বিভিন্ন কূটনীতিক, রাজনীতিক ও শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মালিকেরাও তার শোক বইতে সমবেদনা জানিয়েছেন। প্রথম দিনে ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট ডব্লিউ গিবসন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপ-রাষ্ট্রদূত ডেবিট মিলি, ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনার সন্দ্বীপ চক্রবর্তী, পাকিস্তানের হাইকমিশনারের কাউন্সিলর সামিনা মাহতাব, সৌদি দূতাবাসের খালিদ সুলতান আল উতাইরি ও ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত সাহের মোহাম্মদ গুলশানের কার্যালয়ে রাখা শোক বইতে স্বার করেছেন। এ ছাড়াও চীন, মিসর, সুইডেন, কাতার ও সিঙ্গাপুর দূতাবাসের কূটনীতিকেরাও শোক বইতে স্বার করেন। পর দিন নরওয়ে, স্পেন, তুরস্ক, কুয়েত, নেপাল, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কূটনীতিকেরা সেখানে যান এবং শোক বইয়ে স্বার করেন। শোক বইতে জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক দুই অধিনায়ক শফিকুল হক হীরা ও আকরাম খান এবং সাবেক ফুটবলার আমিনুল ইসলাম ও জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান কাজী জাফর আহম্মেদসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী এবং নানা পেশাজীবী মানুষের ভিড় জমে শোক বইয়ে স্বার করার জন্য। গতকালও সেই দৃশ্য দেখা গেছে। দলীয় নেতাকর্মীরা তো আছেই।
লাখো জনতার ঢল প্রমাণ করে তাদের শোক আবেগ এবং দ্রোহ একাকার হয়ে গেছে। যে দৃশ্য আমরা আরাফাত রহমান কোকোর জানাজায় দেখেছি, সেই দৃশ্য এক অভাবনীয়। এটাই জিয়া পরিবারের বড় বিজয়। বিএনপি এবং ২০ দলীয় জোটের প্রতি দেশের মানুষের দরদ আর ভালোবাসার ঐতিহাসিক বিজয়। আমরা তার জন্য দোয়া করি, রূহের শান্তি কামনা করি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার ও স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই।
লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান, পালি অ্যান্ড বুড্ডিস্ট বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ ফেডারেশন- বাংলাদেশ চ্যাপ্টার
E-mail:skbaruadu@gmail.com