গল্প- 'টপকে গেল টাপ্পু' by ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ

ঝাঁ ঝাঁ রোদ বাইরে। জ্যৈষ্ঠের দুপুরে। এমন দুপুরে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকতে বেশ লাগে টাপ্পুর। গা পোড়ানো গরম। মাথার ওপর শন শন করে ফ্যান ঘুরছে।

মাঝে মাঝে রাস্তা দিয়ে সুর করে হাঁক দিচ্ছে আইসক্রিমওয়ালা। এমন সুনসান দুপুরে কি অঙ্ক কষতে কারো ভালো লাগে।
রিনা বসিয়ে দিয়ে গেছে ছেলেকে।
-খবরদার টাপ্পু, একদম নড়বে না। অঙ্ক কষে তারপর ঘুমোতে যাবে। অঙ্ক কষার পর তোমার ছুটি।
মা কেন অমন করে? এমন নিরিবিলি দুপুরে কি অঙ্ক কষতে ভালস্নাগে? বড়রা কিছুতেই এসব বুঝতে চায় না।
মা তো অন্য সবার মতো নয়। সি্নগ্ধ সুরে বলে, জানিস টাপ্পু- এ সময়টাকে মধুমাস বলে। আম-জাম-কাঁঠাল এসব পাকে তো।
শুক্রবার ছুটির দিন বলে অনেকে আসছে- যাচ্ছে। আম কেটে দিচ্ছে মা, বাড়িতে কত আনন্দ, সত্যিই তো মধুমাস, শুধু টাপ্পুর বেলা অমন হবে কেন? আম-কাঁঠালের মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ বাতাসে ভেসে আসে।
-এবার উঠি মা?
মা চোখ পাকিয়ে বলে, কক্ষনো না- একদম উঠবে না। কই দাদাকে তো এত পড়ার কথা বলতে হয় না। ও নিজে থেকেই পড়াশুনা করে। ওর মতো হতে পারো না?
রিনা চলে গেল নিজের কাজে। অঙ্ক খাতা আর বই বলপেন নিয়ে ঠাঁয় বসে থাকে টাপ্পু। বুনো ষাঁড়ের মতো বুকের ভেতরে রাগ ওর ফুঁসতে থাকে।
১. বড়দের কথা সব সময় শুনতে হবে (পছন্দ না হলেও)
২. কারো সঙ্গে কারো তুলনা না করে বড়রা কথা বলতে পারে না।
খুব মন খারাপ করে বসে আছে টাপ্পু। তুলনার কথাটা আসে কেন? তোমার চেয়ে তোমার ক্লাসের শান্ত অনেক বেশি নম্বর পায়। তোমার চেয়ে টুলটুলদাদার লেখা অনেক ভালো।
তুলনার কথা আসছে কোত্থেকে? আমি আমার মতোই। টেবিলে রাখা অঙ্ক খাতার ওপরে টাপ্পু তিনটে ঘুষি মারে। বিড় বিড় করে বলে, আই উইল বি দা টপ্। আই উইল দা বেষ্ট।
ওর ক্লাসের ফার্স্ট বয় ইমন বেঞ্চিতে বসে যখন তখনই ঘুষি পাকায়। ডেস্কে ঘুষি মেরে বলে,- আই উইল বি দা টপ।
সত্যিই বরাবর ও প্রথম হয়।
রিনা ছেলের মুখে একদিন কথাটি শুনে বলে, দেখেছ ইমনের কী জেদ, কী ডিটারমিনেশন।
টাপ্পু অঙ্ক খাতায় আঁকিবুকি করতে করতে বলে, আমিও একদিন টুলটুল দাদাকে টপকে যাবো।
দুপুর বেলা পেট ভরে ভাত খেলে শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করে না? ঘুমে দু'চোখ ঢুলুঢুলু হয়ে আসে। ভীষণ ঘুম পায় ওর। তবু চেয়ার ছেড়ে উঠতে পারে না টাপ্পু। মাকে মাঝে মাঝে তবুও ফাঁকি দেয়া যায়। কাজের ঝামেলায় সব সময় ব্যস্ত থাকে মা। ধরা পড়লে গলা জড়িয়ে ধরলে মায়ের সব রাগ উধাও হয়ে যায়। বরফের মতো গলে যায় মা।
সি্নগ্ধ সুরে শুধু বলতে থাকে- আর কখনো এমন করবে না টাপ্পু। পড়াশুনায় ফাঁকি দিতে নেই।
ছুটির দিন বলে বাবা আজ বাড়িতে। অঙ্কগুলো যেভাবেই হোক কষতে হবে। বিকেলে চা খেতে খেতে চেক্ করবে বাবা।
টাপ্পু তো বড়ভাই টুলটুল দাদার মতো নয়। টুলটুল দিনের বেশিরভাগ সময় গুণগুণ করে পড়ে, মাথা গুঁজে অঙ্ক কষে। টাপ্পু তা নয়। একনাগাড়ে সে বেশিক্ষণ পড়তে পারে না। বিকেলে ওর বাড়ির কাছাকাছি কোথাও খেলা চাই। মাঠ তো এখন কোথাও নেই, তবে টাপ্পুদের বাড়ির পাশে একটি আকাশ ছোঁয়া বাড়ি হবে। তবে এখনও কাজ শুরু হয়নি। বালি-ইট এনে জমা করা হচ্ছে। পুরোটা জায়গা ফাঁকা রয়েছে বলে খেলার খুব সুবিধে। এ জায়গাটুকুতেই ওরা ক্রিকেট খেলেছে, লুকোচুরি খেলে। তবে বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে বলে এখন শুধু ফুটবল খেলা। টুলটুল দাদার মতো ভালো ছেলে হয়ে গুণগুণ করে সারাক্ষণ পড়া- তা ওর মোটেও ভালো লাগে না। ওর ইচ্ছে করে নীল তিমির কথা জানতে, বরফের দেশে যেতে। জোনাকির জ্বলা-নেভা দেখতে।
কিছুদিন আগে ছোটমামু টরেন্টো থেকে এসে ছোট ভাগ্নেকে দেখে অবাক। টাপ্পু তো ওয়ান্ডারফুল বয়।
-দিদি, তোমার ছোট ছেলে তো দারুণ ইনকুইজিটিভ। সব ব্যাপারে খুব কৌতূহল ওর।
এই পৃথিবীর সবকিছুই অদ্ভুত লাগে ওর কাছে। ছোটদের সাঁতার কাটা অনেক কসরত করে শিখতে হয়, কিন্তু তিমিরা জন্মের পর থেকেই সাঁতার কাটতে পারে। বাছুরও তো জন্মের পর মূহূর্ত থেকে তিড়িং বিড়িং করে লাফায়। ভাবতে ভাবতে খেই পায় না টাপ্পু। শুধু মানুষরাই দেরি করে সব শেখে।
মা-বাবা ওকে বলে, পড় পড়- ভালো করে পড়ো ছোটমামু কিন্তু ওসব বলে না, বরং বলে, কিরে, সারাদিন শুধু পড়া করিস, তার চেয়ে বরং আউট নলেজ বাড়াবার চেষ্টা কর। কুনো ব্যাঙ হয়ে থাকিস না। ছোট মামুর গল্প শুনে তো হতবাক। শীত এলে ইউরোপের অনেক সাগরের পানি জমে নাকি একেবারে বরফ হয়ে যায়। এর ওপর দিয়ে মানুষ দিব্যি হেঁটে যায়, গাড়ি চালায়, স্কি করে সাগর পেরিয়ে যেতে পারে।
সেসব দেশে যেতে ভীষণ ইচ্ছে করে টাপ্পুর। ও নিশ্চয়ই কোনদিন যাবেই যাবে সাগরের গভীরে, বরফের দেশে।
টুলটুল ধমক দিয়ে বলে, আবার তোর সেই উদ্ভট কল্পনা। এগুলোকে বলে দিবাস্বপ্ন-ডে-ড্রিম।
বাড়ির কাউকে এসব কথা বলার জো নেই ওর। সবাই বলে- আরে পাগল নাকি? এখন পড়াশুনা করার সময়। এগুলো নিয়ে কেউ কি ভাবে? বড় হও তখন সব জানতে পারবে। তাই কাউকে আর মনের কথা বলে না। রাতে যখন ঘুমোতে যায়, ফুলপরী নীল পরীরা যখন মুঠো মুঠো ঘুম ছড়িয়ে দিতে থাকে টাপ্পুর দু'চোখের পাতায় তখন হুঁশ হুঁশ করে সমুদ্রের নিচ থেকে নীল তিমি ওর কাছে ছুটে আসে। দুধসাদা বরফগুলো ছুঁয়ে যেতে থাকে বার বার।
ক'দিন থেকে স্কুলে খুশির ঢেউ। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা বইগুলো ব্যাগে ভরে খুশির হাওয়ায় দুলছে। শবেবরাতের রাত চলে গেছে। স্কুলে কিছুদিন পরেই রমজানের ছুটি শুরু হবে। দেখতে দেখতে সেপ্টেম্বর এসে গেল। শরতের রূপে মন ভরে যায়। বাংলা-ইংরেজি-ভূগোল পড়তে পড়তে টাপ্পু জিজ্ঞেস করে ঈদ কবে মা?
-এই তো কদিন পর।
টাপ্পু বলে- এভাবে ক'দিন পর বললে হবে না মা, ঠিকঠাক করে বলো।
-কেন রে?
সত্যি ঈদের দিনটি ভীষণ মজার। মাকে নীলা আন্টি, রিয়াভাবী, রোজী খালাম্মা ফোনে বলেন, সকাল বেলা নাশতা
তৈরি করবে না, আমরা সব পাঠাব।
পেস্তা-বাদাম-কিসমিস দেয়া ঘন দুধের সেমাই, ফিরনি, চটপটি, হালিম- একে একে সব হাজির হয় বাড়িতে। মা কিছু ফ্রিজে তোলে, কিছু টেবিলে সাজিয়ে রাখে।
দুপুর বেলা পাশের বাড়ির রাজুর দাদীমা পাঠান জাফরান রঙে রাঙানো পোলাও, মুরগির কোরমা, আর জরদা। বরাবরের এই-ই নিয়ম। এ দিনটি তাই চমৎকার কাটে।
বেশ কাটে ঈদের দিনটা। এদিন পড়াশুনা একদম নেই। পাশের বাড়ির ছোটরা বেড়াতে আসে, গল্প করে, টিভি দেখে দারুণ কাটে সবার। টাপ্পুর তো কথাই নেই। ভোর বেলা উঠে দাঁত ব্রাশ করে বসে আছে ও। নীলা আন্টি, রিয়াভাবীদের বাড়ি থেকে এসে গেছে সেমাই ফিরনী, চটপটি, নুডুলস।
টুলটুল আর টাপ্পুর সামনে পেস্নট। রিনা বেড়ে দিতে যাবে এমন সময় দরজায় ধাক্কা।
কারেন্ট নেই তাই ডোর বেল বাজেনি। মা বলে, দেখি তো কে এলো!
দরজা খুলে মা অবাক।
- তুমি আজকে এলে কেন বুয়া? তোমার তো আজ ঈদ। ছুটির দিন।
একমুখ হেসে কলিমন বলে, কাম করতে আসি নাই আম্মা। বাইয়াগো লাইগা সিমুই আনছি।
ওর পরনে আজ ন্যাতানো শাড়ি নয়, রিনার দেয়া লাল-সবুজ-হলুদ মেশানো ছাপা শাড়ি। নৌকার পালের মতো ফুলে উঠেছে শাড়ি। বুয়াকে আজ অন্যরকম লাগছে।
আঁচলের ঢাকা সরিয়ে কাঁচের বাটি বের করে সে। বাটি ভর্তি সেমাই।
-আপনেগো লাইগা আনছি আম্মা।
রিনা বুয়ার শরীরে হাত বুলিয়ে বলে, এত কষ্ট করে এনেছ বুয়া- পেস্তা-বাদাম-কিসমিস-ঘি দেয়া খাবারের পাশে বুয়ার সেমাইয়ের বাটি রাখে রিনা।
পাতলা টলটলে দুধে সেমাই ভাসছে। টুলটুল ওর পেস্নটে তুলে নেয় ডিম-মটরশুঁটি-বিন মেশানো নুডুলস। পাশে কুচি করা পেস্তা-বাদাম ছড়ানো অনেকখানি সেমাই। বুয়ার বাটি এমনই এককোণে পড়ে থাকে। একটু দূরে বুয়া করুণ চোখে তাকিয়ে আছে দু'ভাইয়ের দিকে। কুচ পরোয়া নেহি। টাপ্পু বলে, আমাকে বুয়ার সেমাই দাও তো মা, অনেকটা দিয়ো কিন্তু
-তুমি খাইবা সোনা?
বুয়া আপনমনে বলে, পিরিচে কইরা দুধের সেমাই খাওয়ন যায়নি, দুধের সেমাই বাটিতে খাওয়ন লাগে।
যত্ন করে টেবিল থেকে বাটি নিয়ে বেড়ে দেয় বুয়া।
-খাও সোনা।
দু'চোখ বুঁজে চামচ দিয়ে খেতে থাকে টাপ্পু। শায়লা ম্যাডামের কথা দু'কানে ঝাপটা দিতে থাকে।
'কারো মনে, কখনও কষ্ট দেবে না। কাউকে দুঃখ দিতে নেই।'
টুলটুল দাদা বুয়ার সেমাই থেকে চামচ দিয়ে একটুখানি নিতে পারত, তা সে নেয়নি। পড়াশুনায় খুব ভালো ও। অঙ্কে ভীষণ মাথা কিন্তু কারো মন বুঝতে পারে না। স্বাদ নিতে নিতে টাপ্পু বোঝে-বুয়ার সেমাই পানসে, চিনিও কম। তারপও বেশ অন্যরকম স্বাদ। দুধ-কর্নফ্লেক্স খাবার চেয়ে অনেক-অনেক ভালো। ওদের জন্য যত্ন করে তৈরি করেছে যে- হয়তো তাই। বুয়া জিজ্ঞেস করে, সিমুই ক্যাম্পুন হইছে কইলা না হুরু ভাইয়া।
খুশি খুশি গলায় টাপ্পু বলে, দারুণ। বুয়া, ইয়ু আর দা বেষ্ট।
-আমার সিমুই খাইছে গো সোনায়- বলে পান জরদা মাখা ঠোঁটে টাপ্পুর কপালে চুমু খায় চকাস করে। অন্য সময় কেউ আদর করলে ও চ্যাঁচামেচি করে ভীষণ। বলে, আমার মুখে থুতু লাগিয়ে দিয়েছ কেন? আজ কিছুই বলে না। বুয়ার আদর খুশি মনে উপভোগ করে টাপ্পু।
মা রিনা অবাক হয়ে খেয়াল করে, তার ফার্স্ট বয় ছেলে টুলটুলকে কি ডিঙিয়ে প্রথম হয়ে গিয়েছে দুষ্টু আর ভাবুক ছেলেটি? প্রাণভরে মনে মনে হাসতে থাকে রিনা। পড়-য়া ছেলে টুলটুলকে কী অনায়াসেই না টপকে গেল মিষ্টি চেলে টাপ্পু।
================
গল্প- 'নাচে বানু নাচায়রে' by আতা সরকার  গল্প- 'রূপকথার মতো' by নাসির আহমেদ  গল্প- 'বিয়ে' by আর্নল্ড বেনেট  গল্প- 'মাদকাসক্ত' by আলী ইদ্রিস  গল্প- 'বেঁটে খাটো ভালোবাসা' by রেজানুর রহমান  কবর by জসীম উদ্দীন (পল্লীকবি)  গল্প- 'নদীর নাম চিলমারী' by নীলু দাস  গল্প- 'লাউয়ের ডগা' by নূর কামরুন নাহার  গল্প- 'অপূর্ব সৃষ্টি' by পারভীন সুলতানা গল্প- 'ঊনচলিস্নশ বছর আগে' by জামাল উদ্দীন  গল্প- 'সুচ' by জাফর তালুকদার   গল্প- 'বাসস্ট্যান্ডে যে দাঁড়িয়েছিল' by ঝর্না রহমান  গল্প- 'গন্না' by তিলোত্তমা মজুমদার  গল্প- 'ঘুড়িয়াল' by শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়  গল্প- 'প্রক্ষেপণ' by মোহিত কামাল  গল্প- 'গন্তব্য বদল' by রফিকুর রশীদ  গল্প- 'ঝড়ের রাতে' by প্রচেত গুপ্ত  গল্প- 'শুধু একটি রাত' by সাইপ্রিয়েন এক্ওয়েন্সি। অনুবাদ বিপ্রদাশ বড়ুয়া  গল্প- 'পিতা ও কুকুর ছানা' by হরিপদ দত্ত  স্মরণ- 'শওকত ভাই : কিছু স্মৃতি' by কবীর চৌধুরী  সাহিত্যালোচনা- 'রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে পালাকারের নাটক  স্মরণ- 'আবদুল মান্নান সৈয়দ : কবি ও প্রাবন্ধিক' by রাজু আলাউদ্দিন  স্মরণ- 'সিদ্ধার্থ শংকর রায়: মহৎ মানুষের মহাপ্রস্থানে by ফারুক চৌধুরী  গল্প- 'ফাইভ স্টার' by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম  গল্প- 'নূরে হাফসা কোথায় যাচ্ছে?' by আন্দালিব রাশদী  গল্প- 'হার্মাদ ও চাঁদ' by কিন্নর রায়  গল্প- 'মাটির গন্ধ' by স্বপ্নময় চক্রবর্তী  সাহিত্যালোচনা- 'কবি ওলগা ফিওদোরোভনা বার্গলজ'  গল্পিতিহাস- 'বালিয়াটি জমিদারবাড়ির রূপগল্প' by আসাদুজ্জামান  ফিচার- ‘কাপ্তাই লেক:ক্রমেই পতিত হচ্ছে মৃত্যুমুখে' by আজিজুর রহমান


দৈনিক ইত্তেফাক এর সৌজন্য
লেখকঃ ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ


এই গল্প'টি পড়া হয়েছে...
free counters