ভর্তুকি দাবি ১৯ হাজার কোটি টাকা

ব্যাংক সচল রাখতে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে সরকারি মালিকানাধীন পাঁচটি ব্যাংক। এ টাকা দিয়ে ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণ করা হবে। ভর্তুকির এ দাবি সর্বকালের সর্বোচ্চ। যা চলতি বাজেটে এ খাতে বরাদ্দের নয় গুণের বেশি। ভর্তুকি দাবির শীর্ষে রয়েছে সোনালী এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। বিপুল অঙ্কের অর্থ পূরণের বিষয়টি নেতিবাচকভাবে দেখছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
তবে এ অর্থায়নের বিকল্প পথ খোঁজা হচ্ছে। এ ব্যাপারে বুধবার ব্যাংকগুলোর এমডি ও সিইওদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. ইউনুসুর রহমান। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণে চলতি বাজেটে ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিপরীতে ব্যাংকগুলো চেয়েছে ১৯ হাজার কোটি টাকা। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বরাদ্দের অর্থ দেয়া হবে। বিষয়টি নিয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করা হবে। এরপর ঘাটতি অর্থায়নের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংকগুলো সঠিক নিয়মে ঋণ দেয়নি। অধিকাংশ ঋণের অর্থ লুটপাট হয়েছে। যে কারণে এখন টাকা ফেরত আসবে না। গত কয়েক বছর ধরেই এ প্রক্রিয়া চলছে, একদিনে হয়নি। সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক ঘটনার প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, চার হাজার কোটি টাকা কোনো টাকাই না। এ বক্তব্যের পর ব্যাংকগুলোয় ভুল বার্তা গেছে। ফলে ব্যাংকগুলো লুটপাটকারীদের উৎসাহিত ও নিরাপত্তা দিয়েছে। যে কারণে আজকে এ মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। আগ থেকে সাবধান হলে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। জানা গেছে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত উল্লিখিত ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে পৃথকভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাছে এ টাকা চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ৫ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা। অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি মূলধনের পরিমাণ আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ঘাটতি ৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ ছাড়া রূপালী ব্যাংক ৭০০ কোটি টাকা ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি মূলধন ৮০০ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। ব্যাংকগুলো মূলধন ঘাটতি নিয়ে সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছে। সূত্রমতে, বেসিক ব্যাংকের টাকা বস্তায় ভর্তি করে ব্যাংক থেকে বের করে নেয়া হয়। ঋণের নামে এ টাকা সরানো হয় ব্যাংক থেকে। একইভাবে হলমার্কের দুর্নীতির কারণে সোনালী ব্যাংক বড় ধরনের ঘাটতির মুখে পড়ে। অন্যান্য ব্যাংকের মূলধন ঋণের নামে বের করে নেয়া হয়। ফলে সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলোয় বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পরিস্থিতি নিয়ে বুধবার সোনালী, রূপালী, বেসিক, বাংলাদেশ কৃষি এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের শীর্ষ প্রধানদের সঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. ইউনুসুর রহমান বৈঠক করেছেন। প্রতিবছর কেন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতির পরিমাণ বাড়ছে, এর নেপথ্যে মৌলিক কারণগুলো চিহ্নিত করতে ওই বৈঠকে ব্যাপক আলোচনা হয়। মূলধন ঘাটতির বড় একটি কারণ হিসেবে খেলাপি ঋণকে শনাক্ত করা হয়। বৈঠকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনার নির্দেশ দেয়া হয় এমডিদের। বৈঠকে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এবং রাজশাহী কৃষি ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, সরকার কৃষকদের ঋণ দিচ্ছে, ভর্তুকি দিয়েছে। ফলে এ ব্যাংক দুটির লোকসান ও মূলধন ঘাটতি হবে এটিই স্বাভাবিক। সূত্রমতে, বৈঠকে ব্যাংকের এমডিরা সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ বিতরণের সার্ভিস চার্জ দাবি করেন। তারা বলেন, প্রতিবছর বিভিন্ন কর্মসূচির ৩০-৪০ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া সরকারের আরও ২৫-৩০ ধরনের সার্ভিস বিনা মূল্যে কোটি কোটি মানুষকে দেয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বড় একটি অংশ সম্পৃক্ত থাকার কারণে তারা অন্য কোনো কাজ করতে পারে না।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রতিবছর মূলধন ঘাটতি পূরণে টাকা দেয়া হচ্ছে। জনগণের টাকায় ঘাটতি মূলধন পূরণ নিয়ে বাইরে বেশ সমালোচনা হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বিতরণে তাদের সার্ভিস চার্জ দেয়ার বিধান রাখা হলে ব্যাংকগুলো বেশকিছু টাকা পাবে। যা মূলধন ঘাটতি পূরণের বিকল্প কৌশল হিসেবে ব্যবহার হবে। এদিকে আন্তর্জাতিক মান ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে মূলধন সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়া হয় বৈঠকে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে গত ৯টি অর্থবছরে ১৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১২ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকাই দেয়া হয়েছে গত পাঁচটি অর্থবছরে। এই অর্থের মধ্যে সর্বাধিক পেয়েছে বেসিক ও সোনালী ব্যাংক। জানা গেছে, বিগত চার অর্থবছরে শুধু সোনালী ও বেসিক ব্যাংককে মূলধন ঘাটতি পূরণে ৬ হাজার ৯৫ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। ২০১৩-২০১৪ এবং ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে সোনালী ব্যাংক এ খাত থেকে অর্থ পেয়েছে যথাক্রমে এক হাজার ৯৯৫ কোটি টাকা ও ৭১০ কোটি টাকা। ‘হলমার্ক’ কেলেঙ্কারির কারণে সোনালী ব্যাংকের খোয়া গেছে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা, যা এখনও অনাদায়ী। একইভাবে বেসিক ব্যাংককে ২০১৪-১৫ এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মূলধন ঘাটতি পূরণ দেয়া হয়েছে যথাক্রমে এক হাজার ১৯০ কোটি টাকা এবং ১২০০ কোটি টাকা।