কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ‘মানবিকতা’ থাকাই সবচেয়ে জরুরি: মুহাম্মদ মনির হোসেন by দিনার হোসাইন

লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন-২ঃ তরুণ ও নবীন পেশাজীবীদের ক্যারিয়ার গঠনে বইয়ের শিক্ষার চেয়ে বেশি প্রয়োজন বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া সঠিক দিকনির্দেশনা। সেই প্রয়োজনীয়তা থেকেই লিগ্যাসি তৈরির পথে থাকা সফল তরুণদের স্বপ্ন, শেখার অভিজ্ঞতা আর ভুল থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নিয়ে প্রথম আলো ডটকমপ্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ পডকাস্ট শো: লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন-২। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হকের সঞ্চালনায় পঞ্চম পর্বে অতিথি হিসেবে অংশ নেন বিটোপিয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মনির হোসেন। আলোচনার বিষয় ছিল ‘ফ্রিল্যান্সিং থেকে সিস্টেম বিল্ডিং: বিটোপিয়ার বিবর্তন ও দক্ষ জনশক্তি নিয়ে ভাবনা।’

‘এই জেনারেশনের ছেলেমেয়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় যে গুণটি রয়েছে, তা হলো তারা বেশ কুইক লার্নার। খুব সহজেই যেকোনো জিনিস শিখে ফেলতে পারে। তবে তাদের ধৈর্য অনেক কম। এই জিনিসটির ওপর তাদের কাজ করতে হবে।’ পডকাস্ট শোতে অংশ নিয়ে কথাগুলো বলেন বিটোপিয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মনির হোসেন। পডকাস্ট শোর ধারণ করা পর্বটি প্রচারিত হয় গতকাল শনিবার প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে।

নিজের দক্ষতার ওপর ভর করে ফ্রিল্যান্সিং দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন মুহাম্মদ মনির হোসেন। আজ হাজারো মানুষের একটি ইকোসিস্টেমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। পডকাস্টের শুরুতেই সঞ্চালক জানতে চান, ফ্রিল্যান্সিং থেকে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নিলেন কেন?

মুহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, ‘২০১৩ সালে আমি ফ্রিল্যান্সিং শুরু করি। ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ারে প্রোফাইল সাসপেনশন এবং অনিশ্চয়তার মতো প্রতিকূলতা আমাকে বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। দীর্ঘ সময় রাত জেগে কাজ করার ফলে ২০১৫ সাল থেকে আমি তীব্র ব্যাক পেইনে ভুগতে শুরু করি, যা আমাকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভোগায়। এর ফলে আমার মাসিক আয় ৫ থেকে ৮ হাজার ডলার থেকে কমে মাত্র ৮০০ ডলারে নেমে আসে। তখনই আমি অনুধাবন করি যে ব্যক্তিনির্ভর ফ্রিল্যান্সিং এবং এই অস্বাস্থ্যকর জীবনধারা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই নয়। এই উপলব্ধি থেকেই কাজের ধরনে পরিবর্তন আনতে ২০১৭ সালে আমি “বিডিকলিং আইটি লিমিটেড” প্রতিষ্ঠা করি।’

মুহাম্মদ মনির হোসেন আরও বলেন, ‘২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত আমি ব্যবসাটা শিখেছি—কীভাবে পিপল ম্যানেজমেন্ট, প্রসেস ডেভেলপমেন্ট, ডেলিগেট এবং কেপিআই অ্যাচিভ করতে হয়।’

প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, এই শেখার প্রক্রিয়াটি ঠিক কেমন ছিল?

মুহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, ‘আমার ব্যাকগ্রাউন্ড কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) হওয়ায় পড়াশোনার মাধ্যমে অনেক কিছু শিখতে পেরেছি। এ ছাড়া আমি কন্টিনিউয়াস লার্নিংয়ের মধ্যে ছিলাম। বর্তমানেও আমি কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে “সিনিয়র লিডারশিপ এক্সিকিউটিভ” প্রোগ্রামে পড়াশোনা করছি। আমাকে সব সময় পড়াশোনার মধ্যেই থাকতে হয়। এভাবে শিখতে শিখতেই কোম্পানির পরিসর বৃদ্ধি পেল।’

মুহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, ‘কোভিডের সময় আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়। কারণ তখন ইউরোপ এবং ইউএসএতে আউটসোর্সিংয়ের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়। এই কোভিডের সময়েই আমাদের কর্মীর সংখ্যা মাত্র ৩০ জন থেকে বেড়ে ৪০০ জনে দাঁড়ায়। বর্তমানে আমাদের কর্মিসংখ্যা ৪ হাজার। এ পর্যন্ত আমরা ছোট–বড় মিলিয়ে প্রায় ৮৫ হাজারের মতো প্রজেক্ট করেছি।’

এরপর সঞ্চালক জানতে চান, অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের প্রতিষ্ঠানে কর্মীর সংখ্যা ৩০ জন থেকে বেড়ে চার হাজারে হওয়ার অনুভূতি ঠিক কেমন?

উত্তরে মুহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, ‘এটি খুবই অসাধারণ এক অনুভূতি। আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে এই ভেবে যে আমরা এমন কিছু তৈরি করছি, যা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই।’

আপনি প্রায়ই বলেন, বাংলাদেশে ট্যালেন্টের অভাব নেই, অভাব আছে সিস্টেমের। এই ধারণাটি ঠিক কখন এবং কোন অভিজ্ঞতা থেকে এসেছে?

উপস্থাপকের এমন প্রশ্নের উত্তরে মুহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, মেধা বা ট্যালেন্ট সবার মধ্যেই সুপ্ত থাকে। তবে একে বিকশিত করার জন্য যে সুযোগ প্রয়োজন, আমাদের দেশে তার অভাব রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া একটি শিশু শৈশব থেকেই যেসব সুবিধা পায়, আমাদের দেশের শিশুরা সচরাচর তা পায় না। বিটোপিয়া গ্রুপ মূলত এই বৈষম্য দূর করতেই কাজ করে যাচ্ছে। আমরা চাই, বিশ্বমানের সব সুযোগ-সুবিধা আমাদের দেশের মেধাবীদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে, যাতে তারা তাদের মেধা ও কাজের মাধ্যমে নিজের এবং দেশের জন্য একটি ইমপ্যাক্ট তৈরি করতে পারে।’

এখনো আমাদের দেশে ফ্রিল্যান্সারদের যথাযথ সম্মান জানানো বা মূল্যায়ন করা হয় না বলে অনেকেই অভিযোগ করেন। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

মুহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, ‘আমি মনে করি ফ্রিল্যান্সারদের সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ফ্রিল্যান্সারদের জন্য ব্যাংক লোনেরও ব্যবস্থা নেই। তবে বর্তমানে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য আইটি কার্ড দেওয়ার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটি প্রশংসাযোগ্য। এ ধরনের উদ্যোগ আরও নেওয়া প্রয়োজন।’

মুহাম্মদ মনির হোসেন আরও বলেন, ‘বর্তমানে আমরা যেভাবে ফ্রিল্যান্সারদের উৎসাহিত বা প্রমোট করছি, তা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে এর পাশাপাশি আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বা অর্গানাইজেশন তৈরির দিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে। আমরা যখন লক্ষ্য নির্ধারণ করি যে আইটি বা সফটওয়্যার খাত থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করব, তখন বুঝতে হবে, শুধু ব্যক্তিগত বা ইন্ডিভিজ্যুয়াল ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে এই বিশাল লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। এটি তখনই সম্ভব হবে, যখন আমরা শক্তিশালী আইটি প্রতিষ্ঠান বা অর্গানাইজেশন গড়ে তুলব। সেই সঙ্গে আমাদের কান্ট্রি ব্র্যান্ডিংয়ের জন্যও কিছু উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’

প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠান বা অর্গানাইজেশন গড়ে তোলার পথে সবচেয়ে বড় বাধা কোনটি বলে আপনি মনে করেন?

মুহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে টেকসই অর্গানাইজেশন গড়ে তোলার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো উদ্যোক্তাদের অতিরিক্ত অপারেশনাল–নির্ভরতা। একজন উদ্যোক্তার মূল ভূমিকা হওয়া উচিত কৌশলগত নেতৃত্ব প্রদান। কিন্তু অনেকেই দৈনন্দিন ছোটখাটো কাজে আটকে পড়েন। একটি সফল প্রতিষ্ঠানের সার্থকতা সেখানেই, যেখানে উদ্যোক্তার অনুপস্থিতিতেও সিস্টেম বা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজ নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে।’

এরপর সঞ্চালক জানতে চান, বিটোপিয়া গ্রুপ এখন আইটি, এনার্জি, ইনফ্রাস্ট্রাকচার, এআই—অনেকগুলো সেক্টরে কাজ করছে। এই ডাইভারসিফিকেশনের রিস্ক কেন নিলেন?

জবাবে মুহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, ‘একটি ঝুড়িতেই সব ডিম রাখলে কিন্তু রিস্ক বেশি থাকে। এটিই আমার মধ্যে একটি ভয় সৃষ্টি করেছিল। ধরুন, কোনো কারণে যদি এ সেক্টর বন্ধ হয়ে যায় তাহলে আমি কোথায় যাব। এই চিন্তা থেকেই আমি আমার অন্য কোম্পানিগুলো প্রতিষ্ঠা করি।’

এআই নিয়ে অনেক ভয় আর হাইপ আছে। এটি মানুষকে রিপ্লেস করবে, নাকি মানুষকে আরও পাওয়ারফুল করবে বলে মনে করেন?

সঞ্চালকের এমন প্রশ্নের উত্তরে মুহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, ‘অ্যারোস্পেস সেক্টরকে বর্তমানে শতভাগ নিরাপদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে অদূর ভবিষ্যতে এমন এক সময় আসবে, যখন এই খাতের সবকিছুই হবে স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেটেড। চিকিৎসা খাতের ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রযোজ্য। বর্তমানে এজেন্টিক এআই চলে এসেছে, যা অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের চেয়েও নিখুঁতভাবে মেডিকেল রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে পরামর্শ দিতে সক্ষম। তবে এর মানে এই নয় যে মানুষের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যাবে; বরং প্রযুক্তির এই উৎকর্ষের সঙ্গে আমাদের নিজেদেরও দক্ষ হতে হবে।’

আলোচনার শেষ পর্যায়ে উপস্থাপক জানতে চান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে আজ থেকে পাঁচ বছর পরে মানুষের মধ্যে কোন একটি গুণ থাকা উচিত?

মুহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, ‘মানবিকতা। এটি থাকতেই হবে। কোনো কাজ করার আগে আমাদের ভাবতে হবে এটি কমিউনিটির জন্য ভালো কি না, কারও ওপর ক্ষতিকর কোনো প্রভাব ফেলছে কি না এবং এটি আমাদের সমাজ কিংবা দেশের ওপর কেমন প্রভাব ফেলবে।’

পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন–২’–এর পঞ্চম পর্বে অতিথি হিসেবে অংশ নেন বিটোপিয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মনির হোসেন
পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন–২’–এর পঞ্চম পর্বে অতিথি হিসেবে অংশ নেন বিটোপিয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মনির হোসেন। ছবি: প্রথম আলো

No comments

Powered by Blogger.