Saturday, November 13, 2010
গল্প- 'সড়ক নভেল' by হাসনাত আবদুল হাই
গল্প- 'সড়ক নভেল' by হাসনাত আবদুল হাই
আধখানা ঘোমটা মাথায় দিয়ে রাস্তার দুদিকে তাকিয়ে থাকা মেয়েমানুষটা অনেকক্ষণ থেকে আর অ্যান্ড এইচের মহাসড়কের পাশে কড়ই গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে আছে। কতক্ষণ, তা সে বলতে পারবে না, যারা যেতে যেতে তাকে দেখেছে তারাও না। তবে অনেকক্ষণ যে সে
দাঁড়িয়ে আছে, তা তার একটা অস্থিরতা আর চোখ-মুখের ক্লান্তির ভাব দেখলেই বোঝা যায়। অপেক্ষা করার সময় বেড়ে গেলে চোখে-মুখে তার দাগ কাটে, তখন দেখলেই চোখে পড়ে। এখন প্রায় দুপুর হয়ে এসেছে। রাগে গড়গড় করা সূর্য একটু পর মাথার ওপরে এসে চোখ রাঙাবে। ভাদ্রমাসের রোদে এখন বেশ তাপ, ঝলসে না দিলেও ঘাম ঝরায় একটু পরপর। কড়ই গাছটার নিচে ছেঁড়াখোঁড়া ছায়া আছে, কিন্তু চারদিক থেকে আসা বাতাসের তাপ সেই ছায়াকে ধমকে তাড়িয়ে দিয়েছে।
মেয়েমানুষটা এখন ঘামছে। ঘোমটা ঢাকা মাথার ওপর থেকে কপাল আর মুখ বেয়ে ঘাম ঝরছে ছোট ছোট লম্বা দাগের মতো। সেই দাগ এঁকেবেঁকে পেঁৗছে যাচ্ছে মুখের নিচে গলায়, তারপর বুক বেয়ে শরীরের ওপর। মেয়েমানুষটার এক হাতে একটা পুরনো পুঁটলি, ভেতরে শক্ত কিছু নেই, কয়েকটা কাপড়-চোপড় দলা পাকানো। পুরনো শাড়ি, গায়ের জামা, হয়তো এসব। তার গলা, কান হাত সব খালি। নাকে ফুটো আছে কিন্তু কোন নাকফুল নেই। যে শাড়িটা পরেছে সেটা নীল রঙের ছিল, পুরনো হওয়ার জন্য রংচটা দেখাচ্ছে। জায়গায় জায়গায় মসলা আর কালিঝুলির দাগ। সে মাথায় ঘোমটা দিয়ে আছে, ঘোমটার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে শুকনো খড়খড়ে হয়ে যাওয়া কয়েক গাছি চুল। বাতাস এলে কখনো সেই চুল তার চোখের ওপর এসে পড়ছে। সে ভালো করে দেখার জন্য হাত দিয়ে সরিয়ে রাস্তার দুদিকে তাকিয়ে থাকছে একদৃষ্টিতে। তাকে বেশ ক্লান্ত আর অস্থির দেখাচ্ছে, যেন দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না আর । ভারী কিছু বহন করলে যেমন হয়। মেয়েটি মাঝে মাঝে এক হাত দিয়ে তার পেট আগলে রাখছে, স্পর্শ করছে আর নিচে তাকিয়ে দেখছে একটু পরপর।
সড়কে এসে পেঁৗছাবার পর থেকে মেয়েমানুষটা বাস, গাড়ি, মাইক্রো দেখলেই হাত তুলছে থামাবার জন্য। কিন্তু কেউ থামছে না। বাসগুলো যাত্রীতে ভর্তি হয়ে দূরপালস্নায় যাচ্ছে। রাস্তায় থেমে নতুন যাত্রী নেয়ার নিয়ম নেই। ড্রাইভারগুলো মেয়েমানুষটার তোলা হাত দেখতে পেলেও থামছে না। যেমন দ্রুতবেগে আসছে, সেভাবেই চলে যাচ্ছে। ধাবমান বাসের ভেতর থেকে কোনো যাত্রীর চোখে পড়লেও পড়তে পারে দৃশ্যটা। নিম্নবিত্ত শ্রেণির একটা মেয়েমানুষ কড়ই গাছের নিচে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। একহাতে ময়লা কাপড়ের পুঁটলি, অন্য হাতে অনেকক্ষণ বাস, গাড়ি থামাবার জন্য তোলার পর মাঝে মাঝে নিচে নামিয়ে পেটের ওপর বুলিয়ে নিচ্ছে। তার গাড়ি থামতে বলার ভঙ্গিতে কিছুটা জড়তা আর সঙ্কোচ মেশানো। যেন খুব আস্থা নেই নিজের ওপর অথবা সঙ্কোচ বোধ করছে। এক নিমিষে দেখা সেই দৃশ্য বেশিক্ষণ মনে থাকে না অধিকাংশ যাত্রীর, যারা বাসের ভেতর থেকে তাকে দেখে। বাস কিংবা মাইক্রোর ড্রাইভাররা এমন এক দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে যে তাকে একনজরে দেখা ছাড়া তাদের উপায় থাকে না। নিমিষের দেখায় তারা পথের পাশে মানুষ আর গরু ছাগলের মধ্যে তফাৎ করতে পারে না। তাদের তখন চিন্তা থাকে রাস্তায় যেন কেউ হঠাৎ করে দৌড়ে না আসে। তবে যাত্রীদের কারো কাছে হয়তো দৃশ্যটা কৌতূহলের বিষয় হয়। একটা মেয়েমানুষ দিনে-দুপুরে রাস্তার পাশে একা দাঁড়িয়ে আছে আর খুব ভীরুভাবে হাত তুলছে মাঝে মাঝে, এর মধ্যে তারা একটা কাহিনী দেখতে পায়। কারো কারো কাছে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েমানুষটাকে দু'পাশের গাছগুলোর মতো স্বাভাবিক মনে হয় না। সে যদি কারো সঙ্গে থাকত কিংবা সামনে অথবা পেছনে হেঁটে যেত, তাহলে তার একটা মানে খুঁজে পাওয়া যেত। যারা তার বিষয়ে অতিরিক্ত কৌতুহলি হয়, সে সব যাত্রী মেয়েমানুষটার আপাদমস্তক দেখে কপালে ভাঁজ ফেলে কিছু চিন্তা করে। সেই চিন্তা বেশিক্ষণ থাকে না, কেন না তারা গাছের নিচে দাঁড়ানো মেয়েটাকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যায়। তাদের চোখে পড়ে নতুন নতুন দৃশ্য। পেছনের দৃশ্য হারিয়ে যায়, তা সে যত বিশিষ্ট অথবা অদ্ভুতই হোক না কেন।
মেয়েমানুষটার চেহারা দেখে মনে হয় তার বয়স ত্রিশের নিচেই হবে। শ্যামলা রং, মাঝারি দৈর্ঘ্যের, মোটামুটি সুশ্রী। গায়ের শ্যামল রং এখন পাঠ কাঠীর ফ্যাকাশে হয়ে এসেছে, যার জন্য চেহারা দেখাচ্ছে মলিন। কিন্তু মেয়েটির চোখ দুটিতে মায়াজড়ানো। সেখানে ভয়, শংকা, অনিশ্চয়তা ভিড় করে আছে আর সেইসঙ্গে আছে একটা বোবা স্নেহের ভাব। তার নাক লম্বা হয়ে অনেক দূর নেমে এসেছে ঠোঁটের ওপরে যেখানে দেখা যাচ্ছে অল্প ফাঁক করা দু'টো ফুটো। ঠোঁট দুটো পাতলা, বাঁশপাতার মতো। যখন সে হাঁ করছে না বাতাস নেয়ার জন্য তখন মুখের সঙ্গে মিশে যায় সেই ঠোঁট। মেয়েটা কথা বলছে না, তাই তার মুখ একটা অখন্ড নকশার মতো দেখাচ্ছে, যেন মাটির তৈরি মূর্তি। তার শক্ত মুখের চোয়ালও এই ভাবটা ফুটিয়ে তোলে। মেয়েমানুষটা লজ্জা পাচ্ছে, সঙ্কোচ করছে, কিন্তু সে ভীরু নয়। তার যে সাহস আছে তা রাস্তার পাশে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিতেই বোঝা যায়। রাস্তায় গ্রামের মানুষ যারা হেঁটে যাচ্ছে তাদের কেউ কেউ চোখ তুলে তাকে দেখে। তাদের দৃষ্টিতে অবাক হওয়ার ছাপ থাকে এবং সেইসঙ্গে কৌতূহলও। কিন্তু তারা তার জন্য দাঁড়ায় না, যার যার পথে চলে যায় কোনো কথা না বলে। মেয়েটিও তাদের দিকে তাকায় না। গ্রামের কোনো লোক খুব কাছে দিয়ে হেঁটে গেলে সে উলটোদিকে মুখ করে দাঁড়ায়, যেন তাদেরকে এড়িয়ে যাচ্ছে। কৌতূহলি কারো কারো মনে প্রশ্ন জাগে, কে এই মেয়ে মানুষ? কোথা থেকে এলো? কোথায় যাবে? কিন্তু এসব প্রশ্ন করা হয় না। তারা থামে না, কেননা মেয়েমানুষটা তাদের থামতে বলে না। বরং যেন চলে যেতেই বলে। তারা চলে গেলে তার চোখ আবার সরে আসে সড়কের ওপর যেতে থাকা গাড়ি, বাস আর ট্রাকের দিকে।
অনেকক্ষণ হাত তুলে নাড়তে নাড়তে ক্লান্ত হয়ে গেলে মেয়েমানুষটা গাছের গুড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। তার হয়তো একটু বসার ইচ্ছে করছে, কিন্তু সে বসতে পারছে না। নিরুপায় হয়েই সে ধুলোমাটির মধ্যে পা দুটো শক্ত করে রেখে দাঁড়িয়ে থাকে। গাছে হেলান দেয়ার পরও সে হঠাৎ সোজা হয়ে হাত নাড়তে থাকে, যখনই সামনে দিয়ে যানাবহন যায়। প্রাইভেট গাড়িগুলো দেখে সে খুব একটা সাহস পায় না হাত তুলতে। ভেতর থেকে কেউ যেন তাকে নিষেধ করে। বাস আর মাইক্রো দেখেই তার হাত উঠে আসে। বেশ কিছুক্ষণ এমনভাবে হাত উঠাবার পর কোনো যানবাহনই থামতে না দেখে সে ট্রাক দেখেও এখন হাত উঠাতে শুরু করেছে। কিন্তু ট্রাকও তার হাত তোলা দেখে থামে না। গর্জন করতে করতে মালভর্তি ট্রাকগুলো জন্তুর মতো সামনে ছুটে যায়। বাস যাওয়ার সময় যেমন হয় একইভাবে ট্রাক চলে গেলে রাস্তাটা কেঁপে কেঁপে ওঠে, চারিদিকে ধূলো ওড়ে ছোটখাট ঝড়ের মতো। ট্রাক, বাস দূরে চলে গেলেও তাদের শব্দ শোনা যায় গোঙানির মতো। যেন একটা জন্তু, খুব রেগে গিয়েছে অথবা জখম হয়েছে। সেই শব্দ শুনে মেয়েটার নিজের গোঙানির কথা মনে পড়ে। সেটা এক দুঃস্বপ্নের মতো, তাই সে বেশিক্ষণ মনে করতে চায় না। তার এখন একমাত্র চিন্তা আর আগ্রহ একটা বাস কি ট্রাকে উঠে বসে সামনে যাওয়া। কিন্তু অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও তা হচ্ছে না। তাই দুঃস্বপ্নটা মাঝে মাঝেই মনের ভেতর এসে হানা দিচ্ছে, জানিয়ে দিচ্ছে তার অসহায় অবস্থার কথা। একটা বাস, মাইক্রো কিংবা ট্রাকে উঠে বসতে পারলে এই যন্ত্রণা থেকে রক্ষা পাওয়া যেত। তার মনে হচ্ছে শরীরের কষ্টের চেয়ে তার মনের যন্ত্রণাটাই তাকে বেশি বেসামাল করে দিচ্ছে। তবে তার আশা করার মতন খুব বেশিকিছু নেই। সামনের গন্তব্যেও রয়েছে অনিশ্চয়তা। বাস কি ট্রাক তাকে সেখানে নিয়ে গেলেও তার সমস্যার যে সমাধান হবে, সে সম্বন্ধে সে নিশ্চিন্ত হতে পারেনি। কিন্তু সেই ভাবনা তাকে এই মুহূর্তে কাতর করছে না। সে জোর করে একটা আশা পোষণ করছে যে, এই রাস্তা থেকে চলে যেতে পারলে সামনে একটা আশ্রয় পাওয়া যাবে। খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে কিংবা ঘুমুতে হবে না। গঞ্জনা, লাঞ্ছনা, তিরস্কার, ধমক এবং শাসানি হিংস হয়ে তার পিছু ধাওয়া করবে না। সামনে একটা আশ্রয় পাওয়া যাবে, এই বিশ্বাস তার মনে ডালপালা মেলে না দিলেও একটা শিকড় গেড়েছে। এই আশাটাই এখন তার একমাত্র সম্বল।
একটা ট্রাক চলে যাচ্ছিল শব্দ করে, যেন মাল টেনে নিয়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে খুব। তার হাত তোলা দেখেও ট্রোকটা সামনে ছুটে গেল। তারপর তার অবাক চোখের সামনে ট্রাকটা কিছুদূর যেয়ে থেমে গেল প্রচন্ড শব্দ করে। দেখা গেল, ভেতর থেকে বাইরে মাথা বাড়িয়ে একটা লোক তার দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ দেখার পর লোকটা ব্যস্ত হয়ে হাত তুলে তাকে ডাকল। ট্রাকের কাছ যেতে বলছে। দেখেই মেয়েমানুষটার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে তার ক্লান্ত এবং ভারি শরীরটা টেনে যতটুকু সম্ভব দ্রুত পায়ে সামনে হেঁটে গেল, প্রায় দৌড়াবার ভঙ্গিতে। ট্রাকটা তখন রাস্তার একপাশে এনে থামিয়েছে ড্রাইভার। ট্রাকের পেছনে বড় বড় কাঠের বাক্স। হলুদ কাঠের গায়ে কালো কালো দাগে কী সব লেখা। মেয়েমানুষটা কাছে যেতেই ড্রাইভার বলল, হাত তুললা যে? সামনে যাইতে চাও? মেয়ে মানুষটা মাথা নেড়ে সায় দিলো। তার দুই চোখে আকুলতা।
ড্রাইভার ব্যস্ত হয়ে বলল, কই যাইবা? মেয়েমানুষটা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, শার্শা। যশোর।
ড্রাইভার বলল, শার্সা নিতে পারুম না। আমরা যশোর যাইতাছি। হেইখান পর্যন্ত যাইতে পার। যাইবা? মেয়েমানুষটা কৃতজ্ঞতায় চোখ ভিজিয়ে বলল, বেশ। যশোরই নিয়া চলেন। হেইখান থেইকা শার্সায় যাওনের পথ দেখুম খন।
ড্রাইভার অন্যপাশের দরজা দেখিয়ে দিয়ে বলে, তাড়াতাড়ি ওঠো। তারপর তার পাশে বসে-থাকা কাউকে উদ্দেশ্য করে বলে, এই জব্বর। সইরা বস। মায়াডারে বসতে দে।
পাশে বসে-থাকা হেলপার জব্বর এতক্ষণ ঝিমুচ্ছিল। পাঁজরে গুঁতো খেয়ে সে প্রায় লাফিয়ে উঠে বসল। তারপর হকচকিয়ে বলল, কী কইলা ওস্তাদ? মাইয়া মানুষ? অহনি? আইয়া পড়লাম নাকি ঘাটে?
ড্রাইভার মজিদ খিস্তি দিয়ে বলল, হালা খালি মাইয়া মানুষের কথা চিন্তা করে। নে, এইদিকে সইরা আয়। মাইয়া মানুষটারে তোর পাশে বসতে দে।
ততক্ষণে মেয়েমানুষটা জব্বরের পাশে দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। জব্বর তাকে একনজর দেখে বলে, আরে বাপ! কী কাম করতাছ ওস্তাদ? দেখছনি মাইয়াডারে ভালা কইরা? এমুন মাইয়া রাস্তা থেইকা তুইলা নেবা? মজিদ ড্রাইভার তার কথার উত্তর দেয় না। অস্ফুটস্বরে কিছু বলে খিস্তি করার মতো।
মেয়েটা অনেক কষ্টে গাড়ির ওপরে উঠে সামনের সিটের বাঁ-দিকে বসে। মজিদ ড্রাইভার জব্বরকে ধমক দিয়ে বলে, এই হালা, হাত দিয়া টাইনা তোল ওপরে। দেখস না মাইয়াডা উঠতে পারতেছে না। টাইনা তোল তাড়াতাড়ি।
হেলপার জব্বর ধমক খেয়ে মেয়ে মানুষটাকে দুই হাতে টেনে ওপরে এনে তার পাশে বসায়। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, ওরে বাপ। কী ভারি। মাল লোড করা মনে হয়। তারপর একটু থেমে মজিদের দিকে তাকিয়ে বলে, ওস্তাদ কামডা কি ঠিক করলা?
মজিদ ড্রাইভার তখন ট্রাক আবার রাস্তার ওপরে এনে সামনে যাওয়ার জন্য পায়ে চাপ দিয়েছে। সামনের দিকে তাকিয়ে সে বলল, ক্যান, কামডা বেঠিক মনে করলি ক্যান?
জব্বর অবাক হয়ে বলে, ভালা কইরা দেখছ মাইয়াডারে?
মজিদ ড্রাইভার গম্ভীর হয়ে বলে, দেখছি। খুব ভালা কইরাই দেখছি। তোর মতন গাড়িতে বইসা ঘুমাই নাকি আমি?
জব্বর মাথা নেড়ে অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে বলে, কোথাকার না কোথাকার, কার না কার, এমন একটা মাইয়া মানুষ, বলা নাই কওয়া নাই গাড়িতে উঠাইয়া নিলা?
মজিদ গাড়ির গতি বাড়িয়ে বলে, তয়? হইছেডা কি? কী কইতে চাস তুই?
জব্বর বলে, ঝামেলা হইব না। এমুন একটা মাইয়া মানুষঃ সে কথা শেষ করে না।
ড্রাইভার মজিদ বিরক্তির সঙ্গে বলে, বারে বারে এমুন একটা, এমুন একটা করিস না। এমুন কী দেখলি? মাইয়া মানুষডার মাথায় শিং আছে? চোখ আছে চারটা?
জব্বর ইতস্তত করে ভয়ে ভয়ে বলে, হ্যার প্যাট দেখছ? প্যাট?
মজিদ বলে, দেখুম না ক্যান? হ। প্যাটে কী হইছে?
জব্বর প্রায় অাঁতকে উঠে বলে, হ্যার প্যাটে বাচ্চা। দেখছ তুমি?
মজিদ খুব স্বাভাবিক স্বরে বলে, দেখছি। তয়। হইছে কী? মাইয়া মানুষের প্যাটে এর আগে বাচ্চা দেখস নাই?
জব্বর বলে, চেনা নাই শোনা রাস্তা থেইকা একটা পোয়াতি মাইয়া তুইলা নিলে আমরা বিপদে পড়-ম না? কোথাকার না কোথাকার মাইয়া মানুষ। কিছুই জানি না তার সম্বন্ধে। চোর, ডাকাত, এমনকি খুনিও হইতে পারে। অহন পলাইতাছে। তারে নিয়া যাওন কি ঠিক হইতাছে? থানা-পুলিশ, এইসব ঝামেলার কথা ভাইবা দেখছ?
মজিদ ধমক দিয়ে বলে, চুপ কর বেটা। তোর মাথায় খালি খারাপ চিন্তা। একটা মানুষ বিপদে পড়লে দেইখাই চেনা যায়। বিপদে পড়লে তারে সাহায্য করা লাগে না? ট্রাক-ডাইভার হইছি বইলা কি মানুষ না? কী কস!
জব্বর বলে, তারে সাহায্য করতে গিয়া আমরা নিজেরা না বিপদে পড়ি। অহনো ভাইবা দেখ। রাস্তার পাশে গাড়ি থামাইয়া মাইয়াডারে নামাইয়া দেও।
মজিদ গম্ভীর হয়ে বলে, হ। ঠিকই কইছিস। গাড়িডা রাস্তার পাশে থামাইয়া নামাইয়া দেই। তবে মাইয়া মানুষটারে না। তোরে। তুই খুব ডরাইয়া যাস। উলটাসিধা কথা কস। মেজাজটা খাট্টা কইরা দিলি। দিমু নামাইয়া?
জব্বর কাঁধ ঝাঁকুনি দিয়া বলে, এতদিন তোমার লগে আছি। অহন আর আলগা হই কেমনে? লও যাই। যা হইবার একলগে দুইজনেরই হইবো। তারপর একটু থেমে বলে, একটা কিছু হইবো মনে কাইতাছে।
মজিদ বলে, প্যাচাল পাড়িস না। ঘুমা আগের মতন। দেখিস, মাইয়া মানুষটার ওপরে হেইলা পরিস না আবার।
ট্রাক নিয়ে তারা যখন মানিকগঞ্জ শহরে পেঁৗছায় সে-সময়ে দুপুরের সূর্য ওপর থেকে পশ্চিমে হেলেছে। ভাদ্রের গরমে চিড়বিড় করছে শরীর। ঘামের ভেজা গন্ধ এসে লাগছে নাকে। যে-ধুলোবালি এতক্ষণ তাদের পেছনে উড়ছিল সেসব এখন সন্ত্রাসীর মতো চারিদিকে ঘিরে দাঁড়াল। কিছুক্ষণের জন্য অস্পস্ট দেখাল চারপাশ। শহরের কাছে গাড়ি, ট্রাক, বাস, রিকশার জটলা, লোকজনের ভিড়। যানবাহন আর মানুষের মেশানো কোলাহল শোনা যাচ্ছে চাকের মৌমাছির মতো।
মজিদ ট্রাকের গতি কমিয়ে আস্তে আস্তে যেতে থাকে। সামনে ট্রাফিক পুলিশ ট্রাক থামাবার জন্য হাত তোলে। মজিদ তার সামনে এসে ট্রাক থামাবার পর সে ভেতরে একটা হাত বাড়িয়ে দেয়। তারপর ভেতরটা দেখে বলে, কী মিয়া, জিনিসপত্রের লগে দেখি আদম পাচারও শুরু করছ? তারপর ভালো করে দেখে বলে, তাও আবার মাইয়া মানুষ। মজিদ ইতস্তত করে তারপর বলে, পরিবার। ট্রাফিক পুলিশ মেয়েটিকে ভালো করে দেখে নিয়ে বলে, হুঁ। পেটে বাচ্চা দেখা যাইতাছে। বাপ হইতে যাইতাছ। বেশ বেশ। দাও দেখি, বেশি কইরা দাও ট্যাক্স আইজ। মাল বেশি নিতাছ লগে। হে-হে-হে।
মজিদের মুখে পরিবার কথাটা শুনে কুলসুমের মুখ রক্তিম হয়ে যায়, শ্যামল রঙে একটা উজ্জ্বল আভা আসে। সে ঠোঁট কামড়ে নিচের দিকে তাকায়। জব্বর অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে মজিদের দিকে। তার মুখের হাঁ বন্ধ হয় না। মজিদ ট্রাক চালিয়ে শহরের শেষ মাথায় দোকানপাট, রেস্টুরেন্টের পাশে নিয়ে থামায়। মুখের ঘাম জামার নিচের অংশ তুলে মুছতে মুছতে বলে, কী রে শালা। অখনো হাঁ কইরা রইছিস ক্যান?
জব্বর বলে, তুমি যা কইলা ট্রাফিক পুলিশরে হেইডা হুইনা, পরিবার- এইডা হুইনা। বলে সে একবার কুলসুমের দিকে আর একবার মজিদের দিকে তাকায়।
মজিদ বলে, ট্রাফিকের কাছে অমন মিছা কথা কওয়া কী নতুন নাকি। না কইলে হে ঝামেলা শুরু করত না? হুনলি না কী কইল? মানুষ পাচার। হেই সন্দেহ দূর না করলে ব্যাপারটা আরো দূরে গড়াইত। হেই বেডাই গড়াইয়া নিত আমাদের টাইট দেওয়নের লাইগা। তারপর সিট থেকে নিচে নামতে নামতে বলল, ভুক লাগছে, চল গিয়া কিছু খাই। এরপর মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, কী নাম তোমার? তুমিও নামো। তোমারও ক্ষুধা লাগনের কথা। মেয়েটি মাথা নিচু রেখেই বলে, কুলসুম। আমার ক্ষুধা নাই। তারপর বলে, আপনাগো লগে যাই। এইখানে একা বইসা থাকলে ক্যাডা আইয়া কী কয় কে জানে। কুলসুম নামের মেয়েটা হঠাৎ চিন্তা করার মতো একটা কথা বলে। খুব বোকা নয় সে, বোঝা গেল।
কুলসুমের কথা শুনে মজিদ ভাবে কিছুক্ষণ। সে ঠিক বলছে। তাকে একা ট্রাকে রেখে যাওয়া যায় না। অনেক মানুষের ভিড় এখানে। কে কখন কোন মতলবে এসে হাজির হয় তার ঠিক নেই। আসুক কুলসুম তাদের সঙ্গে। তাকে নিয়েই একসঙ্গে খাবারের দোকানে ঢুকবে তারা। কারো মনে করার মতো কিছু নেই। একটা পোয়াতি মেয়ে সঙ্গে নিয়ে ভেতরে ঢুকলে সন্দেহ করবে না কেউ। ভাববে, তার স্ত্রী অথবা নিকটাত্মীয়। পেটে বাচ্চা থাকার এই একটা সুবিধা। ভাগিয়ে নিচ্ছে এমন কথা মনে উঠবে না কারো। বাচ্চাসুদ্ধ মেয়ে কোন্ বোকা ভাগাতে চায়? অবশ্য সংসারে আজব লোকের অভাব নেই। কার মাথায় কখন কী চিন্তা ঢোকে তার ঠিক কি!
রেস্টুরেন্টের ভেতরে বেশ ভিড়। বেশিরভাগই বাসের যাত্রী আর ড্রাইভার। শহরের শেষ মাথায় হওয়ার জন্য এটা অনেকের পছন্দের। মালিক আইনুদ্দিনের সঙ্গে পরিচয় আছে মজিদের, যার জন্য বেশ একটা খাতির পাওয়া যায়। লোকটা ভালো, শুধু টাকা হাতিয়ে নেয়ার দিকে নজর নেই। কাস্টমারদের খেদমত করাটাও তার কাছে বেশ বড় মনে হয়। মজিদকে দেখে আইনুদ্দিন বলল, কী মিয়া শাদি করছ কও নাই তো? বাপও হইতে যাইতেছ দেখি। কিছুই তো কও নাই আগে? বেশ গোপন রাখছ ব্যাপারটা। অহনে মিঠাই খাওয়াও। এমনিতে চলবো না।
তার কথা শুনে কুলসুম মাথার ঘোমটা লম্বা করে। তার মুখ শ্যামল রঙের চামড়ার নিচে আবার রক্তিম হয়ে আসে। সে এবার মাথা নিচু করে ফিক করে হেসেও ফেলে আইনুদ্দিনের কথা শুনে। মজিদ সেটা লক্ষ করে চাপাস্বরে একটু ধমক দিয়েই বলে, এই হাইসো না। চুপচাপ থাহ। তারপর একটা খালি বেঞ্চের দিকে যেতে যেতে আইনুদ্দিনের উদ্দেশে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, কী আর করা। প্রথম বউটা বাচ্চা দিতে গিয়ে মারা গেল। তারপর ভাবছিলাম আর শাদি করুম না। বেশ শোক পাইছিলাম। কিন্তু মায়ে খালি কয়, বিয়া কর। বিয়া কর। নাতির মুখ দেখতাম চাই। তাই চাপে পইড়াই আরেকটা বিয়া। বলতে বলতে সে বেঞ্চে বসে তার পাশে কুলসুমকে বসায়। কুলসুম তখন মাথার ঘোমটা আরো বড় করে দিয়ে মুখ লুকোতে চাচ্ছে। জব্বরের মুখে ভ্রুকুটি দেখা ব্যস্ত। আইনুদ্দিন বলে, কই নিছিলা বিবিরে?
মজিদ বলে, একটা অসুখ হইছে। মফস্বল শহরের ডাক্তারে কইলো ঢাকায় নিয়া দেখাইতে। তাই গেলাম। বড় ভিড়। ডাক্তারের দেখা পাওন মুশকিল।
আইনুদ্দিন মাছি তাড়াতে তাড়াতে বলে, ভিড় কি একখানে? যেদিকে তাকাও খালি মানুষ আর মানুষ। এইটুকু দেশ, এত মানুষের জায়গা হইবো কেমনে আলস্নাহ জানে।
জব্বর বলে, তার মধ্যে বাচ্চা হওন চলতাছে লাগাতার। শুনে মজিদ তার দিকে রুষ্ট হয়ে তাকায়। জব্বর মুখ নিচু করে।
একটা ছেলে ভাত দেয়ার জন্য পেস্নট দিয়েছে তাদের সামনে। কুলসুম পেস্নট দু'টো দেখে বলল, দাঁড়ান। দাঁড়ান। ময়লা দেখা যায়। ভালো করে ধোয় নাই। ধুইয়া দিতে কন। শুনে মজিদ অবাক হয়ে কুলসুমকে দেখে। তারপর জব্বরের দিকে তাকায়। দু'জনই কুলসুমকে দেখে, যেন নতুন করে দেখছে। কুলসুমই ছেলেটাকে ডেকে ধোয়া পেস্নট দিতে বলে। ভাত আসে, ধোঁয়া উঠছে গরম ভাত থেকে। পেস্নটে ভাত নেয় দু'জন। তরকারির বাটি সামনে আসতেই কুলসুম বাটি তুলে নাক দিয়ে শোঁকে। তারপর বলে, বাসি। গন্ধ হইয়া গেছে। বদলাইতে কন। পেটের অসুখ হইবো খাইলে। শুনে আবারও অবাক হয় মজিদ। জব্বরও তাকায় অদ্ভুত দৃষ্টিতে কুলসুমের দিকে। তরকারির নতুন বাটি দিয়ে যাওয়ার পর আইনুদ্দিন বলে, মজিদ মিয়া দারুণ বউ পাইছ। সবদিকেই নজর। ফাঁকি দেয়ার উপায় নাই। তা ভাই, যখন দোকানে আইয়া খাইবা, তারে সঙ্গে আইনো না। আমার লস হইবো। তার কথা শুনে আশেপাশে বসা আর খেতে থাকা লোক সবাই হাসে। কুলসুম ঘোমটা বাড়িয়ে দিয়ে নিচের দিকে তাকায়। মজিদ বলে, তুমি অল্পকিছু খাইয়া নাও। এতদূরের পথ না খাইয়া যাইবা ক্যামনে? এই অল্প সময়ের মধ্যে কুলসুম নামের মেয়েটাকে বেশ কাছের মানুষ বলে মনে হয় তার।
কুলসুম খেতে চায় না। কয়েকবার বলার পর সে একটা রুটি আর ভাজি নেয় ছোট একটা পেস্নটে। বলে, এতেই তার ক্ষিধে মিটবে। মজিদ বলে, শরম কইরো না। টাকার কথা ভাইবো না। একজনের খাওনে আর কত টাকাই বা খরচ হয়? খাও ইচ্ছেমতো। পোলাও-কোরমা তো না।
খাওয়া শেষে পানির বোতল নিয়ে আসে কাজের ছেলেটা। সেটা দেখে কুলসুম ফেরত দিলো। বললো, ভেতরে শ্যাওলা দ্যাখা যায়। আরেকটা আনো।
মজিদ গম্ভীর হয়ে স্বর নামিয়ে বলে, এত ভালা মাইয়া মানুষ তুমি। এত দরদ, আদর যত্ন কর। তোমারে স্বামী বাড়ি থেকে তাড়াইয়া দিলো ক্যান? অমানুষ নাহি হে?
কুলসুম বলে, হে তাড়াইয়া দেয় নাই।
তা হইলে? ক্যাডা তাড়াইলো? তুমি স্বামীর সংসার ছাড়লা কার কথায়? মজিদ তাকায় তার দিকে একটুক্ষণ।
কুলসুম মুখ নিচু করে থাকে। কিছুক্ষণ কথা বলে না। পেস্নটের রুটি ছিঁড়ে কুটিকুটি করে। তারপর বলে, সালিশে বিচার হইছে আমার চরিত্র খারাপ। গ্রাম থেইকা বাইর কইরা দিছে। শুনে তাজ্জব হয়ে যায় মজিদ। জব্বরের মুখে অল্প হাসি। ভাবখানা, বলেছিলাম না। মেয়েটার চরিত্র ভালা না। তাই খেদায়া দিছে।
মজিদ বলে, তোমার স্বামী কিছু কইতে পারল না?
কুলসুম চুপ করে থাকে। তারপর বলে, তিনিই নালিশ কইরা বিচার চাইছেন। কইছেন আমার পেটের পোলা তার না।
শুনে মজিদের খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। সে একদৃষ্টিতে কুলসুমকে দেখে বলে, তোমার কপাল খারাপ। তাই এমুন স্বামী পাইছিলা। একটা পাষণ্ড। এমন সন্দেহ করল ক্যামনে? তোমারে দেইখা চরিত্রহীন মনে হয় না।
জব্বর ফিসফিস করে বলে, আস্তে কথা কও ওস্তাদ। আইনুদ্দিন হুনবো। বউ বইলা যে-গল্প হুনাইছো হেইডা মনে থাহে যেন। এহনে লও তাড়াতাড়ি যাই। অনেক দূরের পথ। তারপর আবার কুলসুমরে নামাইতে হইবো যশোর। আলস্নাইজানে কী হইবো আইজ।
মজিদ ধমক দিয়ে বলে, চুপ কর ব্যাটা। মুখে খালি খই ফোটে।
পাটুরিয়া ঘাটের কাছে এসে দেখা গেল বাস-ট্রাক আর গাড়ির লম্বা লাইন। কোনো কিছুই নড়ছে না। শোনা গেল, দু'টো ফেরি খারাপ। অনেকক্ষণ থেকে নদী পারাপার করছে না যানবাহন। ফেরির ইঞ্জিন মেরামত হওয়ার পর পারাপার শুরু হবে। সেটা কখন হবে কেউ বলতে পারছে না। এদিকে ঢাকা থেকে আসা বাস, ট্রাক আর গাড়ির বিরাট জ্যাম লেগে গিয়েছে। লাইনের মধ্যে ট্রাক রেখে মজিদ ইঞ্জিন বন্ধ করে সামনের দিকে তাকাল। তারপর জব্বরকে বলল, মনে হইতাছে অনেক সময় নিবো। ফ্যাসাদ লাগলো একটা। ভাবছিলাম দিনে দিনে যশোর যামু। তা আর হইলো না। অনেক রাত হইয়া যাইবো। শালাদের কাণ্ড। একলগে দুইটা ফেরির ইঞ্জিন খারাপ হয় কেমনে? শালারা করে কী? ইঞ্জিন খারাপ হওনের আগে টের পায় না? বলে সে বিরক্তির সঙ্গে থুতু ফেলে বাইরে।
এই সময় লাল গেঞ্জি, মাথায় সাদা টুপি, টি-শার্ট পরা এক লোক এসে হেসে বলল, কী মজিদভাই, ফান্দে আটকাইছ বুঝি?
শুনে প্রথমটায় বুঝতে পারে না মজিদ। বলে ফান্দে, কিসের ফান্দে?
লোকটার নাম জবেদ। ফেরিঘাটেই থাকে। মেয়েপাড়ায় দালালি করে। সে হেসে বলে, সামনে দেখতাছ না কত বড় লাইন। অনেকক্ষণ থাকন লাগবো। ওইপারে যাইতে যাইতে রাইত হইয়া যাইবো। থাকবা নাহি কোনো ঘরে, রাত কাটাইতে? ব্যবস্থা করি।
শুনে মজিদ ধমক দিয়ে বলে, চুপ করো মিয়া। দেহো না সঙ্গে লেডিজ।
লেডিজ শুনে জবেদ ভেতরের দিকে ভালো করে তাকায়। কুলসুম ঘোমটা দিয়ে উলটোদিকে মুখ ফিরিয়ে ছিল। তাই তার দিকে চোখ পড়েনি আগে জবেদের। সে ভালো করে দেখে ফিসফিস করে বলল, আরে বাব্বা। মাল নিয়াই যাইতাছ। আমাদের কী হইবো তা হইলে?
মজিদ আবার ধমক দিয়ে বলে, চুপ করো। বাজে কথা কইও না। ভালা মাইয়া মানুষ দেইখা চিনতে পারো না? বিপদে পড়ছে। যশোরে পৌঁছায়া দিতাছি।
শুনে জবেদ মজিদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে, সে কী বলতে চায়। মজিদ দৌলতদিয়ার ঘাট পার হইতাছে সঙ্গে মাইয়া মানুষ নিয়া! কেইসটা কী? সে গম্ভীর হয়ে বলে, আত্মীয় লাগে নাকি? পোয়াতি দেখা যায়।
মজিদ মাথা নেড়ে বলে, হ আত্মীয়।
জবেদ বলে, মুখের ছুরত ভালাই। গতর সুন্দর। স্বামীডার ভাগ্য ভাল।
জব্বর বলে, স্বামী নাই অহন। ভাগাইয়া দিছে।
মজিদ তার দিকে বিরক্ত হয়ে তাকায়। বলে, এত কথা কস কেন? তারপর জবেদের দিকে তাকিয়ে বলে, যাইবা এইখান থাইক্যা? দুইজনে প্যাচাল পাইরা কান ঝালাফালা কইরা দিলা। তফাৎ যাও।
জবেদ সরে যেতে যেতে বলে, এত চ্যাত ক্যান? খারাপ কিছু তো কই নাই। যাইতাছি বাবা।
জবেদ চলে গেলে মজিদ জব্বরকে বলে, চল নিচে নামি। ট্রাকে বইসা থাইকা পা ধইরা গেছে। তারপর কুলসুমের দিকে তাকিয়ে বলে, তুমি এইহানে বইয়া থাহো। মনে করলে সিটের ওপর শুইতেও পার। বেশ জায়গা আছে। কেউ দেখতে পাইবো না বাইরে থাইক্যা। ট্রাকের সিট বেশ উঁচা। এই একটা সুবিধা। কুলসুম কিছু বলতে যাচ্ছিল, মজিদ থামিয়ে দিয়ে বলল, চিন্তার কিছু নাই। আমরা কাছেই আছি। রাস্তার পাশে কোনো একটা গাছের নিচে। তাকাইলেই দেখতে পাইবা আমাদের।
কুলসুম উদ্বেগের সঙ্গে বলে, একটু পরই সন্ধ্যা হইবো। আন্ধারে দেখমু কেমনে?
মজিদ বলে, চিন্তা কইরো না। আমরাই আইয়া পড়-ম।
রাস্তায় নেমে মজিদ দেখল বড় গাছপালার নিচে ছায়া দেখে অনেকেই সেসব জায়গা দখল করে নিয়েছে। সেখানে কেউ দাঁড়িয়ে কথা বলছে, কেউ বসে বসে সিগারেট খাচ্ছে। ফেরিওয়ালার কাছ থেকে খাবার-দাবার কিনছে। সব গাছের নিচেই নানা ধরনের লোকের জটলা। বোঝা যাচ্ছে গাড়ির লাইন অনেকক্ষণ থেকেই লম্বা হচ্ছে। ড্রাইভার যারা তারা লাইনের দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে দেখছে নড়াচড়া হচ্ছে কিনা, গাড়ি সামনে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে কিনা। দেখতে না পেয়ে তাদের কেউ কেউ মুখে খিস্তি তুলছে। যাত্রীদের মধ্যে মেয়ে-পুরুষ, বাচ্চাকাচ্চা সবই আছে। মায়ের কোলে অনেকক্ষণ বসে থাকার জন্যই বোধহয় বাচ্চারা চঞ্চল হয়ে উঠেছে। তাদের কেউ কেউ গরম সহ্য করতে না পেরে হইচই করছে। কান্নার শব্দও শোনা গেল কয়েকবার। খালি গাছের নিচে ছায়া খুঁজতে খুঁজতে মজিদ আর জব্বর বেশকিছু দূরে এসে গেল। তারপর একটা ছায়াঅলা গাছ দেখতে পেয়ে তার নিচে গিয়ে দাঁড়াল দুজন। তাদের পেছনে পেছনে হকার এলো, মিষ্টি, আইসক্রিম এসব বিক্রির জন্য। তারা দুজন হাত নেড়ে বলল, লাগবো না। একটু পর রুটি আর বিস্কিট নিয়ে এক ফেরিঅলা এলে তার কাছ থেকে তিনটা বড় রুটি কিনে নিল মজিদ। পয়সা দিয়ে বলল, কিইনা রাখি। দেরি হইলে খাইতে হইবো। পরে আর পাওয়া যাইব না।
মুখে সিগারেট ধরিয়ে জব্বর বলল, কুলসুম মাইয়াডা ভালা। স্বীকার করি। কিন্তু তারে নিয়া ঝামেলায় পড়বা ওস্তাদ। কইয়া দিলাম।
সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে মজিদ বলল, কেমন বিপদ? ক দেখি। হুনি।
জব্বর বলল, ধরো কুলসুমের সৎভাই তার বাড়িতে জায়গা দিতে চাইবো না তারে। তহন তুমি কী করবা? একটা বিপদে পড়বা না?
মুখ থেকে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে মজিদ বলে, বিপদ হইবো ক্যান? কুলসুম আমার মায়ের লগে আমাদের বাড়িতেই থাকবো না-হয়। বাড়িটা খালি। বউ মারা যাওয়ার পর মা মাঝেই মাঝেই কয়, বাড়িডা বড় সুনসান। বউ আন রে মজিদ। কুলসুমরে পাইয়া মা খুশি হইব। হউক না অন্যের বউ। বাড়ি থেকে খেদাইয়া দিছে। হেইসব খবরে আমাদের কাম কী? মা শুধু দেখব যারে নিয়া আইলাম তার স্বভাবচরিত্র কেমন। কুলসুম যে ভালো স্বভাবের হেইডা তো আমরা নিজেরাই টের পাইছি। আমার মায়েও পাইবো।
জব্বর চোখ বড় করে বলে, তার মানে তুমি কুলসুমরেঃ। তার কথা শেষ হয় না।
মজিদ বলে, না। অহনি তেমন চিন্তা করতাছি না। তবে অবস্থা বুইঝা তেমন কিছু হইয়া যাইতে পারে। তারপর কিছু ভেবে বলে, কুলসুম খারাপ মাইয়া না। দেখলি না, কেমন যত্ন করল দোকানে খাওনের সময়? ভালা স্বভাবের মাইয়া না হইলে এমন করে? তার স্বামীডা একটা বেকুব। পাষণ্ড বলা যায়।
জব্বর বলে, বাইরে বাইরে মাইয়া মানুষদের ভালা মনে হয়। তাদের মনের ভেতরের খবর পাওন মুশকিল। সময় লাগে। তুমি হুট কইরা বাড়িতে উঠাইও না। আমি অহনও কইতাছি। অশান্তি আইবো।
তারা কথা বলছে এমন সময় ঘাটের দালাল জবেদ কোকাকোলার বোতল হাতে এসে বলে, নাও খাও, ঠাণ্ডা। যা গরম পড়ছে। খাইয়া শরীর আর মেজাজ ঠাণ্ডা করো। যা, ধমক দিলো মজিদ মিয়া। বাপরে বাপ।
মজিদ তার দিকে তাকিয়ে থেকে ইতস্তত করে কোকাকোলার বোতল হাতে নিয়ে বললো, এতদূর ট্রাক চালায়া আইসা মেজাজ খাট্টা হইয়া আছিল। তোমার কথা হুইনা মেজাজ আরো খারাপ হইয়া গেল। তাই ধমক দিলাম। কিছু মনে কইরো না। বহ। তুমিও ঠান্ডা খাও আমাগো লগে।
জবেদ মাথা নেড়ে বলে, না। আমার কাম আছে। কাস্টমার যোগাড় করতে হইবো। বড় কমপিটিশন এহন। দালাল বাইড়া গেছে ঘাটে।
শুনে মজিদ হাসে, তারপর বলে, হ। সত্যি কথা কইছ মিয়া। সব জায়গাতেই কমপিটিশন, না কী য্যান কয়, হেইডা বাইড়া গেছে। রাস্তায় এত ট্রাক আগে দেহি নাই। বাসও না। যেদিকে তাকাও হুদা ভিড়।
জব্বর কোকাকোলা বোতল মুখ থেকে বার করে বলে, হইবো না। লোক কত বাড়ছে। হাঁটতে গেলেই গায়ে লাগে।
কুলসুমকে ডাকতেই সে জড়োসড়ো হয়ে বসে পড়ে সিটের ওপর। দুই হাত দিয়ে তার পেট অাঁকড়ে ধরে। যেন নিজেকে রক্ষা করছে কারো হাত থেকে। জবেদ হেসে বলে, আমি জবেদ। এই যে কিছুক্ষণ আগে আইছিলাম। মজিদ ভাই পাঠাইলো কোকাকোলা নিয়া। খাও। ঠাণ্ডা পানি। মিঠাও লাগবো। গরমে খুব আরাম পাইবা। নাও। মুখ খোলাই আছে, বলে সে কোকাকোলার বোতলটা কুলসুম যেখানে বসেছিল সেখানে বাড়িয়ে দেয়। কুলসুম কিছুক্ষণ ইতস্তত করে কোকাকোলার বোতলটা হাতে নেয়। জবেদ ভালো করে দেখে তাকে। হঁ্যা। শরীরটা আঁটসাঁট। বাচ্চা হইয়া গেলে পুরুষদের টানতে পারবো কাছে। মাসি খুশি হইবো দেইখা।
পথের পাশে গাছের নিচে বসে কোকাকোলার বোতল মুখ থেকে নামিয়ে জব্বর বলে, এক কাম করলে হয় না ওস্তাদ?
মজিদ বলে, কী?
জব্বর বলে, কুলসুমরে দৌলতদিয়ার ঘাটে কোনো মাসির ঘরে রাইখা যাই আমরা। হে-ই তারে দেখাশোনা করবো। বাচ্চা হওনের সময় যা করার হেইসবও করবো। তার একটা স্বার্থ আছে না? কুলসুম দেখতে-শুনতে খারাপ না। মাসি তার কাছেই রাইখা দিবো তারে। রাস্তার মাইয়া রাস্তাতেই আশ্রয় পাইয়া যাইবো। তারে নিয়া তোমার কোনো চিন্তা করা লাগবো না।
কোকাকোলার বোতল প্রায় শেষ করে এনেছে মজিদ। খেতে ভালোই লাগল, বেশ ঠাণ্ডা আর মিষ্টি। কিন্তু গরমের জন্য মাথাটা এখন ঝিমঝিম করছে। কেমন যেন ঢলে পড়তে চায়, খুব ঘুম পেলে যেমন হয়। সে জব্বরের কথা শুনে তার দিকে তাকায়। তাকে কেমন যেন ঝাপসা দেখাচ্ছে এখন। কিন্তু জব্বরের কথাগুলো তার কানে ঠিকভাবেই পেঁৗছেছে। কিছুক্ষণ ঝিম ধরে থাকে সে, ঝড়ের আগে গুমোট হাওয়ার মতো। চোখে সূঁচালো করে সে দেখে জব্বরকে। তারপর বাজের মতো ফেটে পড়ে বলে, হারামজাদা। কী কইলি? মুখ থেইকা ওই কতা আবার বাইর হইলে মাথাডা ফাডায়া দিমু। বলে সে জব্বরের মুখে প্রচণ্ড এক চড় মারে। চড়ের ধাক্কায় মাটিতে পড়ে গড়ায় জব্বর। মজিদ তার দিকে তাকিয়ে উত্তেজিত স্বরে বলে, রাস্তার মাইয়া? খুব কথা কইতে শিখছস। মাইয়ারা কি রাস্তায় জন্মায়? নাকি তারা আকাশ থেইকা রাস্তায় আইয়া পড়ে? কুলসুমরে রাস্তায় থেইকা তুইলা আনছি বইলা রাস্তাতেই ফালাইয়া যামু? মাইয়া মানুষ দেখলে তোর দেখি শুধু একটা কথাই মনে পড়ে। বদমায়েশ কোথাকার! বলে সে জব্বরের মুখে আরেকটা থাপ্পড় দেয় জোরে। জব্বর আর্তচিৎকার করে ওঠে। মজিদের দৃষ্টি এখন ঘোলাটে হয়ে এসেছে। সে ভালো করে জব্বারকে দেখতে পায় না। তার মাথাটা খুব ঘুরছে। মনে হয় যেন মাথা না, একটা পাথর বসিয়ে দিয়েছে কেউ। খুব ভারি লাগছে। একটু পর সে মাটিতে লুটিয়ে-পড়া জব্বরের শরীরের ওপর ঢলে পড়ে। তারপর দু'জনে বেঁহুশ হয়ে ঘুমায়।
তাদের যখন জ্ঞান ফেরে, ফেরিঘাটের এদিকের লম্বা লাইন দেখা যায় না। রাস্তা দিয়ে একটা-দু'টো করে গাড়ি যাচ্ছে।। তাদের হেডলাইট জ্বলছে। দু'পাশে অন্ধকার ঘাপটি মেরে আছে লাফিয়ে পড়ার জন্য। দূরে দৌলতদিয়াঘাট আলোয় ঝলমল করছে। তারা যে গাছের নিচে শুয়ে ছিল সেখানে অন্ধকার জমে আছে। তারা দু'জন প্রায় একসঙ্গে উঠে দাঁড়াল। দু'জনের শরীরই ঢলছে, যেন পড়ে যাবে নিচে। একে অন্যের কাঁধে হাত রেখে সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলল, দেরি হয়ে গেছে। কী যে ঘুম দিলাম। কিছুই টের পাইলাম না। অহনে গাড়ির কোনো লাইন নাই। ফেরিতে উঠতে অসুবিধা হইবো না। চল, ট্রাকের কাছে যাই। সন্ধ্যা হইয়া গেছে। যশোর পেঁৗছাইতে পেঁৗছাইতে অনেক রাত হইবো।
ট্রাকের সামনে কোনো গাড়ি অপেক্ষা করে নেই। শুধু পেছন থেকে হেডলাইট জ্বালিয়ে মাঝে মাঝে বাস, ট্রাক আসছে। সেই আলোতে তাদের ট্রাকটা এতিমের মতো দেখায়। যেন জন্মের পর কেউ ফেলে দিয়ে গিয়েছে। পেছনের ট্রাক আর বাসের ড্রাইভাররা মুখ বার করে তাদের ট্রাকের দিকে তাকিয়ে গালি দিচ্ছে পথ আটকিয়ে রাখার জন্য। তাদের ট্রাক এড়িয়ে একটু ঘুরে যেতে হচ্ছে, যার জন্য এই রাগ। দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে রেগে গিয়ে বলে, খালি সামনে যাইতে চাও? আমরা যে এহানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বইয়া রইছি, হেই খবর রাহ? যাও, ঘুইরা যাও একটু। আমাদের ট্রাক পাশ কাটাইয়া যাও। আমরা রাস্তা ছাইড়া দিমু না। হ।
প্রায় টলতে টলতে দু'জনে ট্রাকের কাছে পেঁৗছালো। পেছন থেকে আসা ট্রাকের হেডলাইটের জন্য চোখে হাত রাখতে হলো তাদের। আলো তো নয় যেন হলুদ হাতের থাবা। চোখ টেনে নিয়ে যেতে চায়। বেশ কসরত করে ট্রাকের দরজা খুলে লাফ দিয়ে ভেতরে উঠে বসল মজিদ। তারপর স্টিয়ারিং দুই হাতে ধরে সামনের দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে বসে থাকল। তার হাত কাঁপছে, সেইসঙ্গে শরীর। মাথার ঝিমুনিটাও আছে। চোখে সবকিছু এখনো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। ব্যাপারটা কী? এমন তো কখনো হয় নাই? তারপর কিছু মনে পড়ায় পাশে যেখানে কুলসুম বসে ছিল সেদিকে তাকিয়ে দারুণ অবাক হয়ে গেল সে। বেশ হকচকিয়ে গেল। তার পাশে কুলসুম নেই, জব্বর বসে বসে ঢুলছে। সে জব্বরের ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে বলল, জব্বর। এই জব্বর। কুলসুম গেল কই? তারে তো দেখি না ভেতরে?
জব্বর খুব চেষ্টা করে মাথা তুলে বলল, কুলসুম? কুলসুম কেডা? কার কথা কও ওস্তাদ?
মজিদ রেগে গিয়ে উত্তেজিতে স্বরে বলে, কুলসুম। যারে আমরা রাস্তা থেকে তুইলা আনলাম। তোর আর আমার মাঝখানে বইয়া ছিল এতক্ষণ। কুলসুম গেল কই?
জব্বর মাথা হেলিয়ে জড়ানো স্বরে বলে, কী যে কও ওস্তাদ! কুলসুম বইলা কোনো মাইয়া আমাদের দু'জনের মাঝখানে বসে নাই। আমরা দু'জনেই ট্রাক নিয়া আইছি। তুমি কুলসুমরে কই দেখলা? নিজের বউয়ের নাম কুলসুম আছিল বইলা তুমি কি শুধু তার কথাই ভাববা? মনে করবা যে, সে আমাদের মাঝখানে বইয়া রইছে? সব তোমার মাথার খোয়াব। কুলসুম বইলা কেউ এই ট্রাকে ছিল না। থাকলে কি দেখতে পাইতাম না? এ্যা?
মজিদ দৃষ্টি স্পষ্ট করার জন্য চোখদু'টো বড় বড় করে তাকায়। জব্বর আর তার মাঝখানের জায়গাটায় ভালো করে দেখে। না, কেউ নাই। কেউ ছিল বলেও মনে হয় না। হাত দিয়ে সিটের জায়গাটা দেখে সে, ঠাণ্ডা। একটা মানুষ বসে থাকলে যেমন গরম থাকে, জায়গাটা তেমন মনে হচ্ছে না। ঠাণ্ডা। বরফের মতো ঠাণ্ডা। নাহ, কেউ ছিল না এখানে। তার মনের খেয়াল, জব্বর ঠিকই বলছে। সে একটা বেকুব, কিন্তু মাঝে মাঝে সে ঠিক কথা বলে ফেলে। হঠাৎ কোকাকোলার খালি বোতল হাতে লাগার পর মজিদ অবাক হয়ে বলে, এইডা আইলো কোত্থেইকা? এ্যা?
জব্বর তার দিকে তাকিয়ে জড়ানো গলায় বলে, কী চিজ পাইলা ওস্তাদ? চোখে পরিষ্কার দেহি না। ধোঁয়া-ধোঁয়া লাগে।
মজিদ বোতলটা তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে জড়ানো স্বরে বলে, বোতল। কোকাকোলার বোতল। তুই আনছিস। ভিতরে?
জব্বর মাথা দোলায় কয়েকবার দুইদিকে, তারপর বলে, বোতল? না। আমি কুনো বোতল আমিন নাই। মনে হয় তোমার বোতল। তুমি আনছ।
শুনে মজিদ বোতলটা চোখের সামনে নিয়ে দেখার চেষ্টা করে। হাত কাঁপার জন্য বোতলটা স্থির হয়ে থাকে না। মজিদ কিছুক্ষণ দেখার পর বলে, আমি আনছি? হুউউ। মনে করতে পারতাছি না। শালা মাথাটায় কিছু ঢুকতাছে না অখন। ঘুম দেওয়ার পর কী যে হইলো! বলে মজিদ সোজা হয়ে বসার চেষ্টা করে। তারপর ইঞ্জিনে চাবি ঘোরায়। কিছুক্ষণ পর অন্ধকারের মধ্যে ট্রাকটা গর্জন করে ওঠে, যেন কোনো বুনো জন্তু। হেডলাইট দু'টো জ্বালাতেই সামনের অন্ধকার ছিঁড়েফুঁড়ে যায়। মজিদ সেই হলুদ আলোর ভেতর দেখতে পায় ধুলোর ঝড়। সেই ধুলোয় রাস্তাটা অস্পষ্ট হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর ফেরির হর্ন শুনতে পায় সে ক্ষীণ শব্দের মতো। জব্বরের দিকে তাকিয়ে বলে, ফেরিঘাটটা কোনদিকে রে?
জব্বর উত্তর দেয় না। সে ঘাড় গুঁজে একপাশে হেলে ঘুমিয়ে পড়েছে। কয়েকবার ডেকে সাড়াশব্দ না পেয়ে মজিদ হঠাৎ স্টিয়ারিং হুইলের ওপরে ঢলে পড়ে। তার বুকের চাপে ট্রাকের হর্ন বাজতে থাকে একটানা। প্যা-এ-এ-এ-এ-এ।
।। দুই ।।
পরে যখন ঘুম ভাঙে তাদের কতক্ষণ ট্রাকের ভেতরেই ঘুমিয়ে থাকে দুইজন মনে করতে পারে না। চারপাশে অন্ধকার তখন হালকা হতে শুরু করেছে কালো কালির ভেতর পানি পড়ার মত। পাখিদের ডাকাডাকি শোনা যাচ্ছে আশেপাশের গাছপালা থেকে। পাশ দিয়ে ট্রাক যাচ্ছে, কখনো বা বাস। গাড়ি দেখা গেলো না একটাও। এই সময়ে গাড়ির চলাচল থাকে না।
মজিদ চোখ রগড়ে সামনে একটা ট্রাকের হেড লাইটে ধুলো উড়তে দেখে বললো, কিছু পরিষ্কার দেখি নারে জব্বর। কান্ডটা কী?
জব্বর অতিকষ্টে মাথা তুলে বলে, আমারও হেই অবস্থা। মাথার মধ্যে তোলপাড়। য্যান বাউকুড়ানি হইতাছে। মজিদ ঢুলুঢুলু চোখে তাকিয়ে বলে, শালার কেইসটা কী? এমুন তো হয় নাই কহনো। নেশা করতছিস নাকি?
জব্বর জড়ানো গলায় বলে,না। রাস্তায় কী নেশা করিছি কহনো? একটা জায়গায় পৌঁছাইয়া তারপর নেশা করিছি। রাস্তায় ট্রাক থামাইয়া করতি যাবো ক্যান।?
তা ঠিকই কয়িছিস। কিন্তু এই যে নেশাখোরের মতন লাগে, এই ব্যাপারটা কী? মাথা ভারি মনে হয় ক্যান? আর আমরা রাস্তার মধ্যে ট্রাক থামাইয়া করতিছি কী? ঘাটে যাই নাই, যশোরের রাস্তা ধরি নাই। সব দেহি উল্টা-পাল্টা হইয়া গ্যাছে। কারবারটা সুবিধার মনে হয় না রে জব্বর। ভুতের পালস্নায় পরলাম, না জ্বীনের?
তখন জব্বর হঠাৎ মাথা তুলে বলে, জবেদ। জবেদ শয়তানটার কাম এইটা। সেইই আমাদের বেহুশ করিছে।
জবেদ? ঘাটের দালালটা? সে আমাদের বেহুশ করলো ক্যামনে? রাইতে আইছিলো বটে যহন ট্রাক থামইছি এই হানে। তার হাতে মদের বোতল ছিল না। গস্নাস ছিল না। বেহুশ করলো কেমনে? মজিদ জড়ানো গলায় বলে।
জব্বর উত্তেজিত স্বরে বলে, কোলাকোলার বোতল নিয়া আইছিল। দিছিলো আমাদের খাইতে। মনে নাই? হ। মনে পড়তিছে। কিন্তু কোকাকোলায় কি নেশা হয়? এমন বেহুশ করে? মজিদ মাথা বুকের কাছে এনে বলে।
করে না। কিন্তু কোকাকোলার খোলা বোতলে সে কী মিশাইছে তা আমরা টের পাই নাই। আমাদের কোকাকোলা খাওয়াইয়া ঘুম পাড়াইছে হারামজাদা। মজিদ বুক থেকে মাথা তুলার চেষ্টা করে বলে, তা সে আমাদের ঘুম পাড়াইবার চেষ্টা করবো ক্যান? আমরা কী শিশু? আমাদের ঘুম পাড়াইবার লোক লাগে? হ্যা? বলে সে আবার মাথা বুকের কাছে রাখে।
লাগে। ওস্তাদ লাগে। দরকারের সময়ে লাগে।
দরকার? কী দরকার?
কুলসুম। কুলসুমরে উঠাইয়া নিছে সে। দেহো না ট্রাকে কুলসুম নাই।
শুনে ধড়ফড়িয়ে সোজা হয়ে বসে মজিদ। তার উত্তেজিত হাতের চাপে বাসের হর্ন বাজতে থাকে। যেন বিপদ সংকেত দিচ্ছে। ভোরের আকাশে সেই শব্দ বাতাসে মিশে জমাট বাধে, তারপর ভাঙতে ভাঙতে ছড়িয়ে পড়ে।
কুলসুম! কুলসুম নাই? মজিদ পাশে হাতড়ায়।
জব্বর বলে, না। কুলসুম নাই। তার জায়গায় একটা খালি বোতল। তারেও বেহুশ কছে শালা জবেদ।
মজিদ বলে, ক্যান, তারে বেহুশ করছে ক্যান? সে কী নেশা করে? কইছে তারে।
আরে ওস্তাদ মাঝে মাঝে তোমার আক্কেল হারায়া ফ্যালাও। কুলসুমরে ক্যান বেহুশ করছে করছে বোঝো না? তারে উঠায়া নিয়া গ্যাছে?
উঠায়ে নিয়া গ্যাছে? ক্যান, তারে উঠায়ে নিবে ক্যান? মজিদ চোখ রগড়াতে রগড়াতে বলে।
জব্বর একটু বিরক্ত হয়ে বলে, আজ তোমার হইছে কী ওস্তাদ? সোজা কথা বোঝো না। একটা মাইয়া মানুষরে ঘাটের দালাল উঠায়া নেয় ক্যান? তারে ঘাটের পাড়ায় রাখবো। তারে দিয়া ব্যবসা করবো।
মজিদ এবার সচেতন হয়ে ওঠে। গম্ভীর গলায় বলে, কুলসুম পোয়াতি। তার পেট দেখলেই টের পাওয়া যায়। তারে ঘাটের পাড়ায় নিয়া লাভ? কী কস্ তুই? মাথা খারাপ হয়িছে তোর।
জব্বর বলে, ঠিকই কই। কুলসুম কী সব সময়েই পোয়াতি থাকবো? বাচ্চা হইবো না? তহন তারে ব্যবসায় লাগাইবো। সে তো দেখতে সুন্দরই। শরীরটাও টাইট। একটা বাচ্চা হইলে হেরফের হইবো না ঐ শরীরে। আরো খোলতাই হইবো।
হু। বলে মজিদ কিছুক্ষণ ঝিম মেরে থাকে। তারপর ইঞ্জিনে স্টার্ট দিয়ে খুব স্পিডে সামনে যেতে থাকে। এবড়ো-থেবড়ো রাস্তায় ট্রাকটা হোচট খায়, হেলতে দুলতে থাকে। ভেতরে বসে জব্বর হেলপার সামাল দিতে পারে না গতির সঙ্গে। ধাক্কা খায় সিটের পেছনে, বাঁয়ে লেগে। সে আঁতকে ওঠে বলে, করো কী ওস্তাদ? এ্যাকসিডেন্ট করবা! আস্তে চালাও।
মজিদ দাঁত কিড়মিড় করে বলেন শালা। হারামখোর। এত বড় সাহস। মজিদ ট্রাইভাররে চেনো না।
জব্বর বলে, ওস্তাদ আমারে বকো ক্যান?
মজিদ বলে, তোরে না। জারজ ব্যাটা জবেদরে। ওরে আমি আস্তা রাখমু না। হাড়-গোড় ভাইঙ্গা ফ্যালামু। কত সাহস। আমার ট্রাক থেইকা মাইয়া মানুষ তুইলা নিয়া যায়।
জব্বর বলে, ভাবছে কুলসুম খারাপ মাইয়া। না হইলে আমাদের ট্রাকে উঠছে ক্যান? তাই উঠাইয়া নিছে চালাকি কইরা।
হু। তার চালাকি বার করতিছি। কুলসুমরে খারাপ মাইয়া মনে করো। কুলসুমরে আমার ট্রাক থেইকা উঠায়া নাও। সাহস কতো। দাঁড়াও আইতাছি।
একটা ট্রাকের সঙ্গে প্রায় লেগে যাচ্ছিল তাদের ট্রাক। জব্বর আর্তস্বরে বলে, সাবধানে চালাও ওস্তাদ। একসিডেন্ট করবা, আস্তে চালাও।
মজিদ উত্তেজিত স্বরে বলে, চুপ কইয়া বইসা থাক। কথা কইয়া মেজাজ খারাপ করি দিস না। এমনিতেই খাট্টা হইয়া আছে।
জব্বর বলে, তোমারে সব বলা ঠিক হয় নাই, কুলসুম যে নাই, তারে নিয়া গ্যাছে এইডা এহন না কইলেও পারতাম। যশোরে গিয়া কওয়া যাইতো। অহন তুমি যে কী করো আলস্নাহ জানে।
তুই কইবি না আমারে? তুই না হেলপার। তোরে সব কথা কতি হবে। না হইলে তুই কেমুন হেলপার? এহন আফসোস করো। পরে যে মাইর দিতাম তহন কী করতা? আফশোস কইরো না। ঠিকই করছো কইয়া আমারে। পরে কইলে খবর হইতো।
জব্বর আমতা আমতা করে বলে, চোহে তো দেহি নাই। সবই অনুমান। জবেদ কুলসুমরে নাও উঠায়া নিতে পারে।
তা হইলে কে উঠাইছে? মজিদ চকিতে তাকায় তার দিকে। তার মুখে ভ্রূকুটি।
জব্বর বলে, ঘাটের কাছে কতো মন্দ লোকের আনাগোনা। তাদের কেউ নিতে পারে।
মজিদ রাগের সঙ্গে বলে, তুই কথা ঘুরাইছ না। উল্টাসিধা কথা কইছ না। জবেদই উঠায়া নিছে। কোনো সন্দেহ নাই। তুইও হেইডা জানিস। হে ছাড়া আর কে আইয়া কোকাকোলা খাওয়াইছে। কুলসুমরেও খাইতে দিছে। দেখছ না সিটের উপর খালি বোতল। বোতলে ওষুধ মিশাইছে। ঘুম পাড়াইছে আমাদের। বড় বুদ্ধি হারামখোরের। মনে করছে টের পামু না। পাইলেও হৈ-চৈ করমু না। এ্যাহন মজা টের পাইবা। আইতাছি তোর যম।
জব্বর বলে, হৈ-চৈ করা কী ঠিক হইলো? লোকে যদি কয় কুলসুমরে কই পাইলা? হে তোমাদের কে হয়? তখন কইবা কী ওস্তাদ?
মজিদ একহাত দিয়ে সামনে মাছি তাড়াবার মতো ভঙ্গি করে বলে,বড় ডরপুক তুই। একটুতেই ঘাবড়ায়া যাছ। চুপ থাক। খালি দেখ আমি কী করি।
জব্বর নিজের মনে বলে, কী যে বিপদে পড়া গেল। কেন যে ঐ মাইয়াটারে তুললাম ট্রাকে।
মজিদ কাঁধে ঘুষি মেরে বলে, তুই তুলিস নাই। আমি তুলিছি। তোর সেই সাহস নাই জব্বর। এর জন্যি বুকের পাটা থাকন লাগে। অহন চুপ থাক। আর একটু পর দেখবি মদারির খেল। দৌলতদিয়া ঘাটে পৌছায়া নিই।
পাটুরিয়া ঘাটে বেশ কয়েকটা ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। দুটো বাস। ভোর হওয়ার আগে ফেরি চলাচল শুরু হবে না। মজিদ ট্রাক থেকে নেমে পাশের খোলা জায়গায় গিয়ে প্যান্টের জিপার খোলে। একটু পর সরসর শব্দ শোনা যায়। বেশ বড় করে একটা পাদও দেয় সে। শুনে জব্বর বলে, সর্বনাশ হয়িছে। জবেদরে পালি তার পেটের সব হাগা বার করি দিবে ওস্তাদ। বড় চটিছে। এতবড় পাদ আগে শুনি নাই।
মজিদ ফিরে এসে সিটে বসে একটা সিগারেট ধরায়। এখনো পরিষ্কার হয়নি চারিধার। লোকজনও তেমন দেখা যাচ্ছে না। ফেরীটা ঘাটে গোয়ালে গরুর মত শক্ত করে বাঁধা। রমজান মাসে সবার সামনে সিগারেট খাওয়া যায় না আজকাল। কিন্তু এই ভোরে সেই সমস্যা নেই। সে একমনে সিগারেট টানে আর বড় করে ধুয়া ছাড়ে। তাকে দেখে বোঝা যায় সে এখন তার মাথায় ফন্দি ঘুরছে। কৌশল বার করছে। তার এই ভাব সাব জব্বরের জানা। মজিদ সিগারেট শেষ না করে জব্বরের দিকে দিয়ে বলে, নে। টান। বইসা বইসা আর কী করবি?
জব্বর সিগারেটে টান দিয়ে বলে, ওস্তাদ যাই, আমার ডর করতাছে। তুমি একটা হাঙ্গামা না বাধায়া দাও। তারপর বলে, কোথাকার একটা মাইয়া মানুষ, জানা নাই, চেনা নাই, তার লাগি ঝামেলায় জড়াইয়ো না। কুলসুম আমাদের কে? কেউ না। তার কথা ভুইলা যাও। থাকুক সে যেহানে আছে। আমাদের কী?
মজিদ সামনের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডাস্বরে বলে, তা হয় নারে জব্বর। হয় না। জবেদের মতো একটা দালাল আমারে ফাঁকি দিবো, চালাকি দেখাইবো, এইটা মাইনা নেওয়া যায় না। ওর বাড়াবাড়ির ফল তারে পাইতে হইবো। এরজন্যি হাঙ্গামা-হুজুত যা হবার হইবো। তহন কিছু ঠেকানো যাবি না।
কুলসুমের লাগি করবা এইসব? যাকে চেনো না। জব্বর তাকায়।
মজিদ তার দিকে না তাকিয়ে বলে, হে তুই বুঝবি না।
পাটুরিয়া থেকে দৌলতদিয়া ঘাটে পৌঁছাতে সময় নেয় না। ট্রাক-বাস এখন এই ভোরে বেশ কম। লোকজনও বেশি নেই। ওপাশেও ঘাট ফাঁকাই দেখা যায়। দূর থেকেই চোখে পড়ে দৌলতদিয়া ঘাটের পাড়া। সাড়ি দিয়ে তৈরি বাঁশের বেড়া আর টিনের ছাদের দোচালা, একচালা সব বাড়ী। ধুঁয়ো উঠছে বাড়ির ভেতর থেকে। সকালের উনুন জ্বালিয়েছে, সবাই না হলেও কেউ কেউ। এতো সকালে পাড়ার মেয়েরা ঘুম থেকে জাগে না। তাদের সংসারের কাজ শুরু হয় সূর্য একটু উপরে ওঠার পর। তখন ঘাটের কাছে অনেক বাস-ট্রাক গাড়ির ভিড়। লোকজনের জটলা। হৈ-চৈ। দোকানের কেনা-বেঁচা শুরু হয়ে যায়। চায়ের দোকানে জোরে জোরে বাজে হিন্দি গান। কোলাহলে মুখর হয়ে ওঠে ঘাট।
দৌলতদিয়া ঘাটে পেঁৗছে মজিদ রাস্তার একপাশে ট্রাক রেখে ইঞ্জিন বন্ধ করে ঘাটের দোকানের দিকে যায়। পেছনে পেছনে আসে জব্বর। তাকে বেশ অস্থির দেখায় যেন বিপদের আশংকা করছে, যে কোন মুহূর্তে। টের পেয়ে মজিদ হেসে বলে, এই ব্যাটা পা চালায়া আয়। ডর পাওনের কিছু নাই। যা হইবার তোর ওস্তাদের হইবো। তুই খালি দেখবি খাড়ায়া খাড়ায়া।
একটা চায়ের দোকানে ঢোকে তারা। বেশ কিছু খরিদ্দার চা-নাস্তা করছে। পরাটা, ডিম ভাজি, সবজির তরকারি রান্না হচ্ছে দোকানের সামনে। সয়াবিন তেল পুড়তে পুড়তে কালো হয়ে গিয়েছে। গন্ধ বের হচ্ছে কড়া। পরোটা, ডিম, সবজি ভাজি দেখে জব্বরের পেটের ভেতরের ক্ষুধা চনমনিয়ে উঠলো। দোকানী বললো, বাইরে খাওন যাইবো না। ভিতরে যান। পর্দার আড়ালে। রমজান বাস। ঝামেলা বাধায়েন না। মাদ্রাসার পোলারা আইসা দেইখা যায় মাঝে মাঝে। হাতে লাঠি থাকে। তাকে খুব সতর্ক মনে হয়। সে চারদিকে চোখ রাখে।
জব্বর চায়ের দোকানের ভেতরে ঢুকে যায় তাড়াতাড়ি। তার খুব ক্ষিদে পেয়েছে। মজিদেরও। কিন্তু সে এখন অন্য কাজে ব্যস্ত। খাওয়ার দিকে মন নেই। তার ভেতরে রাগ গজরাচ্ছে। মুখের পেশী ফুলে উঠেছে। শক্ত হয়ে আছে চিবুক। থেকে থেকে হাতের মুঠো শক্ত হচ্ছে। যেন কারো গলা টিপে ধরতে চায়।
সে দোকানীকে একটু একা পেয়ে বলে, ভাইজান, একটা খবর দিতে পারেন?
কী খবর? দোকানী চায়ের ছাকনি থেকে গরম পানি ঝরতে দিয়ে বলে। কালো রঙ পানি বের হয়। চায়ের পাতা জ্বাল দিতে দিতে এখন বাদামি রঙ পাওয়া যাচ্ছে না।
একটা মেয়ের খবর? মজিদ বলে।
মেয়ে! কোন মেয়ের খবর? পাড়ার?
একটা পোয়াতি মেয়ে। শ্যামলা রঙ। নীল পেড়ে শাড়ি। লাল বস্নাউজ গায়ে। হাতে লাল-নীল কাচের চুড়ি। বলে সে তাকায় দোকানীর দিকে।
দোকানী বলে, হু। তা ঐ মেয়েটার কী জানতি চাও তা তো কলা না।
দেখেছেন নাকি তারে? এই ঘাটে আসতি? নিজে তো হেটে আসতি পারে নাই। শরীর খারাপ। কেউ একজন নেয়া আসিছে। ধরি ধরি। কিংবা পাজাকোলা করি।
দোকানী গম্ভীর হয়ে বলে, নারে ভাই। এমন মাইয়া চোহে পড়ে নাই। দোকানে আইলি কতি পারতাম। রাস্তার, ঘাটের লোকজনের দিকে তাকায়া থাকার সময় কই?
মজিদ বলে, ঘাটে পাড়ার এক দালাল। জবেদ। জবেদ তারে নিয়া আসছি। টের পান নাই?
দোকানী এবার চোখ খুলে তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে মজিদের দিকে তাকায়। তারপর বলে, কী কতিছো তুমি? আমি চা-খাবার বিক্রি করি। কেডা দালাল, কে কহন মাইয়া মানুষ নিয়া ঢুকলো, সেইসব দেহি নাকি। বড় তামাশা করতিছো তুমি। যাও, খাওনের হলি ভিতরে যাও। নাহলি কাইটে পড়ো। বিরক্ত করো না। আমার এহন মেলা কাম।
মজিদ ভেতরে ঢোকে না। আরো তিনটে দোকানে গিয়ে একই প্রশ্ন করে। একটা পান সিগােেরটের দোকান। একটা মণিহারী দোকান। একটা ওষুধের দোকান। সেসব দোকানের মালিক বিক্রেতা তার কথা শুনে চায়ের দোকানীর মতোই প্রথমে অবাক হয়, তারপর বিরক্তি দেখায়। মজিদ কোনো খবর পায় না। অনেকগুলো জিজ্ঞাসু চোখ তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তাদের দৃষ্টিতে সন্দেহ মেশানো।
মজিদ চায়ের দোকানের ভেতর ঢুকে দেখে জব্বর নাস্তা খেয়ে শেষ করে বসে আছে। তাকে দেখে বললো, কী ওস্তাদ, দেরী যে? কই গেছিলা নাস্তা না খাইয়া? খাইবা না? ভুক লাগে নাই?
মজিদ তার পাশে বসে বলে, কুলসুমের খোঁজ নিতে।
অবাক চোখে তাকায় জব্বর। বলে, তোমার দেহি মাথায় এ্যাহন কুলসুম ছাড়া আর কোনো চিন্তা নাই। তার কথা ছাড়ি দাও। যেহানে আছে ভালই আছে, এটা মনে করো। এ্যাহন চলো যাই। আমাদের বাড়ি-ঘর আছে। কুলসুমের কথা ভাইবা মাথা গরম করলি হবি না।
মজিদ পরোটার সঙ্গে সবজি মিশিয়ে নিতে নিতে বলে, কুলসুমরে তার বাড়ি পৌঁছাইবার কথা দিছি। ট্রাকে নিয়া এতদূর আসিছি। এ্যাহন তারে ফালায়া যাতি পারি না। তার বিপদ জাইনাও যাওয়া যায়? তুমি কী কও হেলপার? তোমার মন নাই? দয়ামায়া নাই? মায়া-মহব্বত নাই?
জব্বর কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে, আছে ওস্তাদ। তাই বইলা রাস্তার একটা মাইয়ার জন্যি এত মায়া-মহব্বত দেখাইতে চাই না।
মজিদ বলে, কুলসুম রাস্তার মাইয়া ছিল না। তারে পাষন্ড স্বামী বাড়ি থেকে খেদাইয়া রাস্তার পাঠাইছে। জব্বর বলে, হের লাগি কী আমরা দায়ী? আমাদের কোন দায়িত্ব আছে এহানে?
দায়িত্ব আসি পড়িছে। ঔ যে তারে রাস্তায় থেইকে তুললাম। কলাম বাড়ি পৌঁছাইয়া দিবো। তারপর একটা দায়িত্ব আসি পড়িছে। বুঝলা হেলপার মিয়া।
জব্বর কাধ ঝাকুনি দিয়ে বলে, এমন দায়িত্ব ঘারে নিলে সংসারে চলতি পারবা না ওস্তাদ। টের পাও নাই এ বড় কঠিন জায়গা। তাল দিয়ে সামলানো, ঠিকমত চলা মুশকিল। সেখানে উটকো ঝামেলার জড়ালি আর কথাই নাই।
মজিদ পানির গস্নাস হাতে নিয়ে বলে, ঝামেলায় যহন জড়ায়ে গেছি তহন আর ছাড়াছাড়ি নাই। ঝামেলা শেষ করতি হবি। মাঝখানে থামলি চলবি না। এ হল গিয়া জেদের ব্যাপার।
জব্বর বলে, তুমি এহনো ভালো করি চিন্তা করি দেহো। যা করতিছো তা ঠিক হতিছে কিনা। আমি কই বাড়ি চলো। সেখানে গিয়া গোসল করি খায়ি-দায়ি নাক ডাকাইয়া ঘুমাইয়া লই। শরীরে বড় চাপ গেছে এই ক'দিন। তারপর রাস্তায় নেশার জিনিস খায়ি বেহুশ হয়ে থাকা। এসব আর না। চলো বাড়ি। খুব হয়িছে এই ট্রিপে।
মজিদ বলে, বাড়ি যামু। কিন্তু কুলসুমরেও তার বাড়ি পৌঁছায়ে দিমু। তারে কথা দিছি।
জব্বর মাথা নেড়ে বলে, তোমার মাথা খারাপ হয়িছে ওস্তাদ। বউ মারা যাবার পর থেইকাই তুমি যেন ক্যামন হয়ি গেছো। আগের মতো নাই। কী য্যানো ভাবো উদাস হয়ি।
মজিদ বলে, সে তুই বুঝবি না। কথা না বাড়ায়া সঙ্গে থাক। তোরে কিছু করতি হবি না।
জব্বর বলে, আমি না হেলপার? কিছু করতি হবি না কলিই হলো।
মজিদ বলে, এই ব্যাপারে কিছু করা লাগবি না।
মজিদ নাস্তা শেষ করে ব্যস্ত হয়ে, যেন কোথাও যাবে সে। তাকে অস্থির দেখাচ্ছে। উত্তেজনায় কাঁপছে গলার কাছের নীল রগ। আরো নীল দেখাচ্ছে, যেন রক্ত বেরিয়ে আসবে ছিঁড়ে ফুঁড়ে। জব্বর তার ওস্তাদের এই মুড বেশ বোঝে। অন্য সময় হলে ঠাট্টা করে বলতো, কী ওস্তাদ মুড ভালো নেই? কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে মজিদের মুড যাকে বলে একেবারে খাট্টা হয়ে আছে। তার সঙ্গে এখন রসিকতা করা যাবে না। ঠাট্টা তো নয়ই।
মজিদ বাইরে এসে বিল দেখে দোকানীকে টাকা দেয়। রাস্তা দিয়ে দুই লাইনে বাস-ট্রাক নিচে নামছে, উঠছে ফেরী থেকে। ধুলো উড়ছে। সকালের সূর্য এখনি চড়বড় করে উঠছে ফুটন্ত পানির মত। বেশ গরম পড়বে বোঝা যাচ্ছে।
জব্বরকে নিয়ে পাড়ায় ঢোকে মজিদ। সতর্ক চোখে দেখে চারিদিক। পাড়ার মেয়েরা সবে ঘুম থেকে উঠেছে। কেউ মুখ ধুচ্ছে। কেউ কাপড় বদলাচ্ছে উঠোনে। রানা ঘরে ঢুকেছে পৌঢ়া যারা সেই সব খালা, চাচী। ধুঁয়ো উঠছে রান্না ঘরে। বাচ্চাদের কান্না শোনা যাচ্ছে। ক্যাসেটে গান হচ্ছে জোরে জোরে। একটা গা বেশ পরিচিত। 'খায়রুলরে তোর লম্বা মাথার কেশ। দিরল দাঁতের হাসি দিয়া পাগল করলি দেশ। বেশ জনপ্রিয় হয়েছে পাল্টা। শেষ পর্যন্ত কোনো শব্দই বিশেষ হয়ে থাকছে না। না গান, না কথা মেয়েরা তাদের দুজনকে দেখে চমকে উঠলো। তারপর হেসে কুটোপাটি হবার জোগাড়। একজন বললো, মিয়ারা দেহি অহনই আইয়া পড়ছো। বড় গরম মনে হইতেছে।
আরেক জন তাদেরকে বলে, বিশ্রাম নিতে দিবা না? ট্রাক পাইছো নাকি? যহন ইচ্ছা ইঞ্জিন চালাইবা? তার কথা শুনে পাশের মেয়েরা হেসে উঠে খিলখিল করে। তাদের হাসিতে অন্য মেয়েরা এসে জড়ো হয় উঠোনে। মজিদ তাদের দিকে তাকায় না। সোজা এসে হাজির হয় হালিমা খালার টিনের ঘরে। তিনি তখন বারান্দায় বসে পানি নিয়ে কুলি করছিলেন। মুখ ধুচ্ছিলেন। তাদের দু'জনকে দেখে মুখ ধোয়া বন্ধ করে তাকালেন। বেশ অবাক হয়েছেন আর চমকে গিয়েছেন, দেখেই মনে হলো।
মজিদ উঠোনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর হয়ে বললো, খালা একটা মাইয়ারে খুঁজতেছি। দেখছো?
কোন মাইয়া? কেমন মাইয়া? হালিমা খালা তাকায় দুজনের দিকে। তারপর মজিদকে উদ্দেশ্যে করে বলে, তুমি তো অনেক দিন আহো না। হঠাৎ আইয়া এক মাইয়ার খোঁজ করতাছো। হঠাৎ।
মজিদ বলে, পোয়াতি। শ্যামলা রঙ। দেখতে সুন্দর।
হালিমা বলেন, এহানে আইছে? কবে? কেডা আনলো?
মজিদ বলে, কাইল রাইতে। আসে নাই, তারে নিয়া আসা হইছে। ইচ্ছার বিরুদ্ধে।
একটা পোয়াতি মাইয়ারে এহানে নিয়ে আসবো ক্যান? তারে দিয়া কী কাম হইবো? ক্যাডা এই আহম্মকি কাম করতে যাইবো? তারপর একটু থেমে বলে। ইচ্ছার বিরুদ্ধে আনা হয় বটে। তবে এমুন মাইয়ারে আনবো ক্যান?
মজিদ ধমক দিয়ে বলে, পঁ্যাচাল পাইরো না। পোয়াতি মাইয়ার পেট খালাস হইলে তোমরা হ্যাদের কামে লাগাও। লাগাও না? তারপর উত্তরের অপেক্ষা না করে বলে, ভান-ভনিতা কইরো না। সত্যি কথা কও। পোয়াতি মাইয়াটারে কই রাখছো শুনি।
হালিমা মাথা নেড়ে বলে, কার কথা কইতেছো? ক্যাডা আনছে তারে? আমি তো কিছুই জানি না। সক্কালে আসি কী কথা কও তুমি মজিদ মিয়া?
মজিদ বলে, জবেদ দালাল। হে আনছে। আমার ট্রাক থেইকা তুইলা আনছে।
তোমায় ট্রাক থেইকা? কোনহানে ছিল তোমার ট্রাক? জবেদ গেল কেমনে সেহানে? খোঁজ পাইলো ক্যামনে? মজিদ বললো, হেইডা জবেদই কইবো। এ্যাহন পঁ্যাচাল রাহ। কও মাইয়াডারে দেখছো কিনা। দেখলে কই রাখছো তারে।
নারে বাবা। কোনো পোয়াতি মাইয়া দেহি নাই আমি। সারা রাত জ্বরে কাঁপছি। হুইয়াই ছিলাম। এই সকালে উঠলাম। কাউরে দেহি নাই।
মজিদ কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, জবেদ কোনহানে? তার ঘরটা কোথায় দেখাও দেহি।
হালিমা খালা পানির জগ একহাতে নিয়ে অন্য হাত তুলে বলে, হঁ্যা কি আমারে কয় কোনদিন কোনহানে থাকে? সে চলে তার মর্জি মাফিক। আমারে পাত্তা দেয় না। বয়স হইছে বইলা কেউ এহন পাত্তা দেয় না।
মজিদ কাছে এসে বলে, খালা তুমি সব জানো। এই পাড়ায় কোনহানে কী হইতেছে কিছুই তোমার অজানা থাহে না। তোমার নজর রইছে সব খানে। এ্যাহন শেষবারের মত কই কোনহানে জবেদরে পামু কও। আমার সময় নাই অনেক দূর যাতি হবে। দেরী হয়ি যাতিছে।
হালিমা খালা কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে, মারো ধরো। যা ইচ্ছা করো। কপালে এইসবই লেখা আছে আমার। গায়ে হাত দিবা? দাও। তাকায়া আছো ক্যান?
মজিদ বারান্দায় দাঁড়ানো একটা মেয়ের হাত ধরে বলে, এই মাগি নিয়া চল্ কোথায় আছে জবেদ। তোরা সবাই জানিস্। চল্। বলে সে টানতে টানতে নিয়ে যায় মেয়েটাকে।
পেছন থেকে জোরে জোরে কেঁদে বিলাপ করতে থাকে হালিমা খালা। তার কান্না শুনে কয়েকজন মেয়ে এসে ঢোকে বাড়ির উঠোনে আশেপাশের ঘর-বাড়ি থেকেও মেয়েদের গলার স্বর শোনা যায়। তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে বলে মনে হলো।
মেয়েটা তাদের দুজনকে অাঁকা-বাঁকা গলি-পথ হয়ে নিয়ে গেল একটা লম্বা টিনের ঘরের সামনে। কয়েকটা মুরগী কিছু খাচ্ছিলো উঠোনে খুঁটে খুঁটে। তাদের দেখে ক্ক্র শব্দ করে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। একটা বেড়াল বারান্দায় বসে মুরগীগুলোর দিকে তাকিয়েছিল। সেও এক লাফে উঠোনে নেমে চোখের আড়ালে চলে গেল। সজনে গাছের ডালে বসে ডাকতে থাকলো কয়েকটা কাক কর্কশ করে। মজিদ লাফ দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো। তিনজন শুয়ে আছে মেঝেতে পাতা বিছানায়। তাদের মধ্যে জবেদকে দেখেই চিনলো। দুহাত দুদিকে দিয়ে হাত একপাশে করে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। তার লুঙ্গি উঠে গিয়েছে কোমর পর্যন্ত। বিচিশুদ্ধ পুরুষাঙ্গ দেখা যাচ্ছে। ঘরে মদের বাসি গন্ধ। এক কোনে ক্যারু কোম্পানীর দুটো খালি বোতল, কয়েকটা প্রান চানাচুরের খালি প্যাকেট। লাল পিঁপড়ের লাইন যাচ্ছে সেই প্যাকেটের দিকে। ঘরের দুটো জানালার মধ্যে একটা খোলা। রোদ এসে তেরছা হয়ে পড়েছে বেড়ার দেয়ালে।
মজিদ কাছে গিয়ে জবেদের পাছায় লাথি মেরে বললো, এই শালা ওঠ। খুব ঘুমানো হইছে। মনে করিছো পার পায়ি যাবা। হ তোমারে দেখাইতিছি মজা।
জবেদ ধড়মড়িয়ে উঠে বসে। চোখ রগড়ে মজিদ আর জব্বরকে দেখে ভূত দেখার মত চমকে ওঠে। তারপর লাফিয়ে উঠে পালাতে চায়। মজিদ লাথি মেরে তাকে মেঝেতে ফেলে দেয়। অন্য দুজন তখন গোলমাল শুনে ঘুম থেকে উঠে তাকায়। জবেদের আর্তস্বর শুনে তার দিকে তাকিয়ে একজন বলে, কী হইতেছে জবেদ? এরা কারা? সন্ত্রাসী?
মজিদ দুজনের পাছায় লাথি মেরে কঠিন স্বরে বলে, হা সন্ত্রাসী। এ্যাহন বাঁচতে চাইলে চুপ কইরা থাক। এই শালারে সাইজ কইরা নিই।
একে তো মেঝেতে শুয়ে আছে তার ওপর জবেদের কাকুতি মিনতি দেখে দুইজন আর হৈ চৈ করে না। তারা বুঝতে পারে যে জবেদ কিছু একটা করেছে যার কারণে এই দুইজন ঘরে ঢুকে মারধোর করছে। শালা জবেদের সঙ্গে রাত কাটালো কেন তারা? এর আগেও এমন এক কাণ্ড হয়েছিল। অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিল সেবার তারা। যারা আক্রমণ করেছিল তাদের হাতে অস্ত্র ছিল। এদের হাতেও যে নেই তা কে বলবে? তারা চুপ করে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করলো।
মজিদ পাছায় একটা লাথি কষে জবেদকে বললো, উঠ শালা। চল, কুলসুমের কাছে নিয়া যাবি? কই রাখছ্স তারে? কুলসুম? জবেদ অবাক হয়ে তাকায়।
হ হারামজাদা কুলসুম। ভুইলা গেছো এহনি। কাইল রাইতে আমাদের কোকাকোলা খাওয়াইয়া পোয়াতি মাইয়াটারে নিয়া আইছো। ভাবছো কিছু কমু না। ঝামেলা না কইরা যামু গিয়া? তা হইবো না। আইছি কুলসুমকে নিতে। চল, তার কাছে নিয়া চল।
আমি জানি না। বলে জবেদ মজিদের দুই পা ধরতে যায়। মজিদ আরেকটা লাথি দিয়ে বলে, বাঁইচতে চাইলে চল্। বেশী টাইম নাই আমাদের। উঠ শালা। সে আরেকটা লাথি মারার জন্য পা তোলে। জবেদ ধড়মড়িয়ে উঠে বসে। তারপর উঠে দাঁড়ায় কাঁপা কাঁপা পায়ে। বোঝা যায় এখনো তার নেশার ঘোরটি কাটে নাই। সে আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
জব্বর তার পেছনে গিয়ে 'পিঠে কনুই দিয়ে ধাক্কা দেয়। হুঙ্কার দিয়ে বলে, খুব চালাকি। কোকাকোলা খাওয়াইয়া অজ্ঞান করিছো। মনে করিছো আমরা টের পামু না। আমার ওস্তাদরে চিনো না। রাগি গেলে তার মাথায় খুন চাপি যায়। চল্ কুলসুমের কাছে নিয়া জানে বাঁচতে চাইলে।
জবেদ যেতে যেতে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে, আমার দোষ না। বস্ কইলো উঠাইয়া আনতি। আমি একা আনি নাই।
রাখ তোর বস্। তারে পরে দেখা যাইবো। এহন কুলসুমের কাছে নে। না হইলে তোর খবর আছে।
হালিমা খালায় টিনের ঘরের পেছনে বন্ধ একটা ঘরের মেঝেতে শুয়েছিল কুলসুম। তার হাত-পা বাঁধা। মুখে কাপড় গোজা। সে গোঙাচ্ছিল। মজিদ এক লাফে কাছে গিয়ে কুলসুমের হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দিলো। তারপর মুখের কাপড় বার করে আনলো। কিছুক্ষণ হাঁফাতে থাকলো কুলসুম।
তারপর তাদের দুজনকে দেখে কাঁদতে শুরু করলো বাচ্চার মত। মজিদ বললো, কাইদো না। বিপদ কাইটা গিছে। আমরা আইয়া পড়ছি। এ্যাহন চলো যাই যশোর।
উঠোনে এসে তারা দেখে বেশ কয়েকজন মেয়ে এসে জড়ো হয়েছে আশপাশের ঘর থেকে। হালিমা খালা বারান্দায় বসে আছে মুখ নিচু করে। তার গলায় নিচু স্বরের বিলাপ। চুপ হয়ে শুনলে শোনা যায়, সে বলছে আমি কী করুম। আমার কী ক্ষমতা আছে না করার।
মজিদ তার দিকে তাকিয়ে বললো, সকালে একটা উইঠা হাছা কথা কইলেও পারতা। সারা জীবনই কী পাপ কইরা সাইবা?
জবেদ কিছু দূর এসে বলে, আমি আর যামু না।
ক্যান? তুই যাবি না ক্যান? পঁ্যাচ মারতে চাস্ পেছন থেইকা? বড় বদ বুদ্ধি তোর। মজিদ বলে।
না ওস্তাদ কিছু করুম না। রাস্তায় দেখলে আমার কেইস খারাপ হইয়া যাইবো। নিয়া যাইতেছো যাও। আমি চিৎকার দিমু না। কিছু করুম না। পরে কমু মাইয়াটা জালাসা গিছে। বলে সে দু'হাত জড়ো করে মাফ চাইতে থাকে।
জব্বর বলে ছাইড়া দাও ওস্তাদ। আর কিছু করবো বইলা মনে হয় না।
মজিদ কুলসুমের কাঁধে হাত দিয়ে ধরে আস্তে আস্তে বড় রাস্তায় এসে দেখে কিছু লোক জড়ো হয়েছে। তারা শুনতে পেয়েছে কিংবা কেউ এসে বলেছে। তাদের তিনজনের দিকে তাকিয়ে আছে সবাই।
পানের দোকানী তাদের দেখে বললো, এই মাইয়াটারেই খুজতাছিলা? কী য্যান নাম কইছিলা। কুলসুম? হু। তারপর বলে, পোয়াতি। তারে এহানে আনলো ক্যাডা?
মজিদ কোনো উত্তর দিলো না। ভিড়ের মধ্যে থেকে কয়েকজন একসঙ্গে বলে উঠলো, তোমার ক্যাডা হয়? কই লইয়া যাও?
মজিদ এসব প্রশ্নেরও উত্তর দেয় না। সে কুলসুমকে ধরে ধরে অদূরে রাস্তার পাশে ট্রাকের কাছে নিয়ে যেতে থাকে। কুলসুম পেটের বাচ্চার জন্য বেশী জোরে হাঁটতে পারে না। আস্তেই হাঁটুক সে। কোন বিপদ নাই। মজিদ সোজা ট্রাক নিয়ে চলে যাবে যশোর।
ট্রাকের কাছে পৌঁছানোর আগেই একটা বেবি ট্যাক্সি করে কয়েকজন পুলিশ এসে নামলো। তাদের তিনজনের সামনে দাঁড়িয়ে বললো, কে তোমরা? কোথায় যাও?
মজিদ বললো, আমি ঐ ট্রাকের ড্রাইভার। যশোরে যাইতেছি।
যশোর? তা এই মাইয়া মানুষটা কে? কী হয় তোমার?
মজিদ আমতা আমতা করে। তারপর বলে, খালাতো বোন। তার মায়ের বাড়ি পেঁৗছায়া দিতে নিতাছি। কোথায় তার মায়ের বাড়ি? পুলিশের একজন বন্দুক কাঁধে ঝুলিয়ে বলে।
শার্সা। মজিদ বলে পুলিশ তিনজনের দিকে তাকায়।
পুলিশ তিনজন নিজেদের মধ্যে কিছুক্ষণ আলাপ করে। এতক্ষণে ঘাটের কাছে যে ভিড় জমেছিল সেখান থেকে কয়েকজন এসে পেঁৗছায়। তাদের একজন বলে, মাইয়াটারে নিয়া জবর ফাইট হইছে।
ফাইট? কোথায়? পুলিশদের নেতা জিজ্ঞেস করে।
দৈলেতদিয়ার পাড়ে। এরা মারধোর কইরা মাইয়াডারে নিয়া যাইতাছে। গোলমাল আছে মনে হয়। পরিষ্কার কেইস না।
পুলিশ তিনজনের নেতা মজিদকে বলে, চলো থানায়। গোয়ালন্দ থানায়। জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
জিজ্ঞাসাবাদ কেন? আমার লাইসেন্স দেখেন। গাড়ির পারমিট দেখেন। মজিদ পকেটে হাত দেয়।
একজন পুলিশ বলে, মাইয়া মানুষটারে যে নিতাছো তার পারমিট আছে? বড় সেয়ানা মনে হয়। চলো থানায়।
মজিদ অসহায়ের মতো বলে, আমারে নিয়া চলেন। মাইয়াটারে যাইতে দিন। দ্যাখতেছেন না ক্যাম্ন শরীরের অবস্থা। যহন তহন ব্যথা উঠতে পারে।
চল্ ব্যাটা। সবাই চল। ফন্দি আটিস না ব্যথা উঠলে আমরা দেখবো। তুমি যে মাইয়া পাচার করতাছো না হেইডা দেখতে হইবো।
মাইয়া পাচার? এই পোয়াতি মাইয়ারে? মজিদ আকাশ থেকে পড়ে।
হা। এই পোয়াতি মাইয়ারে। অহনে চোরাচালানিরা বড় সেয়ানা হইয়া গেছে। পোয়াতি মাইয়া চালান দিতেছে। ভাবে সন্দেহ করবো না কেউ।
মজিদ পুলিশটার হাত ধরে বলে, ভুল করিতেছেন স্যার। আমরা সে ধরনের লোক না। যশোরে ট্রাক মালিকরে জিগাইলে ভালো সার্টিফিকেট দিবো। জিগাইয়া দেহেন।
পুলিশ তিনজন তাদের ধরে টেম্পোতে উঠিয়ে নিজেরাও বসে নিয়ে বলে, চল। এখন বেশী কথা কইস না। থানায় সব ফয়সলা হইবো।
তাদের কথা শুনে যারা জড়ো হয়েছিল তাদের মধ্যে উলস্নাস দেখা যায়। হৈ হৈ করে তারা টেম্পোর পেছনে কিছুদূর আসে। ধুলোর জন্য তারা বেশী দূর যেতে পারে না।
থানায় গিয়ে পুলিশ তিনজন তাদের তিনজনকে ভেতরে যে ঘরে ঢোকালো সেখানে একজন টেবিলে বসে লিখছিল। পুলিশদের একজন তাকে দু' পা ঠেকিয়ে হাত তুলে সালাম দিয়ে বললো, স্যার আসামী।
লিখতে থাকা পুলিশ মুখ তুলে মজিদ, জব্বর আর, কুলসুমকে দেখে বললো, কিসের আসামী?
পুলিশদের একজন বললো, আদমপাচারের। নারী পাচারের আগামী এই দুইজন। হাতে নাতে ধরা পড়ছে। বলে সে মজিদ আর জব্বরকে দেখালো। কুলসুম মাথা নিচু করে আছে। তার একহাত একটা। পেটের উপর কাপড় চেপে রেখেছে। তাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে। ঘরের মধ্যে পুরনো একটা ফ্যান ক্যাচক্যাচ শব্দ করে ঘুরছে। কয়েকটা চড়-ই এসে ঘরে ওড়াউড়ি আর শব্দ করছে। ফ্যানের শব্দের সঙ্গে তাদের ডাক মিশে যাচ্ছে।
ডিউটি অফিসার তাদের তিনজনকে দেখে পুলিশ তিনজনের দিকে ফিরে বললো, কোথায় পাইছো তাদের?
মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়িয়লা পুলিশ বললো, দৌলতদিয়া ঘাট পাড়ে। পাড়া থেকে পার হইয়া আইছে। ট্রাকে উঠবে এই সময়।
শুনে ডিউটি অফিসার টেবিলে রাখা ছোট লাঠি হাতে নিয়ে প্রচণ্ড জোরে মজিদের কাঁধে একটা আঘাত করে বললো, কিরে শালা চার করতে যাইতেছিলি? এই একটাই মাইয়া মানুষ, না আরো আছে? তোরা তো একজন কইরা পাচার করিস না।
মজিদ মার খেয়ে যন্ত্রণায় কঁকিয়ে ওঠে। তারপর গোঙাতে গোঙাতে বলে, আমরা পাচারকারী না স্যার। ট্রাক ড্রাইভার আর হেলপার। এই যে লাইসেন্স আছে। বলে সে পকেট থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স বের করে। ডিউটি অফিসার মুখ খিস্তি করে বলে, রাখ তোর লাইসেন্স। মাইয়া মানুষ নিয়া ট্রাকে উঠতিছিলি ক্যান? এই ধরনের মাল লওনের লাগি ট্রাক?
মজিদ বলে, খালাতো বোন। স্বামী তালাক দিছে। তাই তাকে মায়ের কাছে নিয়া যাতিছি। জিগায়া দ্যাখেন। তারপর স্বর নামিয়ে বলে, নয় মাসের পোয়াতি ম্যায়া। বেশীও হইতে পারে। এমুন মাইয়া মানুষ কেউ পাচার করে?
ডিউটি অফিসার তার চেয়ারে বসে বলে, করে করে?
তোদের অনেক ফন্দিফিকির। অনেক চালাকি। পোয়াতি নিয়া ট্রাকে উঠলে কেউ সন্দেহ করবে না ভাবছিস্। তাই না? বড় ধুরন্ধর তোরা। তোদের সাথে তাল মিলাইয়া চলা মুশকিল। তারপর যে পুলিশ তিনজন ওদের ধরে নিয়ে এসেছিল তাদের উদ্দেশ্যে বললো, ওসি সাহেব তদন্তে গেছেন। আইতে টাইম নিবো। ওদের হাজতে ভর এখন। তিনি আইয়া সিদ্ধান্ত দিবেন। কী করবো এদের নিয়া।
পুলিশ তিনজন মজিদ, জব্বর আর কুলসুমকে নিয়ে লোহার গেট আলা একটা ঘরের দিকে যায়। সেখানে দু'জন মাটিতে বসে আছে, হাটুতে মুখ রেখে। চুল ও মুখ ধূসর দেখাচ্ছে গায়ের কাপড় ছেড়া। শরীরে, মুখে মারধোরের চিহ্ন। রক্ত বের হচ্ছে একজনের কপাল থেকে। তারা তাদের দেখে মাথা তুলে দেখলো। উদভ্রান্তের মত দৃষ্টি! ভীষন বোঁটকা গন্ধ আসছে ঘরটার ভেতর থেকে। মনে হলো জমে থাকা পেশাবের গন্ধ। রাইফেল হাতে পাহারা দিচ্ছিলো একজন পুলিশ। সে এসে তালা খুলে লোহার গেটের ভেতর ঠেলে দিল তিনজনকে। দরজা বন্ধ করার আগে জব্বর আর মজিদের পাছায় কষে লাথি মারলো। খিস্তি করে বললো, পেট বাধাইয়া নিয়া আইছো। ছদ্মবেশ। যত সব হারামী।
থানার বাইরে কিছু লোক জমেছে। তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভেতরের দৃশ্য দেখছে। মেয়েছেলে দেখে
তাদের উৎসাহ বেড়ে গিয়েছে। নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। হাসছে। রাইফেল হাতে পাহাড়াদার পুলিশ তাদের উদ্দেশ্যে বললো, এই যাও। তফাত যাও। মজা দেখতাছো নাহি? আইসো হাজতের ভিতরে তা হইলে আরো মজা পাইবা।
তার কথা শুনে লোকজন হি হি করে হাসে। তারা সত্যি মজা পেয়েছে। সকালবেলায় ঘুরছিল, কোনো কাজ নেই। তখন এখানে এসে যেন একটা কাজ পেয়ে গিয়েছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা, জল্পনা-কল্পনা করা। বেকার থাকলে এসবও কাজ হয়ে যায়।
সামনের চায়ের দোকানে পর্দার আড়ালে বসে চা খাচ্ছে, সিগারেট টানছে কয়েকজন। তারাও মাঝে মাঝে মাথা তুলে দেখছে থানার দিকে। একটা ছোট ছেলে ট্রেতে করে কয়েক কাপ চা নিয়ে গেল কাপড়ে ঢেকে। রমজান মাসের পবিত্রতা রাখার জন্য।
ট্রাকটা থানার সামনে একটা গাছের নিচে এনে রাখা হয়েছে। পুলিশই এনেছে লোক দিয়ে। ট্রাকের তার পাশে ঘুর ঘুর করছে কয়েকজন ছেলে। একটা কুকুর লাল জিভ বের করে সেলাল ঝরাচ্ছে।
দুপুরের দিকে মজিদ লোহার গরাদের কাছে এসে ডাক দিয়ে বললো, এই যে ভাই। শোনেন একটু।
রাইফেল হাতে পুলিশটা কাছে এসে ধমক দিয়ে বললো, ভাই হবি না। তোর কিসের ভাই? স্যার কবি। কী হইছে? ডাকছ ক্যান?
মজিদ বলে, আমরা দুইজন রোজা। কিন্তু পোয়াতি মাইয়াডা মানে আমার রোজা নাই। পোয়াতি মানুষ ক্যামনে রোজা রাখে। তারে দুপুরের খাওয়া দেওয়া লাগে। ভুক লাগছে।
পুলিশ মাথা নেড়ে বলে, এটা হোটেল না। খাওয়া নাই। তারেও রোজা রাখতে কও।
মজিদ অনুনয়ের স্বরে বলে, তার শরীর তো ভালা না। একটা কিছু খাইতে দেন। রুটি, চিড়া, মুড়ি। যাই পান।
পাহারাদার পুলিশ গরাদের কাছে এসে বলে, টাকা আছে? বার করো।
মজিদ পকেট থেকে দশ টাকার দুটো নোট বের করে দেয়। পাহারাদার পুলিশ দেখে বলে, তোর পকেটে আরো টাকা দেখা যায়। বার কর। হাজতে টাকা নিয়ে ঢোকার নিয়ম নাই। টাকা, ঘড়ি সব দে। জমা থাকবো। যাওনের সময় ফেরত পাইবি। বলে সে দাঁড়িয়ে থাকে। মজিদ ইতস্তত করে বুক পকেট থেকে টাকা আর হাতের ঘড়ি খুলে দেয়।
পুলিশ সেসব হাতে নিয়ে জব্বরের দিকে তাকিয়ে বলে, কীরে তোর কাছে কিছু নাই। চুপ করে আছোস? জব্বর বলে, আমি হেলপার। ওস্তাদের কাছেই সব থাকে। পুলিশ বলে, মিছা কথা কইলে বিপদ আছে। সার্চ করা হইতে পারে। থাকলে বার কর এখন।
জব্বর হাত কচলে বলে, নাই স্যার। সত্যি কথা কতিছি।
কিছু পর চায়ের দোকানের ছেলেটা একটা বড় রুটি আর চিনি নিয়ে আসে। পুলিশ সেসব পরীক্ষা করে দেখে হাজতের ভেতরে দিতে বলে।
কুলসুমকে রুটিটা দিয়ে মজিদ বলে, খাও। সকাল থেইকা কিছু খাও নাই।
কুলসুম বলে, আপনারা? খাইবেন না?
মজিদ স্বর নামিয়ে বলে, আস্তে বলো। আমরা রোজা। না, আমাদের খাওয়া লাগবো না। সকালে নাস্তা করছি ঘাটে। তুমি খাও। অনেক বেলা হইছে।
কুলসুম রুটি হাতে নিয়ে বসে থাকে। মজিদ বলে, কী হইলো খাও। মাছি বসতাছে।
কুলসুম বলে, আমার লাগি আপনাদের কত বিপদ হইলো। আমাকে আনতি গেলেন ক্যান? থাকতাম ঐ বেডির ঘরে। আমার জন্যি আপনারা এত কষ্ট করতাছেন ক্যান?
মজিদ বললো, এখন এসব কথা কইয়া লাভ নাই। যা হইবার হইছে। তুমি রুটি খাও। তারপর দেখা যাইবো আর কী হয়। তারপর একটু অধৈর্য হয়ে বলে, অত ডরাও ক্যান? আমরা ডরাইছি? ডরাই নাই। পুলিশ আমাদের মাঝে মাঝেই ধরে। মারধোর করে। নতুন কিছু না। তোমাকে আমাদের লাগি ভাবতি হবিনা। কুলসুম মাথা নিচু করে রুটি চিবোতে থাকে। অল্প শব্দ শোনা যায়। যেন ইদুরে কিছু খাচ্ছে। অন্য লোক দুটো মেঝেতে পড়ে ঘুমোচ্ছে। একজনের নাক ডাকছে। বাইরে কাকের কর্কশ শব্দ শোনা গেল।
বিকেলে তদন্ত শেষ করে ওসি সাহেব এলেন অফিসে ঢুকে বসে বললেন, নতুন আসামী এনেছো মনে হচ্ছে। কারা এরা?
ডিউটি অফিসার বললো, একজন ড্রাইভার, আর হেলপার। আর একটা মাইয়া মানুষ। পাচার করতে যাইতেছিল।
পাচার করছিল? কোথায় ধরা পড়লো? ওসি তাকান।
দৌলতদিয়া ঘাটে স্যার। ট্রাকে কইরা যাইতেছিল। সেই সময় টহলদার পুলিশ ধইরা আনছে।
ওসি চেয়ারে হেলান দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বললেন, আনো দেখি। তিনটারে হাজির করো। চবি্বশ ঘন্টার মধ্যে তো আবার কোর্টে হাজির করতে হবে। ঝামেলা আর কমছে না।
সামনে নিয়ে আসার পর কুলসুমকে দেখে ওসি বললেন, এই মেয়েকে পাচার করতে যাচ্ছিলো? এতো দেখি প্রেগন্যান্ট। এডভান্সড স্টেজে আছে। কী কাণ্ড। তারপর মজিদকে দে খে বাজখাই গলায় বলেন, কীরে ব্যাটা এরে পাচার করতে নিয়ে যাচ্ছিলি? এই অবস্থায়? তোরা কি অমানুষ। বদমায়েশের দল।
মজিদ তার ড্রাইভিং লাইসেন্স বার করে বলে, না হুজুর। আমার খালাতো বোন। স্বামী তালাক দিছে। তাই লইয়া যাইতেছিলাম তার মায়ের কাছে। ঘাটে ট্রাক উঠল এই সময় পুলিশ ধইরা নিয়া আইছে। আমি পাচারকারী না স্যার। এই দ্যাহেন লাইসেন্স। যশোরে মালিক আছেন। তারে ফোন কইরা দেখতে পারেন।
ফোন নম্বর আছে? ওসি তাকান মজিদের দিকে। তার মুখে ভ্রুকুটি।
আছে স্যার। এই যে নেন। বলে সে তাড়াতাড়ি পকেট থেকে ফোন নম্বর লেখা কাগজ বার করে দেয়।
ওসি ফোন তুলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে পেয়ে যান ট্রাকের মালিক হাজি সেলিমকে। দুজনে কিছুক্ষণ কথা হয়। তারপর ফোন রেখে তিনি বললেন, হ্যা। তোমার নাম শুনে চিনেছেন। তোমার হেলপারের নামও জানেন। কিন্তু মেয়েটার কথা কিছু জানেন না। মাল নিয়ে যাওয়ার কথা। কোনো মেয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা না। তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়ালো? তুমি নিজেই পাচার করছ। তোমার মালিক কিছু জানেন না। কিংবা জানলেও কিছু বলছেন না।
হঠাৎ কুলসুম বলে, আলস্নার কিরা। কিরা কইতাছি এরা আমাকে জোর কইরা আনে নাই। আমি ইচ্ছা কইরাই উঠিছি ট্রাকে। আমার মায়ের বাড়ী যামু।
সে কোথায় থাকে?
শার্সা। যশোরে।
হু। বলে ওসি কিছুক্ষণ ভাবেন। তারপর তিনি অফিসারকে বলেন, এডভান্সড স্টেজের একটা মেয়েকে নিয়ে পাচার করতে যাচ্ছে এটা সত্যি নাও হতে পারে। তাছাড়া একসঙ্গে কয়েকজনকে পাচার করে। একজনকে নেব কেন? এক কাজ করা যায়। এর স্টেটমেন্ট নিয়ে লাইসেন্সটা থানায় রেখে দাও। যশোর কোতওয়ালী থানায় গিয়ে সে রিপোর্ট করবে। তাদের কাছ থেকে রিপোর্ট পেলে এই লাইসেন্স ফেরত দেওয়া হবে। এই শর্তে ছেড়ে দেওয়া যায় এদের। আমাদেরও ঝামেলা কমবে তাতে।
তার সহকমর্ী বলে, ঠিক আছে স্যার। স্টেটমেন্ট লেখাইতাছি।
স্টেটমেন্ট দিয়ে সই করে বাইরে বেরিয়ে এল মজিদ, জব্বর আর কুলসুম। পাহাড়াদার পুলিশকে দেখে বললো, স্যার পকেট একেবারে খালি। যা নিলেন তার থেইকা কিছু ফেরত দ্যান।
পুলিশ রাইফেল কাঁধে নিয়ে বলেন, থানায় কিছু দিলে ফেরত পাওয়া যায় না। জানস না। চোপ্। যা অহন। তার কথা শুনে অন্য পুলিশও হাসে।
মজিদ কিছু বলে ট্রাকে উঠে। তার পাশে কুলসুম। অন্যপাশে জব্বর। সে বেশ রাগের সঙ্গে ইঞ্জিনে স্টার্ট দেয়। একটা গালি শোনা যায় তার মুখে। জব্বর সামনে তাকিয়ে বলে, বাঁচা গেল।
মজিদ মুখ খিস্তি কলে বললো, আপাতত:। যশোর কোতওয়ালী থানায় আবার কী হয় কেডা বলতি পারে।
শুনে কুলসুম অপরাধবোধ নিয়ে সামনে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু কিছু বলতে পারে না। তার কান্না পেতে থাকে। মনে হয় এরচেয়ে মরে যাওয়া ভাল ছিল। সে কেন গলায় দিল না তালাকের পরদিনই?
কিছুদূর আসার পর ইঞ্জিনটা ঘরঘর করতে থাকে। এমন ভান করে যেন থেমে যাবে।
মজিদ গিয়ার বদলে গতি কমিয়ে বিরক্ত হয়ে বলে, নাও এখন তোমারেই কিছু করা বাকি। কী করতি চাও? আমি যাতি আটকায়ো থাকি তাই করো। আজ রাতও না হয় তোমার ভেতরেই কাটিয়ে দেবো। যত সব অনাসৃষ্টি।
জব্বর বলে, সামনে রাজবাড়ি পর্যন্ত যাতি পারলি সমস্যা হবি না। মেলা ওয়ার্কশপ পাবো।
হ্যা। তা পাবো। কিন্তু যশোর পৌঁছাতে মনে হয় রাত কাবার হয়ি যাবে। কুফা লাগিছে। শেষের কথাটা বলেই সে আফসোস করে। কুলসুম নিশ্চয়ই ভাববে তার জন্যই সে কথাটা বলা। আসলে সে তাকে মনে করে কথাটা বলেনি। হঠাৎ এসে গেল। রাস্তায় যখন কোথাও দেরী হয় সে একথাই বলে থাকে। তখনতো কুলসুম বলে কেউ থাকে না। কিন্তু কুলসুম যদি একথা শুনে মন খারাপ করে তাহলে তাকে বোঝাবে কে? এইসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মেজাজটা তিরিক্ষি হয়ে আসে তার।সত্যিইতো রাস্তা থেকে মেয়েটাকে তোলার দারকার ছিল কী? চেনা-নাই, জানা নাই একটা মেয়ের জন্য তার দরদ উথলে ওঠাটা একটু বাড়াবাড়িই হয়ে গিয়েছে। তাও আবার পোয়াতি। এমন ঝামেলা কেউ স্বেচ্ছায় ঘাড়ে তুলে নেয়? পরক্ষনেই মনের ভেতর থেকে তাকে কেউ বলে তাকে, তুমি এমনি এমনি নাও নাই। কুলসুম তোমারে ডাকে নাই, তার ভিতরে তুমি তোমার বউ কুলসুমরে দেখছো। তার পেটেও বাচ্চা আছিল। বাচ্চা প্রসব করতে গিয়াই মইরা গেল সে। তহন তুমি তার পাশে ছিলোনা। ট্রিপে গিছিলা। কুলসুমরে দেইখা তোমার মনে পোয়াতি কুলসুমের কথা মনে হইছে। সে কুলসুম ছিল তোমার বউ। ভাবনাটা মনের মধ্যে লাফায়, তাকে অস্থির করে তোলে অশান্ত বাতাসের মত। সে হঠাৎ ঘামেতে থাকে। যেন ধরা পড়ে গিয়েছে তার গোপন ইচ্ছা নিয়ে। কেউ যেন হাসছে মুখে অাঁচল চাপা দিয়ে। সে জোরে ট্রাক চালায়। কয়েকটা বাস ওভারটেক করে।
জব্বর ঘাবড়ে গিয়ে বলে, করো কী ওস্তাদ? এত জোরে চালাও?
মজিদ হেসে বলে, ক্যান ডর লাগে তোর?
জব্বর বলে, কুলসুমের কথা ভাবো। তার পেটে বাচ্চা। এত লাফালাফি, হোচট খাওয়া কী তার সয়? ভাল হবি তার জন্যে?
শুনে মজিদ লজ্জা পায়। সে গাড়ির গতি কমিয়ে আনে।
কুলসুম বুঝতে পেরে বরে, অসুবিধা নাই। গাড়িতেই তো বইয়া আছি। কোনো অসুবিধা নাই।
বরং আপনারই কষ্ট হতিছে।
আমার? আমার কী কষ্ট? মজিদ চকিতে কুলসুমের দিকে তাকায় পাশ ফিরে।
কুলসুম বলে, ভাল করে বসতি পারতিছেন না। আমি জায়গা নিয়া নিছি। হো। বলে সে হাসে।
মজিদ বলে, আমার কোনো কষ্ট হতিছে না। তুমি জব্বরের জয়গা নিহো। তারপর বলে, ভালই করিছো। ও শালা একটু পর পর ঘুমায় আর আমার কাঁধে হেইলে পড়ে। এ্যাহন সেটা বন্ধ। তা তোমার ওপর হেইলে পড়তিছে নাতো? তার স্বরে কৌতূক।
কুলসুম বলে, না। তিনি ঐদিকে ঘেষে বসি আছেন। সেই তখন থেইকা। একবারও আমার গায়ে পরেন নাই।
শুনে মজিদ হাসে। তারপর বলে, মেয়ে লোক দেখলে হেলপার সাবধান হয়ে যায়। খুব ভদ্রতা দেখায়। সাহেবদের মত শুদ্ধ করি কথা কতি চায়।
জব্বর বলে, ঠাট্টা করো ক্যান ওস্তাদ। তারপর কুলসুমের দিকে তাকিয়ে সে বলে, সে রকম মনে হয়িছে তোমার? অনেক দুর তো একসঙ্গে আসিছি।
কুলসুম হেসে বলে, আপনারা দুইজনই ভালো। দুনিয়ায় এমন লোক আছে জানতাম না। ঠিক ভাইয়ের মত ব্যবহার করতিছেন।
জব্বর গর্বের সঙ্গে বলে, শুনলা ওস্তাদ। কেমন সার্টিফিকেট দিলো কুলসুম। অহনে তোমার ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলিও ক্ষতি নাই।
একটা ট্রাককে রাস্তা দিতে দিতে মজিদ বললো, হু।
রাজবাড়িতে পেঁৗছে এক ওয়ার্কশপে গাড়িটা দেখালো মজিদ। পাশের চায়ের দোকানে গিয়ে বসলো কুলসুম আর জব্বরকে নিয়ে। দোকানী বললো, ভেতরে যান। জায়গা আছে। ইফতারী দেওয়া হইবো। মজিদ বললো, এখানেই ঠিক আছে। ঠান্ডা বাতাস আসতিছে। ইফতারের টাইম হউক। তখন খাইতে দিয়েন। বলে সে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকে।
।। তিন ।।
যশোরে পৌঁছালো তারা রাত দুপুরে। শহরের রাস্তায় তখনো রিকশা চলছে, দু'-একটা বাস যাচ্ছে। প্রাইভেট গাড়ি দেখা গেল একটু পর পর। রাস্তায় লোকজন তেমন নেই, দোকানের সামনে বেশ ভিড়। বিশেষ করে চায়ের দোকান। কয়েকটা ওষুধের দোকানও খোলা।
হাজি সেলিমের আস্তানায় গেল মজিদ। এত রাতে কুলসুমকে নিয়ে বাড়ি যেতে কষ্ট হবে। তার না, কুলসুমের হবে। রিকশা পাওয়া যাবে কিন্তু শহরতলী পর্যন্ত যেতে সময় লেগে যাবে। যতই সেদিকে যাবে রাস্তা এবড়ো-থেবড়ো হয়ে আসবে। রিকশায় বসে লাফাতে হবে সিটের ওপর, হোঁচট খেতে হবে থেকে থেকে। পড়ে যাওয়ারও সম্ভাবনা বেশ। ট্রাক নিয়েই বাড়ি যাবে সে। সে ট্রাক থামিয়ে জব্বরকে রাস্তায় নামিয়ে বললো, সকালে কোতওয়ালী থানায় আসবা দুজনকেই হাজিরা দিতে কইছে। মনে আছে তো?
জব্বর বলে, মনে আবার নাই। যা কয়েকখন বুট জুতার লাথি খাইলাম। আরো খাইতে হইবো নাকি কে জানে।
শুনে কুলসুম লজ্জা পায়। সংকোচে মাথা নামায়। এরজন্য নিজেকেই দায়ী করে সে তা বোঝা যায়। তার মনের ভাব বুঝতে পেরে মজিদ বলে, জব্বরটা অমনই। কথার ছিরিবিরি নাই। বে-আক্কল যারে কয়। ট্রাক গ্যারাজে রেখে দিতে গিয়ে আরো কিছু সময় যায়। রাস্তায় এসে তারা একটা রিকশায় ওঠে। প্রথমে মজিদ ওঠে তারপর হাত দিয়ে যত্ন করে কুলসুমকে ওপরে ওঠায়। যতক্ষণ না উঠে বলে, আস্তে, আস্তে।
শহরের এক প্রান্তে থাকার জন্য একটু খোলামেলা। দক্ষিণ দিকে বাতাস পাওয়া যায় একটু পর পর।
তারা দুজন উঠোনে ঢুকতেই ঘুমন্ত কুকুরটা জেগে ডেকে উঠলো। গাবগাছে পেচাটাও ডাকলো কর্কশ স্বরে কয়েকবার। দক্ষিণ দিক থেকে বাতাস বয়ে এলো বাঁশঝাড়ে ঝর ঝর শব্দ তুলে। কুলসুম জড়োসড়ো হয়ে হাতের পুটলিটা জড়িয়ে ধরলো পেটের সঙ্গে। দেখে মজিদ হেসে বললো, আস্তে কইরা ধরো। বাচ্চাটা কষ্ট পাবি।
শুনে লজ্জা পেয়ে পুটলিটা সরিয়ে হাত দিয়ে জড়িয়ে লাখলো।
একটু পর মজিদের মা দরজা খুলে মাটির দাওয়ায় এসে বললেন, কেরে এত রাইতে? তার হাতে ধরা কুপির আগুন কাঁপছে বাতাসে। হলুদ আলো, ওপরে কুন্ডলী পাকানো কালো ধোয়া।
মজিদ বললো, আমি আম্মা।
তার মা আস্তে উঠোনে নামতে নামতে বললেন, এত রাইতে? আমি ভাবছি আজ আর আইবি না। তারপর মজিদের পাশে কুলসুমকে দেখে তিনি বলেন, মাইয়া মানুষ মনে হয়। ক্যাডারে মজিদ?
মজিদ বলে কুলসুম।
তার মা কাছে এসে কুলসুমকে ভাল করে দেখেন। কয়েকবার চোখ পড়ে তার স্ফীত পেটের দিকে। তারপর মজিদের দিকে তাকিয়ে বলেন, কুলসুম? ক্যাডা এই মাইয়া? কোত্থেকে আইলো?
মজিদ বললো, সে বড় লম্বা কিচ্ছা। কমু তোমারে। অহনে কিছু খাইতে দাও। তারপর ঘুমাইতে হইবো।
তার মা কুলসুমের দিকে তাকিয়ে বলেন, বিয়া কইরা শহরে। অহন বাচ্চা হওনের লাগি বাড়িতে আনছিস্। ভাল কথা। কিন্তু এত দিন কস্ নাই ক্যান? আমি কবে থাইকা কতিছি বিয়া কর। বিয়া কর। কানেই নিলি না। এহন বুঝছি কেন নেস নাই কানে। শহরে মাইয়া পাইছিস্। পছন্দ হইছে। তারপর কুপির আলো কুলসুমের মুখের উপর তুলে দেখে বলেন, পছন্দ হইবো না ক্যান? ক্যামন সুন্দর মুখ। মায়া-মহব্বত জড়ানো চোখ। আমারও পছন্দ হইছেরে মজিদ। ঠিক আমাগো কুলসুমের লাহান। বলতে গিয়ে তার গলাভারী হয়ে আসে। আইসো মা। ঘরে আইসো বলে তিনি কুপি হাতে সামনে হেটে যান। কুলসুম জড়োসড়ো হয়ে তার পেছনে যায়। দু'তিনবার মজিদের দিকে তাকায়। সেখানে লজ্জার আর সঙ্কোচ। মজিদ বলে, যাও, মায়ের লগে যাও। মারে সব কিছু কমু কাইল। কিছু নাই? মা কিছু কবে না। আমারে না, তোমারেও না। মা বড় ভাল মানুষ। তার একটাই দোষ। খালি বউ আন। বউ আন করেন। তোমাকে দেখি মনে হতেছি বউ আনিছি বুঝি। মজার কাণ্ড হবে বটে যখন সব কমু তারে।
পরদিন সকালে দেরিতে ওঠে মজিদ। চিড়া দই আর কাঠাল দিয়ে নাস্তা করে সে পেটপুরে। কুলসুম রান্নাঘরে মাকে সাহায্য করছে। পরে মা বলে, মাইয়াটা বড় ভালা। তারে কই, এত মেন্নত কইরো না। শরীরের এই অবস্থা। সে শোনে না। শুধু কাম করে। বড় ভালো মাইয়ারে মজিদ। এমন বউই চাইছিলাম। আলস্নাহ আইনা দিছে শেষ পর্যন্ত।
মজিদ বলে, মা তোমারে সব কমু। এহন যাই। জরুরী কাম আছে।
যাবার আগে সে কুলসুমের কাছ থেকে শার্সার তার সৎ ভাই-এর গ্রামের নাম, ঠিকানা নিয়ে নেয়। সে আজই সেখানে যাবে। কুলসুম সম্বন্ধে তার ভাইকে সব বলতে হবে।
কোতওয়ালী থানায় এসে দেখে জব্বর বারান্দায় বসে মাছি তাড়াচ্ছে। তাকে দেখে উঠে দাঁড়ালো। বলল, তুমি না আবার শার্সা যাইবা?
মজিদ বললো, বড় ধখল গ্যাছে কাইল। ঘুমাই নাই দুইদিন। তাই দেরী কইরা উঠলাম। তারপর বলে, তাড়াহুড়ার কী আছে। মালিকের কাছে গিয়া ট্রাক পেঁৗছায়া দিছি। মালামাল সব ঠিক পাইছেন। সব খুইলা
কইলাম তারে। তিনি খুব খুশী হন নাই, আবার বকাবকিও করেন নাই। কইছেন, তুই বড় আবেগপ্রবণ মানুষ মজিদ। মাথা দিয়া কাম করিস না। কলজাটা তোরে হুকুম দেয় যহন তহন আর কোনো হুশ থাকে না। শুধু শুধু ঝামেলায় পড়ছিস্। এহন দ্যাখ কী করি সুরাহা হয়। সমস্যা হলি আমারে ফোন করিস। আমি থানায় যামুনে।
থানায় ডিউটি অফিসারকে গোয়ালন্দ থানার লেখা স্টেটমেন্টটার কপি দেখাল মজিদ। সেই সঙ্গে ড্রাইভিং লাইসেন্সের ফটোকপি আর মালিক হাজি সেলিমের ঠিকানা।
ডিউটি অফিসার বলে, যারে নিয়া এতকাণ্ড সেই মাইয়াটা কই? তারপর কাগজে চোখ রেখে বলে, কুলসুম যে কই?
মজিদ বলে, পোয়াতি। যহন তহন অবস্থা। তাই বাড়িতে রাইখা আইছি।
ডিউটি অফিসার মাথা নেড়ে বলে, উহু। এতে হইবো না। দেখাতে হইবো সশরীরে। সে এহানে আছে না, বর্ডার পার হইয়া গ্যাছে। দেখতে হইবো। আনো এহানে।
মজিদ বলে, কেউ আমাদের বাড়ি গিয়া দেইখা আইতে পারে না?
শুনে ঠা ঠা করে হাসে ডিউটি অফিসার। তারপর বলে, মসকরা করতাছো? এইভাবে বাড়ি বাড়ি গিয়া তত্ত্ব-তালাশ করতি হলি থানা ফাঁকা হইয়া যাইবো না? ক্যাডা থাকবো থানায়? তোমরা?
মজিদ আমতা-আমতা করে বলে, তা হইলে বিকালে নিয়া আসি। এহন আমারে শার্সা যাইতে হইবো। কুলসুমের ভাইএর বাড়ি।
কুলসুমের ভাই-এর বাড়ি?
=====================================
গল্প- 'জানালার বাইরে' by অরহ্যান পামুক স্মৃতি ও গল্প- 'কবির অভিষেক' by মহাদেব সাহা ইতিহাস- 'ভাওয়ালগড়ের ষড়যন্ত্র' by তারিক হাসান আলোচনা- 'বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা' by বেলাল চৌধুরী আলোচনা- 'শিল্প সৃষ্টি ও নান্দনিকতা' by আহমদ রফিক আলোচনা- ''স্বর্ণকণা শোভে শত শত' মদির গন্ধভরা কণ্টকফল by মুহম্মদ সবুর বিশেষ রচনা :ওমর খৈয়াম by ড. শামসুল আলম সাঈদ নাটক- 'বিম্বিত স্বপ্নের বুদ্বুদ' by মোজাম্মেল হক নিয়োগী গল্প- 'জয়া তোমাকে একটি কথা বলবো' by জাহিদুল হক গল্প- 'নতুন বন্ধু' by আশরাফুল আলম পিনটু গল্প- 'টপকে গেল টাপ্পু' by ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ গল্প- 'নাচে বানু নাচায়রে' by আতা সরকার গল্প- 'রূপকথার মতো' by নাসির আহমেদ গল্প- 'বিয়ে' by আর্নল্ড বেনেট গল্প- 'মাদকাসক্ত' by আলী ইদ্রিস গল্প- 'বেঁটে খাটো ভালোবাসা' by রেজানুর রহমান কবর by জসীম উদ্দীন (পল্লীকবি) গল্প- 'নদীর নাম চিলমারী' by নীলু দাস গল্প- 'লাউয়ের ডগা' by নূর কামরুন নাহার গল্প- 'অপূর্ব সৃষ্টি' by পারভীন সুলতানা গল্প- 'ঊনচলিস্নশ বছর আগে' by জামাল উদ্দীন
দৈনিক ইত্তেফাক এর সৌজন্য
লেখকঃ হাসনাত আবদুল হাই
এই গল্প'টি পড়া হয়েছে...
গল্প- 'জানালার বাইরে' by অরহ্যান পামুক স্মৃতি ও গল্প- 'কবির অভিষেক' by মহাদেব সাহা ইতিহাস- 'ভাওয়ালগড়ের ষড়যন্ত্র' by তারিক হাসান আলোচনা- 'বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা' by বেলাল চৌধুরী আলোচনা- 'শিল্প সৃষ্টি ও নান্দনিকতা' by আহমদ রফিক আলোচনা- ''স্বর্ণকণা শোভে শত শত' মদির গন্ধভরা কণ্টকফল by মুহম্মদ সবুর বিশেষ রচনা :ওমর খৈয়াম by ড. শামসুল আলম সাঈদ নাটক- 'বিম্বিত স্বপ্নের বুদ্বুদ' by মোজাম্মেল হক নিয়োগী গল্প- 'জয়া তোমাকে একটি কথা বলবো' by জাহিদুল হক গল্প- 'নতুন বন্ধু' by আশরাফুল আলম পিনটু গল্প- 'টপকে গেল টাপ্পু' by ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ গল্প- 'নাচে বানু নাচায়রে' by আতা সরকার গল্প- 'রূপকথার মতো' by নাসির আহমেদ গল্প- 'বিয়ে' by আর্নল্ড বেনেট গল্প- 'মাদকাসক্ত' by আলী ইদ্রিস গল্প- 'বেঁটে খাটো ভালোবাসা' by রেজানুর রহমান কবর by জসীম উদ্দীন (পল্লীকবি) গল্প- 'নদীর নাম চিলমারী' by নীলু দাস গল্প- 'লাউয়ের ডগা' by নূর কামরুন নাহার গল্প- 'অপূর্ব সৃষ্টি' by পারভীন সুলতানা গল্প- 'ঊনচলিস্নশ বছর আগে' by জামাল উদ্দীন
দৈনিক ইত্তেফাক এর সৌজন্য
লেখকঃ হাসনাত আবদুল হাই
এই গল্প'টি পড়া হয়েছে...
About: Anonymous
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1402)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
-
▼
2010
(9402)
-
▼
November
(820)
-
▼
Nov 13
(26)
- জমজমের পানি ও কূপের ইতিবৃত্ত by মুহাম্মদ আবদুল মুন...
- আকিজ ফুড বাজারে নিয়ে এল ফ্রুটিকা গ্রিন ম্যাঙ্গো জুস
- শিল্পঋণে রাজনৈতিক প্রভাবের পূর্ণ দমন সম্ভব নয়: অর্...
- সাজা কমানো হলো চেন শুই বিয়ানের
- ত্বকের কোষ রক্তে রূপান্তরের পদ্ধতি উদ্ভাবনের দাবি
- পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমের ৪৪ নেতা-কর্মীর যাবজ্জীবন
- ইয়াসির আরাফাতের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী পালিত
- পার্সেল বোমা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে বিস্ফোরিত...
- করাচিতে সিআইডি ভবনে জঙ্গি হামলা, নিহত ২০
- ফের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন মালিকি
- হাইতিতে কলেরায় মৃতের সংখ্যা ৬৪৩
- পশ্চিমা স্বার্থে আঘাত হানতে নতুন কমান্ডার নিয়োগ লা...
- জর্জ বুশের বিরুদ্ধে তদন্ত চায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্...
- দুবাইয়ে স্পিন লড়াই
- চার দলের অলিখিত সেমিফাইনাল
- বীণা মালিক নিজেই বাজিকর!
- বিশ্বকাপের পোশাকি মহড়া
- আইসিসিকে জুলকারনাইনের পরামর্শ
- বন্ধুকে ইনিয়েস্তার শ্রদ্ধাঞ্জলি
- গল্প- 'বৃষ্টি নেমেছিল' by ইমদাদুল হক মিলন
- গল্প- 'সড়ক নভেল' by হাসনাত আবদুল হাই
- গল্প- 'জানালার বাইরে' by অরহ্যান পামুক (অনুবাদঃ না...
- স্মৃতি ও গল্প- 'কবির অভিষেক' by মহাদেব সাহা
- ইতিহাস- 'ভাওয়ালগড়ের ষড়যন্ত্র' by তারিক হাসান
- আলোচনা- 'বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা' by বেলাল চৌধুরী
- আলোচনা- 'শিল্প সৃষ্টি ও নান্দনিকতা' by আহমদ রফিক
-
▼
Nov 13
(26)
-
▼
November
(820)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
Recent Comments
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
প্রথম আলো
আন্তর্জাতিক
মানবজমিন
আলোচনা
কালের কণ্ঠ
উপ-সম্পাদকীয়
যুগান্তর
প্রথম পাতা
মতামত
জাতীয়
সমকাল
নয়া দিগন্ত
রাজনীতি
জনকণ্ঠ
সুশীল কথন
ভারত
অর্থনীতি
শেষের পাতা
বিনোদন
ক্রিকেট খেলা
দেশে দেশে
যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্য
স্পেশাল প্রতিবেদন
নির্বাচন
প্রথম আলো
খেলা
খোলা কলম
আইন আদালত ও বিচার
ফুটবল খেলা
আমার দেশ
ইসরায়েল
বাংলানিউজ
মুক্তধারা
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা
Lead
ফিলিস্তিন
রাজধানী
অপরাধ
আন্দোলন
এক্সক্লুসিভ
আইন ও মানবাধিকার
নারী
শিক্ষা
বিএনপি
সারা বিশ্ব
ইরান
ক্রিকেট
সাহিত্য
পাকিস্তান
মুক্তমঞ্চ
আওয়ামী লীগ
বাংলা ট্রিবিউন
শিশু
দুর্নীতি
সারা দেশ
বিশাল বাংলা
চট্টগ্রাম
ব্রেকিং নিউজ
সাউথ এশিয়ান মনিটর
সিলেট
ক্রীড়া
পার্সটুডে
অর্থ
খালেদা জিয়া
কালবেলা
অর্থ ও বাণিজ্য
শিল্প বাণিজ্য
চীন
বিবিসি বাংলা
কাশ্মীর
চতুরঙ্গ
খবরাখবর
প্রধানমন্ত্রী
বিশ্ব
নতুন বার্তা
হত্যা
ধর্ম
স্মরণ
গল্প
যুক্তরাজ্য
শিক্ষাঙ্গন
শেখ হাসিনা
ফুটবল
বার্তা২৪ ডটনেট
রস+আলো
সাক্ষাৎকার
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
মুসলিম
জাতিসংঘ
মুক্তিযুদ্ধ
রাশিয়া
মিডিয়া
হরতাল-অবরোধ
খেলা ধুলা
ছাত্রলীগ
প্রতিবেদন
ইতিহাস
ইউরোপ
সোহরাব হাসান
জামায়াতে ইসলামী
অমানবিক
সৌদি আরব
আলোকিত চট্টগ্রাম
পশ্চিমবঙ্গ
আইন
চাষাবাদ- কৃষি ও কৃষক
ফিচার
ভ্রমণ
মিজানুর রহমান খান
ওয়েছ খছরু
খোলা চোখে
বাংলাদেশ-ভারত
ইসলাম ও সমাজ
সিরিয়া
যৌন নির্যাতন
নারায়ণগঞ্জ
নারী ধর্ষণ
জাতীয় সংসদ
আনন্দ
খেলাধুলা
ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ
বিজ্ঞান ও গবেষণা
মাদক
আফ্রিকা
সন্ত্রাস
আনিসুল হক
যৌন আবেদনময়ী
প্রবাস
মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান
ছুটির দিনে
সৈয়দ আবুল মকসুদ
সংখ্যালঘু
নকশা
বিজ্ঞান প্রজন্ম ও কম্পিউটার
গোল্লাছুট
তুরস্ক
আফগানিস্তান
বইপত্র
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
অন্য আলো
প্রতারণা
ছবি
টাইমস্ আই বেঙ্গলী
প্রকৃতি
ব্যবসা বাণিজ্য
অপহরণ
দুর্ঘটনা
সাহিত্যালোচনা
ইউক্রেন
গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিক
জাতীয় পার্টি
রাজশাহী
স্টেডিয়াম
দীন ইসলাম
মানবাধিকার
তরুণ প্রজন্ম
ফূটবল খেলা
রোহিঙ্গা
মিজানুর রহমান
মশিউল আলম
আইন ও বিচার
আলী যাকের
রুদ্র মিজান
হিন্দু
মানবকণ্ঠ
খুলনা
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
আব্দুল কাইয়ুম
মালয়েশিয়া
তারেক শামসুর রেহমান
আসিফ নজরুল
নেপাল
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
সাজেদুল হক
ফারুক ওয়াসিফ
কাফি কামাল
মৌলভীবাজার
হাসান ফেরদৌস
স্বাস্থ্য
আনন্দ কণ্ঠ
তৃতীয় পাতা
যাপিত জীবন
সড়ক দুর্ঘটনা
ক্রিখেট খেলা
জ্যোতির্বিজ্ঞান
ফুটবল খলা
বদরুদ্দীন উমর
মরিয়ম চম্পা
আলী রীয়াজ
রংপুর
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া
নতুনের জানালা
বৃষ্টি ও বন্যা
মোস্তফা কামাল
শিল্প ও সাহিত্য
এ এম এম শওকত আলী
কক্সবাজার
বন্ধুসভা
সংবিধান ও রাষ্ট্র
ঢাকা
বগুড়া
মিয়ানমার
ঈদ বিশেষ সংখ্যা
বাংলাদেশ
অবৈধ-অনিয়ম-কারচুপি
এ কে এম জাকারিয়া
গবেষণা
নির্বাচনী কূটনীতি
বদিউল আলম মজুমদার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
মিসর
এম আবদুল হাফিজ
পরিবেশ
শোক
সংস্কৃতি
খবর
বাংলাদেশে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
অজয় দাশগুপ্ত
প্রজন্ম ডট কম
শুভ্র দেব
আবুল কাশেম
আমদানি ও রপ্তানি
ফ্রান্স
কিশোরগঞ্জ
আবদুল মান্নান
রঙের মেলা
ঐতিহ্য
জাপান
কুমিল্লা
মুক্তমত
রাজনৈতিক আলোচনা
শরিফুল হাসান
শিল্প
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল
মাহমুদুর রহমান
ময়মনসিংহ
লেবানন
সংবাদ২৪.নেট
পার্বত্য চট্টগ্রাম
সীমান্ত সন্ত্রাস
আহমদ রফিক
ইফতেখার মাহমুদ
কাজের খবর
ইরাক
স্বপ্ন নিয়ে
টাঙ্গাইল
HotTopic
জীবনযাপন
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর
যশোর
অমর সাহা
আনোয়ার হোসেন
আলী ইমাম মজুমদার
গাজীপুর
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
আবুল মোমেন
থাইল্যান্ড
মুফতি এনায়েতুল্লাহ
শ্রীলঙ্কা
চিকিৎসা
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
মেহেদী হাসান
রসালোচনা
কামরুজ্জামান মিলু
পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য
বরগুনা
কাজী সোহাগ
স্মৃতিচারণ
আনু মুহাম্মদ
কলকাতা
কুলদীপ নায়ার
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
সারাবেলা
অস্ট্রেলিয়া
তথ্য প্রযুক্তি
মারুফ কিবরিয়া
ব্রাজিল
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
অন্য দিগন্ত
মহিউদ্দীন জুয়েল
মানসুরা হোসাইন
মুনতাসীর মামুন
শিরোনাম
শেখ রোকন
আবু সাঈদ খান
জেল থেকে জেলে
ফেসবুক
মহিউদ্দিন আহমদ
সংবাদ
কবিতা
বিশ্বজিৎ চৌধুরী
আলী হাবিব
প্রকৃতি ও পরিবেশ
শিল্প ও বাণিজ্য
শেষ পাতা
আবু আহমেদ
এম সাখাওয়াত হোসেন
নুরুজ্জামান লাবু
নূর মোহাম্মদ
সুভাষ সাহা
আতাউস সামাদ
আলোচনা মতামত
অর্থনীতি ও বানিজ্য
এবিএম মূসা
আতাউর রহমান
কামাল আহমেদ
পিয়াস সরকার
আসাম
মসজিদ
রংবেরং
রাহীদ এজাজ
শ্রদ্ধাঞ্জলি
আশরাফুল ইসলাম
ফেনী
বরিশাল
রণজিৎ বিশ্বাস
রোকনুজ্জামান পিয়াস
অরুণ কর্মকার
ইয়েমেন
প্রকৃতি ও বিজ্ঞান
মোস্তফা হোসেইন
Exclusive
একরামুল হক
আশীষ-উর-রহমান
একরামুল হক শামীম
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
তুহিন ওয়াদুদ
অপরাজিতা
ইন্দোনেশিয়া
উত্তর কোরিয়া
কালি ও কলম
জলবায়ু ও পরিবেশ
জাগোনিউজ২৪.কম
মইনুল ইসলাম
মানিকগঞ্জ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
মোশতাক আহমেদ
আশরাফুল হক রাজীব
ফরহাদ মাহমুদ
প্রণব বল
শংকর কুমার দে
সেলিম জাহিদ
আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
কামরুল হাসান
পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য
রাজীব আহমেদ
শিল্পী
সাময়িকী ফ্যাশন
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
বিদ্যুৎ
মোরসালিন মিজান
রবার্ট ফিস্ক
অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য
ঈদ
কাজী সুমন
ঝিলিমিলি
মুস্তাফা জামান আব্বাসী
কুষ্টিয়া
জাতীয় নাগরিক পার্টি
মনজুরুল হক
মহসীন হাবিব
মাহবুব মোর্শেদ
রফিকুল ইসলাম
শিলালিপি
শুভ রহমান
চৌধুরী মুমতাজ আহমদ
ছিটমহল
নিবন্ধ
jugantor
নোবেল পুরস্কার
পাঠকের মতামত
পাবনা
মোশাররফ বাবলু
তানভীর সোহেল
মামুন রশীদ
আনন্দ প্রতিদিন
উৎপল রায়
এনামুল হক
কাজল ঘোষ
নদী দূষণ
নাটোর
নিত্যপণ্য
ফাহিমা আক্তার সুমি
বাংলা নববর্ষ
উচ্চশিক্ষা
চারু শিল্প
ভেনেজুয়েলা
শওকত হোসেন
নজরুল ইসলাম
নিউজিল্যান্ড
বিজ্ঞান
পার্থ সারথি দাস
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
গোলাম মর্তুজা
ফরহাদ মজহার
শারমিন নাহার
principalsanaullah
আদিবাসী
কালের খেয়া
দিল্লি
ফখরুল ইসলাম
বাংলাদেশ প্রতিদিন
মুখোমুখি প্রতিদিন
মোহীত উল আলম
রাহাত খান
অমিতোষ পাল
গল্পালোচনা
পানি আগ্রাসন
প্রযুক্তি
বিশ্বজিৎ পাল বাবু
মাহবুব তালুকদার
আব্দুল কুদ্দুস
কানাডা
বিদেশ
WikiOpinion
জনস্বাস্থ্য
তোফায়েল আহমেদ
তৌহিদা শিরোপা
কাতার
আলোকিত বাংলাদেশ
কাদের সিদ্দিকী
ড. আবু এন এম ওয়াহিদ
ফারুক মঈনউদ্দীন
মোছাব্বের হোসেন
উৎপল শুভ্র
দিনাজপুর
নোমান মোহাম্মদ
সুদীপ অধিকারী
অরূপ দত্ত
পাভেল পার্থ
ফরিদপুর
ফিরোজ মান্না
মাসুদ পারভেজ
রোজিনা ইসলাম
শরিফুজ্জামান
হামিদ-উজ-জামান মামুন
আকমল হোসেন
আজিজুর রহমান
আলম শাইন
ঝড় ও দুর্যোগ
তারেক মাহমুদ
দীপংকর চন্দ
পাভেল হায়দার চৌধুরী
ফখরে আলম
মাসুদ রানা
শহিদুল ইসলাম
আবুল হাসনাত
আসিফ আহমেদ
ইশতিয়াক পারভেজ
জিয়া চৌধুরী
শিশির মোড়ল
হারুন হাবীব
হুমায়ূন আহমেদ
অমিত বসু
আল আমিন
ওমর ফারুক
ফজলুল বারী
ফারুক চৌধুরী
মাসুদ মিলাদ
শর্মিলা সিনড্রেলা
শাহাদুজ্জামান
হায়দার আকবর খান রনো
জাবেদ রহিম বিজন
জাহাঙ্গীর আলম
ট্রানজিট
নন্দন
যতীন সরকার
যুবলীগ
আরিফুজ্জামান তুহিন
কাজী আনিছ
খাবার
গাজীউল হাসান খান
তারেক রহমান
বাংলার দিগন্ত
মোহাম্মদ কায়কোবাদ
লাতিন আমেরিকা
শেখ হাফিজুর রহমান
শৈলী
সাতকানিয়া
সুদান
কাজী হাফিজ
জার্মানি
জোবাইদা নাসরীন
নিয়ামত হোসেন
মাহফুজুর রহমান মানিক
লুৎফর রহমান রনো
ইমরান আলী
এস এম আজাদ
জাহাঙ্গীর শাহ
মাহমুদুর রহমান মান্না
মুশফিকুর রহমান
সাতক্ষীরা
ইকতেদার আহমেদ
উৎসব
ঝিনাইদহ
মাসুদা ভাট্টি
মোকারম হোসেন
শেখ সাবিহা আলম
সিরাজগঞ্জ
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
হারুন আল রশীদ
WikiEducation
উজ্জ্বল মেহেদী
কনকচাঁপা
ড. মাহফুজ পারভেজ
পরিতোষ পাল
মিঠুন চৌধুরী
শাহদীন মালিক
হায়দার আলী
আহমেদ জামাল
ইমদাদুল হক মিলন
নওগাঁ
পোশাকশিল্প
বাতায়ন
ব্যবসা
আবু সালেহ আকন
এমাজউদ্দীন আহমদ
টিপু সুলতান
ড. মাহবুব উল্লাহ্
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
শোকাবহ ১৫ ও ২১ আগস্ট
WikiInternational
এবনে গোলাম সামাদ
পারভেজ খান
ফজলুল আলম
ফরিদা আখতার
বিভাষ বাড়ৈ
মাহমুদুজ্জামান বাবু
মুনির হাসান
মোশতাক আহমদ
সুনামগঞ্জ
আপেল মাহমুদ
আরব আমিরাত বা দুবাই
জহির উদ্দিন বাবর
নোয়াখালী
রিপন আনসারী
শরীফুল ইসলাম
সুব্রত আচার্য্য
উপন্যাস
কাল স্রোত
ক্রীড়া দিগন্ত
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
গাজীউল হক
জাহীদ রেজা নূর
শাহনেওয়াজ বিপ্লব
সাইদুজ্জামান
সাময়িকী
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
অনন্যা আশরাফ
অনিকা ফারজানা
আদিত্য আরাফাত
ইফতেখার আহমেদ টিপু
কামাল লোহানী
ড. সা'দত হুসাইন
তামান্না ইসলাম অলি
দক্ষিণ কোরিয়া
ফারজানা লাবনী
ফারুক যোশী
মনজুর আহমেদ
রিয়েল-টাইম নিউজ
লিবিয়া
আসজাদুল কিবরিয়া
জলবায়ু
বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
রশিদ মামুন
লক্ষ্মীপুর
সম্পাদকীয়
সাইফুদ্দীন চৌধুরী
সুমন বর্মণ
BBC
ইমরান রহমান
ইলিরা দেওয়ান
এম শাহজাহান
কাক ছোট গল্প
ছিনতাই
নওশাদ জামিল
নুরুন্নবী চৌধুরী
প্রতীক ওমর
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
বিকাশ দত্ত
মনিরুজ্জামান
মহিউদ্দিন আহমেদ
উইঘুর মুসলিম
দৈনিক ইত্তেফাক
পিটার কাস্টার্স
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রিয় চট্রগ্রাম
বাজেট
বাণিজ্য
মোবাশ্বির আলম মজুমদার
সঞ্জয় সাহা পিয়াল
হবিগঞ্জ
খুন
টাকা আনা পাই
মাহবুবুর রহমান
শুভজ্যোতি ঘোষ
হাছান কুতুবী
Hot Topic
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
আবিষ্কার
ড. কামাল
দৈনিক ইনকিলাব
ফিলিপাইন
ভুটান
সাভার
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ
নিয়ন আলোয়
শফিক রহমান
শামীমুল হক
শেয়ারবাজার
আইন আদালত
ইতালি
গ্রিনল্যান্ড
নারী নির্যাতন
পটুয়াখালী
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
মণিপুর
মাগুরা
মেক্সিকো
অনিম আরাফাত
ইসলাম
কিরণ শেখ
জাভেদ ইকবাল
দুদক
মহাকাশচারী
রাঙ্গামাটি
Art Mag
আরিফুল ইসলাম
প্রতিবাদ
প্রবাসী বাঙালি
বান্দরবান
মালদ্বীপ
শফিকুল ইসলাম
শিক্ষানীতি
সংবিধান
ডিডাব্লিউ
শরিফ রুবেল
কূটনীতি
গাইবান্ধা
ঝালকাঠি
নরসিংদী
নাইজেরিয়া
বায়ুদূষণ
শাহনাজ পারভীন
স্বাধীনতা
WikiCity
WikiPolitics
জোহরান মামদানি
বৌদ্ধ
মতিউর রহমান চৌধুরী
যৌন অপরাধ
WikiInterview
আকবর হোসেন
কিশোর আলো
জলবায়ু পরিবর্তন
দৈনিক সংগ্রাম
Exclusive Articles
WikiEconomy
WikiLaw
ইসলামী ছাত্রশিবির
ঘূর্ণিঝড়-হারিকেন
বাগেরহাট
ভূমিকম্প
রাজনৈতিক
সমিতির খবর
সানজানা চৌধুরী
সায়েদুল ইসলাম
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
আমাদের সময় ডট কম
কুতুবদিয়া স্পেশাল
খাগড়াছড়ি
চুয়াডাঙ্গা
ধর্মঘট
আইন ও আদালত
ইহুদি
কাদির কল্লোল
তাইওয়ান
দুর্গোৎসব ও পূজা
দৈনিক আমার সংবাদ
নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা 2013.
নূরে আলম সিদ্দিকী
প্রতিক্রিয়া
বিডিআর বিদ্রোহ
ব্যাংক
মুন্সীগঞ্জ
শিশুসাহিত্য
খ্রিষ্টধর্ম
গদ্যকার্টুন
প্রতিদিনের সংবাদ
ভোরের কাগজ
রুমিন ফারহানা
Hit
আর্জেন্টিনা
পিরোজপুর
বন্যা
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
সরল গরল
স্পেন
Asia
গণমাধ্যম
ডেনমার্ক
পরামর্শ
প্রকৃত্
ভাষা
ভোলা
MERIT
Soikot
WikiWoman
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
উন্নয়ন
জর্ডান
জ্বালানি
পিলখানা হত্যাকাণ্ড
ফ্যাশন
রঞ্জন বসু
সাংসদ
হরতাল
WikiCrime
উইকিলিকস
ক্রিকেট ও রাজনীতি
গণতন্ত্র
গোপালগঞ্জ
চাঁদপুর
চিত্রকর্ম
ছাত্ররাজনীতি
জঙ্গিবাদ
জন্মদিন
তেল-গ্যাস
দক্ষিণ ধুরুং
দূর পরবাস
নাকিবুল আহসান নিশাদ
নারী অধিকার
নোবেল শান্তি পুরস্কার
পঞ্চগড়
পরীক্ষা
বিজয় দিবস
মেঘালয়
রাঙামাটি
সুশাসনের জন্য নাগরিক
হামলা
আন্দালিব রাশদী
ঈদুল আজহা
এনটিভি
কক্সবাজার নিউজ ডটকম
কুতুবদিয়া নিউজ
চট্টগ্রাম বন্দর
ছাত্র রাজনীতি
ঠাকুরগাঁও
ডিজিটাল বাংলাদেশ
তথ্য অধিকার
দ্বিজেন শর্মা
নির্যাতন
নড়াইল
প্রবাসী শ্রমিক
ভারতের প্রধানমন্ত্রী
মৃত্যু
শারদীয় দুর্গোত্সব
শিশুমৃত্যু
শিশুহত্যা
সালমান রাফি শেখ
সুবীর ভৌমিক
সুশাসন
স্মৃতি
Africa
My Art
অধিকার
আন্তর্জাতিক নারী দিবস
একুশে টেলিভিশন
কলম্বিয়া
কুয়েত
চিঠিপত্র
চুক্তি
তিউনিসিয়া
দুর্যোগ
নির্বাচন ও রাজনীতি
নেত্রকোণা
পরিবহন
পর্যটন কেন্দ্র
প্রশাসন
ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা
বিশ্বকাপ ফুটবল
বেলজিয়াম
বড়ঘোপ
ভি এস নাইপল
ভৈরব
মরক্কো
মাওবাদী
মামলা
যানজট
লেমশীখালী
সংসদ
সন্ত্রাসী
সমাজ
সামাজ
সুন্দরবন
সৈয়দ দিদার বখত
সোমালিয়া
হংকং
Middle East
Principal Sanaullah
Special Day
অগ্নিসংযোগ
অমৃতবাজার পত্রিকা
অরবিন্দ কেজরিওয়াল
আইন ও অধিকার
আগুন ও মৃত্যু
আজকের কাগজ
আল মাহমুদ
আহসান কবির
এম.এ মান্নান
এল সালভাদোর
কমল জোহা খান
কিউবা
খাদ্যসমস্যা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
জঙ্গি
তথ্য অধিকার আইন
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা
পানামা
পূর্বপশ্চিম
প্রাণি ও উদ্ভিদ
বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার
বন্য প্রাণী
বেলুচিস্তান
ভিয়েতনাম
ভোরের ঈদ ১৯
ভয়েস অফ আমেরিকা
যায়যায়দিন
লালমনিরহাট
শিক্ষা অধিকার
শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা
শিশুশিক্ষা
শ্রমিক
সন্ত্রাসবাদ
সুইডেন
সুজন সুপান্থ
NEWS
Palestine
fd
অরণ্যে রোদন
অরুণাচল
অর্থনৈতিক
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক
ইকরাম সেহগাল
উত্তর ধুরুং
উমর মনজুর শাহ
একুশে ফেব্রুয়ারি
ঐতিহাসিক
কিশোরকণ্ঠ
কুড়িগ্রাম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
কোরবান
ঘূর্ণিঝড়
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
জর্দান
জাইমা রহমান
জাদুঘর
জামালপুর
জীবন
জেসমিন আখতার
জ্বালানি তেল
টেলিভিশন
তথ্যপ্র্রযুক্তি
তুষার আবদুল্লাহ
দেশপ্রেম
দৈনিক কক্সবাজার
নাগরিক সংবাদ
নারীঅধিকার
নিরাপত্তা
নির্বাচিত
নেদারল্যান্ডস
পাহাড়
পয়লা বৈশাখ
বঙ্গবন্ধু
বন্দর
বিশ্ব অর্থনীতি
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা
মহান বিজয় দিবস
মা
মাদারীপুর
মানবতা
মানববন্ধন
মিজোরাম
মিডিয়া ভাবনা
মে দিবস
শরীয়তপুর
শিক্ষা দিবস
শিক্ষা-প্রশাসন
শুভ বড়দিন
শেরপুর
সজীব ওয়াজেদ জয়
সময়চিত্র
সরেজমিন প্রতিবেদন
সাতকানিয়া পৌরসভা
সিঙ্গাপুর
সুইজ়ারল্যান্ড
সুশান্ত মজুমদার
স্মরণ সভা
স্মর্রণ
হাসান আজিজুল হক
America
Burma
Child
China
Hot Video
Huw Cordey
Latin America
Marwan Barghouti
Tom Geoghegan
Tom Heap
Washington
kolkata24x7
অ্যান্টার্কটিকা
আহমদ ছফা
আহমেদ মুনির
উখিয়া
উত্সব
উদ্যোগ
এসিড-সন্ত্রাস
ওমান
ওয়াসি আহমেদ
কর্মসূচি
কেনিয়া
ঘড়ি
চট্টগ্রাম বন্দর
চাকরি
চারদিক
চীন ও জাপান
জনসংখ্যা
জাকির তালুকদার
জাহাজ
জাহিদ হোসাইন খান
জায়গা
জায়মা জারনাজ রহমান
জীবনী
জেলহত্যা দিবস
জ্বালানী সম্পদ
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
ড. সাজিদ হক
ডিজিটাল
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন
তিব্বত
ত্রিপুরা
নগরজীবন
নরওয়ে
নিবন্ধন
নীলফামারী
পবিত্র আশুরা
পবিত্র ঈদুল ফিতর
পরিকল্পনা
পানিসম্পদ
পুলিশ
পেরু
প্যারিস
প্রান্তকথা
প্রিয়.কম
প্রেক্ষিত
বর্নাঢ্য র্যালী
বলিভিয়া
বাংলাভিশন
বাজারসুবিধা
বাস্তবসম্মত
বিচার
বিশ্ব খাদ্য দিবস
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস
বিশ্ব নদী দিবস
বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস
বিশ্ব শিক্ষক দিবস
বিশ্ববিদ্যালয়
ব্যবস্থাপনা
ব্যাংক ব্যবস্থা
ব্রিটিশ
ভাষাসৈনিক
মাহমুদ আহমাদ
মুস্তাফিজ মামুন
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
যুদ্ধ ও শান্তি
যুদ্ধাপরাধ
যুদ্ধাপরাধের বিচার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজবাড়ী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
লবন চাষ
লামিনে ইয়ামাল
শহীদের স্মৃতি
শান্তি
শিল্প ও পরিবেশ
শিশুশ্রম
সন্ত্রাস ও রাজনীতি
সহজিয়া কড়চা
সিগন্যাল
সেলিনা হোসেন
স্বাধীন
স্বাস্থ্যনীতি
স্মরণ মুক্তিযুদ্ধ
স্মৃতিঘর
হাসপাতাল
Afghanistan
Bangladesh
Brazil
CNN
California
Comments
Croatia
Delhi
Denise Winterman
Dome of the Rock
God Mag
Google
Hugh Schofield
India
Indonesia
Jane O'Brien
Japan
Jeremy Bowen
Jerusalem
Jon Kelly
Kareem Khadder
Kate Dailey
Kim Ghattas
Lead News
Libya
Mahfuz Anam
Michal Zippori
New York
Nigeria
Pakistan
Paris
Paul Colsey
Qamrul Islam
Rosie Goldsmith
Rupert Wingfield-Hayes
Sanjoy Majumder
Source
South Sudan
The Daily Star
The Telegraph
Thomas Fessy
Tours
Vietventures
Wall Street
World's Last Chance
Young
a excellent photo in Kutubdia Island
bdnews24
google search
image
অদিতি ফাল্গুনী
অমানবিকতা
অযোগ্যদে
অসারপনা
আইনকানুন
আজারবাইজান
আদিবাসী দিবস
আনোয়ারা সৈয়দ হক
আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস
আফসার আমেদ
আবদুল লতিফ মাসুম
আবু আজাদ
আশান উজ জামান
আহমদ ফাহমি
ইথিওপিয়া
ইভ টিজিং
ইমরান খান
ইমাম খাইর
ইসলাম ও জীবন
ঈদের খুশি ও আনন্দ
ঈদের বেতন
উজবেকিস্তান
উপনির্বাচ
উপনির্বাচন
উর্দুভাষী
এ পি জে আবদুল কালাম
একুশে ফেব্রুয়ারি:
ঐতিহাস
ওবামা
কক্সবাজার নিউজ
কমিল্লা
কম্বোডিয়া
কলকাতার চিঠি
কাকন রেজা
কাজাখস্তান
কাটরা
কানাই কুণ্ডূ
কালের পুরাণ
কুতুবদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
কৈয়ারবিল
ক্রসফায়ার
ক্ষত
ক্ষমাপ্রার্থনা
ক্ষুদ্রঋণ
কয়লানীতি
খায়ের মাহমুদ
খোন্দকার শওকত হোসেন
গাম্বিয়া
গোধূলি
গোড়ার
গৌড়
গ্রামীণ অর্থনীতি
গ্রেপ্তার
ঘূর্ণিঝড় সম্পাদকীয়
ঘোড়া
চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন
চরমোনাই পীর
চলতি পথে
চাঁদ
চাদ
চিনি
চিরকুট
চিলি
চেয়ারম্যান
ছাত্র-রাজনীতি
ছাড়পত্র
ছুটিদন
জজ হত্যা দিবস
জনদুর্ভোগ
জনস্বাস্থ্যের
জবাবদিহি
জম্মদিন
জলদস্যু
জাতিগত সহিংসতা
জারদারি
জি. মুনীর
জীবনযুদ্ধ
জীবিকা
জুমকন্যার
জ্বালানি রাজনীতি
জ্বালানি সম্পদ
জ্বালানিসম্পদ
জয়পুরহাট
ঝুঁকি
ঝুঁকি হ্রাস দিবস
টিপাইমুখ
টিপাইমুখ বাঁধ
টিপাইমুখে বাঁধ
টিভি চ্যানেল
টোঙ্গা
ঢাকা টাইমস
তানজির আহমেদ রাসেল
তুর্কমেনিস্তান
তেঁতুল
তেলকূপ দুর্ঘটনা
তেলিরকাটা
দক্ষিণ মগডেইল
দারিদ্র্য বিমোচন
দায়গুলো
দায়িত্ব
দুই দু’গুণে পাঁচ
দুর্গ
দূর পরবাসে
দেবনারায়ণ চক্রবর্তী
দৈনিক আজাদী
নগরদর্পণ
নদীকৃত্য দিবস
নববধূ
নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন
নারীর ক্ষমতায়ন
নাসরীন জাহান
নাসিমা আনিস
নাসির উদ্দিনের স্বাভাবিক মৃত্যু
নিকারাগুয়া
নিজাম কুতুবী
নিপীড়ন
নিরাপতা
নির্বাসনে
নিষেধাজ্ঞা’
নূরে আলম জিকু
নেতা ইমরান খান
নেতৃত্বে
নোযাখালী
পণ্যবাজার
পদক
পবিত্র হজ
পররাষ্ট্রনীতি
পরিস্থিতি
পর্তুগাল
পাঠকের মন্তব্
পাপুয়া নিউগিনি
পাপড়ি রহমান
পাসপোর্ট
পাহাড়ধস
পিলখানা হত্যা
পোল্যান্ড
পোশাক
প্রশ্নবিদ্ধ
প্রস্তাবিত
প্রাণীজী
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ
প্রয়াণ
ফাঁসি
ফিনল্যান্ড
ফেরি ও পন্টুন
বঙ্গবন্ধু হত্যা
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন
বঞ্চনা
বনসম্পদ
বরিশাল ছাত্রলীগ
বর্ণবৈষম্যবিলোপ দিবস
বাঁকখালী
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
বাংলাদেশের পতাকা
বার্লিন দেয়াল
বাল্যবিয়ে
বাস্তবা
বাস্তবায়
বিচার বিভাগ
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
বিজ্ঞানচিন্তা
বিজ্ঞাপন
বিজয়
বিদ্যুত
বিদ্যুৎ-সংকট
বিদ্যুৎকেন্দ্রে
বিপ্রদাশ বড়ুয়া
বিলবোর্ড দুর্ঘটনা
বিলেতের স্ন্যাপশট
বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস
বিশ্ব পরিবেশ দিবস
বিসিবি
বুলবন ওসমান
বুড়িগঙ্গা
বৃক্ষরোপণ
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
বৈষম্য
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
ব্রুনাই
বড়পুকুরিয়া
ভাজিরালংকর্ন
ভালোবাসা
ভাষণ
ভেজাল
ভোজ্যতেল
মংলা থেকে
মঈনুল হাসান
মঙ্গোলিয়া
মঞ্জু সরকার
মনযূরুল হক
মনি হায়দার
মন্ত্রিসভা
মাওবাদী সহিংসতা
মাতৃভাষা ও পরভাষা
মানচিত্র নিউজ
মানব
মানসিক স্বাস্থ্য দিব্স
মানসিকতা
মালি
মাল্টা
মাহবুব রেজা
মাহামুদা খাতুন
মিথিলেশ ভট্টাচার্য
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
মুরগি জমা
মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন
মূল্যস্ফীতি
মৃত্যু ও কিছু ভাবনা
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন
ম্যাডোনা
ম্যান্ডেলা দিবস
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল
যুদ্ধাপরাধ-বিচার
রক্ত
রদ্ধাঞ্জলি
রবাণিজ্যে
রাগবি
রাজনৈতিক সংস্কৃতি
রাজপথ
রাষ্ট্রীয়
রাস্তার
রিয়াল মাদ্রিদ
রুবেল হোসেনের
রেলওয়ের
রোমাঞ্চিত
রোমানিয়া
র্বিজ্ঞান
শক্তিশালী
শঙ্কা
শরীরের
শশী থারুর
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
শাকিরা
শাহ্নাজ মুন্নী
শায়খ আহমাদুল্লাহ
শিক্ষক খুন
শিক্ষক-রাজনীতি
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস
শিক্ষাচিত্রে
শিক্ষাবিদের
শিবের গীত
শুঁটকি উৎপাদন
শেরাটনীয়
শোনা
শ্রদ্ধাঞ্জল
শ্রমবাজার
শ্রমশক্তি
ষড়যন্ত্র
সংকট
সংঘাত
সংশোধন
সঙ্গী
সততা
সন্দেশ
সমন্বয়সাধন
সমাজ ও নারী
সমুদ্রস্নান
সময়
সময় নিউজ টিভি
সময়ের প্রতিবিম্ব
সরকার
সাংবাদ
সাইক্লোন শেল্টার
সাইপ্রাস
সাজিদ গ্রেফতার
সাদাসিধে কথা
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
সামন্ততন্ত্র
সামরিক শাসন
সামাজি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
সাহসী
সিডনি
সিয়াম
সুপ্রভাত
সূর্যে
সেচসুবিধা
সোনার বাংলা
স্কাইপি
স্বকৃত নোমান
স্বচ্ছতা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
স্বাধীনত
স্বাধীনতাযুদ্ধ
স্বামী
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
স্বীকৃতি
স্মৃত-নিদর্শন
স্মৃতিসৌধ
স্মৃতিসৌধে
স্লোভাকিয়া
হত্যা ও হরতাল
হাইতি
হামিদ মীর
হুগজিল্ট
No comments:
Post a Comment