আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি

খুন এখন এত সস্তা হয়ে গেছে যে মাত্র কয়েক হাজার টাকায় ভাড়াটে খুনি দিয়ে প্রতিপক্ষ যে-কাউকে অনায়াসে মেরে ফেলা যায়। রাজধানী ঢাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন নাজুক। সোমবার ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকায় ছুরিকাঘাতে এক পোশাকশ্রমিক মারা গেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন। এর আগের দিন মোহাম্মদপুর ও মতিঝিল এলাকা থেকে পুলিশ এক শিশু ও এক বৃদ্ধের লাশ উদ্ধার করেছে। কয়েক দিন আগে খুন হয়েছেন ছাত্রলীগের নেতা ফারুক হোসেন ও বিএনপির নেতা আহাম্মদ হোসেন। রাজধানীর নাগরিকেরা বিপন্ন বোধ না করে পারেন না, কারণ, সকালে ঘর থেকে বের হয়ে প্রাণটুকু নিয়ে ঘরে ফেরার যে নিশ্চয়তা নেই!
ঢাকা মহানগর পুলিশের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০০৯ সালে প্রতি মাসে গড়ে আটটি করে ডাকাতি ও ৩৭টি করে দস্যুতার মামলা হয়েছে। একই সময়ে ২৭টি করে খুন ও ৪৮টি করে অস্ত্র আইনে মামলা হয়েছে। পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বেশ ভালো ছিল। কিন্তু এখন আবার সেই আগের মতো অবস্থা।
অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার ফলে এ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে বলে খোদ পুলিশ কর্মকর্তারাই স্বীকার করেছেন। সোমবার প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত বছর রাজধানীর বিভিন্ন থানায় যে ৩২১টি খুনের মামলা হয়েছে, এর মধ্যে ৬৭টি খুনের ঘটনায় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহূত হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারাই স্বীকার করছেন, অনেক সন্ত্রাসী এখন প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করে। সীমান্ত থেকে ছোট আকারের অস্ত্র আসছে বলে তাঁরা বলছেন। তাঁদের মতে, অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের কোনো তত্পরতা না থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
প্রশ্ন ওঠে, পুলিশের কাজ কী? আইনশৃঙ্খলার অবনতির মুখে তারা কি নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে যাবে? অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের কার্যক্রম কি বন্ধ রাখা হয়েছে? যদি তা না হয়ে থাকে, তাহলে কেন এত অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি? অসুখ ধরা পড়েছে, ওষুধও জানা, তাহলে কেন দেরি? কোনো অবস্থায়ই অবৈধ অস্ত্রে সজ্জিত অপরাধীদের অবাধ বিচরণ চলতে দেওয়া যায় না। পুলিশের কাছে কেউ খুনখারাবির ব্যাখ্যা চায় না, প্রতিকার চায়। তাই অবিলম্বে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান শুরু করা দরকার।
ঢাকা মহানগরে সোয়া এক কোটি মানুষের জন্য আছে মাত্র ২৪ হাজার ৪০৬ জন পুলিশ সদস্য, এর মাত্র অর্ধেক রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। পুলিশের বাকি সদস্যরা মন্ত্রী-নেতাদের নিরাপত্তা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নিরাপত্তায় ব্যস্ত। এত কম পুলিশে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না। সরকারের উচিত তথাকথিত ‘অতিগুরুত্বপূর্ণ’ ব্যক্তিদের তালিকা পুনর্মূল্যায়ন করে যতটা সম্ভব কাটছাঁট করা এবং পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো।
কিন্তু এটাও দেখতে হবে, যত সংখ্যক পুলিশ রাজধানীর রাস্তায় টহলে থাকে, তারা কতটা দক্ষতা ও মনোযোগ দিয়ে দায়িত্ব পালন করে। কাজে অবহেলার জন্য কয়জন পুলিশের বিরুদ্ধে শাস্তি হয়? পুলিশের সামনেই ছিনতাই ও খুনের ঘটনা তো কম নয়।
নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য যা কিছু করা দরকার, তা করতে হবে। এখানে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই।