চাল রফতানির ঘোষণায় ক্রমেই অস্থির বাজার

ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে চালের বাজার। মোকামের সাথে পাইকারি বাজারের সামঞ্জস্য নেই। মিল নেই এক বাজারের সাথে অন্য বাজারের। যে যার মতো করেই পকেট কাটছেন ক্রেতাদের। গত এক মাসে কয়েক দফায় দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ছয় থেকে সাত টাকা। বাণিজ্যমন্ত্রীর শ্রীলঙ্কায় চাল রফতানির ঘোষণার পর থেকেই চালের বাজার ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। সাথে যুক্ত হয়েছে পরিবহন সঙ্কট, ঈদ ও মওসুম শেষ হয়ে আসার বিষয়ও।
গতকাল রাজধানী ঢাকার কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, খুচরাবাজারে ভালো মানের নাজিরশাইল চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৮ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে। ১০ দিন আগে এ চাল বিক্রি হয়েছে পাঁচ থেকে সাত টাকা কমে। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিপ্রতি তিন থেকে পাঁচ টাকা বেড়ে মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৪৮ থেকে ৫২ টাকায়। নি¤œমানের মোটা ইরি চালের কেজি তিন থেকে চার টাকা বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৮ থেকে ৪২ টাকায়। বাজারে গতকাল লতা আটাশ ৩৯ থেকে ৪০ টাকা, জিরা নাজির ৫৫ থেকে ৫৬ টাকা, আটাশ ৪২ থেকে ৪৩ টাকা, চিনি গুঁড়া ১১০ থেকে ১১৫ টাকা, হাসকি ৪০ থেকে ৪২ টাকায় বিক্রি হয়।
গত ১১ সেপ্টেম্বর চতুর্থ এগ্রো বাংলাদেশ এক্সপোর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমদ ঘোষণা দিয়েছিলেন, বাংলাদেশ থেকে শ্রীলঙ্কায় চাল রফতানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ বছর শ্রীলঙ্কায় ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টন চাল রফতানি করবে বাংলাদেশ। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। চাল ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাহবা পাওয়ার আশায় বাণিজ্যমন্ত্রীর দেয়া এমন ঘোষণার পর থেকে চালের দাম বেড়েই চলেছে। মজুদ করতে শুরু করেছেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী।
চালের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাজধানীর বাবুবাজারের পাইকারি চাল বিক্রেতা মেসার্স লক্ষ্মী ভাণ্ডারের মালিক নূর মোহাম্মদ জানান, মওসুমের শেষের দিক হওয়ায় ও বাণিজ্যমন্ত্রীর রফতানির ঘোষণা দেয়ায় চালের উদ্বৃত্ত জেলা দিনাজপুর, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, বগুড়া থেকে চাল এখন কম আসছে। সরবরাহ কম থাকায় পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি চালের দাম দুই থেকে পাঁচ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। যদিও খুচরা বিক্রেতারা কেজিতে বাড়িয়ে দিয়েছেন ছয় থেকে ১০ টাকা। ঈদের আগে-পরে মহাসড়কে পণ্য পরিবহন ও ট্রাক চলাচল বন্ধ থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন চাল বাজারে আসা পর্যন্ত এ সমস্যা থাকতে পারে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় তিন কোটি টন চালের প্রয়োজন হয়। সরকারি হিসেবে এবার উৎপাদন হয়েছে চাহিদার তুলনায় ২০ লাখ টন বেশি চাল। ফলে ঘোষণা দিয়ে বিদেশ থেকে কোনো চাল আমদানি করা হয়নি। কিন্তু ব্যবসায়ীদের দাবি, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ এখন অনেক কম। এর কারণ হিসেবে আদম শুমারির ভুলের কথা উল্লেখ করেন তারা। গবেষকদের মতে, দেশের প্রকৃত জনসংখ্যা সরকারি হিসাবের তুলনায় অন্তত দুই কোটি বেশি। ফলে তিন কোটি টনের বিপরীতে তিন কোটি ২০ লাখ টন চাল উৎপাদন হওয়া সত্ত্বেও সরবরাহ সন্তোষজনক নয়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী চালের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
চালের পাশাপাশি দাম বেড়েছে ইলিশ ছাড়া অন্যসব মাছেরও। তবে সরবরাহ বাড়তে থাকায় শীতের সবজির দাম কিছুটা কমেছে বলে জানান বিক্রেতারা। মাছের বাজারে গিয়ে দেখা যায়, আকারভেদে প্রতিজোড়া ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১২০০ থেকে ১৮০০ টাকায়। প্রতি কেজি রুই ২৮০ থেকে ৩৮০ টাকা, কাতল ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, রূপচাঁদা ১০০০ থেকে ১১০০ টাকা, চিংড়ি ৫৫০ থেকে ৯০০ টাকা, টেংরা ৫৫০ থেকে ৭০০ টাকা, পাবদা ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা, শিং ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, মলা ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা, পোয়া ৬০০ থেকে ৭০০, সিলভার কার্প ১৪০ থেকে ২৫০ টাকা, পাঙ্গাশ ১২০ থেকে ২৫০ টাকা, চাষের কৈ ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, বেলে ৫৫০ থেকে ৭০০ টাকা, তেলাপিয়া ১৮০ থেকে ৩০০ টাকা, মাগুর ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতি কেজি বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা দরে। বরবটি বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকায়। নতুন শিম ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। টমেটো ৬০ থেকে ৮০ টাকা, গাজর ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, কাকরোল, করল্লা, ঝিঙা, চিচিঙা, পটোল, মুলা, ঢেঁড়স, কচুরমুখি, কচুরলতি প্রভৃতি ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়। প্রতি কেজি গরুর গোশত বিক্রি হয় ২৯০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি দরে। খাসির গোশত ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকায়। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় ও লেয়ার মুরগি ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া ফুলকপি ও বাঁধাকপি প্রতি পিস ২০ থেকে ৩০ টাকা, লেবুর হালি ১৬ থেকে ২৪ টাকা, কাঁচা কলার হালি ১৬ থেকে ২০ টাকা, প্রতিটি লাউ ৪০ থেকে ৬০ টাকা, জালি কুমড়া ৩০ থেকে ৪০ টাকা, মিষ্টি কুমড়ার ফালি ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পেঁপের কেজি ২০ থেকে ২৫ ও আলু বিক্রি হচ্ছে ২৫ টাকা দরে। শাকের মধ্যে লাউ শাকের আঁটি ৩০ থেকে ৪০ টাকা এবং লালশাক, পালংশাক, মুলাশাক, ডাঁটাশাক, পুঁইশাক, কলমিশাক প্রভৃতি বিক্রি হচ্ছে প্রতি আঁটি ১০ থেকে ৩০ টাকায়। ধনে পাতার কেজি ৩০০ টাকা।