Saturday, October 16, 2010
উপন্যাস- 'রৌরব' (চার ও শেষ পর্ব) by লীসা গাজী
উপন্যাস- 'রৌরব' (চার ও শেষ পর্ব) by লীসা গাজী
ফরিদা টের পেলেন গলার কাছে কিছু একটা দলা পাকিয়ে আছে, ঢোক গিলতে কষ্ট হচ্ছে। গলা পরিষ্কার করতে চেষ্টা করলেন একবার—দ্বিতীয়বার গলা খাকারি দেয়ার শব্দে মুখলেস সাহেব চোখ মেলে তাকালেন। ফরিদাকে চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্কুলের ছাত্রের মতো প্রায় এ্যাটেনশনের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে পড়তে চেষ্টা করলেন। যেন না দাঁড়ালে কড়া হেড মিস্ট্রেস তাকে এক্ষুনি নিল-ডাউন করিয়ে রাখবে। কিন্তু শরীর তাকে সেই অনুমতি দিলো না। তাই কেমন ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেন।
—চা খাইবা?
মুখলেস সাহেবের ঘুমের ঘোর তখনও কাটে নাই। চোখ কচলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। —চা খাইবা না কি?
—হ্যাঁ খাবো। লাভলি আসছে?
আচমকা
ঘুম ভাঙার জন্যই বোধহয় মুখলেস সাহেব তার যাবতীয় বোধ-বুদ্ধি খুইয়েছেন। নইলে
জ্ঞানত তিনি কখনও উস্কানিমূলক প্রশ্ন করেন না। ফরিদা প্রশ্নের আশ্চর্যরকম
শান্ত উত্তর দিলেন। নিজের শান্ত গলার আওয়াজ শুনে খুব সন্তুষ্ট হলেন—“ না,
এখনও আসে নাই। আসবে সময় মতো।”
—হ্যাঁ হ্যাঁ, চইলা আসবে। চলো চা খাই মাথাটা ধরা ধরা।
কোনো রকমে লাভলির প্রসঙ্গ ধামাচাপা দিয়ে বারান্দা থেকে বের হলেন। প্রায় সারাটা দিন আজকে তার বারান্দাতে বসেই কাটাতে হয়েছে। বেতের চেয়ারে এক নাগারে বসে থেকে কোমর থেকে শরীরের উপরের অংশে রক্ত চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে তাই একটু তাল হারালেন।
—কী হইছে? মাথা ঘুরে না কি?
—না না, অনেকক্ষণ বইসা ছিলাম…।
ফরিদার পাশ দিয়ে কুণ্ঠিত মুখলেস সাহেব বেরিয়ে গেলেন, ফরিদা তার পিছে পিছে গেল। খাবার টেবিলে চা দেয়া হয়েছে। সিঙ্গারাও হয়তো এক্ষুনি ভাজা হয়েছে কারণ ছয়টা সিঙ্গারা থেকে ছয়টা চিকন ধোঁয়ার সূঁতা সোজাসুজি উপরে উঠে যাচ্ছে। ফরিদা চেয়ার টেনে বসলেন। সিমেন্টের মেঝেতে ছেঁচড়ে আসায় বিশ্রী রকম আওয়াজ হলো। সেই আওয়াজ শুনে মুখলেস সাহেব তার চেয়ারটা সাবধানে টানলেন। টেবিলে সিঙ্গারা দেখে এমনিতেই তার মেজাজ ফুরফুরা হয়ে গেছে।
—দুপুর থিকা ঘুমাইতেছো। যাও, হাত-মুখ ধুইয়া সুন্দরমতো আইসা বসো।
মুখলেস সাহেব কোনো তর্কে গেলেন না। চেয়ার আবার যথাস্থানে রেখে হাত-মুখ ধুতে গেলেন।
—খালাম্মা ছোট আপারে ডাকমু? সিঙ্গারা জুরায় যাবে।
ফরিদা কী যেন ভাবলেন। কোনো রকম শব্দ এখন সহ্য হবে না। ‘ডাকো’ বললেই রাবেয়ার মা বীরবিক্রমে বিউটির দরজার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।
—থাক, দরকার নাই। ঘুমাইতেছে মনে হয়, একটু পরে নিজেই উইঠা যাবে। আপার জন্য ডাইল বাইটা রাইখো।
—জি, ছোট আপা বলছেন।
মুখলেস সাহেব হাত-মুখ ধুয়ে ফিরে এলেন, যথাসাধ্য চেষ্টা করলেন চেয়ারে শব্দ না করে বসতে। মুখ তখনও ভেজা ভেজা। ফরিদা তার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। তারা দু’জনেই দু’টা করে সিঙ্গারা খেলেন। গ্লাসভর্তি পানি খেলেন। তারপর চায়ে ছোট ছোট চুমুক দিতে লাগলেন। ফরিদা প্রত্যহ যেমন টুকটাক সাংসারিক কথাবার্তা বলেন, আজকেও সেই চেষ্টা করলেন।
—বাড়িতে যাবা কবে ঠিক করছো?
—মিয়াভাই ফোন করলে রওয়ানা দিতে বলছেন। তারা কিনার মানুষ ঠিক কইরা আমারে খবর দিবেন।
—কী কিনার মানুষ ঠিক করবেন?
—দাদা মশাইয়ের কিছু ভালো ধানী জমি আছে সেইগুলা।
—এখনই বিক্রি করবা কেন, রাইখা দেও পরে কাজে লাগবে।
—এতদিন তারা কিছু দিতেই চায় নাই। এখন না গেলে সবই হাতছাড়া হবে। বেশি দিন তো না, চার পাঁচ দিন।
—তাইলে আমরা সবাই মিলাই যাই চলো।
ফরিদার প্রস্তাবে মুখলেস সাহেব বাক্যহারা হলেন। তিনি মুখভরা চা গিলতে ভুলে গেলেন। সকাল থেকে চেনা ফরিদা দ্রুত বদলে যাচ্ছেন। এতটাই দ্রুত যে তার পরিবর্তনের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। এরকম প্রস্তাব তাদের প্রায় বিয়াল্লিশ বছরের বিবাহিত জীবনে তিনি আর শোনেন নাই। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রতিক্রিয়া কেমন হওয়া উচিৎ সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই তার নাই। কোনো রকমে চা গিলে কৃতার্থ হওয়ার মতো একটা ভাব করলেন।
—যাওয়া যাবে? থাকার জায়গা ফায়গা আছে?
—আছে নিশ্চয়ই। দেখি, মিয়াভাই ফোন করলে জিজ্ঞাস কইরা দেখব।
—হ্যাঁ দেইখো।
মেয়ে দু’টাকে নিয়ে কোথাও অদৃশ্য হয়ে যেতে পারলে তাই যেতেন ফরিদা। হঠাৎ করে গ্রামে গিয়ে থাকার ভাবনা তার কাছে সে কারণেই বেশ মনোঃপুত হলো।
* * *
৯ নভেম্বর, শুক্রবার, ২০০৭। দিনটা শীত-দিনের সমস্ত চরিত্র ধারণ করে দ্রুত ১০ নভেম্বরের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। সন্ধ্যা নেমেছে ১১৫/৩ মনিপুরি পাড়ার গলির উপর। দূরে কোনো বাসা থেকে কচি বাচ্চার সুতীক্ষè কান্নার শব্দ সন্ধ্যার ফিকে আলো আঁধারির সাথে মিলেমিশে যাচ্ছে। স্পষ্ট করে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না—না আলো, না আঁধারি, না কান্না। শুধু একটা চাপ ধরা অস্বস্তি ফরিদার শিরায় শিরায় অনুভূত হচ্ছে। বেশ অনেকক্ষণ হলো শোবার ঘরের জানালার পাশে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। মাঝে মধ্যে যদিও জানালার পাশের বেতের চেয়ারটায় একটু বসবেন ভাবছেন, কিন্তু বসছেন না। জানালা দিয়ে গলির রাস্তা বেশ অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। তিনি তাকিয়ে আছেন। রাত নামছে টের পাচ্ছেন। রাতের যা চরিত্র—সব কিছুকে অন্তত তিনগুণ বাড়িয়ে দেয়। জ্বর বাড়ে রাতে, ব্যথা বাড়ে রাতে, ভয় বাড়ে রাতে, প্রেম বাড়ে রাতে। তার ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটছে। ভয়ে কাঁটা হয়ে আছেন। মেয়েটা ফিরবে কি ফিরবে না সেই সম্ভাবনার যন্ত্রণা তাকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলছে। দোয়া পড়তেও ইচ্ছা করছে না। এক ধরনের বোবাবোধ গিলে ফেলেছে। কিছুই তিনি অনুভব করছেন না আবার করছেনও।
গলি দিয়ে যা-ই যাচ্ছে সেদিকে তার সমস্ত মনোযোগ, দৃষ্টি বিঁধিয়ে দিচ্ছেন। একটা রিকশা যাচ্ছে—তিনি টানটান হয়ে গেলেন, একটা সিএনজি—তার দম বন্ধ হয়ে এলো, আবার একটা রিকশা—তিনি স্থির, একটা কালো ট্যাক্সি—তার পুরো শরীর দু’পায়ের আঙুলে খাড়া।
এভাবে কতক্ষণ কেটেছে কে বলতে পারে। গলির মধ্যে একটা সিএনজি এগিয়ে আসছে, তিনি আশাহীন চোখে তাকিয়ে থাকলেন। সিএনজি তাদের গেট পার হতেই বুকের ভিতরের জমাট শ্বাস ফুস করে বেরিয়ে গেলো। সিএনজিটা অল্প এগিয়েই ঝাঁকিসহ থেমে গেল। ফরিদা সমস্ত সুখ মানত করলেন—খোদা লাভলি যেন হয়, জীবনে আমি আর কিছু চাই না। অনন্তকাল কেউ নামল না। তারপর এক সময় মেয়ের পরিচিত ক্লান্ত অবয়ব চোখে পড়ল, মাথা নুইয়ে সিএনজি থেকে নামল, ধীরে গেইট পযন্ত হেঁটে এল তারপর কোলাপসিবল গেইটের পেটের ছোট গেইট খুলে মাথা নিচু করে বাড়িতে ঢুকলো। মেয়েটা মাথায় শাল জড়িয়ে নিলো। ফরিদা স্পষ্ট দেখতে পেলেন লাভলি মাথা নিচু করে মুহূর্তক্ষণ দাঁড়ালো—এইটুকু দেখে ফরিদা ধীরে চেয়ারে বসে পড়লেন। নিজেকে ধাতস্ত হবার জন্য কিছুটা সময় দরকার। বুকের ভিতরে যে ঘোড়দৌড় চলছে তার লাগাম ধরতে হবে একটু একটু করে। কষে টান দিলে ছিঁড়ে যেতে পারে।
বেল বাজছে, পিচ্চি দৌড়ে তার ঘরের সামনে এল।
—নানি, বড় খালা আসছে।
ফরিদা তখন চেয়ারে বসা, সামলে উঠতে কষ্ট হচ্ছে।
—ভিত্রে আয়।
বহু কসরত করে মাথা উঁচু করলেন। আঁচলের প্রান্ত থেকে চাবির গোছা খুলে দিলেন। পিচ্চি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। এখন, এখন কী হবে?
—বড় খালা আসছেন। আমি যে ডরাইছি!
‘আমি’ শব্দটায় লাভলির কান আটকে গেল। তার মানে কি এই যে বাসার অন্য কেউ ভয় পায় নাই। ওর কি এতে নিশ্চিন্ত হওয়া উচিত। অবশ্য এত শিঘ্রী নিশ্চিন্ত হওয়াটা ঠিক হবে না।
—আম্মা কই?
—বাসাতই।
লাভলির আর কোনো প্রশ্ন মাথায় এলো না—সত্যি কথা বলতে কী, কোনো কিছু সম্পর্কেই ও এই মুহূর্তে বিন্দুমাত্র আগ্রহ বোধ করছে না। তবে এই মুহূর্তে তার বাথরুমে যাওয়াটা জরুরি পর্যায়ে পড়েছে। বাসায় ঢুকে কারও মুখোমুখি হ’তে ইচ্ছা করছে না লাভলির। ও পিচ্চিকে পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে ঠিক করল, সোজা নিজের ঘরে গিয়ে বাথরুমে ঢুকে যাবে।
—(আপুমনি, উত্তম প্রস্তাব)—।
—তুমারে কেউ জিজ্ঞাস করছে?
মনে মনে মাথার ভিতরের লোকটাকে কড়া দাবড়ানি দিলো। দোতালায় উঠে দেখলো বাসার দরজা হাঁ করে খোলা কিন্তু আলো জ্বলছে না। প্রায়োন্ধকার হয়ে আছে জায়গাটা, এই বেশ সুবিধা হলো লাভলির। কাউকে জানান না দিয়ে বাসায় ঢুকলো। নিজের ঘরের দিকে যেতে গিয়ে মায়ের ঘর পার হলো, ভিতরে আলো জ্বলছে কিন্তু ফরিদার আভাস পাওয়া যাচ্ছে না। আম্মা নিশ্চয়ই জানেন ও এসেছে, তাহলে ঘরের মধ্যে ঘাপটি মেরে আছেন কেন? তার উপর তো এতক্ষণে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা। আর সবাই বা কোথায়—আব্বা, বিউটি। বাড়িটা ঠাণ্ডা, অসাড় হয়ে আছে। লাভলি ডানে বাঁয়ে তাকালো না। মাথা নিচু করে ‘ইয়া নফসি’ ‘ইয়া নফসি’ পড়তে পড়তে ঘরের ভিতর ঢুকে গেল। বিছানার উপর ধপাস করে বসল। যেন তার জ্ঞানহীন শরীরটাকে কেউ বিছানা অব্দি এনে হঠাৎ করে ছেড়ে দিয়েছে। ‘আহ্’ শব্দে ওর সচেতন অস্তিত্ব ছড়িয়ে পড়লো ঘরে। আলো জ্বালালো না, দরজা ভিড়ালো না, বাথরুমে গেল না—বিছানার উপর বসে রইল। যদিও বাথরুমে যেতেই হবে অবস্থা। এক সময় উঠে ঢুকে গেল বাথরুমে, অনেকক্ষণ ধরে মুখ ধুল—পার্কের ধূলা-বালি ঘষে ঘষে পরিষ্কার করল। শেলোয়ারে আটকে রাখা ছুরিটা বের করে খয়েরি কাগজের মোড়ক খুলে ফেলল লাভলি—কী সুন্দর ছুরি! নাহ্, আজকে একা একা বাইরে যাওয়া সার্থক। বিউটি দেখলে খুশিতে ঝিলিক দিবে। খুব বেশি পছন্দ করলে নাহয় বিউটিকে দিয়েই দিবে ছুরিটা। ওদের দু’জনের একজনের কাছে থাকলেই তো হলো। ছুরিটা কোথায় লুকিয়ে রাখা যায় লাভলি সেটাই এখন ভাবছে। বিছানার জাজিমের নিচে রাখা যায়। কিন্তু রাবেয়ার মা বিছানা করতে গিয়ে খুঁজে পেলে তুলকালাম বাঁধাবে। অবশ্য একদম মাঝখানে রাখলে হদিস পাবে না। সেটাই করবে ঠিক করলো লাভলি।
সব শেষে ওযু করে নিলো—এখন দীর্ঘ সময় জায়নামাযে কাটানো যাবে। সারাদিনের নামায একসাথে ক্বাযা পড়তে হবে—সময় তো লাগবেই। ভালোই হবে, আশা করা যায় অন্তত নামাযের সময় ফরিদা তার উপর চড়াও হতে পারবেন না।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে ঘরের অন্ধকারে থৈ পেলো না লাভলি। আলো জ্বালিয়ে দেয়া যায় কিন্তু দিতে ইচ্ছা করছে না। ওর জন্য কী ভয়াবহ শাস্তি অপেক্ষা করে আছে তা একমাত্র ফরিদা জানেন আর আল্লাহ জানেন। অন্ধকারের এই আড়ালটাই তাই লাভলির জন্য ভালো মনে হলো। অন্ধকারেই ড্রেসিং টেবিলের প্রথম ড্রয়ার খুলে তার ভিতরের রাজ্যের জঞ্জালের নিচে ছুরিটা আপাতত লুকিয়ে রাখলো। এখন সবচেয়ে নিরাপদ কাজ নামাযে দাঁড়িয়ে যাওয়া। কে যেন কবে বলেছিলো অন্ধকারে নামায পড়া যায় না—কে আর বলবে ফরিদাই বলেছিলেন সম্ভবত, কথাটা মনে পড়তে দোটানায় পড়ে গেলো লাভলি। শেষমেশ আলো জ্বালিয়ে নামাযের জায়গায় দাঁড়ালো। যা হবার হবে, মেরে তো আর ফেলতে পারবে না। মেরে ফেললে অবশ্য এর চেয়ে ভালো ছিল। নামাযে বসে লাভলি সত্যিকার অর্থে খোদার কাছে আত্মসমর্পণ করতে চাইল। নামায পড়তে পড়তেই টের পেল বিউটি ঘরে ঢুকে বিছানার উপর বসেছে। তখনও ওর অনেক রাকাত নামায বাকি। কিন্তু বিউটি ধৈর্যহারা হলো না। সালাম ফিরিয়ে লাভলি খেয়াল করলো বিউটি মাথা নিচু করে ঝিম ধরে বসে আছে। ও যে নামাযের বিছানা থেকে তাকে লক্ষ্য করছে তাও টের পেল না সে।
প্রায় চল্লিশ মিনিট পর লাভলি মোনাজাতে বসলো। হাত তুলে খোদার কাছে ও কিছুই চাইতে পারল না। হঠাৎ বিড় বিড় করে বললো, ‘আল্লাহ আম্মা যেন লাল কাপড়টা পছন্দ করেন’! মিনিট পাঁচেক শূন্য মনে বসে থাকার পর মোনাজাত শেষ করলো। জায়নামাযে বসেই লাভলি বিউটির দিকে মাথা ঘুরিয়ে দেখল, একইভাবে মাথা নিচু করে বসে আছে তখনও।
—আম্মা কই?
কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। মাস কয়েক ধরে মাঝে মধ্যেই বিউটিকে এরকম আনমনা দেখাচ্ছে। আজকে হয়তো বেচারার উপরে অনেক ধকল গেছে। ফরিদা সমস্ত রাগ হয়ত তার উপরেই ঝেড়েছেন।
—আম্মা কই?
দ্বিতীয়বার বলার পর বিউটি মাথা তুলে ওর দিকে তাকাল।
—তুমি কই গেছিলা?
—রমনা পার্কে।
—ইয়ার্কি মারো?
—ইয়ার্কি মারবো কেন, সত্যি।
আসলেই সত্যি কি না শুধু ওকে লক্ষ্য করে নিশ্চিত হতে চাইলো বিউটি। চোখ সরু করে লাভলির দিকে তাকিয়ে রইলো।
—রমনা পার্ক চিনো তুমি? কেমনে যাইতে হয় জানো, আন্দাজে কথা কও যে। আমিই তো চিনি না।
—চিনা লাগবে কেন, সিএনজিরে বলছি নিয়া গেছে।
লাভলি নামায থেকে উঠলো এবং জায়নামায ভাঁজ করে আলনার উপর রাখল। বিউটি বিছানায় বসে চোখের দৃষ্টিতে বোনকে অনুসরণ করছে। বোনের মধ্যে আমূল বদল টের পাচ্ছে, বাইরের হাওয়া মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কি একজনকে এতটা বদলে দিতে পারে? ভীরু, পায়ের নিচের মাটি সব সময় দুলছে এরকম একটা মেয়ে এখন চোখে চোখ রেখে অবলীলায় বলছে ও না কি রমনা পার্ক গেছিল—ওর ধারণা আছে ফরিদা বিষয়টা জানলে কী গতি হবে ওর? চোখে চোখে বোনকে অনুসরণ করছে আর বিউটি ভাবছে—যতই ভাবছে ততই নিজের উপর ঘৃণায় ধিক্কারে মরে যেতে ইচ্ছা করছে—সে তাহলে লাভলির চেয়েও গাড়ল, অপদার্থ—বিউটির চোখ সাদা হয়ে গেল। ছুটে গিয়ে বোনের চোখ-মুখ ফালা ফালা করে দিতে ইচ্ছা করলো।
লাভলি টের পাচ্ছে বোনের দৃষ্টি ওর পিছে পিছে ঘুরছে। বাসায় ফিরেছে ঘণ্টাখানেক তো হবেই কিন্তু ফরিদার পাত্তা পাওয়া যাচ্ছে না—ব্যাপারটায় ও যার পর নাই বিস্মিত হচ্ছে। ধীর পায়ে দরজার কাছে এসে উঁকি দিলো। রান্নাঘরে আলো জ্বলছে, কিন্তু খাবার ঘরে কেউ নাই, মানে কোথাও কেউ নাই—অন্তত লাভলি দেখতে পাচ্ছে না। ভয়ঙ্কর ভূতের কোনো ছবির মতো হয়ত যখন ও সবচাইতে বেশি বেখেয়াল, ঠিক তখন কেউ ঘটাং করে ওর টুটি ঠেসে ধরবে মাটির সাথে এবং ধরেই থাকবে। আশ্চর্য ঘটনা এইসব চিন্তা মনে আনাগোনা করা সত্ত্বেও ওর একটুও ভয় লাগছে না। শুধু কেমন এক ধরনের ‘নাই’ অনুভূতি ওকে আগাপাছতলা মুড়ে রেখেছে।
দরজার কাছ থেকে সরে আসলো লাভলি। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সময় নিয়ে বেণী খুলতে লাগলো।
—তুমার এত বড় সাহস কেমনে হইল?
বিউটির মুখ থেকে শব্দ না হলকা বের হলো। হলকা লাভলির প্রায় গা ছুঁয়ে গেল—আঁচ লাগলো ঠিকই কিন্তু পোড়াতে পারল না।
—কীসের সাহস?
—সকালে গেলা সন্ধ্যায় ফিরলা।
বিউটির সাথে কথা বলতে একদম ইচ্ছা করছে না লাভলির। বেণী খুলছে স্লো মোশানে, পুরো বাড়িটা দুলছে ওর সামনে স্লো মোশানে। ওর অনুপস্থিতিতে সারাদিন সবার কী দশা গেছে, ফরিদা কেন এখনও ওর খোঁজ করছেন না, কখন থেকে ওকে ঘরবন্দি করা হবে, না কি আজকের অপরাধের জন্য নতুন কোনো শাস্তির বিধান চালু হচ্ছে—এইসব বিষয়ের প্রতি লাভলি দ্রুত আগ্রহ হারিয়ে ফেলল। মনে প্রাণে চাইছে বিউটি যেন এই ঘর থেকে বেরিয়ে যায় এবং এখনই।
—বিউটি, আমার মাথা ব্যথা শুরু হইতেছে—তুই যা, আমি লাইট নিবায়ে শুয়ে থাকবো।
—কী?
—আমি লাইট নিবায়ে শুবো, তুই যা।
বিউটি ওর স্পর্ধায় স্তম্ভিত হয়ে গেল। কতোক্ষণ তাকিয়ে ছিল জানে না। হঠাৎ ক্ষোভে দিশাহারা হয়ে গেল, কাণ্ডজ্ঞান সম্পূর্ণ লুপ্ত হল তার। খাট থেকে নেমে ঘোড়ার মত মাটিতে পা ঠুকতে লাগল আর চীৎকার করতে লাগল।
—তুমি কই গেছিলা একক্ষণ বলবা। একক্ষণ। আমি কুনোদিন কুথাও যাই নাই। সারা শহর তুমি ঢ্যাং ঢ্যাং কইরা ঘুরবা। মগের মুল্লুক পাইছো? আম্মা এখনও তুমারে কিচ্ছু বলেন নাই, কেন বলেন নাই?—আম্মাই তুমারে পাঠাইছিলো, কই পাঠাইছিলো বলো?
চুল হেলাফেলা করে আঁচড়ালো লাভলি, তারপর বোনের তাণ্ডব নৃত্য আগ্রহহীন চোখে দেখল, একটা হাইও তুলল আর এই হাই তোলাতেই কাল হলো। তাণ্ডব দশা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ল। ঘরজুড়ে দাপিয়ে বেড়াতে লাগল বিউটি—মাঝে মধ্যে থামে কিছু বলে, দাপায়, ফোঁসে আবার কিছু বলে।
—লাগে যেমুন, দুনিয়া উদ্ধার কইরা আসছো। আমার আলাপে তুমার হাই আসে… তুমার ফুটানি আজকে বার হবে। তেল কমানো হবে আজকে… সবাই একটা মজা পাইয়া গেছে… দেখাইতেছি, আমিও দেখাইতেছি।
দাপানো বন্ধ করে বিউটি ওর উপর এক রকম হুমড়ি খেয়ে পড়লো। লাভলি ড্রেসিং টেবিলের সামনে—তাড়া খাওয়া বাঘের মতো বিউটিকে ওর দিকে ছুটে আসতে দেখে ঘুরে দাঁড়ালো। আয়নায় ওর আঁচড়ানো চুলের ঢল পিঠ ছাপিয়ে পড়েছে তারই পাশে বিউটির সাদাটে চোখের হিংস্রতা, তেড়ে আসার জন্য সিংহের মতো ফুলে থাকা চুল আর দু’হাতের মারমুখী উগ্রতা—আয়নায় চকিতে নিজের এই রূপ চোখে পড়লো বিউটির, মুহূর্তে থমকে দাঁড়ালো, চুপচাপ ঘর থেকে বের হয়ে গেলো।
বিউটির চীৎকারে রান্নাঘরের দরজার কাছে রাবেয়ার মা এসে দাঁড়ালো। হাতে রুটি বেলার বেলুন। বারান্দা থেকে পিচ্চি দৌড়ে আসলো মজা দেখার জন্য। কিন্তু ফরিদা বা মুখলেস সাহেব দু’জনের কেউই সামনে এলেন না। যদিও ফরিদা তার ঘর থেকে বিউটির আস্ফালন, চেঁচামেচি সবই শুনছিলেন, কিন্তু এক ইঞ্চি নড়লেন না। সেই যে বেতের চেয়ারটায় বসেছিলেন, বসেই থাকলেন। দুই মেয়ের কারুরই মুখোমুখি হবার শক্তি তার নাই। তিনি টের পাচ্ছেন বিউটি এবার তার দিকে তেড়ে আসছে। ইচ্ছা করলেই উঠে দরজাটা বন্ধ করে দিতে পারেন—ইচ্ছাটাই করল না।
—আম্মা, আমি জানতে চাই বাসায় কী হইতেছে? আপা আসছে এক ঘণ্টার উপরে, সারাদিন উধাও থাইকা এখন আরামসে বইসা আছে, চুল আঁচড়াইতেছে, মুখে ক্রিম মাখতেছে—আর আপনে ঘরের মধ্যে ঘাপটি মাইরা বইসা আছেন! কেন? আপারে জিজ্ঞাস করবেন না—এতক্ষণ কই ছিলো, কী কইরা আসছে? না কি আপনে কুথাও পাঠাইছিলেন তারে? কই পাঠাইছিলেন?
—ঘর থিকা তুই যা। একক্ষণ যাবি।
—না যাব না। কী করবেন? ন্যায্য কথা জিজ্ঞাস কইরা দোষ কইরা ফেলছি। আরেক মেয়ে যে আল্লায় মালুম কী কইরা বাসায় ফিরছে ওরে কিছু বলবেন না, আমার উপরে যতো চোটপাট। কেন বলবেন না আমি সেইটাই জানতে চাই।
—আমার ইচ্ছা আমি বলমু না। তোরে কৈফিয়ত দিতে হবে? আমি যা করছি, করছি—তার জন্য আমার আল্লারেও কৈফিয়ত দিতে হবে না। আমি সবার কৈফিয়ত নিবো। বান্দির বাচ্চা বান্দি, আমারে জিগাইতে আসে। দাপরানি দেখো তার, শয়তান—বাড়িতে যাত্রা শুরু করছে। … তোরা মরছ না কেন?… বার হ ঘর থিকা, বার হ…
নদীর কুল ছাপানো পানির মত কথার তোড় ফরিদার অন্তরাত্মা ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো। যতটা না জোরে তার চেয়ে হাজারগুণ বেশি ক্ষোভে আর ক্রোধে। সেই মুহূর্তে পুরো বাড়িটা জমে ঠাণ্ডা মেরে গেল—বিউটিও পাল্টা ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত ছিল কিন্তু ফরিদার মুখের দিকে তাকিয়ে গুটিয়ে গেল, ঘর থেকে বেরিয়ে এল ফুসতে ফুসতে। ফরিদা দরজা লাগিয়ে দিলেন।
মায়ের ঘর থেকে বের হয়ে খাবার ঘরে এসে বিউটি জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে লাগলো আর তার মনে হলো সে বিশাল একটা মাঠের মাঝখানে বান্ধবহীন দাঁড়িয়ে আছে। মাঠটা ধীরে কিন্তু টের পাবার মতো দ্রুততায় চারপাশ থেকে তার দিকে এগিয়ে আসছে এবং সে খুব শীঘ্রী মাঠে, ঘাসে, হাওয়ায় বিলীন হয়ে যাবে। সে মরিয়া হয়ে এদিক ওদিক তাকাতে গিয়ে দেখলো বারান্দার দরজার আড়ালে মুখলেস সাহেব দাঁড়িয়ে তাকে দেখছেন।—এবং নিশ্চিত করে বলা যায় মুখলেস সাহেবের পাশে পিচ্চি দাঁড়িয়ে আছে। সে টের পেলো বিভিন্ন ঘর থেকে সবাই তাকে দেখছে। আপার ঘর আলতো ভিড়ানো, কিন্তু সে হলফ করে বলতে পারে ওর যাবতীয় মনোযোগ এখন সে কী করছে সেইদিকে। কিন্তু বিউটির সব রাগ গিয়ে পড়লো মুখলেস সাহেবের উপর। এই মেনীমুখো লোকটা কি আসলেই তার বাবা। এত তেলতেলা পিচ্ছিল একটা লোক—বিউটির গা গুলিয়ে ওঠে।
—আপনে দরজার চিপায় কী করেন? কুনু কাজে-কামে নাই, কিন্তু সবখানে নাক দিয়া বইসা থাকবে। আস্তা ইয়া…
—বিউটি থাপড়ায়া তোর আমি দাঁত ভাঙবো। বাপের সাথে কেমনে কথা বলতে হয় তাও শিখে নাই। ইবলিশের বাচ্চা।
ফরিদা ঘরের ভিতর থেকে চীৎকার করে উঠলেন। বিউটি একদম চুপ মেরে গেল শুধু বারান্দার দরজার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা মুখলেস সাহেবের দিকে পলকহীন তাকিয়ে রইল, বিউটির চোখ দু’টা ধ্বকধ্বক করছিলো। সে যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখান থেকে মুখলেস সাহেবের মুখ দেখা যাচ্ছে না, শুধু গায়ের চাদর দুলতে দেখা গেল। এক সময় মুখলেস সাহেব নড়ে উঠলেন, চাদরসহ অদৃশ্য হলেন। বিউটিও নিজের ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল। কিন্তু স্বভাবসুলভ বিকটা শব্দ তুলল না—দড়াম করে দরজা লাগাল না কিংবা ঠাস করে কপাট ফেলল না। পা টিপে টিপে যথেষ্ট সাবধানতা মেনে নিঃশব্দে ছিটকিনি তুলল। যেন এই বাড়িতে মৃত্যুপথযাত্রী কোনো রোগী ঘুমিয়ে আছেন, এতটুকু নড়াচড়ায় তার ঘুম ভেঙে যাবে আর বেঁচে থাকার জন্য এই ঘুমটুকুর খুব বেশি দরকার। রাবেয়ার মার খুব ভয় লাগছে। খালুজানের জন্য আটার রুটি চার পাঁচটা বেলে রেখেছে, খেতে বসলে গরম গরম সেঁকে দেবে। আপাতত হাতে আর কোনো কাজ নাই। সারা বাড়ি কবরের মতো ঠাণ্ডা মেরে গেছে। এতটাই ঠাণ্ডা যে বারান্দা থেকে একটানা ঝিঁঝির ডাক রান্নাঘর থেকেও শোনা যাচ্ছে। মাঝে মধ্যে ছেদ পড়ছে আবার শুরু হচ্ছে। বারান্দার দরজা বন্ধ করে আসা দরকার। মুখলেস সাহেব কিছুক্ষণ আগে বসার ঘরে গিয়ে বসেছেন। বারান্দায় মনে হয় ঠাণ্ডা লাগছিল। গরম চাদরে গা মাথা জড়িয়ে রেখেছেন। বারান্দার দরজা খোলা দেখলে ফরিদা নির্ঘাত খেঁকিয়ে উঠবেন। কিন্তু রাবেয়ার মা প্রাণে ধরে যেতে পারছে না। আজকে কী যেন হচ্ছে, বদ বুঁ ঘিরে ধরেছে বাসাটা আর থেকে থেকে শরীরে কাঁপুনি ধরছে। পিচ্চিও রাবেয়ার মার পাশে চুপ করে বসে আছে। তার শীত করছে, হাত-পা হীম হয়ে যাচ্ছে আর মনে হচ্ছে কেউ না কেউ তাকে ধরে বেদম ধোলাই দিবে।
টেবিলে খাবার দিবে কি না রাবেয়ার মা বুঝতে পারছে না। গরম করতেও তো সময় লাগবে। রুটিগুল সেঁকে ফেলা দরকার। সে ভীষণ একটা পেরেশানির মধ্যে পড়েছে।
—পিচ্চি উঠ, টেবিল লাগা গিয়া।
—আইজকা কেউ খাইতো না।
—খাইতো না?
—খাইতো না।
—আমরা কী করতাম? আমার পেট ভুক লাগছে।
—আমারও।
দু’জন মানুষ পেটে ক্ষুধা নিয়ে রান্নাঘরে বসে রইল এক সময় দু’জনেরই ঝিমুনি এল। এর মধ্যে কতটা সময় পেরিয়ে গেছে কেউই জানে না। তবে রাত গভীর হচ্ছে এটা বোঝা যায়। শীতের রাত, কুয়াশার আড়ালে চলে গেল।
প্রথম ফরিদার ঘরের দরজা হাট করে খুলে গেল। অন্য দিনের মতো নিজেকে স্বাভাবিক রাখলেন, রান্নাঘরে ঢুকে দেখলেন পিচ্চি আর রাবেয়ার মা ঝিমাচ্ছে। রাবেয়ার মা’র মাথা দেয়ালে ঠেস দেয়া আর পিচ্চি দুই হাঁটুতে দুই হাত লম্বা করে রেখে মাঝখানে মাথাটা ছেড়ে দিয়েছে। দু’জনের দিকে ফরিদা মুহূর্তক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন তারপর সজাগ করলেন।
—রাবেয়ার মা টেবিলে ভাত বাড়ো।
রাবেয়ার মা’র মাথাটা কেঁপে উঠল, ধড়মর করে উঠে বসল। পিচ্চি হাত দু’টা গুটিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াল।
—টেবিল লাগা, পানি দে। জলদি কর, যা—অনেক রাত হইছে।
পিচ্চির মধ্যে কোনো তাড়া দেখা গেল না। কিন্তু রাবেয়ার মা তড়িঘড়ি শুরু করে দিল। ঘুম ঘুম চোখে সে চুলা জ্বালিয়ে তাওয়া বসাল রুটি সেঁকবার জন্য। তার হঠাৎ ভীষণ শীত করছে। গায়ের চাদর ভাল করে জড়িয়ে নিল। শীতে দুই কাঁধ বুকের দিকে চেপে আসছে, সে একটু পর পর তাওয়ার উপর হাত মেলে ধরছে আবার হাতে হাত ঘষছে। রাবেয়ার মা’র সাথে ফরিদাও হাত লাগালেন। পাশের চুলা জ্বালিয়ে তরকারি গরম বসালেন। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থেকে তিনি তদারকি করলেন, হুকুম দিয়ে বেরিয়ে গেলেন না।
—রাবেয়ার মা লেবু কাইটা দিও। পিচ্চি, এই পিচ্চি।
—জি নানি?
—কাটা ফেলবার প্লেট দিস। আল্লাহ’র তিরিশটা দিন মনে করায় দিতে হয়।
পিচ্চি মাথা নেড়ে খাবার ঘরে ফিরে গেল। ফরিদা রান্নাঘর থেকেই পিচ্চিকে বললেন মুখলেস সাহেবকে ডাকতে। নিজের হাতে হাঁসের মাংস আর ইলিশ পোলাও গরম করে বাটিতে বাড়লেন। রাবেয়ার মা টেবিলে দিয়ে আসল। ফরিদা টক দইয়ের সাথে শসাকুচি মিশিয়ে চট করে রাইতা বানালেন। সবকিছু শেষ করে খাবার ঘরে এসে দেখলেন মুখলেস সাহেব চুপ করে তার চেয়ারে বসে আছেন। দু’জনের একবার চোখাচোখি হল, কেউ কিছুই বললেন না। ফরিদা প্রথমে লাভলির ঘরের দরজায় হালকা টোকা দিলেন তারপর বিউটির দরজায়।
—লাভলি খেতে আয়। বিউটি খাবি না? —আয়।
ফরিদা টোকা দিয়ে দরজার কাছ থেকে সরে আসার সাথে সাথেই দুই মেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ওরা যেন এতক্ষণ দরজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়েছিল, ডাকতেই দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছে। ওদের কারও চেহারা দেখে ভিতরে কী ঘটছে বোঝার জো নাই। প্রতিদিনের মত যার যার চেয়ারে গিয়ে বসল। লাভলি বাসায় ফেরার পর এই প্রথম ফরিদার মুখোমুখি হল। কিন্তু ফরিদা বা লাভলি কেউই তা নিয়ে একটা শব্দও উচ্চারণ করল না। সবাই স্বাভাবিক থাকল। লাভলির মাথা আসলে একেবারেই কাজ করছিল না—নইলে ভয়ে ওর হাত-পা এতক্ষণে পেটের ভিতরে ঢুকে যাওয়ার কথা। ওর যে অপরাধী মুখ করে থাকা উচিৎ সেটাও বেমালুম ভুলে গেছে। ক্ষুধা আর পানির পিপাসায় ওর অবস্থা খারাপ। খাওয়া শুরু হতেই লাভলি পোলাওয়ের উপর একরকম হুমড়ি খেয়ে পড়ল। খাবার সময় কোনো কাথাবার্তা হল না। ফরিদা সাংসারিক যা দু’একটা টুকটাক কথাবার্তা খেতে বসে বলেন এখন সেই চেষ্টাও করলেন না। চার চেয়ারে চার জন ক্লান্ত মানুষ মাথা নিচু করে গোগ্রাসে খাচ্ছে।
এই মুহূর্তে মুখলেস সাহেবের খাবার এবং খাওয়ার পরে বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ার চিন্তা ছাড়া আর কিছুই মাথায় ঘুরছে না। দুপুর থেকে বারান্দায় বসে থাকতে থাকতে হাড়ের ভিতর পর্যন্ত ঠাণ্ডা ঢুকে গেছে। আজকে সারাদিন তিনি মানসিকভাবে ভীষণ নড়বড়ে অবস্থায় ছিলেন, নিজেকে কেঁচোর কাছাকাছি কোনো জীব বলে মনে হয়েছে।
বিউটি মাছের কাটা বাছছে পূর্ণ মনোযোগে, এখন যদি পৃথিবী রসাতলেও যায় তার কিছু যাবে আসবে না।
ফরিদা খাচ্ছেন ঠিকই কিন্তু কোনো কিছুর স্বাদ পাচ্ছেন না—লাভলি ফিরে আসার পরে উনি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সিদ্ধান্তটা পুরোপুরি নিয়ে নেয়ার পর হালকা বোধ করছেন। ঠিক করেছেন আবদুুল বশির সাহেবের ব্যাপারটা মেয়েদেরকে খুলে বলবেন। লাভলি তো জানেই, তবুও দুই মেয়েকে একসাথে বসিয়ে বলবেন। তার আগে মেয়েদের কঠিন নিষেধ করবেন বলার সময় কেউ যেন কথার উপর কথা না বলে বা অহেতুক প্রশ্ন না করে। কথা শেষ হওয়ার পরে তাদের যদি কিছু বলার থাকে তিনি তা শুনবেন। তবে আজকে রাতে না—নিজেদের গুছিয়ে নেয়ার জন্য সবারই আজকের রাতটা দরকার।
লাভলি খাচ্ছে ঠিকই কিন্তু আশেপাশে যা হচ্ছে বা ঘটছে সব কিছু ওর কাছে ঝাপসা লাগছে। যেন প্রচণ্ড গতিতে ছুটে চলা ট্রেনের খোলা জানালার পাশে লাভলি বসে আছে আর বাইরের দৃশ্য ক্রমাগত ওকে ফেলে দূরে সরে যাচ্ছে। বাইরের জগতের ঝাপট লাগছে, কিন্তু ঠাহর হচ্ছে না।
রাতের খাওয়া শেষ হয়েছে, এক এক করে সবাই যার যার ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিল। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াবার সময় প্রত্যেকেই আরেকটু নুব্জ হল—কাঁধের উপর অসহ্য চাপ ওদের মাথা, ঘাড় মাটির কাছে নিয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করল। ওদের এই মানসিক অবস্থা সংক্রমিত হল বাড়িটার মধ্যেও।
মনিপুরি পাড়া ১১৫/৩। রাত এখন প্রায় সোয়া বারোটা। মহল্লার গলি ঘুঁপচিতে লেপটে থাকা কুয়াশা ক্রমশ ঘন হচ্ছে। ঘন হতে হতে চতুর্দিক থেকে এক সময় বাড়িটাকে নাই করে দিল। শীত রাতের চাঁদ তীব্র সার্চ লাইট ফেলেও বাড়িটাকে খুঁজে পেল না। ঠিক সেই সময় লাভলি ড্রয়ার থেকে ছুরিটা বের করল। বিছানার তোশকের নিচে রাখতে হবে—কিন্তু রাখবার আগে আরেকবার শানিয়ে নিতে চায়। মুগ্ধ হয়ে ছুরির ধার পরখ করল। ডান হাতের তর্জনি দিয়ে স্টেনলেস স্টিলের পাতের উপর আলতো বুলিয়ে গেল আঙুল।
—(আপুমনি, আপনের মতলব কী?) —
—কই ছিলা এতক্ষণ?
—(ঘুমায়ছিলাম। আপনে কার জন্য বইসা আছেন।) —
—বিউটির জন্য।
—(ছোটো আপু আসবে না ঘুমায় পড়ছে।) —
—আসবে।
—(আসলে কী করবেন?) —
—খেলবো।
—(আমি কই কী আজকে খেলাধূলা বাদ দেন। রেস্ট নেন। ধকল গেছে না।) —
লাভলি ভীষণ মজা পেল। মাথার ভিতরের লোকটা ওকে ভয় পাচ্ছে। এরকম অভিজ্ঞতা লাভলির এই প্রথম যেখানে ওর হাতে কলকাঠি—যেভাবে নাড়বে সেভাবে নড়বে।
দরজায় টোকা পড়ল। কান পেতে না রাখলে শোনা যাওয়ার কথা না, এতটা আস্তে। প্রথম টোকাতেই লাভলি সচেতন হল। দরজা খুলবার জন্য চেয়ার ছেড়ে উঠল। টেবিলের উপর ছুরিটা রেখেও হাতে তুলে নিল। দরজার কাছে যাওয়ার আগে বালিশের নিচে রাখল।
—(আপুমনি, দরজা খুইলেন না। আজকে চলেন শুইয়া শুইয়া মজা করি। যে আসছে সে কিছুক্ষণ দাঁড়ায়ে চলে যাবে।) —
লাভলি অবিচল হেঁটে গিয়ে দরজা খুলে দিল। বিউটি দাঁড়িয়ে আছে, ঘরের আলো লাভলির ডান কাঁধের ফাঁক দিয়ে গলে গিয়ে বিউটির মুখের একপাশ আলোকিত করেছে, অন্যপাশ অন্ধকারে ডুবে আছে। দু’জন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রইল। কেউ কারও জন্য এক চুল নড়ল না।
—আপা, সরো ঘরে যাইতে দাও।
—কেন?
—(ঠিকই বলছেন এতোরাতে ঘরে কী?) —
—ঝগড়া করবো না, বিদ্যা।
অবিকল ছোটবেলার মতো করে বিউটি বলল। লাভলি সরল না। বিউটি একটু সরে গিয়ে ওর শরীর ঘেঁষে ঘরে ঢুকল। লাভলি দরজা ফিরে লাগাল না, বিছানায় গিয়ে বসল। এক হাত আলতো করে বালিশের উপর রাখল। মনস্থির করতে পারছে না, ছুরিটা বিউটিকে দেখাবে কি না।
—ঘুমাবি না?
—ঘুম আসতেছে না। আপা, খেলবা?
—না।
প্রত্যাখ্যানে বিউটি জ্বলে উঠল। “কেন খেলবা না।”
—সারাদিন হাঁটাহাঁটি করছি, ঘুম আসছে।
বিউটি কড়া চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। লাভলি আরেকটু সঙ্কুচিত হল। বালিশের আরও কাছ ঘেঁষে বসল।
—ঘুম তোমার আসে নাই।
বিউটির কথায় ও কেঁপে উঠল। বালিশের উপর ওর ডান হাতের পাঁচ আঙুল ভীষণ অবাধ্য হয়ে উঠল।
—বালিশের নিচে কী?
—(সারছে!) —
—বালিশের নিচে কী আপা?
লাভলি উত্তর দিতে গিয়ে টের পেল গলা শুকিয়ে আসছে। শব্দ করে গলা পরিষ্কার করল।
—কিছু না, একটা ছুরি। আজকে নিউ মার্কেট থিকা কিনছি।
লাভলি বিছানা থেকে উঠে খাবার ঘরে এল। টেবিলের উপর ঢেকে রাখা জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢালল, তারপর পুরো এক গ্লাস পানি ঢকঢক করে খেয়ে নিল।
—(আপুমনি, আমার তরফ থেকে আরেক গ্লাস খান, শীতল হই।) —
—তুমি ঘুমাইতেছো না কেন?
—(আপনে না ঘুমাইলে কেমনে ঘুমাই।) —
—না ঘুমাইলে চুপ থাকো।
লাভলি আরেক গ্লাস পানি ঢেলে নিয়ে ঘরে ফিরে এল। বিউটি ছুরি হাতে বসে আছে—লাভলিকে ঘরে ঢুকতে দেখে কামড়ে ধরা ঠোঁট হাসি হাসি হল। লাভলি এক হাতে দরজা বন্ধ করে ছিটকানি লাগাল। পানি এনে ঘরের ছোট টেবিলের ঠিক মাঝখানে রাখল। অন্য কোনো দিকে তাকাল না। যথাসাধ্য চেষ্টা করল শব্দ না করে চেয়ার টেনে বসতে, ইশারায় বিউটিকেও উল্টাদিকের চেয়ারে এসে বসতে বলল।
—আজকে আসল ছুরি দিয়ে খেলব, না আপা?
কিশোরী-গলায় কথা বলে উঠল বিউটি। হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়া তার খুশি খুশি লাগছে। আপাকেও ভাল লাগছে। লাভলির উল্টা দিকের চেয়ারে এসে ধপ করে বসল সে। ছুরিটা পানির গ্লাসে ঠেস দিয়ে রাখল।
—হুম…।
—(আপুমনি, আপনের অবস্থা কিন্তু কেরাসিন। খেললে ধরা খাবেন।) —
“আম্মা তুমারে কোথায় পাঠাইছিল? বলতেই হবে।” ছুরির উপর থেকে চোখ সরাল না বিউটি, মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল।
—আমারে কেউ কোথাও পাঠায় নাই। বললাম তো গাউছিয়া থিকা রমনা পার্কে গেছিলাম।
—যে মানুষ জন্মে একা বাড়ির বাইর হয় নাই, সে বলা নাই কওয়া নাই রমনা পার্কে চইলা যাবে—তুমি বললা আর আমি বিশ্বাস করলাম।
—বিশ্বাস না করলে নাই। যা হইছে তাই বললাম। ঐখানে একটা লোকের সাথে পরিচয় হইল, সে বাসা পর্যন্ত দিয়া গেছে।
লাভলির কথা শুনে বিউটি বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মধ্যে দুলতে থাকে। হয়তো সত্যিই রমনা পার্কে গেছিল। তবে শেষের কথাটা একেবারেই ফালতু।
—আম্মা যদি তোমারে না পাঠায়ে থাকে, তাইলে তুমি যে এত দেরি করে বাসায় ফিরলা আম্মার তো তোমারে খায়ে ফেলার কথা। আমারে বলো আপা, সত্যি বলতেছি আমি কাউরে বলবো না।
কথা শেষ করতে পারল না তার আগেই চাপা গলায় খিক খিক করে হাসতে লাগল বিউটি। লাভলি চমকে তাকাল কিন্তু কিছু বলল না।
—আমাদের দু’জনেরই মাথা আওলা হইছে। আরে, আমি বলবটা কারে, বলার মানুষ আছে। তুমার সাথে কার পরিচয় হইছে—একটা লোকের? সে আবার বাসা পর্যন্ত আইসা পৌঁছায় দিয়া গেছে।— এ্যাহ্—।
তাচ্ছিল্যের চোটে ঠোঁটসহ গলার স্বর বেঁকে গেল বিউটির। কাশির দমকের মতো খিক খিক হাসি নিয়ন্ত্রণহীন ফিরে এল। লাভলি অনেকক্ষণ বিউটির দিকে তাকিয়ে থাকল। কেন, ওর সাথে কি কোনো মানুষের দেখা বা পরিচয় হতে পারে না? বিউটি কি ভুলে গেছে রিয়াজ ওকেই পছন্দ করেছিল, ওকে।
—(আপুমনি এই সব পুরান প্যাঁচাল ফালায় থোন। একটা কথা কিন্তু ছোটো আপা খাপে খাপ বলছে, সন্ধ্যা কইরা বাসায় আসলাম তারপরও আমরা দুইজনেই বহাল তবিয়তে আছি, রহস্যটা কী?) —
এই ধাঁধার জবাব বাসায় ফেরার পর থেকে লাভলিও খুঁজছে। একটাবার ফরিদা জিজ্ঞেস তো করলেনই না ও কোথায় ছিল উল্টা তিনিই যেন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। চোখে চোখে তাকান নাই পর্যন্ত। তার মানে কী এই ও এখন থেকে ইচ্ছা মতো চলতে ফিরতে পারবে, কাউকে পরোয়া করতে হবে না। সবই আকাশ কুসুম ভাবনা তারপরও নিজের ভিতর আশ্চর্য রকম জোর অনুভব করল লাভলি। বিউটির দিকে তাকিয়ে দেখল গলা এখনও বেঁকে আছে আর বিশ্রী হাসিটা লালার মতো ঠোঁটের প্রান্তে লেপটে আছে। কঠিন শিক্ষা পাওনা হয়েছে বিউটির।
—(আবার ছোটো আপারে নিয়া পড়লেন, খালাম্মা কেন আপনেরে ধরতেছে না সেইটা নিয়া ভাবেন। এর মধ্যে একটা কিন্তু আছে।) —
—এই কিন্তুরে দুই পয়সা দিয়া পুছি না।
মনে মনে লোকটাকে জবাব দিয়ে লাভলি ছুরিটা হাতে তুলে নিল। হাতের মুঠির ভিতর স্টেনলেস স্টিলের ঠাণ্ডা পাত ওর শরীরে শিহরণ জাগাল। মুঠি আলগা করতে গিয়ে আরও শক্ত করে চেপে ধরল।
—আপা খেলবা?
—না।
—আমিও খেলতে চাই না।
—আজকে আমি আম্মা হবো তুই আমি।
—বললাম তো খেলতে চাই না।
—দেরি করে ফিরছি, আম্মা এখন ভিতরের কথা বার করবে তারপর ঘর বন্ধ করবে—না, না ঘরবন্ধ না একদম জানে মাইরা ফেলবে।
—আমি আম্মা হবো আর তুমি তুমিই থাকবা। দেখি…।
বিউটি ছোঁ মেরে ছুরিটা হাতে নিতে চেষ্টা করল কিন্তু লাভলি শক্ত মুঠিতে ধরে রইল। বিউটির পক্ষে ওর সাথে জোরাজুরিতে টেকা সম্ভব হল না।
—না, আমি আম্মা।—এতক্ষণ কই ছিলি?
লাভলি অবিকল ফরিদার গলায় ধমকে উঠল। ধমকের দাপটে বিউটি কেঁপে উঠল, কিন্তু খেলার খেই হারাল না। প্রায় সাথে সাথে নিজেকে সামলে নিয়ে লাভলির মতো করে নরম-গলায় উত্তর দিল।
—গাউছিয়া গেছিলাম।
—তোরে বললাম না গাউছিয়া যাই নাই রমনা পার্কে গেছিলাম। খেললে ঠিক মতো খেল… না খেললে নাই।
—রমনা পার্কে কেন গেছিলা?
—তুই জিজ্ঞাস করতেছিস কেন? প্রশ্নটা আমি তোকে করবো।
আজকে লাভলি অন্য মানুষ। আজকে সবাই যা না তাই। সবাই খোলস ছেড়ে বেরিয়েছে।
—রমনা পার্কে কেন গেছিলি?
—জানি না, ঘুরতে।
বিউটি মনোযোগ দিল খেলায়। খেলার নিয়মকানুন মাথা থেকে ছুটে যাচ্ছে, আর ভুল করা যাবে না।
—ঘুরতে? কার সঙ্গে গেছিলি? আজকে তোরে জানে শেষ করবো। ছিনালি বার করবো আমি তোর।
লাভলির ভ্রƒ ভীষণ রকম কুঁচকে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে কথাগুলি বেরিয়ে এল।
—কারও সঙ্গে যাই নাই। কার সঙ্গে যাবো?
—হারামজাদী তোদের দুইজনরে এমন শায়েস্তা করবো যে জন্মের মতো লুলা হইয়া ঘরে বইসা থাকবি।
—আমরা তো লুলাই।
কথাটা বলেই বিউটি লাভলির হাত থেকে ছুরিটা ছিনিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। ব্যাপারটা এতটাই অতর্কিতে ঘটল যে এর জন্য ও মোটেও তৈরি ছিল না। বিউটি বিপজ্জনক ভঙ্গিতে ছুরিসহ হাতটা লাভলির চোখের উপর দোলাতে লাগল।
—এখন কে কারে শায়েস্তা করবে? লুলা বানায় রাখবে, শখ কতো!
ছুরির গুঁতা থেকে বাঁচবার জন্য লাভলি ওর মাথা পিছনে সরিয়ে নিল আর একই সাথে মেঝেতে দু’পা ঘষটে চেয়ারটাও সরাবার চেষ্টা করল।
—মনে রাইখো আমি সব জানি। সবার সব কীর্তি আমার জানা। আমার নাকের ডগার সামনে দিয়া চুমাচুমি বার করতেছি। কত্তো বড় শয়তান আমি চুমা দিলে চুমা নেয় না। কেন, আমার ছ্যাপে কি বিষ না কি, তোমারটায় মধু, মধু।
এক ঝটকায় লাভলি চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল। বিউটি লাভলির উপর ছুরি নিয়ে প্রায় অর্ধ চাঁদের মতো বেঁকে ছিল, হঠাৎ করে উঠে পড়ায় লাভলির খালি চেয়ারটায় হেলে পড়ল সে এবং হাত থেকে ছুরি খসে পড়ে গেল পাকা মেঝেতে। সিমেন্টের মেঝেতে স্টেনলেস স্টিল ঝন ঝন করে উঠল। চেয়ারের পিঠ ধরে বিউটি নিজেকে সামাল দিল, তারপর মেঝে থেকে ছুরিটা তুলে টেবিলের উপর রাখল।
দুই বোনই হাঁ করে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল। দু’জনেরই বাতাসের অভাব অনুভূত হল। বিউটি চেয়ারে বসল, হাত-পা বশে ছিল না। পানির গ্লাসটা মুখে তুলতে গিয়ে বেশ খানিকটা ছলকে পড়ল।
—নিজের পানি নিজে নিয়া আয় বিউটি। এই পানি আমি আমার জন্য আনছি।
বিউটি ওকে পাত্তা না দিয়ে প্রায় পুরোটা পানি ঢকঢক করে খেয়ে নিল এবং তৃপ্ত হয়ে বোনের দিকে তাকিয়ে হাসল। সহজ স্বাভাবিক হাসি। তলানিতে পড়ে থাকা পানিসহ গ্লাসটা বোনের দিকে বাড়িয়ে দিল। বাড়িয়ে ধরা হাতের দিকে ভ্রূক্ষেপ করল না লাভলি। অন্য চেয়ারটা এক হাতে টেনে বিউটির খুব কাছে নিয়ে এল, তারপর চুপ করে সেটায় বসল। পানির গ্লাসটা বিউটি ছুরির পাশে হেলাফেলা করে রাখল।
—রিয়াজের কথা তুই আম্মারে বলছিলি। আমি ভাবলাম কাদের।
বিউটি ফিক করে হেসে ফেলল। লাভলি একবারও তার দিকে তাকাল না। অলস দৃষ্টিতে গ্লাস আর গ্লাসের নিচে পড়ে থাকা পানির দিকে মাথা ঈষৎ নিচু করে তাকিয়ে থাকল।
ঠিক কতক্ষণ লাভলি তাকিয়েছিল আমরা জানি না। শুধু এইটুকু জানি শান্ত পুকুরে বড় মাছের আতকা ঘাই যেমন দুর্দান্ত আলোড়ন তোলে তেমনি লাভলির শরীরের গভীরে অদেখা কেউ আচমকা ঘাই মারল—সময়ের চেয়ে ধীর গতিতে লাভলি টেবিল থেকে ছুরিটা হাতে তুলে নিল, তুলে নেয়ার সময় কুঁচকে থাকা টেবিল ক্লথের অংশ উঠে এল হাতে—হাত অপ্রস্তুত হয়ে টেবিল ক্লথটা ছেড়ে দেয়, ছুরিটা দ্বিধান্বিত কেঁপে ওঠে আঙুলের ফাঁকে। এক মুহূর্তের দশ ভাগের এক ভাগ সময়ের জন্য ছুরিটা সম্পূর্ণভাবে পাঁচ আঙুলের আওতা থেকে শূন্যে বেরিয়ে এসেই আবার পাঁচ আঙুলের কড়াল মুঠিতে বন্দি হয়ে যায়। এই আন্দোলনে গ্লাসটা কাঁৎ হয়ে পড়ে। তলানির পানি প্লাস্টিকের টেবিল ক্লথের উপর দিয়ে কাঁচের মার্বেলের মতো গড়িয়ে একেবারে প্রান্তে গিয়ে টুপ টাপ ঝরে পড়ে। লাভলির পাঁচ আঙুল চেপে বসে ছুরির বাটে, আঙুলের চাপে হাতের তালু রক্তহীন ফ্যাকাশে হয়ে যায়, নীল শিরা ফুটে বের হয়। দু’জনের বোধের সীমানা ছাড়িয়ে বিউটির দুই পাঁজরের ঠিক নিচে স্টেনলেস স্টিল ছুরি আমূল ঢুকে যায়। বিউটির প্রায় বুজে আসা চোখ আর ফিক ফিক হাসি থমকে যায়, দুই চোখের পাতা প্রথমে পুরোপুরি বুজে যায়, তারপর বড় হতে থাকে—নদীর চরের সাদা, অর্ধ চাঁদের জ্যোতি, অনন্ত দাঁড়িয়ে থাকা রাতের রেলগাড়ির হেডলাইটের আলোর মতো তীব্র কিন্তু স্থির।
শীতের রাতের ঝিম ধরা নৈঃশব্দ ওদের গিলে খাচ্ছে। বিউটির এক হাত বাতাসে ঝুলতে থাকে, আরেক হাত টেবিলের ওপর এলানো; মাথাটা তার ওপর এলোমেলো পড়ে আছে। এত যতেœর কালো চুলের বন্যা চেয়ারের পিঠ ছাপিয়ে ঢেউ তুলছে। ঠোঁটের কোণায় এক চিলতে হাসির আভাস দেখা গেল কি গেল না। এত জোরে চীৎকার দেয়ায় তাকে একটু লজ্জিত দেখাচ্ছে। চোখ দু’টিতে বিস্ময় না কি বোনের কীর্তিতে মুগ্ধতা বোঝা গেল না।
বন্ধ দরোজায় প্রচণ্ড জোরে বাড়ি পড়ছে। সেই শব্দ লাভলির কান ভেদ করে, মস্তিষ্ক ভেদ করে, বুক ভেদ করে তবুও ভিতর পযন্ত পৌঁছায় না। দরজা উড়িয়ে নিয়ে যাবে এমন, ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে এমন। তারপর এক সময় সমস্ত ঝড় ঝাপ্টা থেমে যায়। শান্তি! লাভলি দুই পায়ের গোড়ালি দিয়ে চেয়ারটা কিঞ্চিৎ পিছনে ঠেলে দেয়। কাজের কাজ কিছুই হয় না চেয়ারটা একদিকে শুধু সূঁতাখানেক সরে যায় আর বিউটির চুল ওর কনুইয়ে এসে লাগে। নরম মসৃণ চুল। সান সিল্কের ভালো বিজ্ঞাপন হতে পারতো, ভাবে লাভলি। একবারও বিউটির দিকে পূর্ণ দৃষ্টি দেয় না। এক সময় টের পায় মাথার পিছনে টিউব লাইটের হলদে আলো অসহ্য তীব্রতায় গলে গলে পড়ছে—দেয়াল চুঁইয়ে চটচটা গলন্ত আলো চুল পোড়া গন্ধে লাভলির দিকে গড়িয়ে আসে। লাভলি অনেকক্ষণ বুঝতেই পারে না পায়ের নিচে চটচট করছে কী। বাম পায়ের বুড়া আঙুলে ঠাণ্ডা ধাতব-তরল স্পর্শের সাথে সাথে গা গুলিয়ে ওঠে ওর। সেই তরল দারুণ নিষ্ঠায় দুই পায়ের পাতা ছুঁয়ে থাকে। গা ঘিনঘিন করে ওঠে ওর, নাকের ডগা ইষৎ কুঁচকে যায়—কেমন অসহায় লাগে লাভলির। এই মুহূর্তে পানির খুব দরকার ছিলো। বিউটির দিকে তাকিয়ে থাকে অল্পক্ষণ অথবা বহুক্ষণ। বাতাসে ঝুলতে থাকা বিউটির হাত আলগোছে টেবিলের উপর রাখে। ডাল বাটার গুণাগুণ টের পায়। কী শান্ত ভঙ্গিতে টেবিলের উপর মাথা রেখে শুয়ে আছে। খুব আদর লাগে লাভলির।
যথেষ্ট পারঙ্গমতার সাথে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। মাথা একটুও টলে না, হাত দু’টা নিয়ে অবশ্য মুশকিলে পড়ে যায়। শুরুতে শরীরের দুই পাশে লম্বালম্বি ঝুলতে থাকে, পরক্ষণেই ডান হাত বুকের কাছে উঠে আসে। ডান হাতের দেখাদেখি বাম হাত একই কাজ করতে গিয়ে বিপদে পড়ে যায়। বুকের ধড়ফড়ানি এমন হাস্যকর রকম বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে বেচারা হাত দু’টা সেখানে স্বস্তি পায় না। লাভলি ভাবে এই দু’টাকে কোমড়ের উপর রাখবে। তাহলে বেশ একটা সটান ভাবও আসবে, এই মুহূর্তে ভাবটাই জরুরি। কিন্তু কিছুতেই পারা যাচ্ছে না—হাত দু’টা কোমড়ের উপর রাখছে আর পিছলে পড়ে যাচ্ছে। চারবারের মাথায় হাল ছেড়ে দেয় ও, শেষমেশ দুই হাত পিছনে নিয়ে ডান হাতের মুঠিতে বাম হাতের তর্জনি এবং মধ্যমা শক্ত করে ধরে থাকে। পরবর্তী চুয়ান্ন মিনিট একইভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে লাভলি; আর ওর সমগ্র বেঁচে থাকা চুয়ান্ন মিনিট ধরে ওকে ঘিরে পাক খায়। পাকটা পায়ের পাতা থেকে চক্রাকারে মাথার দিকে ধাবিত হয় কিন্তু তালু পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না, গলার কাছে এসে চেপে ধরে। দমটা যখন প্রায় বেরিয়ে যাবে যাবে অবস্থা ঠিক তখনই বেমক্কা ছেড়ে দেয় তারপর পাক খেতে খেতে আবার নিচে নামতে থাকে। তারপর আবার উপরে তারপর নিচে তারপর উপরে, নিচে, উপরে…
চুয়ান্ন মিনিটে লাভলির জন্ম হয়, ওর তিন বছর বয়সে এক মাথা চুল নিয়ে বিউটির জন্ম। কী ফর্সা! সকাল বেলা পর্দা টানা অন্ধকার ঘরে হঠাৎ রোদের আলো যেমন বেআরাম, তেমনটা। ঘরের বাইরে ফরিদা খানমের চাবি ঘুরাবার শব্দ, বিউটির চুলে ডিমের গন্ধ, দরজা খুলে হুড়মুড় করে ছাদে ঢোকা, গানের তালে মুখলেস সাহেবের হালকা দুলুনি ‘কাভি কাভি মেরা দিল মে খায়াল আতা হ্যয়…।’ আর রিয়াজ, আর লাল মাফলার আর মাথার ভিতরের লোকটা।
মাথার ভিতরের লোকটাকে লাভলি ওর পুরা শরীরে আতিপাতি করে খোঁজে, একবার ফিসফিস করে ডাকেও, ‘আপনে আছেন, শুনতেছেন?’ লোকটাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। একদিন যেমন স্বেচ্ছায় এসেছিলো তেমনি স্বেচ্ছায় চলে গেছে। প্রথম ধাক্কায় খুব মন খারাপ লাগে পরে একটু বিরক্তই হয়—আজকের রাতটা অন্তত থেকে যেতে পারতো!
লাভলি আর দাঁড়িয়ে থাকে না, ঘরের দরজা খুলে বাইরে আসে। দরজার ফাঁক গলে যা একটু আলো খাবার ঘরে এসে জুটেছে নইলে জায়গাটা বেশ অন্ধকার। জিরো পাওয়ারের বাতি অবশ্য একটা জ্বলছে। দরজার মুখে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকায়। নিজের ভারি নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে ভালো লাগে, অন্যরকম একটা ভরসা হয়, নাহ্ ভয়ের কিছু নাই! খুব সতর্কতার সাথে লাভলি ওর শোবার ঘরের দরজাটা ভিড়িয়ে দেয় তারপর ফরিদার ঘরের দিকে ফেরে। এক কী দু’পা এগিয়েও যায় আবার ফিরে আসে, রান্নাঘরের দরজার কাছে কান খাড়া করে দাঁড়িয়ে থাকে, বাইরে থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে দেয়।
এখন লাভলি ফরিদা খানমের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে খুব আস্তে টোকা দিচ্ছে, একটা নির্দিষ্ট ছন্দ অনুসরণ করছে। টকটক টকটকটক টকটক।
খুট করে দরজা খুলে যায়। ফরিদার ঘরেও জিরো পাওয়ারের আলো জ্বলছে। কারো মুখই ঠাহর হয় না। ফরিদা প্রথমে বুঝতে পারেন না কে, কথা বলতে গিয়ে আবিষ্কার করেন গলা দিয়ে যথেষ্ট স্বর বের হচ্ছে না।
—কে? কী? এতো রাতে কী লাভলি?… ঘুমাইতে যা।
—আজকে রাতরে আর ঘুম হবে না আম্মা।
—না হইলেও শুয়ে থাক। যা।
—বাগানের কোদালটা কী সিঁড়ি ঘরে আছে? চাবিটা দেন।
—হ্যাঁ?
—বিউটিরে মাইরা ফেলসি আম্মা। আপনের আসতে লাগবে না, আমি একাই পারবো।
(শেষ)
রচনাকাল: ২০০৮, লন্ডন
—হ্যাঁ হ্যাঁ, চইলা আসবে। চলো চা খাই মাথাটা ধরা ধরা।
কোনো রকমে লাভলির প্রসঙ্গ ধামাচাপা দিয়ে বারান্দা থেকে বের হলেন। প্রায় সারাটা দিন আজকে তার বারান্দাতে বসেই কাটাতে হয়েছে। বেতের চেয়ারে এক নাগারে বসে থেকে কোমর থেকে শরীরের উপরের অংশে রক্ত চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে তাই একটু তাল হারালেন।
—কী হইছে? মাথা ঘুরে না কি?
—না না, অনেকক্ষণ বইসা ছিলাম…।
ফরিদার পাশ দিয়ে কুণ্ঠিত মুখলেস সাহেব বেরিয়ে গেলেন, ফরিদা তার পিছে পিছে গেল। খাবার টেবিলে চা দেয়া হয়েছে। সিঙ্গারাও হয়তো এক্ষুনি ভাজা হয়েছে কারণ ছয়টা সিঙ্গারা থেকে ছয়টা চিকন ধোঁয়ার সূঁতা সোজাসুজি উপরে উঠে যাচ্ছে। ফরিদা চেয়ার টেনে বসলেন। সিমেন্টের মেঝেতে ছেঁচড়ে আসায় বিশ্রী রকম আওয়াজ হলো। সেই আওয়াজ শুনে মুখলেস সাহেব তার চেয়ারটা সাবধানে টানলেন। টেবিলে সিঙ্গারা দেখে এমনিতেই তার মেজাজ ফুরফুরা হয়ে গেছে।
—দুপুর থিকা ঘুমাইতেছো। যাও, হাত-মুখ ধুইয়া সুন্দরমতো আইসা বসো।
মুখলেস সাহেব কোনো তর্কে গেলেন না। চেয়ার আবার যথাস্থানে রেখে হাত-মুখ ধুতে গেলেন।
—খালাম্মা ছোট আপারে ডাকমু? সিঙ্গারা জুরায় যাবে।
ফরিদা কী যেন ভাবলেন। কোনো রকম শব্দ এখন সহ্য হবে না। ‘ডাকো’ বললেই রাবেয়ার মা বীরবিক্রমে বিউটির দরজার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।
—থাক, দরকার নাই। ঘুমাইতেছে মনে হয়, একটু পরে নিজেই উইঠা যাবে। আপার জন্য ডাইল বাইটা রাইখো।
—জি, ছোট আপা বলছেন।
মুখলেস সাহেব হাত-মুখ ধুয়ে ফিরে এলেন, যথাসাধ্য চেষ্টা করলেন চেয়ারে শব্দ না করে বসতে। মুখ তখনও ভেজা ভেজা। ফরিদা তার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। তারা দু’জনেই দু’টা করে সিঙ্গারা খেলেন। গ্লাসভর্তি পানি খেলেন। তারপর চায়ে ছোট ছোট চুমুক দিতে লাগলেন। ফরিদা প্রত্যহ যেমন টুকটাক সাংসারিক কথাবার্তা বলেন, আজকেও সেই চেষ্টা করলেন।
—বাড়িতে যাবা কবে ঠিক করছো?
—মিয়াভাই ফোন করলে রওয়ানা দিতে বলছেন। তারা কিনার মানুষ ঠিক কইরা আমারে খবর দিবেন।
—কী কিনার মানুষ ঠিক করবেন?
—দাদা মশাইয়ের কিছু ভালো ধানী জমি আছে সেইগুলা।
—এখনই বিক্রি করবা কেন, রাইখা দেও পরে কাজে লাগবে।
—এতদিন তারা কিছু দিতেই চায় নাই। এখন না গেলে সবই হাতছাড়া হবে। বেশি দিন তো না, চার পাঁচ দিন।
—তাইলে আমরা সবাই মিলাই যাই চলো।
ফরিদার প্রস্তাবে মুখলেস সাহেব বাক্যহারা হলেন। তিনি মুখভরা চা গিলতে ভুলে গেলেন। সকাল থেকে চেনা ফরিদা দ্রুত বদলে যাচ্ছেন। এতটাই দ্রুত যে তার পরিবর্তনের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। এরকম প্রস্তাব তাদের প্রায় বিয়াল্লিশ বছরের বিবাহিত জীবনে তিনি আর শোনেন নাই। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রতিক্রিয়া কেমন হওয়া উচিৎ সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই তার নাই। কোনো রকমে চা গিলে কৃতার্থ হওয়ার মতো একটা ভাব করলেন।
—যাওয়া যাবে? থাকার জায়গা ফায়গা আছে?
—আছে নিশ্চয়ই। দেখি, মিয়াভাই ফোন করলে জিজ্ঞাস কইরা দেখব।
—হ্যাঁ দেইখো।
মেয়ে দু’টাকে নিয়ে কোথাও অদৃশ্য হয়ে যেতে পারলে তাই যেতেন ফরিদা। হঠাৎ করে গ্রামে গিয়ে থাকার ভাবনা তার কাছে সে কারণেই বেশ মনোঃপুত হলো।
* * *
৯ নভেম্বর, শুক্রবার, ২০০৭। দিনটা শীত-দিনের সমস্ত চরিত্র ধারণ করে দ্রুত ১০ নভেম্বরের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। সন্ধ্যা নেমেছে ১১৫/৩ মনিপুরি পাড়ার গলির উপর। দূরে কোনো বাসা থেকে কচি বাচ্চার সুতীক্ষè কান্নার শব্দ সন্ধ্যার ফিকে আলো আঁধারির সাথে মিলেমিশে যাচ্ছে। স্পষ্ট করে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না—না আলো, না আঁধারি, না কান্না। শুধু একটা চাপ ধরা অস্বস্তি ফরিদার শিরায় শিরায় অনুভূত হচ্ছে। বেশ অনেকক্ষণ হলো শোবার ঘরের জানালার পাশে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। মাঝে মধ্যে যদিও জানালার পাশের বেতের চেয়ারটায় একটু বসবেন ভাবছেন, কিন্তু বসছেন না। জানালা দিয়ে গলির রাস্তা বেশ অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। তিনি তাকিয়ে আছেন। রাত নামছে টের পাচ্ছেন। রাতের যা চরিত্র—সব কিছুকে অন্তত তিনগুণ বাড়িয়ে দেয়। জ্বর বাড়ে রাতে, ব্যথা বাড়ে রাতে, ভয় বাড়ে রাতে, প্রেম বাড়ে রাতে। তার ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটছে। ভয়ে কাঁটা হয়ে আছেন। মেয়েটা ফিরবে কি ফিরবে না সেই সম্ভাবনার যন্ত্রণা তাকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলছে। দোয়া পড়তেও ইচ্ছা করছে না। এক ধরনের বোবাবোধ গিলে ফেলেছে। কিছুই তিনি অনুভব করছেন না আবার করছেনও।
গলি দিয়ে যা-ই যাচ্ছে সেদিকে তার সমস্ত মনোযোগ, দৃষ্টি বিঁধিয়ে দিচ্ছেন। একটা রিকশা যাচ্ছে—তিনি টানটান হয়ে গেলেন, একটা সিএনজি—তার দম বন্ধ হয়ে এলো, আবার একটা রিকশা—তিনি স্থির, একটা কালো ট্যাক্সি—তার পুরো শরীর দু’পায়ের আঙুলে খাড়া।
এভাবে কতক্ষণ কেটেছে কে বলতে পারে। গলির মধ্যে একটা সিএনজি এগিয়ে আসছে, তিনি আশাহীন চোখে তাকিয়ে থাকলেন। সিএনজি তাদের গেট পার হতেই বুকের ভিতরের জমাট শ্বাস ফুস করে বেরিয়ে গেলো। সিএনজিটা অল্প এগিয়েই ঝাঁকিসহ থেমে গেল। ফরিদা সমস্ত সুখ মানত করলেন—খোদা লাভলি যেন হয়, জীবনে আমি আর কিছু চাই না। অনন্তকাল কেউ নামল না। তারপর এক সময় মেয়ের পরিচিত ক্লান্ত অবয়ব চোখে পড়ল, মাথা নুইয়ে সিএনজি থেকে নামল, ধীরে গেইট পযন্ত হেঁটে এল তারপর কোলাপসিবল গেইটের পেটের ছোট গেইট খুলে মাথা নিচু করে বাড়িতে ঢুকলো। মেয়েটা মাথায় শাল জড়িয়ে নিলো। ফরিদা স্পষ্ট দেখতে পেলেন লাভলি মাথা নিচু করে মুহূর্তক্ষণ দাঁড়ালো—এইটুকু দেখে ফরিদা ধীরে চেয়ারে বসে পড়লেন। নিজেকে ধাতস্ত হবার জন্য কিছুটা সময় দরকার। বুকের ভিতরে যে ঘোড়দৌড় চলছে তার লাগাম ধরতে হবে একটু একটু করে। কষে টান দিলে ছিঁড়ে যেতে পারে।
বেল বাজছে, পিচ্চি দৌড়ে তার ঘরের সামনে এল।
—নানি, বড় খালা আসছে।
ফরিদা তখন চেয়ারে বসা, সামলে উঠতে কষ্ট হচ্ছে।
—ভিত্রে আয়।
বহু কসরত করে মাথা উঁচু করলেন। আঁচলের প্রান্ত থেকে চাবির গোছা খুলে দিলেন। পিচ্চি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। এখন, এখন কী হবে?
৩
সিঁড়ির
মাথায় পিচ্চির বত্রিশ পাটির দাঁত দেখা গেল। লাভলি ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে আছে
তো আছেই। পিচ্চি তর তর করে নেমে আসলো বাকি ক’টা ধাপ। তালা খুলতে খুলতে তার
মুখ ছুটলো।—বড় খালা আসছেন। আমি যে ডরাইছি!
‘আমি’ শব্দটায় লাভলির কান আটকে গেল। তার মানে কি এই যে বাসার অন্য কেউ ভয় পায় নাই। ওর কি এতে নিশ্চিন্ত হওয়া উচিত। অবশ্য এত শিঘ্রী নিশ্চিন্ত হওয়াটা ঠিক হবে না।
—আম্মা কই?
—বাসাতই।
লাভলির আর কোনো প্রশ্ন মাথায় এলো না—সত্যি কথা বলতে কী, কোনো কিছু সম্পর্কেই ও এই মুহূর্তে বিন্দুমাত্র আগ্রহ বোধ করছে না। তবে এই মুহূর্তে তার বাথরুমে যাওয়াটা জরুরি পর্যায়ে পড়েছে। বাসায় ঢুকে কারও মুখোমুখি হ’তে ইচ্ছা করছে না লাভলির। ও পিচ্চিকে পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে ঠিক করল, সোজা নিজের ঘরে গিয়ে বাথরুমে ঢুকে যাবে।
—(আপুমনি, উত্তম প্রস্তাব)—।
—তুমারে কেউ জিজ্ঞাস করছে?
মনে মনে মাথার ভিতরের লোকটাকে কড়া দাবড়ানি দিলো। দোতালায় উঠে দেখলো বাসার দরজা হাঁ করে খোলা কিন্তু আলো জ্বলছে না। প্রায়োন্ধকার হয়ে আছে জায়গাটা, এই বেশ সুবিধা হলো লাভলির। কাউকে জানান না দিয়ে বাসায় ঢুকলো। নিজের ঘরের দিকে যেতে গিয়ে মায়ের ঘর পার হলো, ভিতরে আলো জ্বলছে কিন্তু ফরিদার আভাস পাওয়া যাচ্ছে না। আম্মা নিশ্চয়ই জানেন ও এসেছে, তাহলে ঘরের মধ্যে ঘাপটি মেরে আছেন কেন? তার উপর তো এতক্ষণে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা। আর সবাই বা কোথায়—আব্বা, বিউটি। বাড়িটা ঠাণ্ডা, অসাড় হয়ে আছে। লাভলি ডানে বাঁয়ে তাকালো না। মাথা নিচু করে ‘ইয়া নফসি’ ‘ইয়া নফসি’ পড়তে পড়তে ঘরের ভিতর ঢুকে গেল। বিছানার উপর ধপাস করে বসল। যেন তার জ্ঞানহীন শরীরটাকে কেউ বিছানা অব্দি এনে হঠাৎ করে ছেড়ে দিয়েছে। ‘আহ্’ শব্দে ওর সচেতন অস্তিত্ব ছড়িয়ে পড়লো ঘরে। আলো জ্বালালো না, দরজা ভিড়ালো না, বাথরুমে গেল না—বিছানার উপর বসে রইল। যদিও বাথরুমে যেতেই হবে অবস্থা। এক সময় উঠে ঢুকে গেল বাথরুমে, অনেকক্ষণ ধরে মুখ ধুল—পার্কের ধূলা-বালি ঘষে ঘষে পরিষ্কার করল। শেলোয়ারে আটকে রাখা ছুরিটা বের করে খয়েরি কাগজের মোড়ক খুলে ফেলল লাভলি—কী সুন্দর ছুরি! নাহ্, আজকে একা একা বাইরে যাওয়া সার্থক। বিউটি দেখলে খুশিতে ঝিলিক দিবে। খুব বেশি পছন্দ করলে নাহয় বিউটিকে দিয়েই দিবে ছুরিটা। ওদের দু’জনের একজনের কাছে থাকলেই তো হলো। ছুরিটা কোথায় লুকিয়ে রাখা যায় লাভলি সেটাই এখন ভাবছে। বিছানার জাজিমের নিচে রাখা যায়। কিন্তু রাবেয়ার মা বিছানা করতে গিয়ে খুঁজে পেলে তুলকালাম বাঁধাবে। অবশ্য একদম মাঝখানে রাখলে হদিস পাবে না। সেটাই করবে ঠিক করলো লাভলি।
সব শেষে ওযু করে নিলো—এখন দীর্ঘ সময় জায়নামাযে কাটানো যাবে। সারাদিনের নামায একসাথে ক্বাযা পড়তে হবে—সময় তো লাগবেই। ভালোই হবে, আশা করা যায় অন্তত নামাযের সময় ফরিদা তার উপর চড়াও হতে পারবেন না।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে ঘরের অন্ধকারে থৈ পেলো না লাভলি। আলো জ্বালিয়ে দেয়া যায় কিন্তু দিতে ইচ্ছা করছে না। ওর জন্য কী ভয়াবহ শাস্তি অপেক্ষা করে আছে তা একমাত্র ফরিদা জানেন আর আল্লাহ জানেন। অন্ধকারের এই আড়ালটাই তাই লাভলির জন্য ভালো মনে হলো। অন্ধকারেই ড্রেসিং টেবিলের প্রথম ড্রয়ার খুলে তার ভিতরের রাজ্যের জঞ্জালের নিচে ছুরিটা আপাতত লুকিয়ে রাখলো। এখন সবচেয়ে নিরাপদ কাজ নামাযে দাঁড়িয়ে যাওয়া। কে যেন কবে বলেছিলো অন্ধকারে নামায পড়া যায় না—কে আর বলবে ফরিদাই বলেছিলেন সম্ভবত, কথাটা মনে পড়তে দোটানায় পড়ে গেলো লাভলি। শেষমেশ আলো জ্বালিয়ে নামাযের জায়গায় দাঁড়ালো। যা হবার হবে, মেরে তো আর ফেলতে পারবে না। মেরে ফেললে অবশ্য এর চেয়ে ভালো ছিল। নামাযে বসে লাভলি সত্যিকার অর্থে খোদার কাছে আত্মসমর্পণ করতে চাইল। নামায পড়তে পড়তেই টের পেল বিউটি ঘরে ঢুকে বিছানার উপর বসেছে। তখনও ওর অনেক রাকাত নামায বাকি। কিন্তু বিউটি ধৈর্যহারা হলো না। সালাম ফিরিয়ে লাভলি খেয়াল করলো বিউটি মাথা নিচু করে ঝিম ধরে বসে আছে। ও যে নামাযের বিছানা থেকে তাকে লক্ষ্য করছে তাও টের পেল না সে।
প্রায় চল্লিশ মিনিট পর লাভলি মোনাজাতে বসলো। হাত তুলে খোদার কাছে ও কিছুই চাইতে পারল না। হঠাৎ বিড় বিড় করে বললো, ‘আল্লাহ আম্মা যেন লাল কাপড়টা পছন্দ করেন’! মিনিট পাঁচেক শূন্য মনে বসে থাকার পর মোনাজাত শেষ করলো। জায়নামাযে বসেই লাভলি বিউটির দিকে মাথা ঘুরিয়ে দেখল, একইভাবে মাথা নিচু করে বসে আছে তখনও।
—আম্মা কই?
কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। মাস কয়েক ধরে মাঝে মধ্যেই বিউটিকে এরকম আনমনা দেখাচ্ছে। আজকে হয়তো বেচারার উপরে অনেক ধকল গেছে। ফরিদা সমস্ত রাগ হয়ত তার উপরেই ঝেড়েছেন।
—আম্মা কই?
দ্বিতীয়বার বলার পর বিউটি মাথা তুলে ওর দিকে তাকাল।
—তুমি কই গেছিলা?
—রমনা পার্কে।
—ইয়ার্কি মারো?
—ইয়ার্কি মারবো কেন, সত্যি।
আসলেই সত্যি কি না শুধু ওকে লক্ষ্য করে নিশ্চিত হতে চাইলো বিউটি। চোখ সরু করে লাভলির দিকে তাকিয়ে রইলো।
—রমনা পার্ক চিনো তুমি? কেমনে যাইতে হয় জানো, আন্দাজে কথা কও যে। আমিই তো চিনি না।
—চিনা লাগবে কেন, সিএনজিরে বলছি নিয়া গেছে।
লাভলি নামায থেকে উঠলো এবং জায়নামায ভাঁজ করে আলনার উপর রাখল। বিউটি বিছানায় বসে চোখের দৃষ্টিতে বোনকে অনুসরণ করছে। বোনের মধ্যে আমূল বদল টের পাচ্ছে, বাইরের হাওয়া মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কি একজনকে এতটা বদলে দিতে পারে? ভীরু, পায়ের নিচের মাটি সব সময় দুলছে এরকম একটা মেয়ে এখন চোখে চোখ রেখে অবলীলায় বলছে ও না কি রমনা পার্ক গেছিল—ওর ধারণা আছে ফরিদা বিষয়টা জানলে কী গতি হবে ওর? চোখে চোখে বোনকে অনুসরণ করছে আর বিউটি ভাবছে—যতই ভাবছে ততই নিজের উপর ঘৃণায় ধিক্কারে মরে যেতে ইচ্ছা করছে—সে তাহলে লাভলির চেয়েও গাড়ল, অপদার্থ—বিউটির চোখ সাদা হয়ে গেল। ছুটে গিয়ে বোনের চোখ-মুখ ফালা ফালা করে দিতে ইচ্ছা করলো।
লাভলি টের পাচ্ছে বোনের দৃষ্টি ওর পিছে পিছে ঘুরছে। বাসায় ফিরেছে ঘণ্টাখানেক তো হবেই কিন্তু ফরিদার পাত্তা পাওয়া যাচ্ছে না—ব্যাপারটায় ও যার পর নাই বিস্মিত হচ্ছে। ধীর পায়ে দরজার কাছে এসে উঁকি দিলো। রান্নাঘরে আলো জ্বলছে, কিন্তু খাবার ঘরে কেউ নাই, মানে কোথাও কেউ নাই—অন্তত লাভলি দেখতে পাচ্ছে না। ভয়ঙ্কর ভূতের কোনো ছবির মতো হয়ত যখন ও সবচাইতে বেশি বেখেয়াল, ঠিক তখন কেউ ঘটাং করে ওর টুটি ঠেসে ধরবে মাটির সাথে এবং ধরেই থাকবে। আশ্চর্য ঘটনা এইসব চিন্তা মনে আনাগোনা করা সত্ত্বেও ওর একটুও ভয় লাগছে না। শুধু কেমন এক ধরনের ‘নাই’ অনুভূতি ওকে আগাপাছতলা মুড়ে রেখেছে।
দরজার কাছ থেকে সরে আসলো লাভলি। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সময় নিয়ে বেণী খুলতে লাগলো।
—তুমার এত বড় সাহস কেমনে হইল?
বিউটির মুখ থেকে শব্দ না হলকা বের হলো। হলকা লাভলির প্রায় গা ছুঁয়ে গেল—আঁচ লাগলো ঠিকই কিন্তু পোড়াতে পারল না।
—কীসের সাহস?
—সকালে গেলা সন্ধ্যায় ফিরলা।
বিউটির সাথে কথা বলতে একদম ইচ্ছা করছে না লাভলির। বেণী খুলছে স্লো মোশানে, পুরো বাড়িটা দুলছে ওর সামনে স্লো মোশানে। ওর অনুপস্থিতিতে সারাদিন সবার কী দশা গেছে, ফরিদা কেন এখনও ওর খোঁজ করছেন না, কখন থেকে ওকে ঘরবন্দি করা হবে, না কি আজকের অপরাধের জন্য নতুন কোনো শাস্তির বিধান চালু হচ্ছে—এইসব বিষয়ের প্রতি লাভলি দ্রুত আগ্রহ হারিয়ে ফেলল। মনে প্রাণে চাইছে বিউটি যেন এই ঘর থেকে বেরিয়ে যায় এবং এখনই।
—বিউটি, আমার মাথা ব্যথা শুরু হইতেছে—তুই যা, আমি লাইট নিবায়ে শুয়ে থাকবো।
—কী?
—আমি লাইট নিবায়ে শুবো, তুই যা।
বিউটি ওর স্পর্ধায় স্তম্ভিত হয়ে গেল। কতোক্ষণ তাকিয়ে ছিল জানে না। হঠাৎ ক্ষোভে দিশাহারা হয়ে গেল, কাণ্ডজ্ঞান সম্পূর্ণ লুপ্ত হল তার। খাট থেকে নেমে ঘোড়ার মত মাটিতে পা ঠুকতে লাগল আর চীৎকার করতে লাগল।
—তুমি কই গেছিলা একক্ষণ বলবা। একক্ষণ। আমি কুনোদিন কুথাও যাই নাই। সারা শহর তুমি ঢ্যাং ঢ্যাং কইরা ঘুরবা। মগের মুল্লুক পাইছো? আম্মা এখনও তুমারে কিচ্ছু বলেন নাই, কেন বলেন নাই?—আম্মাই তুমারে পাঠাইছিলো, কই পাঠাইছিলো বলো?
চুল হেলাফেলা করে আঁচড়ালো লাভলি, তারপর বোনের তাণ্ডব নৃত্য আগ্রহহীন চোখে দেখল, একটা হাইও তুলল আর এই হাই তোলাতেই কাল হলো। তাণ্ডব দশা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ল। ঘরজুড়ে দাপিয়ে বেড়াতে লাগল বিউটি—মাঝে মধ্যে থামে কিছু বলে, দাপায়, ফোঁসে আবার কিছু বলে।
—লাগে যেমুন, দুনিয়া উদ্ধার কইরা আসছো। আমার আলাপে তুমার হাই আসে… তুমার ফুটানি আজকে বার হবে। তেল কমানো হবে আজকে… সবাই একটা মজা পাইয়া গেছে… দেখাইতেছি, আমিও দেখাইতেছি।
দাপানো বন্ধ করে বিউটি ওর উপর এক রকম হুমড়ি খেয়ে পড়লো। লাভলি ড্রেসিং টেবিলের সামনে—তাড়া খাওয়া বাঘের মতো বিউটিকে ওর দিকে ছুটে আসতে দেখে ঘুরে দাঁড়ালো। আয়নায় ওর আঁচড়ানো চুলের ঢল পিঠ ছাপিয়ে পড়েছে তারই পাশে বিউটির সাদাটে চোখের হিংস্রতা, তেড়ে আসার জন্য সিংহের মতো ফুলে থাকা চুল আর দু’হাতের মারমুখী উগ্রতা—আয়নায় চকিতে নিজের এই রূপ চোখে পড়লো বিউটির, মুহূর্তে থমকে দাঁড়ালো, চুপচাপ ঘর থেকে বের হয়ে গেলো।
বিউটির চীৎকারে রান্নাঘরের দরজার কাছে রাবেয়ার মা এসে দাঁড়ালো। হাতে রুটি বেলার বেলুন। বারান্দা থেকে পিচ্চি দৌড়ে আসলো মজা দেখার জন্য। কিন্তু ফরিদা বা মুখলেস সাহেব দু’জনের কেউই সামনে এলেন না। যদিও ফরিদা তার ঘর থেকে বিউটির আস্ফালন, চেঁচামেচি সবই শুনছিলেন, কিন্তু এক ইঞ্চি নড়লেন না। সেই যে বেতের চেয়ারটায় বসেছিলেন, বসেই থাকলেন। দুই মেয়ের কারুরই মুখোমুখি হবার শক্তি তার নাই। তিনি টের পাচ্ছেন বিউটি এবার তার দিকে তেড়ে আসছে। ইচ্ছা করলেই উঠে দরজাটা বন্ধ করে দিতে পারেন—ইচ্ছাটাই করল না।
—আম্মা, আমি জানতে চাই বাসায় কী হইতেছে? আপা আসছে এক ঘণ্টার উপরে, সারাদিন উধাও থাইকা এখন আরামসে বইসা আছে, চুল আঁচড়াইতেছে, মুখে ক্রিম মাখতেছে—আর আপনে ঘরের মধ্যে ঘাপটি মাইরা বইসা আছেন! কেন? আপারে জিজ্ঞাস করবেন না—এতক্ষণ কই ছিলো, কী কইরা আসছে? না কি আপনে কুথাও পাঠাইছিলেন তারে? কই পাঠাইছিলেন?
—ঘর থিকা তুই যা। একক্ষণ যাবি।
—না যাব না। কী করবেন? ন্যায্য কথা জিজ্ঞাস কইরা দোষ কইরা ফেলছি। আরেক মেয়ে যে আল্লায় মালুম কী কইরা বাসায় ফিরছে ওরে কিছু বলবেন না, আমার উপরে যতো চোটপাট। কেন বলবেন না আমি সেইটাই জানতে চাই।
—আমার ইচ্ছা আমি বলমু না। তোরে কৈফিয়ত দিতে হবে? আমি যা করছি, করছি—তার জন্য আমার আল্লারেও কৈফিয়ত দিতে হবে না। আমি সবার কৈফিয়ত নিবো। বান্দির বাচ্চা বান্দি, আমারে জিগাইতে আসে। দাপরানি দেখো তার, শয়তান—বাড়িতে যাত্রা শুরু করছে। … তোরা মরছ না কেন?… বার হ ঘর থিকা, বার হ…
নদীর কুল ছাপানো পানির মত কথার তোড় ফরিদার অন্তরাত্মা ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো। যতটা না জোরে তার চেয়ে হাজারগুণ বেশি ক্ষোভে আর ক্রোধে। সেই মুহূর্তে পুরো বাড়িটা জমে ঠাণ্ডা মেরে গেল—বিউটিও পাল্টা ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত ছিল কিন্তু ফরিদার মুখের দিকে তাকিয়ে গুটিয়ে গেল, ঘর থেকে বেরিয়ে এল ফুসতে ফুসতে। ফরিদা দরজা লাগিয়ে দিলেন।
মায়ের ঘর থেকে বের হয়ে খাবার ঘরে এসে বিউটি জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে লাগলো আর তার মনে হলো সে বিশাল একটা মাঠের মাঝখানে বান্ধবহীন দাঁড়িয়ে আছে। মাঠটা ধীরে কিন্তু টের পাবার মতো দ্রুততায় চারপাশ থেকে তার দিকে এগিয়ে আসছে এবং সে খুব শীঘ্রী মাঠে, ঘাসে, হাওয়ায় বিলীন হয়ে যাবে। সে মরিয়া হয়ে এদিক ওদিক তাকাতে গিয়ে দেখলো বারান্দার দরজার আড়ালে মুখলেস সাহেব দাঁড়িয়ে তাকে দেখছেন।—এবং নিশ্চিত করে বলা যায় মুখলেস সাহেবের পাশে পিচ্চি দাঁড়িয়ে আছে। সে টের পেলো বিভিন্ন ঘর থেকে সবাই তাকে দেখছে। আপার ঘর আলতো ভিড়ানো, কিন্তু সে হলফ করে বলতে পারে ওর যাবতীয় মনোযোগ এখন সে কী করছে সেইদিকে। কিন্তু বিউটির সব রাগ গিয়ে পড়লো মুখলেস সাহেবের উপর। এই মেনীমুখো লোকটা কি আসলেই তার বাবা। এত তেলতেলা পিচ্ছিল একটা লোক—বিউটির গা গুলিয়ে ওঠে।
—আপনে দরজার চিপায় কী করেন? কুনু কাজে-কামে নাই, কিন্তু সবখানে নাক দিয়া বইসা থাকবে। আস্তা ইয়া…
—বিউটি থাপড়ায়া তোর আমি দাঁত ভাঙবো। বাপের সাথে কেমনে কথা বলতে হয় তাও শিখে নাই। ইবলিশের বাচ্চা।
ফরিদা ঘরের ভিতর থেকে চীৎকার করে উঠলেন। বিউটি একদম চুপ মেরে গেল শুধু বারান্দার দরজার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা মুখলেস সাহেবের দিকে পলকহীন তাকিয়ে রইল, বিউটির চোখ দু’টা ধ্বকধ্বক করছিলো। সে যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখান থেকে মুখলেস সাহেবের মুখ দেখা যাচ্ছে না, শুধু গায়ের চাদর দুলতে দেখা গেল। এক সময় মুখলেস সাহেব নড়ে উঠলেন, চাদরসহ অদৃশ্য হলেন। বিউটিও নিজের ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল। কিন্তু স্বভাবসুলভ বিকটা শব্দ তুলল না—দড়াম করে দরজা লাগাল না কিংবা ঠাস করে কপাট ফেলল না। পা টিপে টিপে যথেষ্ট সাবধানতা মেনে নিঃশব্দে ছিটকিনি তুলল। যেন এই বাড়িতে মৃত্যুপথযাত্রী কোনো রোগী ঘুমিয়ে আছেন, এতটুকু নড়াচড়ায় তার ঘুম ভেঙে যাবে আর বেঁচে থাকার জন্য এই ঘুমটুকুর খুব বেশি দরকার। রাবেয়ার মার খুব ভয় লাগছে। খালুজানের জন্য আটার রুটি চার পাঁচটা বেলে রেখেছে, খেতে বসলে গরম গরম সেঁকে দেবে। আপাতত হাতে আর কোনো কাজ নাই। সারা বাড়ি কবরের মতো ঠাণ্ডা মেরে গেছে। এতটাই ঠাণ্ডা যে বারান্দা থেকে একটানা ঝিঁঝির ডাক রান্নাঘর থেকেও শোনা যাচ্ছে। মাঝে মধ্যে ছেদ পড়ছে আবার শুরু হচ্ছে। বারান্দার দরজা বন্ধ করে আসা দরকার। মুখলেস সাহেব কিছুক্ষণ আগে বসার ঘরে গিয়ে বসেছেন। বারান্দায় মনে হয় ঠাণ্ডা লাগছিল। গরম চাদরে গা মাথা জড়িয়ে রেখেছেন। বারান্দার দরজা খোলা দেখলে ফরিদা নির্ঘাত খেঁকিয়ে উঠবেন। কিন্তু রাবেয়ার মা প্রাণে ধরে যেতে পারছে না। আজকে কী যেন হচ্ছে, বদ বুঁ ঘিরে ধরেছে বাসাটা আর থেকে থেকে শরীরে কাঁপুনি ধরছে। পিচ্চিও রাবেয়ার মার পাশে চুপ করে বসে আছে। তার শীত করছে, হাত-পা হীম হয়ে যাচ্ছে আর মনে হচ্ছে কেউ না কেউ তাকে ধরে বেদম ধোলাই দিবে।
টেবিলে খাবার দিবে কি না রাবেয়ার মা বুঝতে পারছে না। গরম করতেও তো সময় লাগবে। রুটিগুল সেঁকে ফেলা দরকার। সে ভীষণ একটা পেরেশানির মধ্যে পড়েছে।
—পিচ্চি উঠ, টেবিল লাগা গিয়া।
—আইজকা কেউ খাইতো না।
—খাইতো না?
—খাইতো না।
—আমরা কী করতাম? আমার পেট ভুক লাগছে।
—আমারও।
দু’জন মানুষ পেটে ক্ষুধা নিয়ে রান্নাঘরে বসে রইল এক সময় দু’জনেরই ঝিমুনি এল। এর মধ্যে কতটা সময় পেরিয়ে গেছে কেউই জানে না। তবে রাত গভীর হচ্ছে এটা বোঝা যায়। শীতের রাত, কুয়াশার আড়ালে চলে গেল।
প্রথম ফরিদার ঘরের দরজা হাট করে খুলে গেল। অন্য দিনের মতো নিজেকে স্বাভাবিক রাখলেন, রান্নাঘরে ঢুকে দেখলেন পিচ্চি আর রাবেয়ার মা ঝিমাচ্ছে। রাবেয়ার মা’র মাথা দেয়ালে ঠেস দেয়া আর পিচ্চি দুই হাঁটুতে দুই হাত লম্বা করে রেখে মাঝখানে মাথাটা ছেড়ে দিয়েছে। দু’জনের দিকে ফরিদা মুহূর্তক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন তারপর সজাগ করলেন।
—রাবেয়ার মা টেবিলে ভাত বাড়ো।
রাবেয়ার মা’র মাথাটা কেঁপে উঠল, ধড়মর করে উঠে বসল। পিচ্চি হাত দু’টা গুটিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াল।
—টেবিল লাগা, পানি দে। জলদি কর, যা—অনেক রাত হইছে।
পিচ্চির মধ্যে কোনো তাড়া দেখা গেল না। কিন্তু রাবেয়ার মা তড়িঘড়ি শুরু করে দিল। ঘুম ঘুম চোখে সে চুলা জ্বালিয়ে তাওয়া বসাল রুটি সেঁকবার জন্য। তার হঠাৎ ভীষণ শীত করছে। গায়ের চাদর ভাল করে জড়িয়ে নিল। শীতে দুই কাঁধ বুকের দিকে চেপে আসছে, সে একটু পর পর তাওয়ার উপর হাত মেলে ধরছে আবার হাতে হাত ঘষছে। রাবেয়ার মা’র সাথে ফরিদাও হাত লাগালেন। পাশের চুলা জ্বালিয়ে তরকারি গরম বসালেন। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থেকে তিনি তদারকি করলেন, হুকুম দিয়ে বেরিয়ে গেলেন না।
—রাবেয়ার মা লেবু কাইটা দিও। পিচ্চি, এই পিচ্চি।
—জি নানি?
—কাটা ফেলবার প্লেট দিস। আল্লাহ’র তিরিশটা দিন মনে করায় দিতে হয়।
পিচ্চি মাথা নেড়ে খাবার ঘরে ফিরে গেল। ফরিদা রান্নাঘর থেকেই পিচ্চিকে বললেন মুখলেস সাহেবকে ডাকতে। নিজের হাতে হাঁসের মাংস আর ইলিশ পোলাও গরম করে বাটিতে বাড়লেন। রাবেয়ার মা টেবিলে দিয়ে আসল। ফরিদা টক দইয়ের সাথে শসাকুচি মিশিয়ে চট করে রাইতা বানালেন। সবকিছু শেষ করে খাবার ঘরে এসে দেখলেন মুখলেস সাহেব চুপ করে তার চেয়ারে বসে আছেন। দু’জনের একবার চোখাচোখি হল, কেউ কিছুই বললেন না। ফরিদা প্রথমে লাভলির ঘরের দরজায় হালকা টোকা দিলেন তারপর বিউটির দরজায়।
—লাভলি খেতে আয়। বিউটি খাবি না? —আয়।
ফরিদা টোকা দিয়ে দরজার কাছ থেকে সরে আসার সাথে সাথেই দুই মেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ওরা যেন এতক্ষণ দরজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়েছিল, ডাকতেই দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছে। ওদের কারও চেহারা দেখে ভিতরে কী ঘটছে বোঝার জো নাই। প্রতিদিনের মত যার যার চেয়ারে গিয়ে বসল। লাভলি বাসায় ফেরার পর এই প্রথম ফরিদার মুখোমুখি হল। কিন্তু ফরিদা বা লাভলি কেউই তা নিয়ে একটা শব্দও উচ্চারণ করল না। সবাই স্বাভাবিক থাকল। লাভলির মাথা আসলে একেবারেই কাজ করছিল না—নইলে ভয়ে ওর হাত-পা এতক্ষণে পেটের ভিতরে ঢুকে যাওয়ার কথা। ওর যে অপরাধী মুখ করে থাকা উচিৎ সেটাও বেমালুম ভুলে গেছে। ক্ষুধা আর পানির পিপাসায় ওর অবস্থা খারাপ। খাওয়া শুরু হতেই লাভলি পোলাওয়ের উপর একরকম হুমড়ি খেয়ে পড়ল। খাবার সময় কোনো কাথাবার্তা হল না। ফরিদা সাংসারিক যা দু’একটা টুকটাক কথাবার্তা খেতে বসে বলেন এখন সেই চেষ্টাও করলেন না। চার চেয়ারে চার জন ক্লান্ত মানুষ মাথা নিচু করে গোগ্রাসে খাচ্ছে।
এই মুহূর্তে মুখলেস সাহেবের খাবার এবং খাওয়ার পরে বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ার চিন্তা ছাড়া আর কিছুই মাথায় ঘুরছে না। দুপুর থেকে বারান্দায় বসে থাকতে থাকতে হাড়ের ভিতর পর্যন্ত ঠাণ্ডা ঢুকে গেছে। আজকে সারাদিন তিনি মানসিকভাবে ভীষণ নড়বড়ে অবস্থায় ছিলেন, নিজেকে কেঁচোর কাছাকাছি কোনো জীব বলে মনে হয়েছে।
বিউটি মাছের কাটা বাছছে পূর্ণ মনোযোগে, এখন যদি পৃথিবী রসাতলেও যায় তার কিছু যাবে আসবে না।
ফরিদা খাচ্ছেন ঠিকই কিন্তু কোনো কিছুর স্বাদ পাচ্ছেন না—লাভলি ফিরে আসার পরে উনি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সিদ্ধান্তটা পুরোপুরি নিয়ে নেয়ার পর হালকা বোধ করছেন। ঠিক করেছেন আবদুুল বশির সাহেবের ব্যাপারটা মেয়েদেরকে খুলে বলবেন। লাভলি তো জানেই, তবুও দুই মেয়েকে একসাথে বসিয়ে বলবেন। তার আগে মেয়েদের কঠিন নিষেধ করবেন বলার সময় কেউ যেন কথার উপর কথা না বলে বা অহেতুক প্রশ্ন না করে। কথা শেষ হওয়ার পরে তাদের যদি কিছু বলার থাকে তিনি তা শুনবেন। তবে আজকে রাতে না—নিজেদের গুছিয়ে নেয়ার জন্য সবারই আজকের রাতটা দরকার।
লাভলি খাচ্ছে ঠিকই কিন্তু আশেপাশে যা হচ্ছে বা ঘটছে সব কিছু ওর কাছে ঝাপসা লাগছে। যেন প্রচণ্ড গতিতে ছুটে চলা ট্রেনের খোলা জানালার পাশে লাভলি বসে আছে আর বাইরের দৃশ্য ক্রমাগত ওকে ফেলে দূরে সরে যাচ্ছে। বাইরের জগতের ঝাপট লাগছে, কিন্তু ঠাহর হচ্ছে না।
রাতের খাওয়া শেষ হয়েছে, এক এক করে সবাই যার যার ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিল। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াবার সময় প্রত্যেকেই আরেকটু নুব্জ হল—কাঁধের উপর অসহ্য চাপ ওদের মাথা, ঘাড় মাটির কাছে নিয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করল। ওদের এই মানসিক অবস্থা সংক্রমিত হল বাড়িটার মধ্যেও।
মনিপুরি পাড়া ১১৫/৩। রাত এখন প্রায় সোয়া বারোটা। মহল্লার গলি ঘুঁপচিতে লেপটে থাকা কুয়াশা ক্রমশ ঘন হচ্ছে। ঘন হতে হতে চতুর্দিক থেকে এক সময় বাড়িটাকে নাই করে দিল। শীত রাতের চাঁদ তীব্র সার্চ লাইট ফেলেও বাড়িটাকে খুঁজে পেল না। ঠিক সেই সময় লাভলি ড্রয়ার থেকে ছুরিটা বের করল। বিছানার তোশকের নিচে রাখতে হবে—কিন্তু রাখবার আগে আরেকবার শানিয়ে নিতে চায়। মুগ্ধ হয়ে ছুরির ধার পরখ করল। ডান হাতের তর্জনি দিয়ে স্টেনলেস স্টিলের পাতের উপর আলতো বুলিয়ে গেল আঙুল।
—(আপুমনি, আপনের মতলব কী?) —
—কই ছিলা এতক্ষণ?
—(ঘুমায়ছিলাম। আপনে কার জন্য বইসা আছেন।) —
—বিউটির জন্য।
—(ছোটো আপু আসবে না ঘুমায় পড়ছে।) —
—আসবে।
—(আসলে কী করবেন?) —
—খেলবো।
—(আমি কই কী আজকে খেলাধূলা বাদ দেন। রেস্ট নেন। ধকল গেছে না।) —
লাভলি ভীষণ মজা পেল। মাথার ভিতরের লোকটা ওকে ভয় পাচ্ছে। এরকম অভিজ্ঞতা লাভলির এই প্রথম যেখানে ওর হাতে কলকাঠি—যেভাবে নাড়বে সেভাবে নড়বে।
দরজায় টোকা পড়ল। কান পেতে না রাখলে শোনা যাওয়ার কথা না, এতটা আস্তে। প্রথম টোকাতেই লাভলি সচেতন হল। দরজা খুলবার জন্য চেয়ার ছেড়ে উঠল। টেবিলের উপর ছুরিটা রেখেও হাতে তুলে নিল। দরজার কাছে যাওয়ার আগে বালিশের নিচে রাখল।
—(আপুমনি, দরজা খুইলেন না। আজকে চলেন শুইয়া শুইয়া মজা করি। যে আসছে সে কিছুক্ষণ দাঁড়ায়ে চলে যাবে।) —
লাভলি অবিচল হেঁটে গিয়ে দরজা খুলে দিল। বিউটি দাঁড়িয়ে আছে, ঘরের আলো লাভলির ডান কাঁধের ফাঁক দিয়ে গলে গিয়ে বিউটির মুখের একপাশ আলোকিত করেছে, অন্যপাশ অন্ধকারে ডুবে আছে। দু’জন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রইল। কেউ কারও জন্য এক চুল নড়ল না।
—আপা, সরো ঘরে যাইতে দাও।
—কেন?
—(ঠিকই বলছেন এতোরাতে ঘরে কী?) —
—ঝগড়া করবো না, বিদ্যা।
অবিকল ছোটবেলার মতো করে বিউটি বলল। লাভলি সরল না। বিউটি একটু সরে গিয়ে ওর শরীর ঘেঁষে ঘরে ঢুকল। লাভলি দরজা ফিরে লাগাল না, বিছানায় গিয়ে বসল। এক হাত আলতো করে বালিশের উপর রাখল। মনস্থির করতে পারছে না, ছুরিটা বিউটিকে দেখাবে কি না।
—ঘুমাবি না?
—ঘুম আসতেছে না। আপা, খেলবা?
—না।
প্রত্যাখ্যানে বিউটি জ্বলে উঠল। “কেন খেলবা না।”
—সারাদিন হাঁটাহাঁটি করছি, ঘুম আসছে।
বিউটি কড়া চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। লাভলি আরেকটু সঙ্কুচিত হল। বালিশের আরও কাছ ঘেঁষে বসল।
—ঘুম তোমার আসে নাই।
বিউটির কথায় ও কেঁপে উঠল। বালিশের উপর ওর ডান হাতের পাঁচ আঙুল ভীষণ অবাধ্য হয়ে উঠল।
—বালিশের নিচে কী?
—(সারছে!) —
—বালিশের নিচে কী আপা?
লাভলি উত্তর দিতে গিয়ে টের পেল গলা শুকিয়ে আসছে। শব্দ করে গলা পরিষ্কার করল।
—কিছু না, একটা ছুরি। আজকে নিউ মার্কেট থিকা কিনছি।
লাভলি বিছানা থেকে উঠে খাবার ঘরে এল। টেবিলের উপর ঢেকে রাখা জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢালল, তারপর পুরো এক গ্লাস পানি ঢকঢক করে খেয়ে নিল।
—(আপুমনি, আমার তরফ থেকে আরেক গ্লাস খান, শীতল হই।) —
—তুমি ঘুমাইতেছো না কেন?
—(আপনে না ঘুমাইলে কেমনে ঘুমাই।) —
—না ঘুমাইলে চুপ থাকো।
লাভলি আরেক গ্লাস পানি ঢেলে নিয়ে ঘরে ফিরে এল। বিউটি ছুরি হাতে বসে আছে—লাভলিকে ঘরে ঢুকতে দেখে কামড়ে ধরা ঠোঁট হাসি হাসি হল। লাভলি এক হাতে দরজা বন্ধ করে ছিটকানি লাগাল। পানি এনে ঘরের ছোট টেবিলের ঠিক মাঝখানে রাখল। অন্য কোনো দিকে তাকাল না। যথাসাধ্য চেষ্টা করল শব্দ না করে চেয়ার টেনে বসতে, ইশারায় বিউটিকেও উল্টাদিকের চেয়ারে এসে বসতে বলল।
—আজকে আসল ছুরি দিয়ে খেলব, না আপা?
কিশোরী-গলায় কথা বলে উঠল বিউটি। হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়া তার খুশি খুশি লাগছে। আপাকেও ভাল লাগছে। লাভলির উল্টা দিকের চেয়ারে এসে ধপ করে বসল সে। ছুরিটা পানির গ্লাসে ঠেস দিয়ে রাখল।
—হুম…।
—(আপুমনি, আপনের অবস্থা কিন্তু কেরাসিন। খেললে ধরা খাবেন।) —
“আম্মা তুমারে কোথায় পাঠাইছিল? বলতেই হবে।” ছুরির উপর থেকে চোখ সরাল না বিউটি, মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল।
—আমারে কেউ কোথাও পাঠায় নাই। বললাম তো গাউছিয়া থিকা রমনা পার্কে গেছিলাম।
—যে মানুষ জন্মে একা বাড়ির বাইর হয় নাই, সে বলা নাই কওয়া নাই রমনা পার্কে চইলা যাবে—তুমি বললা আর আমি বিশ্বাস করলাম।
—বিশ্বাস না করলে নাই। যা হইছে তাই বললাম। ঐখানে একটা লোকের সাথে পরিচয় হইল, সে বাসা পর্যন্ত দিয়া গেছে।
লাভলির কথা শুনে বিউটি বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মধ্যে দুলতে থাকে। হয়তো সত্যিই রমনা পার্কে গেছিল। তবে শেষের কথাটা একেবারেই ফালতু।
—আম্মা যদি তোমারে না পাঠায়ে থাকে, তাইলে তুমি যে এত দেরি করে বাসায় ফিরলা আম্মার তো তোমারে খায়ে ফেলার কথা। আমারে বলো আপা, সত্যি বলতেছি আমি কাউরে বলবো না।
কথা শেষ করতে পারল না তার আগেই চাপা গলায় খিক খিক করে হাসতে লাগল বিউটি। লাভলি চমকে তাকাল কিন্তু কিছু বলল না।
—আমাদের দু’জনেরই মাথা আওলা হইছে। আরে, আমি বলবটা কারে, বলার মানুষ আছে। তুমার সাথে কার পরিচয় হইছে—একটা লোকের? সে আবার বাসা পর্যন্ত আইসা পৌঁছায় দিয়া গেছে।— এ্যাহ্—।
তাচ্ছিল্যের চোটে ঠোঁটসহ গলার স্বর বেঁকে গেল বিউটির। কাশির দমকের মতো খিক খিক হাসি নিয়ন্ত্রণহীন ফিরে এল। লাভলি অনেকক্ষণ বিউটির দিকে তাকিয়ে থাকল। কেন, ওর সাথে কি কোনো মানুষের দেখা বা পরিচয় হতে পারে না? বিউটি কি ভুলে গেছে রিয়াজ ওকেই পছন্দ করেছিল, ওকে।
—(আপুমনি এই সব পুরান প্যাঁচাল ফালায় থোন। একটা কথা কিন্তু ছোটো আপা খাপে খাপ বলছে, সন্ধ্যা কইরা বাসায় আসলাম তারপরও আমরা দুইজনেই বহাল তবিয়তে আছি, রহস্যটা কী?) —
এই ধাঁধার জবাব বাসায় ফেরার পর থেকে লাভলিও খুঁজছে। একটাবার ফরিদা জিজ্ঞেস তো করলেনই না ও কোথায় ছিল উল্টা তিনিই যেন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। চোখে চোখে তাকান নাই পর্যন্ত। তার মানে কী এই ও এখন থেকে ইচ্ছা মতো চলতে ফিরতে পারবে, কাউকে পরোয়া করতে হবে না। সবই আকাশ কুসুম ভাবনা তারপরও নিজের ভিতর আশ্চর্য রকম জোর অনুভব করল লাভলি। বিউটির দিকে তাকিয়ে দেখল গলা এখনও বেঁকে আছে আর বিশ্রী হাসিটা লালার মতো ঠোঁটের প্রান্তে লেপটে আছে। কঠিন শিক্ষা পাওনা হয়েছে বিউটির।
—(আবার ছোটো আপারে নিয়া পড়লেন, খালাম্মা কেন আপনেরে ধরতেছে না সেইটা নিয়া ভাবেন। এর মধ্যে একটা কিন্তু আছে।) —
—এই কিন্তুরে দুই পয়সা দিয়া পুছি না।
মনে মনে লোকটাকে জবাব দিয়ে লাভলি ছুরিটা হাতে তুলে নিল। হাতের মুঠির ভিতর স্টেনলেস স্টিলের ঠাণ্ডা পাত ওর শরীরে শিহরণ জাগাল। মুঠি আলগা করতে গিয়ে আরও শক্ত করে চেপে ধরল।
—আপা খেলবা?
—না।
—আমিও খেলতে চাই না।
—আজকে আমি আম্মা হবো তুই আমি।
—বললাম তো খেলতে চাই না।
—দেরি করে ফিরছি, আম্মা এখন ভিতরের কথা বার করবে তারপর ঘর বন্ধ করবে—না, না ঘরবন্ধ না একদম জানে মাইরা ফেলবে।
—আমি আম্মা হবো আর তুমি তুমিই থাকবা। দেখি…।
বিউটি ছোঁ মেরে ছুরিটা হাতে নিতে চেষ্টা করল কিন্তু লাভলি শক্ত মুঠিতে ধরে রইল। বিউটির পক্ষে ওর সাথে জোরাজুরিতে টেকা সম্ভব হল না।
—না, আমি আম্মা।—এতক্ষণ কই ছিলি?
লাভলি অবিকল ফরিদার গলায় ধমকে উঠল। ধমকের দাপটে বিউটি কেঁপে উঠল, কিন্তু খেলার খেই হারাল না। প্রায় সাথে সাথে নিজেকে সামলে নিয়ে লাভলির মতো করে নরম-গলায় উত্তর দিল।
—গাউছিয়া গেছিলাম।
—তোরে বললাম না গাউছিয়া যাই নাই রমনা পার্কে গেছিলাম। খেললে ঠিক মতো খেল… না খেললে নাই।
—রমনা পার্কে কেন গেছিলা?
—তুই জিজ্ঞাস করতেছিস কেন? প্রশ্নটা আমি তোকে করবো।
আজকে লাভলি অন্য মানুষ। আজকে সবাই যা না তাই। সবাই খোলস ছেড়ে বেরিয়েছে।
—রমনা পার্কে কেন গেছিলি?
—জানি না, ঘুরতে।
বিউটি মনোযোগ দিল খেলায়। খেলার নিয়মকানুন মাথা থেকে ছুটে যাচ্ছে, আর ভুল করা যাবে না।
—ঘুরতে? কার সঙ্গে গেছিলি? আজকে তোরে জানে শেষ করবো। ছিনালি বার করবো আমি তোর।
লাভলির ভ্রƒ ভীষণ রকম কুঁচকে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে কথাগুলি বেরিয়ে এল।
—কারও সঙ্গে যাই নাই। কার সঙ্গে যাবো?
—হারামজাদী তোদের দুইজনরে এমন শায়েস্তা করবো যে জন্মের মতো লুলা হইয়া ঘরে বইসা থাকবি।
—আমরা তো লুলাই।
কথাটা বলেই বিউটি লাভলির হাত থেকে ছুরিটা ছিনিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। ব্যাপারটা এতটাই অতর্কিতে ঘটল যে এর জন্য ও মোটেও তৈরি ছিল না। বিউটি বিপজ্জনক ভঙ্গিতে ছুরিসহ হাতটা লাভলির চোখের উপর দোলাতে লাগল।
—এখন কে কারে শায়েস্তা করবে? লুলা বানায় রাখবে, শখ কতো!
ছুরির গুঁতা থেকে বাঁচবার জন্য লাভলি ওর মাথা পিছনে সরিয়ে নিল আর একই সাথে মেঝেতে দু’পা ঘষটে চেয়ারটাও সরাবার চেষ্টা করল।
—মনে রাইখো আমি সব জানি। সবার সব কীর্তি আমার জানা। আমার নাকের ডগার সামনে দিয়া চুমাচুমি বার করতেছি। কত্তো বড় শয়তান আমি চুমা দিলে চুমা নেয় না। কেন, আমার ছ্যাপে কি বিষ না কি, তোমারটায় মধু, মধু।
এক ঝটকায় লাভলি চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল। বিউটি লাভলির উপর ছুরি নিয়ে প্রায় অর্ধ চাঁদের মতো বেঁকে ছিল, হঠাৎ করে উঠে পড়ায় লাভলির খালি চেয়ারটায় হেলে পড়ল সে এবং হাত থেকে ছুরি খসে পড়ে গেল পাকা মেঝেতে। সিমেন্টের মেঝেতে স্টেনলেস স্টিল ঝন ঝন করে উঠল। চেয়ারের পিঠ ধরে বিউটি নিজেকে সামাল দিল, তারপর মেঝে থেকে ছুরিটা তুলে টেবিলের উপর রাখল।
দুই বোনই হাঁ করে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল। দু’জনেরই বাতাসের অভাব অনুভূত হল। বিউটি চেয়ারে বসল, হাত-পা বশে ছিল না। পানির গ্লাসটা মুখে তুলতে গিয়ে বেশ খানিকটা ছলকে পড়ল।
—নিজের পানি নিজে নিয়া আয় বিউটি। এই পানি আমি আমার জন্য আনছি।
বিউটি ওকে পাত্তা না দিয়ে প্রায় পুরোটা পানি ঢকঢক করে খেয়ে নিল এবং তৃপ্ত হয়ে বোনের দিকে তাকিয়ে হাসল। সহজ স্বাভাবিক হাসি। তলানিতে পড়ে থাকা পানিসহ গ্লাসটা বোনের দিকে বাড়িয়ে দিল। বাড়িয়ে ধরা হাতের দিকে ভ্রূক্ষেপ করল না লাভলি। অন্য চেয়ারটা এক হাতে টেনে বিউটির খুব কাছে নিয়ে এল, তারপর চুপ করে সেটায় বসল। পানির গ্লাসটা বিউটি ছুরির পাশে হেলাফেলা করে রাখল।
—রিয়াজের কথা তুই আম্মারে বলছিলি। আমি ভাবলাম কাদের।
বিউটি ফিক করে হেসে ফেলল। লাভলি একবারও তার দিকে তাকাল না। অলস দৃষ্টিতে গ্লাস আর গ্লাসের নিচে পড়ে থাকা পানির দিকে মাথা ঈষৎ নিচু করে তাকিয়ে থাকল।
ঠিক কতক্ষণ লাভলি তাকিয়েছিল আমরা জানি না। শুধু এইটুকু জানি শান্ত পুকুরে বড় মাছের আতকা ঘাই যেমন দুর্দান্ত আলোড়ন তোলে তেমনি লাভলির শরীরের গভীরে অদেখা কেউ আচমকা ঘাই মারল—সময়ের চেয়ে ধীর গতিতে লাভলি টেবিল থেকে ছুরিটা হাতে তুলে নিল, তুলে নেয়ার সময় কুঁচকে থাকা টেবিল ক্লথের অংশ উঠে এল হাতে—হাত অপ্রস্তুত হয়ে টেবিল ক্লথটা ছেড়ে দেয়, ছুরিটা দ্বিধান্বিত কেঁপে ওঠে আঙুলের ফাঁকে। এক মুহূর্তের দশ ভাগের এক ভাগ সময়ের জন্য ছুরিটা সম্পূর্ণভাবে পাঁচ আঙুলের আওতা থেকে শূন্যে বেরিয়ে এসেই আবার পাঁচ আঙুলের কড়াল মুঠিতে বন্দি হয়ে যায়। এই আন্দোলনে গ্লাসটা কাঁৎ হয়ে পড়ে। তলানির পানি প্লাস্টিকের টেবিল ক্লথের উপর দিয়ে কাঁচের মার্বেলের মতো গড়িয়ে একেবারে প্রান্তে গিয়ে টুপ টাপ ঝরে পড়ে। লাভলির পাঁচ আঙুল চেপে বসে ছুরির বাটে, আঙুলের চাপে হাতের তালু রক্তহীন ফ্যাকাশে হয়ে যায়, নীল শিরা ফুটে বের হয়। দু’জনের বোধের সীমানা ছাড়িয়ে বিউটির দুই পাঁজরের ঠিক নিচে স্টেনলেস স্টিল ছুরি আমূল ঢুকে যায়। বিউটির প্রায় বুজে আসা চোখ আর ফিক ফিক হাসি থমকে যায়, দুই চোখের পাতা প্রথমে পুরোপুরি বুজে যায়, তারপর বড় হতে থাকে—নদীর চরের সাদা, অর্ধ চাঁদের জ্যোতি, অনন্ত দাঁড়িয়ে থাকা রাতের রেলগাড়ির হেডলাইটের আলোর মতো তীব্র কিন্তু স্থির।
শীতের রাতের ঝিম ধরা নৈঃশব্দ ওদের গিলে খাচ্ছে। বিউটির এক হাত বাতাসে ঝুলতে থাকে, আরেক হাত টেবিলের ওপর এলানো; মাথাটা তার ওপর এলোমেলো পড়ে আছে। এত যতেœর কালো চুলের বন্যা চেয়ারের পিঠ ছাপিয়ে ঢেউ তুলছে। ঠোঁটের কোণায় এক চিলতে হাসির আভাস দেখা গেল কি গেল না। এত জোরে চীৎকার দেয়ায় তাকে একটু লজ্জিত দেখাচ্ছে। চোখ দু’টিতে বিস্ময় না কি বোনের কীর্তিতে মুগ্ধতা বোঝা গেল না।
বন্ধ দরোজায় প্রচণ্ড জোরে বাড়ি পড়ছে। সেই শব্দ লাভলির কান ভেদ করে, মস্তিষ্ক ভেদ করে, বুক ভেদ করে তবুও ভিতর পযন্ত পৌঁছায় না। দরজা উড়িয়ে নিয়ে যাবে এমন, ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে এমন। তারপর এক সময় সমস্ত ঝড় ঝাপ্টা থেমে যায়। শান্তি! লাভলি দুই পায়ের গোড়ালি দিয়ে চেয়ারটা কিঞ্চিৎ পিছনে ঠেলে দেয়। কাজের কাজ কিছুই হয় না চেয়ারটা একদিকে শুধু সূঁতাখানেক সরে যায় আর বিউটির চুল ওর কনুইয়ে এসে লাগে। নরম মসৃণ চুল। সান সিল্কের ভালো বিজ্ঞাপন হতে পারতো, ভাবে লাভলি। একবারও বিউটির দিকে পূর্ণ দৃষ্টি দেয় না। এক সময় টের পায় মাথার পিছনে টিউব লাইটের হলদে আলো অসহ্য তীব্রতায় গলে গলে পড়ছে—দেয়াল চুঁইয়ে চটচটা গলন্ত আলো চুল পোড়া গন্ধে লাভলির দিকে গড়িয়ে আসে। লাভলি অনেকক্ষণ বুঝতেই পারে না পায়ের নিচে চটচট করছে কী। বাম পায়ের বুড়া আঙুলে ঠাণ্ডা ধাতব-তরল স্পর্শের সাথে সাথে গা গুলিয়ে ওঠে ওর। সেই তরল দারুণ নিষ্ঠায় দুই পায়ের পাতা ছুঁয়ে থাকে। গা ঘিনঘিন করে ওঠে ওর, নাকের ডগা ইষৎ কুঁচকে যায়—কেমন অসহায় লাগে লাভলির। এই মুহূর্তে পানির খুব দরকার ছিলো। বিউটির দিকে তাকিয়ে থাকে অল্পক্ষণ অথবা বহুক্ষণ। বাতাসে ঝুলতে থাকা বিউটির হাত আলগোছে টেবিলের উপর রাখে। ডাল বাটার গুণাগুণ টের পায়। কী শান্ত ভঙ্গিতে টেবিলের উপর মাথা রেখে শুয়ে আছে। খুব আদর লাগে লাভলির।
যথেষ্ট পারঙ্গমতার সাথে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। মাথা একটুও টলে না, হাত দু’টা নিয়ে অবশ্য মুশকিলে পড়ে যায়। শুরুতে শরীরের দুই পাশে লম্বালম্বি ঝুলতে থাকে, পরক্ষণেই ডান হাত বুকের কাছে উঠে আসে। ডান হাতের দেখাদেখি বাম হাত একই কাজ করতে গিয়ে বিপদে পড়ে যায়। বুকের ধড়ফড়ানি এমন হাস্যকর রকম বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে বেচারা হাত দু’টা সেখানে স্বস্তি পায় না। লাভলি ভাবে এই দু’টাকে কোমড়ের উপর রাখবে। তাহলে বেশ একটা সটান ভাবও আসবে, এই মুহূর্তে ভাবটাই জরুরি। কিন্তু কিছুতেই পারা যাচ্ছে না—হাত দু’টা কোমড়ের উপর রাখছে আর পিছলে পড়ে যাচ্ছে। চারবারের মাথায় হাল ছেড়ে দেয় ও, শেষমেশ দুই হাত পিছনে নিয়ে ডান হাতের মুঠিতে বাম হাতের তর্জনি এবং মধ্যমা শক্ত করে ধরে থাকে। পরবর্তী চুয়ান্ন মিনিট একইভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে লাভলি; আর ওর সমগ্র বেঁচে থাকা চুয়ান্ন মিনিট ধরে ওকে ঘিরে পাক খায়। পাকটা পায়ের পাতা থেকে চক্রাকারে মাথার দিকে ধাবিত হয় কিন্তু তালু পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না, গলার কাছে এসে চেপে ধরে। দমটা যখন প্রায় বেরিয়ে যাবে যাবে অবস্থা ঠিক তখনই বেমক্কা ছেড়ে দেয় তারপর পাক খেতে খেতে আবার নিচে নামতে থাকে। তারপর আবার উপরে তারপর নিচে তারপর উপরে, নিচে, উপরে…
চুয়ান্ন মিনিটে লাভলির জন্ম হয়, ওর তিন বছর বয়সে এক মাথা চুল নিয়ে বিউটির জন্ম। কী ফর্সা! সকাল বেলা পর্দা টানা অন্ধকার ঘরে হঠাৎ রোদের আলো যেমন বেআরাম, তেমনটা। ঘরের বাইরে ফরিদা খানমের চাবি ঘুরাবার শব্দ, বিউটির চুলে ডিমের গন্ধ, দরজা খুলে হুড়মুড় করে ছাদে ঢোকা, গানের তালে মুখলেস সাহেবের হালকা দুলুনি ‘কাভি কাভি মেরা দিল মে খায়াল আতা হ্যয়…।’ আর রিয়াজ, আর লাল মাফলার আর মাথার ভিতরের লোকটা।
মাথার ভিতরের লোকটাকে লাভলি ওর পুরা শরীরে আতিপাতি করে খোঁজে, একবার ফিসফিস করে ডাকেও, ‘আপনে আছেন, শুনতেছেন?’ লোকটাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। একদিন যেমন স্বেচ্ছায় এসেছিলো তেমনি স্বেচ্ছায় চলে গেছে। প্রথম ধাক্কায় খুব মন খারাপ লাগে পরে একটু বিরক্তই হয়—আজকের রাতটা অন্তত থেকে যেতে পারতো!
লাভলি আর দাঁড়িয়ে থাকে না, ঘরের দরজা খুলে বাইরে আসে। দরজার ফাঁক গলে যা একটু আলো খাবার ঘরে এসে জুটেছে নইলে জায়গাটা বেশ অন্ধকার। জিরো পাওয়ারের বাতি অবশ্য একটা জ্বলছে। দরজার মুখে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকায়। নিজের ভারি নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে ভালো লাগে, অন্যরকম একটা ভরসা হয়, নাহ্ ভয়ের কিছু নাই! খুব সতর্কতার সাথে লাভলি ওর শোবার ঘরের দরজাটা ভিড়িয়ে দেয় তারপর ফরিদার ঘরের দিকে ফেরে। এক কী দু’পা এগিয়েও যায় আবার ফিরে আসে, রান্নাঘরের দরজার কাছে কান খাড়া করে দাঁড়িয়ে থাকে, বাইরে থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে দেয়।
এখন লাভলি ফরিদা খানমের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে খুব আস্তে টোকা দিচ্ছে, একটা নির্দিষ্ট ছন্দ অনুসরণ করছে। টকটক টকটকটক টকটক।
খুট করে দরজা খুলে যায়। ফরিদার ঘরেও জিরো পাওয়ারের আলো জ্বলছে। কারো মুখই ঠাহর হয় না। ফরিদা প্রথমে বুঝতে পারেন না কে, কথা বলতে গিয়ে আবিষ্কার করেন গলা দিয়ে যথেষ্ট স্বর বের হচ্ছে না।
—কে? কী? এতো রাতে কী লাভলি?… ঘুমাইতে যা।
—আজকে রাতরে আর ঘুম হবে না আম্মা।
—না হইলেও শুয়ে থাক। যা।
—বাগানের কোদালটা কী সিঁড়ি ঘরে আছে? চাবিটা দেন।
—হ্যাঁ?
—বিউটিরে মাইরা ফেলসি আম্মা। আপনের আসতে লাগবে না, আমি একাই পারবো।
(শেষ)
রচনাকাল: ২০০৮, লন্ডন
===============================
লীসা গাজী
লেখক, অভিনেত্রী, নির্দেশক
leesa@morphium.co.uk
bdnews24 এর সৌজন্যে
লেখকঃ লীসা গাজী
অলঙ্করণ: রনি আহম্মেদ
লেখকঃ লীসা গাজী
অলঙ্করণ: রনি আহম্মেদ
About: Anonymous
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1407)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
-
▼
2010
(9402)
-
▼
October
(964)
-
▼
Oct 16
(16)
- নবজাতক শিশুর যত্ন ও পরিচর্যা মুহাম্মদ আবদুল মুনিম...
- সপ্তাহের শেষ দিন মূল্যসূচক কমল
- যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা বিমা জালিয়াতির বড় ঘটনা ফাঁস
- বিশ্ব গণমাধ্যমে ভূয়সী প্রশংসা
- ওবামা ও পেলিন দূর সম্পর্কের ভাইবোন!
- খনিশ্রমিকদের আমন্ত্রণ জানাবে তাইওয়ান
- সৌভাগ্যের নম্বর ৩৩
- ৮ হাজার কোটি রুপির বাড়ি!
- পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রীকে ‘হত্যার পরিকল্পনা’ ব্যর্থ
- আবেগে উচ্ছ্বাসে চিলি
- গদ্যালোচনা- 'এল ডোর্যাডো সেরাফিনো!' by মীর ওয়ালীউ...
- উপন্যাস- 'রৌরব' (চার ও শেষ পর্ব) by লীসা গাজী
- উপন্যাস- 'রৌরব' (পর্ব-তিন) by লীসা গাজী
- উপন্যাস- 'রৌরব' (পর্ব-দুই) by লীসা গাজী
- উপন্যাস- 'রৌরব' (পর্ব-এক) by লীসা গাজী
- উপন্যাস- 'লালঘর' by ইচক দুয়েন্দে
-
▼
Oct 16
(16)
-
▼
October
(964)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
Recent Comments
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
প্রথম আলো
আন্তর্জাতিক
মানবজমিন
আলোচনা
কালের কণ্ঠ
উপ-সম্পাদকীয়
যুগান্তর
প্রথম পাতা
মতামত
জাতীয়
সমকাল
নয়া দিগন্ত
রাজনীতি
জনকণ্ঠ
সুশীল কথন
ভারত
অর্থনীতি
শেষের পাতা
বিনোদন
ক্রিকেট খেলা
দেশে দেশে
যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্য
স্পেশাল প্রতিবেদন
নির্বাচন
প্রথম আলো
খেলা
খোলা কলম
আইন আদালত ও বিচার
ফুটবল খেলা
আমার দেশ
ইসরায়েল
বাংলানিউজ
মুক্তধারা
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা
Lead
ফিলিস্তিন
রাজধানী
অপরাধ
আন্দোলন
এক্সক্লুসিভ
আইন ও মানবাধিকার
নারী
শিক্ষা
বিএনপি
সারা বিশ্ব
ইরান
ক্রিকেট
সাহিত্য
পাকিস্তান
মুক্তমঞ্চ
আওয়ামী লীগ
বাংলা ট্রিবিউন
শিশু
দুর্নীতি
সারা দেশ
বিশাল বাংলা
চট্টগ্রাম
ব্রেকিং নিউজ
সাউথ এশিয়ান মনিটর
সিলেট
ক্রীড়া
পার্সটুডে
অর্থ
খালেদা জিয়া
কালবেলা
অর্থ ও বাণিজ্য
শিল্প বাণিজ্য
চীন
বিবিসি বাংলা
কাশ্মীর
চতুরঙ্গ
খবরাখবর
প্রধানমন্ত্রী
বিশ্ব
নতুন বার্তা
হত্যা
ধর্ম
স্মরণ
গল্প
যুক্তরাজ্য
শিক্ষাঙ্গন
শেখ হাসিনা
ফুটবল
বার্তা২৪ ডটনেট
রস+আলো
সাক্ষাৎকার
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
মুসলিম
জাতিসংঘ
মুক্তিযুদ্ধ
রাশিয়া
মিডিয়া
হরতাল-অবরোধ
খেলা ধুলা
ছাত্রলীগ
প্রতিবেদন
ইতিহাস
ইউরোপ
সোহরাব হাসান
জামায়াতে ইসলামী
অমানবিক
সৌদি আরব
আলোকিত চট্টগ্রাম
পশ্চিমবঙ্গ
আইন
চাষাবাদ- কৃষি ও কৃষক
ফিচার
ভ্রমণ
মিজানুর রহমান খান
ওয়েছ খছরু
খোলা চোখে
বাংলাদেশ-ভারত
ইসলাম ও সমাজ
সিরিয়া
যৌন নির্যাতন
নারায়ণগঞ্জ
নারী ধর্ষণ
জাতীয় সংসদ
আনন্দ
খেলাধুলা
ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ
বিজ্ঞান ও গবেষণা
মাদক
আফ্রিকা
সন্ত্রাস
আনিসুল হক
যৌন আবেদনময়ী
প্রবাস
মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান
ছুটির দিনে
সৈয়দ আবুল মকসুদ
সংখ্যালঘু
নকশা
বিজ্ঞান প্রজন্ম ও কম্পিউটার
গোল্লাছুট
তুরস্ক
আফগানিস্তান
বইপত্র
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
অন্য আলো
প্রতারণা
ছবি
টাইমস্ আই বেঙ্গলী
প্রকৃতি
ব্যবসা বাণিজ্য
অপহরণ
দুর্ঘটনা
সাহিত্যালোচনা
ইউক্রেন
গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিক
জাতীয় পার্টি
রাজশাহী
স্টেডিয়াম
দীন ইসলাম
মানবাধিকার
তরুণ প্রজন্ম
ফূটবল খেলা
রোহিঙ্গা
মিজানুর রহমান
মশিউল আলম
আইন ও বিচার
আলী যাকের
রুদ্র মিজান
হিন্দু
মানবকণ্ঠ
খুলনা
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
আব্দুল কাইয়ুম
মালয়েশিয়া
তারেক শামসুর রেহমান
আসিফ নজরুল
নেপাল
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
সাজেদুল হক
ফারুক ওয়াসিফ
কাফি কামাল
মৌলভীবাজার
স্বাস্থ্য
হাসান ফেরদৌস
আনন্দ কণ্ঠ
তৃতীয় পাতা
যাপিত জীবন
সড়ক দুর্ঘটনা
ক্রিখেট খেলা
জ্যোতির্বিজ্ঞান
ফুটবল খলা
বদরুদ্দীন উমর
মরিয়ম চম্পা
আলী রীয়াজ
রংপুর
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া
নতুনের জানালা
বৃষ্টি ও বন্যা
মোস্তফা কামাল
শিল্প ও সাহিত্য
এ এম এম শওকত আলী
কক্সবাজার
বন্ধুসভা
সংবিধান ও রাষ্ট্র
ঢাকা
বগুড়া
মিয়ানমার
ঈদ বিশেষ সংখ্যা
বাংলাদেশ
অবৈধ-অনিয়ম-কারচুপি
এ কে এম জাকারিয়া
গবেষণা
নির্বাচনী কূটনীতি
বদিউল আলম মজুমদার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
মিসর
এম আবদুল হাফিজ
পরিবেশ
শোক
সংস্কৃতি
খবর
বাংলাদেশে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
অজয় দাশগুপ্ত
প্রজন্ম ডট কম
শুভ্র দেব
আবুল কাশেম
আমদানি ও রপ্তানি
ফ্রান্স
কিশোরগঞ্জ
আবদুল মান্নান
রঙের মেলা
ঐতিহ্য
জাপান
কুমিল্লা
মুক্তমত
রাজনৈতিক আলোচনা
শরিফুল হাসান
শিল্প
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল
মাহমুদুর রহমান
ময়মনসিংহ
লেবানন
সংবাদ২৪.নেট
পার্বত্য চট্টগ্রাম
সীমান্ত সন্ত্রাস
আহমদ রফিক
ইফতেখার মাহমুদ
কাজের খবর
ইরাক
স্বপ্ন নিয়ে
টাঙ্গাইল
জীবনযাপন
HotTopic
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর
যশোর
অমর সাহা
আনোয়ার হোসেন
আলী ইমাম মজুমদার
গাজীপুর
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
আবুল মোমেন
থাইল্যান্ড
মুফতি এনায়েতুল্লাহ
শ্রীলঙ্কা
চিকিৎসা
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
মেহেদী হাসান
রসালোচনা
কামরুজ্জামান মিলু
পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য
বরগুনা
কাজী সোহাগ
স্মৃতিচারণ
আনু মুহাম্মদ
কলকাতা
কুলদীপ নায়ার
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
সারাবেলা
অস্ট্রেলিয়া
তথ্য প্রযুক্তি
মারুফ কিবরিয়া
ব্রাজিল
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
অন্য দিগন্ত
মহিউদ্দীন জুয়েল
মানসুরা হোসাইন
মুনতাসীর মামুন
শিরোনাম
শেখ রোকন
আবু সাঈদ খান
জেল থেকে জেলে
ফেসবুক
মহিউদ্দিন আহমদ
সংবাদ
কবিতা
বিশ্বজিৎ চৌধুরী
আলী হাবিব
প্রকৃতি ও পরিবেশ
শিল্প ও বাণিজ্য
শেষ পাতা
আবু আহমেদ
এম সাখাওয়াত হোসেন
নুরুজ্জামান লাবু
নূর মোহাম্মদ
সুভাষ সাহা
আতাউস সামাদ
আলোচনা মতামত
অর্থনীতি ও বানিজ্য
এবিএম মূসা
আতাউর রহমান
কামাল আহমেদ
পিয়াস সরকার
আসাম
মসজিদ
রংবেরং
রাহীদ এজাজ
শ্রদ্ধাঞ্জলি
আশরাফুল ইসলাম
ফেনী
বরিশাল
রণজিৎ বিশ্বাস
রোকনুজ্জামান পিয়াস
অরুণ কর্মকার
ইয়েমেন
প্রকৃতি ও বিজ্ঞান
মোস্তফা হোসেইন
Exclusive
একরামুল হক
আশীষ-উর-রহমান
একরামুল হক শামীম
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
তুহিন ওয়াদুদ
অপরাজিতা
ইন্দোনেশিয়া
উত্তর কোরিয়া
কালি ও কলম
জলবায়ু ও পরিবেশ
জাগোনিউজ২৪.কম
মইনুল ইসলাম
মানিকগঞ্জ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
মোশতাক আহমেদ
আশরাফুল হক রাজীব
ফরহাদ মাহমুদ
প্রণব বল
শংকর কুমার দে
সেলিম জাহিদ
আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
কামরুল হাসান
পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য
রাজীব আহমেদ
শিল্পী
সাময়িকী ফ্যাশন
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
বিদ্যুৎ
মোরসালিন মিজান
রবার্ট ফিস্ক
অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য
ঈদ
কাজী সুমন
ঝিলিমিলি
মুস্তাফা জামান আব্বাসী
কুষ্টিয়া
জাতীয় নাগরিক পার্টি
মনজুরুল হক
মহসীন হাবিব
মাহবুব মোর্শেদ
রফিকুল ইসলাম
শিলালিপি
শুভ রহমান
চৌধুরী মুমতাজ আহমদ
ছিটমহল
নিবন্ধ
jugantor
নোবেল পুরস্কার
পাঠকের মতামত
পাবনা
মোশাররফ বাবলু
তানভীর সোহেল
মামুন রশীদ
আনন্দ প্রতিদিন
উৎপল রায়
এনামুল হক
কাজল ঘোষ
নদী দূষণ
নাটোর
নিত্যপণ্য
ফাহিমা আক্তার সুমি
বাংলা নববর্ষ
উচ্চশিক্ষা
চারু শিল্প
ভেনেজুয়েলা
শওকত হোসেন
নজরুল ইসলাম
নিউজিল্যান্ড
বিজ্ঞান
পার্থ সারথি দাস
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
গোলাম মর্তুজা
ফরহাদ মজহার
শারমিন নাহার
principalsanaullah
আদিবাসী
কালের খেয়া
দিল্লি
ফখরুল ইসলাম
বাংলাদেশ প্রতিদিন
মুখোমুখি প্রতিদিন
মোহীত উল আলম
রাহাত খান
অমিতোষ পাল
গল্পালোচনা
পানি আগ্রাসন
প্রযুক্তি
বিশ্বজিৎ পাল বাবু
মাহবুব তালুকদার
আব্দুল কুদ্দুস
কানাডা
জনস্বাস্থ্য
বিদেশ
WikiOpinion
তোফায়েল আহমেদ
তৌহিদা শিরোপা
কাতার
আলোকিত বাংলাদেশ
কাদের সিদ্দিকী
ড. আবু এন এম ওয়াহিদ
ফারুক মঈনউদ্দীন
মোছাব্বের হোসেন
উৎপল শুভ্র
দিনাজপুর
নোমান মোহাম্মদ
সুদীপ অধিকারী
অরূপ দত্ত
পাভেল পার্থ
ফরিদপুর
ফিরোজ মান্না
মাসুদ পারভেজ
রোজিনা ইসলাম
শরিফুজ্জামান
হামিদ-উজ-জামান মামুন
আকমল হোসেন
আজিজুর রহমান
আলম শাইন
ঝড় ও দুর্যোগ
তারেক মাহমুদ
দীপংকর চন্দ
পাভেল হায়দার চৌধুরী
ফখরে আলম
মাসুদ রানা
শহিদুল ইসলাম
আবুল হাসনাত
আসিফ আহমেদ
ইশতিয়াক পারভেজ
জিয়া চৌধুরী
শিশির মোড়ল
হারুন হাবীব
হুমায়ূন আহমেদ
অমিত বসু
আল আমিন
ওমর ফারুক
ফজলুল বারী
ফারুক চৌধুরী
মাসুদ মিলাদ
শর্মিলা সিনড্রেলা
শাহাদুজ্জামান
হায়দার আকবর খান রনো
জাবেদ রহিম বিজন
জাহাঙ্গীর আলম
ট্রানজিট
নন্দন
যতীন সরকার
যুবলীগ
আরিফুজ্জামান তুহিন
কাজী আনিছ
খাবার
গাজীউল হাসান খান
তারেক রহমান
বাংলার দিগন্ত
মোহাম্মদ কায়কোবাদ
লাতিন আমেরিকা
শেখ হাফিজুর রহমান
শৈলী
সাতকানিয়া
সুদান
কাজী হাফিজ
জার্মানি
জোবাইদা নাসরীন
নিয়ামত হোসেন
মাহফুজুর রহমান মানিক
লুৎফর রহমান রনো
ইমরান আলী
এস এম আজাদ
জাহাঙ্গীর শাহ
মাহমুদুর রহমান মান্না
মুশফিকুর রহমান
সাতক্ষীরা
ইকতেদার আহমেদ
উৎসব
ঝিনাইদহ
মাসুদা ভাট্টি
মোকারম হোসেন
শেখ সাবিহা আলম
সিরাজগঞ্জ
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
হারুন আল রশীদ
WikiEducation
উজ্জ্বল মেহেদী
কনকচাঁপা
ড. মাহফুজ পারভেজ
পরিতোষ পাল
মিঠুন চৌধুরী
শাহদীন মালিক
হায়দার আলী
আহমেদ জামাল
ইমদাদুল হক মিলন
নওগাঁ
পোশাকশিল্প
বাতায়ন
ব্যবসা
আবু সালেহ আকন
এমাজউদ্দীন আহমদ
টিপু সুলতান
ড. মাহবুব উল্লাহ্
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
শোকাবহ ১৫ ও ২১ আগস্ট
WikiInternational
এবনে গোলাম সামাদ
পারভেজ খান
ফজলুল আলম
ফরিদা আখতার
বিভাষ বাড়ৈ
মাহমুদুজ্জামান বাবু
মুনির হাসান
মোশতাক আহমদ
সুনামগঞ্জ
আপেল মাহমুদ
আরব আমিরাত বা দুবাই
জহির উদ্দিন বাবর
নোয়াখালী
রিপন আনসারী
শরীফুল ইসলাম
সুব্রত আচার্য্য
উপন্যাস
কাল স্রোত
ক্রীড়া দিগন্ত
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
গাজীউল হক
জাহীদ রেজা নূর
শাহনেওয়াজ বিপ্লব
সাইদুজ্জামান
সাময়িকী
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
অনন্যা আশরাফ
অনিকা ফারজানা
আদিত্য আরাফাত
ইফতেখার আহমেদ টিপু
কামাল লোহানী
ড. সা'দত হুসাইন
তামান্না ইসলাম অলি
দক্ষিণ কোরিয়া
ফারজানা লাবনী
ফারুক যোশী
মনজুর আহমেদ
রিয়েল-টাইম নিউজ
লিবিয়া
আসজাদুল কিবরিয়া
জলবায়ু
বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
রশিদ মামুন
লক্ষ্মীপুর
সম্পাদকীয়
সাইফুদ্দীন চৌধুরী
সুমন বর্মণ
BBC
ইমরান রহমান
ইলিরা দেওয়ান
এম শাহজাহান
কাক ছোট গল্প
ছিনতাই
নওশাদ জামিল
নুরুন্নবী চৌধুরী
প্রতীক ওমর
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
বিকাশ দত্ত
মনিরুজ্জামান
মহিউদ্দিন আহমেদ
উইঘুর মুসলিম
দৈনিক ইত্তেফাক
পিটার কাস্টার্স
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রিয় চট্রগ্রাম
বাজেট
বাণিজ্য
মোবাশ্বির আলম মজুমদার
সঞ্জয় সাহা পিয়াল
হবিগঞ্জ
খুন
টাকা আনা পাই
মাহবুবুর রহমান
শুভজ্যোতি ঘোষ
হাছান কুতুবী
Hot Topic
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
আবিষ্কার
ড. কামাল
দৈনিক ইনকিলাব
ফিলিপাইন
ভুটান
সাভার
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ
নিয়ন আলোয়
শফিক রহমান
শামীমুল হক
শেয়ারবাজার
আইন আদালত
ইতালি
গ্রিনল্যান্ড
নারী নির্যাতন
পটুয়াখালী
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
মণিপুর
মাগুরা
মেক্সিকো
অনিম আরাফাত
ইসলাম
কিরণ শেখ
জাভেদ ইকবাল
দুদক
মহাকাশচারী
রাঙ্গামাটি
Art Mag
আরিফুল ইসলাম
প্রতিবাদ
প্রবাসী বাঙালি
বান্দরবান
মালদ্বীপ
শফিকুল ইসলাম
শিক্ষানীতি
সংবিধান
ডিডাব্লিউ
শরিফ রুবেল
কূটনীতি
গাইবান্ধা
ঝালকাঠি
নরসিংদী
নাইজেরিয়া
বায়ুদূষণ
শাহনাজ পারভীন
স্বাধীনতা
WikiCity
WikiPolitics
জোহরান মামদানি
বৌদ্ধ
মতিউর রহমান চৌধুরী
যৌন অপরাধ
WikiInterview
আকবর হোসেন
কিশোর আলো
জলবায়ু পরিবর্তন
দৈনিক সংগ্রাম
Exclusive Articles
WikiEconomy
WikiLaw
ইসলামী ছাত্রশিবির
ঘূর্ণিঝড়-হারিকেন
বাগেরহাট
ভূমিকম্প
রাজনৈতিক
সমিতির খবর
সানজানা চৌধুরী
সায়েদুল ইসলাম
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
আমাদের সময় ডট কম
কুতুবদিয়া স্পেশাল
খাগড়াছড়ি
চুয়াডাঙ্গা
ধর্মঘট
আইন ও আদালত
ইহুদি
কাদির কল্লোল
তাইওয়ান
দুর্গোৎসব ও পূজা
দৈনিক আমার সংবাদ
নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা 2013.
নূরে আলম সিদ্দিকী
প্রতিক্রিয়া
বিডিআর বিদ্রোহ
ব্যাংক
মুন্সীগঞ্জ
শিশুসাহিত্য
খ্রিষ্টধর্ম
গদ্যকার্টুন
প্রতিদিনের সংবাদ
ভোরের কাগজ
রুমিন ফারহানা
Hit
আর্জেন্টিনা
পিরোজপুর
বন্যা
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
সরল গরল
স্পেন
Asia
গণমাধ্যম
ডেনমার্ক
পরামর্শ
প্রকৃত্
ভাষা
ভোলা
MERIT
Soikot
WikiWoman
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
উন্নয়ন
জর্ডান
জ্বালানি
পিলখানা হত্যাকাণ্ড
ফ্যাশন
রঞ্জন বসু
সাংসদ
হরতাল
WikiCrime
উইকিলিকস
ক্রিকেট ও রাজনীতি
গণতন্ত্র
গোপালগঞ্জ
চাঁদপুর
চিত্রকর্ম
ছাত্ররাজনীতি
জঙ্গিবাদ
জন্মদিন
তেল-গ্যাস
দক্ষিণ ধুরুং
দূর পরবাস
নাকিবুল আহসান নিশাদ
নারী অধিকার
নোবেল শান্তি পুরস্কার
পঞ্চগড়
পরীক্ষা
বিজয় দিবস
মেঘালয়
রাঙামাটি
সুশাসনের জন্য নাগরিক
হামলা
আন্দালিব রাশদী
ঈদুল আজহা
এনটিভি
কক্সবাজার নিউজ ডটকম
কুতুবদিয়া নিউজ
চট্টগ্রাম বন্দর
ছাত্র রাজনীতি
ঠাকুরগাঁও
ডিজিটাল বাংলাদেশ
তথ্য অধিকার
দ্বিজেন শর্মা
নির্যাতন
নড়াইল
প্রবাসী শ্রমিক
ভারতের প্রধানমন্ত্রী
মৃত্যু
শারদীয় দুর্গোত্সব
শিশুমৃত্যু
শিশুহত্যা
সালমান রাফি শেখ
সুবীর ভৌমিক
সুশাসন
স্মৃতি
Africa
My Art
অধিকার
আন্তর্জাতিক নারী দিবস
একুশে টেলিভিশন
কলম্বিয়া
কুয়েত
চিঠিপত্র
চুক্তি
তিউনিসিয়া
দুর্যোগ
নির্বাচন ও রাজনীতি
নেত্রকোণা
পরিবহন
পর্যটন কেন্দ্র
প্রশাসন
ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা
বিশ্বকাপ ফুটবল
বেলজিয়াম
বড়ঘোপ
ভি এস নাইপল
ভৈরব
মরক্কো
মাওবাদী
মামলা
যানজট
লেমশীখালী
সংসদ
সন্ত্রাসী
সমাজ
সামাজ
সুন্দরবন
সৈয়দ দিদার বখত
সোমালিয়া
হংকং
Middle East
Principal Sanaullah
Special Day
অগ্নিসংযোগ
অমৃতবাজার পত্রিকা
অরবিন্দ কেজরিওয়াল
আইন ও অধিকার
আগুন ও মৃত্যু
আজকের কাগজ
আল মাহমুদ
আহসান কবির
এম.এ মান্নান
এল সালভাদোর
কমল জোহা খান
কিউবা
খাদ্যসমস্যা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
জঙ্গি
তথ্য অধিকার আইন
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা
পানামা
পূর্বপশ্চিম
প্রাণি ও উদ্ভিদ
বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার
বন্য প্রাণী
বেলুচিস্তান
ভিয়েতনাম
ভোরের ঈদ ১৯
ভয়েস অফ আমেরিকা
যায়যায়দিন
লালমনিরহাট
শিক্ষা অধিকার
শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা
শিশুশিক্ষা
শ্রমিক
সন্ত্রাসবাদ
সুইডেন
সুজন সুপান্থ
NEWS
Palestine
fd
অরণ্যে রোদন
অরুণাচল
অর্থনৈতিক
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক
ইকরাম সেহগাল
উত্তর ধুরুং
উমর মনজুর শাহ
একুশে ফেব্রুয়ারি
ঐতিহাসিক
কিশোরকণ্ঠ
কুড়িগ্রাম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
কোরবান
ঘূর্ণিঝড়
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
জর্দান
জাইমা রহমান
জাদুঘর
জামালপুর
জীবন
জেসমিন আখতার
জ্বালানি তেল
টেলিভিশন
তথ্যপ্র্রযুক্তি
তুষার আবদুল্লাহ
দেশপ্রেম
দৈনিক কক্সবাজার
নাগরিক সংবাদ
নারীঅধিকার
নিরাপত্তা
নির্বাচিত
নেদারল্যান্ডস
পাহাড়
পয়লা বৈশাখ
বঙ্গবন্ধু
বন্দর
বিশ্ব অর্থনীতি
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা
মহান বিজয় দিবস
মা
মাদারীপুর
মানবতা
মানববন্ধন
মিজোরাম
মিডিয়া ভাবনা
মে দিবস
শরীয়তপুর
শিক্ষা দিবস
শিক্ষা-প্রশাসন
শুভ বড়দিন
শেরপুর
সজীব ওয়াজেদ জয়
সময়চিত্র
সরেজমিন প্রতিবেদন
সাতকানিয়া পৌরসভা
সিঙ্গাপুর
সুইজ়ারল্যান্ড
সুশান্ত মজুমদার
স্মরণ সভা
স্মর্রণ
হাসান আজিজুল হক
America
Burma
Child
China
Hot Video
Huw Cordey
Latin America
Marwan Barghouti
Tom Geoghegan
Tom Heap
Washington
kolkata24x7
অ্যান্টার্কটিকা
আহমদ ছফা
আহমেদ মুনির
উখিয়া
উত্সব
উদ্যোগ
এসিড-সন্ত্রাস
ওমান
ওয়াসি আহমেদ
কর্মসূচি
কেনিয়া
ঘড়ি
চট্টগ্রাম বন্দর
চাকরি
চারদিক
চীন ও জাপান
জনসংখ্যা
জাকির তালুকদার
জাহাজ
জাহিদ হোসাইন খান
জায়গা
জায়মা জারনাজ রহমান
জীবনী
জেলহত্যা দিবস
জ্বালানী সম্পদ
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
ড. সাজিদ হক
ডিজিটাল
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন
তিব্বত
ত্রিপুরা
নগরজীবন
নরওয়ে
নিবন্ধন
নীলফামারী
পবিত্র আশুরা
পবিত্র ঈদুল ফিতর
পরিকল্পনা
পানিসম্পদ
পুলিশ
পেরু
প্যারিস
প্রান্তকথা
প্রিয়.কম
প্রেক্ষিত
বর্নাঢ্য র্যালী
বলিভিয়া
বাংলাভিশন
বাজারসুবিধা
বাস্তবসম্মত
বিচার
বিশ্ব খাদ্য দিবস
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস
বিশ্ব নদী দিবস
বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস
বিশ্ব শিক্ষক দিবস
বিশ্ববিদ্যালয়
ব্যবস্থাপনা
ব্যাংক ব্যবস্থা
ব্রিটিশ
ভাষাসৈনিক
মাহমুদ আহমাদ
মুস্তাফিজ মামুন
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
যুদ্ধ ও শান্তি
যুদ্ধাপরাধ
যুদ্ধাপরাধের বিচার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজবাড়ী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
লবন চাষ
লামিনে ইয়ামাল
শহীদের স্মৃতি
শান্তি
শিল্প ও পরিবেশ
শিশুশ্রম
সন্ত্রাস ও রাজনীতি
সহজিয়া কড়চা
সিগন্যাল
সেলিনা হোসেন
স্বাধীন
স্বাস্থ্যনীতি
স্মরণ মুক্তিযুদ্ধ
স্মৃতিঘর
হাসপাতাল
Afghanistan
Bangladesh
Brazil
CNN
California
Comments
Croatia
Delhi
Denise Winterman
Dome of the Rock
God Mag
Google
Hugh Schofield
India
Indonesia
Jane O'Brien
Japan
Jeremy Bowen
Jerusalem
Jon Kelly
Kareem Khadder
Kate Dailey
Kim Ghattas
Lead News
Libya
Mahfuz Anam
Michal Zippori
New York
Nigeria
Pakistan
Paris
Paul Colsey
Qamrul Islam
Rosie Goldsmith
Rupert Wingfield-Hayes
Sanjoy Majumder
Source
South Sudan
The Daily Star
The Telegraph
Thomas Fessy
Tours
Vietventures
Wall Street
World's Last Chance
Young
a excellent photo in Kutubdia Island
bdnews24
google search
image
অদিতি ফাল্গুনী
অমানবিকতা
অযোগ্যদে
অসারপনা
আইনকানুন
আজারবাইজান
আদিবাসী দিবস
আনোয়ারা সৈয়দ হক
আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস
আফসার আমেদ
আবদুল লতিফ মাসুম
আবু আজাদ
আশান উজ জামান
আহমদ ফাহমি
ইথিওপিয়া
ইভ টিজিং
ইমরান খান
ইমাম খাইর
ইসলাম ও জীবন
ঈদের খুশি ও আনন্দ
ঈদের বেতন
উজবেকিস্তান
উপনির্বাচ
উপনির্বাচন
উর্দুভাষী
এ পি জে আবদুল কালাম
একুশে ফেব্রুয়ারি:
ঐতিহাস
ওবামা
কক্সবাজার নিউজ
কমিল্লা
কম্বোডিয়া
কলকাতার চিঠি
কাকন রেজা
কাজাখস্তান
কাটরা
কানাই কুণ্ডূ
কালের পুরাণ
কুতুবদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
কৈয়ারবিল
ক্রসফায়ার
ক্ষত
ক্ষমাপ্রার্থনা
ক্ষুদ্রঋণ
কয়লানীতি
খায়ের মাহমুদ
খোন্দকার শওকত হোসেন
গাম্বিয়া
গোধূলি
গোড়ার
গৌড়
গ্রামীণ অর্থনীতি
গ্রেপ্তার
ঘূর্ণিঝড় সম্পাদকীয়
ঘোড়া
চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন
চরমোনাই পীর
চলতি পথে
চাঁদ
চাদ
চিনি
চিরকুট
চিলি
চেয়ারম্যান
ছাত্র-রাজনীতি
ছাড়পত্র
ছুটিদন
জজ হত্যা দিবস
জনদুর্ভোগ
জনস্বাস্থ্যের
জবাবদিহি
জম্মদিন
জলদস্যু
জাতিগত সহিংসতা
জারদারি
জি. মুনীর
জীবনযুদ্ধ
জীবিকা
জুমকন্যার
জ্বালানি রাজনীতি
জ্বালানি সম্পদ
জ্বালানিসম্পদ
জয়পুরহাট
ঝুঁকি
ঝুঁকি হ্রাস দিবস
টিপাইমুখ
টিপাইমুখ বাঁধ
টিপাইমুখে বাঁধ
টিভি চ্যানেল
টোঙ্গা
ঢাকা টাইমস
তানজির আহমেদ রাসেল
তুর্কমেনিস্তান
তেঁতুল
তেলকূপ দুর্ঘটনা
তেলিরকাটা
দক্ষিণ মগডেইল
দারিদ্র্য বিমোচন
দায়গুলো
দায়িত্ব
দুই দু’গুণে পাঁচ
দুর্গ
দূর পরবাসে
দেবনারায়ণ চক্রবর্তী
দৈনিক আজাদী
নগরদর্পণ
নদীকৃত্য দিবস
নববধূ
নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন
নারীর ক্ষমতায়ন
নাসরীন জাহান
নাসিমা আনিস
নাসির উদ্দিনের স্বাভাবিক মৃত্যু
নিকারাগুয়া
নিজাম কুতুবী
নিপীড়ন
নিরাপতা
নির্বাসনে
নিষেধাজ্ঞা’
নূরে আলম জিকু
নেতা ইমরান খান
নেতৃত্বে
নোযাখালী
পণ্যবাজার
পদক
পবিত্র হজ
পররাষ্ট্রনীতি
পরিস্থিতি
পর্তুগাল
পাঠকের মন্তব্
পাপুয়া নিউগিনি
পাপড়ি রহমান
পাসপোর্ট
পাহাড়ধস
পিলখানা হত্যা
পোল্যান্ড
পোশাক
প্রশ্নবিদ্ধ
প্রস্তাবিত
প্রাণীজী
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ
প্রয়াণ
ফাঁসি
ফিনল্যান্ড
ফেরি ও পন্টুন
বঙ্গবন্ধু হত্যা
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন
বঞ্চনা
বনসম্পদ
বরিশাল ছাত্রলীগ
বর্ণবৈষম্যবিলোপ দিবস
বাঁকখালী
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
বাংলাদেশের পতাকা
বার্লিন দেয়াল
বাল্যবিয়ে
বাস্তবা
বাস্তবায়
বিচার বিভাগ
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
বিজ্ঞানচিন্তা
বিজ্ঞাপন
বিজয়
বিদ্যুত
বিদ্যুৎ-সংকট
বিদ্যুৎকেন্দ্রে
বিপ্রদাশ বড়ুয়া
বিলবোর্ড দুর্ঘটনা
বিলেতের স্ন্যাপশট
বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস
বিশ্ব পরিবেশ দিবস
বিসিবি
বুলবন ওসমান
বুড়িগঙ্গা
বৃক্ষরোপণ
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
বৈষম্য
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
ব্রুনাই
বড়পুকুরিয়া
ভাজিরালংকর্ন
ভালোবাসা
ভাষণ
ভেজাল
ভোজ্যতেল
মংলা থেকে
মঈনুল হাসান
মঙ্গোলিয়া
মঞ্জু সরকার
মনযূরুল হক
মনি হায়দার
মন্ত্রিসভা
মাওবাদী সহিংসতা
মাতৃভাষা ও পরভাষা
মানচিত্র নিউজ
মানব
মানসিক স্বাস্থ্য দিব্স
মানসিকতা
মালি
মাল্টা
মাহবুব রেজা
মাহামুদা খাতুন
মিথিলেশ ভট্টাচার্য
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
মুরগি জমা
মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন
মূল্যস্ফীতি
মৃত্যু ও কিছু ভাবনা
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন
ম্যাডোনা
ম্যান্ডেলা দিবস
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল
যুদ্ধাপরাধ-বিচার
রক্ত
রদ্ধাঞ্জলি
রবাণিজ্যে
রাগবি
রাজনৈতিক সংস্কৃতি
রাজপথ
রাষ্ট্রীয়
রাস্তার
রিয়াল মাদ্রিদ
রুবেল হোসেনের
রেলওয়ের
রোমাঞ্চিত
রোমানিয়া
র্বিজ্ঞান
শক্তিশালী
শঙ্কা
শরীরের
শশী থারুর
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
শাকিরা
শাহ্নাজ মুন্নী
শায়খ আহমাদুল্লাহ
শিক্ষক খুন
শিক্ষক-রাজনীতি
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস
শিক্ষাচিত্রে
শিক্ষাবিদের
শিবের গীত
শুঁটকি উৎপাদন
শেরাটনীয়
শোনা
শ্রদ্ধাঞ্জল
শ্রমবাজার
শ্রমশক্তি
ষড়যন্ত্র
সংকট
সংঘাত
সংশোধন
সঙ্গী
সততা
সন্দেশ
সমন্বয়সাধন
সমাজ ও নারী
সমুদ্রস্নান
সময়
সময় নিউজ টিভি
সময়ের প্রতিবিম্ব
সরকার
সাংবাদ
সাইক্লোন শেল্টার
সাইপ্রাস
সাজিদ গ্রেফতার
সাদাসিধে কথা
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
সামন্ততন্ত্র
সামরিক শাসন
সামাজি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
সাহসী
সিডনি
সিয়াম
সুপ্রভাত
সূর্যে
সেচসুবিধা
সোনার বাংলা
স্কাইপি
স্বকৃত নোমান
স্বচ্ছতা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
স্বাধীনত
স্বাধীনতাযুদ্ধ
স্বামী
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
স্বীকৃতি
স্মৃত-নিদর্শন
স্মৃতিসৌধ
স্মৃতিসৌধে
স্লোভাকিয়া
হত্যা ও হরতাল
হাইতি
হামিদ মীর
হুগজিল্ট
No comments:
Post a Comment