কাঁচাবাজারে আগুন-দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক উদ্যোগ প্রয়োজন

দ্রব্যমূল্য, বিশেষ করে মাছ ও তরিতরকারির দাম যে হারে বেড়েছে, তাতে মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী এবং সীমিত আয়ের মানুষের জীবনে রীতিমতো নাভিশ্বাস উঠে গেছে। ৬০-৭০ টাকার নিচে কোনো তরকারি পাওয়া যায় না। শুক্রবার বা ছুটির দিনগুলোতে এই দামও আবার লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে যায়। অর্থাৎ যেখানে যেমন সুযোগ আছে, তেমনভাবেই ক্রেতার পকেট কাটা হয়। এগুলো দেখার বা নিয়ন্ত্রণ করার কেউ নেই। এসব নিয়ন্ত্রণে সরকারেরও কোনো উদ্যোগ


নেই। ফলে সীমিত আয়ের লোকজনের পক্ষে জীবন ধারণ করাই এখন কষ্টকর হয়ে পড়েছে। দাম বাড়ানোর ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের বাহানার কোনো অভাব নেই। কিছুদিন আগে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর অজুহাত দেওয়া হয়েছিল। বর্ষাকালে বৃষ্টির অজুহাত দেওয়া হয়। খুচরা ব্যবসায়ী পাইকারি ব্যবসায়ীদের ওপর দোষ চাপিয়ে বলে, বেশি দামে কিনতে হয়, তাই বেশি দামে বিক্রি করি। পাইকারি ব্যবসায়ীরা খুচরা দোকানদারদের ওপর দোষ চাপিয়ে বলে, সুযোগ পেলেই ওরা ১০ টাকার জিনিস ২০ টাকায় বিক্রি করে। সম্প্রতি পথে পথে চাঁদাবাজির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। পত্রপত্রিকায়ও পথে পথে চাঁদাবাজির অনেক খবর প্রকাশিত হচ্ছে। অথচ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকে এ পর্যন্ত অভিযোগটি কমই শোনা গিয়েছিল। এভাবে পথে পথে চাঁদাবাজি হলে স্বাভাবিকভাবেই ঢাকা পর্যন্ত পেঁৗছতে পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। কিন্তু মানুষের আয় তো আর কয়েকগুণ বাড়ে না। তারা এই বর্ধিত পণ্যমূল্যের সঙ্গে নিজেদের আয়ের সমন্বয় করবে কিভাবে? আর তা করতে না পেরেই সরকারি কর্মচারীরা সরকারকে আলটিমেটাম দিয়েছেন। স্বাভাবিক জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে তাঁরা সরকারের কাছে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতাসহ সাত দফা দাবি জানিয়েছেন। এ জন্য তাঁরা সরকারকে ৯০ দিন সময় বেঁধে দিয়েছেন। এর মধ্যে দাবি পূরণ না হলে তাঁরা দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবেন বলে সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেছেন। তাঁরা যেসব দাবি জানিয়েছেন, তার কোনোটির সঙ্গেই দ্বিমত পোষণ করার অবকাশ নেই। পাশাপাশি একটি প্রশ্ন থেকে যায়_স্বল্প বেতনের বেসরকারি কর্মচারীদের কী হবে? নির্দিষ্ট আয়ের দিনমজুরদের কী হবে? দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে তাঁরাও নিশ্চয়ই আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবেন। ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী শুধু গদ্যময় নয়, কঠিন গদ্যময় হয়ে উঠবে। সেই পরিস্থিতিটা নিশ্চয়ই সরকারের জন্য খুব একটা সুখকর হবে না।
সরকারি কর্মচারীরা চাল-ডাল-তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী রেশনপ্রথায় প্রদানেরও দাবি জানিয়েছেন। এই প্রথা শুধু সরকারি কর্মচারীদের জন্যই নয়, নিম্ন এবং সীমিত আয়ের সব নাগরিকের জন্যই প্রয়োজন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রায় তিন বছরেও সরকার রেশনপ্রথা তো দূরের কথা, টিসিবিকেও কার্যকর করতে পারেনি। দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার যে প্রতিশ্রুতি নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ দিয়েছিল, এটা তার সুস্পষ্ট বরখেলাপ। ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানোকে এই সরকার রোধ করতে পারেনি। গুদামে চিনি রেখে বাজারে চিনির সংকট সৃষ্টিকে সরকার আটকাতে পারেনি। পথে পথে শুধু নয়, বাজারে বাজারে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণেও সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, চাঁদাবাজদের বড় অংশই সরকারি দলের লোক। অথচ জনগণকে তার মাসুল দিতে হচ্ছে।
দুই বছর পর বর্তমান সরকারকে আবার জনগণের কাছে যেতে হবে। আবার ক্ষমতায় আসার জন্য ভোট চাইতে হবে। তখন কি তারা এই সরকারকে আবার ক্ষমতায় দেখতে চাইবে? নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থেই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের সর্বাত্মক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।