কল্পকথার গল্প-অভিমন্যু কিংবা কোনো এক গাছির গল্প by আলী হাবিব

কী হচ্ছে রাজনীতিতে? একটি পরিবর্তন কি আসন্ন? কী সে পরিবর্তন? নানাজনের নানা অভিমত। কারো কারো মতে, আওয়ামী লীগের বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে। বিএনপি ক্ষমতায় এলো বলে- এই ভেবে পুলকিত কেউ কেউ।
তৃতীয় শক্তির অভ্যুদয় হচ্ছে না ভেবে হতাশাগ্রস্তদের মনে হচ্ছে, শক্তির কি আকাল পড়েছে দেশে?
ওদিকে বিএনপি সমর্থকদের মনে আশা, দল আবার ক্ষমতায় আসবে। পাঁচ সিটিতে ভরাডুবির পর আওয়ামী শিবিরে হতাশা দেখা দেওয়াটাও স্বাভাবিক। এই নিয়ে বিস্তর লেখালেখি চলছে। কেউ কেউ মনে করছেন, শেখ হাসিনা একাই এখন আওয়ামী লীগের ত্রাতা। দায়িত্ব গ্রহণের পর অনেক ফ্রন্টে যুদ্ধ শুরু করেছিল বর্তমান সরকার। সেই যুদ্ধে শেখ হাসিনা এখন অভিমন্যুর ভূমিকায়।
অভিমন্যুকে জানতে হলে একটু পুরাণের দিকে তাকাতে হবে। পৌরাণিক কাহিনীতে বলা হয়েছে, নির্ভীক ও তেজস্বী বলে সুভদ্রার এই ছেলের নাম রাখা হয়েছিল অভিমন্যু। অল্প বয়সেই অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শিতা লাভ। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় ১৬ বছর বয়সী অভিমন্যুর বীরত্ব সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অসংখ্য কুরু সেনা বিনাশ করেন তিনি। ভীষ্মের রথধ্বজ ছেদন করেন। কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধের ত্রয়োদশ দিনে দ্রোণাচার্য অভেদ্য চক্রব্যূহ রচনা করেন। অর্জুন তখন সংশপ্তকদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত। পাণ্ডবপক্ষে অভিমন্যু চক্রব্যূহে প্রবেশ-প্রণালি জানতেন। কিন্তু সেখান থেকে বের হয়ে আসার উপায় তাঁর জানা ছিল না। দ্রোণাচার্যকে বাধা দেওয়ার কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে যুধিষ্ঠির অভিমন্যুকে ভেদ করতে বললেন। তাঁকে রক্ষা করার আশ্বাসও দিলেন। অভিমন্যু চক্রব্যূহে প্রবেশ করলেন। কর্ণের এক ভাই, দুর্যোধনের ছেলে লক্ষ্মণ অভিমন্যুর হাতে নিহত হলেন, পরাস্ত হলেন অন্য মহারথীরাও। তখন মহাদেবের বলে বলীয়ান জয়দ্রথ ব্যূহ বন্ধ করে দেন। দ্রোণ, কৃপ, কর্ণ, অশ্বত্থামা, বৃহদ্বল ও কৃতবর্মা- এই ছয় রথী অভিমন্যুকে ঘিরে ধরেন। অন্যায় যুদ্ধে নিহত হন অভিমন্যু।
শেখ হাসিনাকে এখন অনেকেই পুরাণের অভিমন্যুর সঙ্গে তুলনা করছেন। শেখ হাসিনা কি প্রতিপক্ষের চক্রব্যূহে ঢুকে পড়েছেন? তা পড়েছেন বৈকি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া এই সরকার নিশ্চিত করেছে। কালই তো একটি রায় হয়ে গেল। এখন সবাই মিলে শেখ হাসিনাকেই ঘিরে ধরেছেন। অভিমন্যুর সঙ্গে শেখ হাসিনার একটু তফাৎ আছে। রক্ষার বদলে চারদিক থেকে শেখ হাসিনাকেই দোষারোপ করা হচ্ছে। সব ফ্রন্টে যুদ্ধ ঘোষণা করে তিনি যেন অপরাধ করে ফেলেছেন। নির্বাচনের আগে তিনি যে এসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সে বিষয়টি যেন বিস্মৃত সবাই।
এ তো গেল একদিকের কথা। অন্যদিকে সরকার যে দোষের ভাগী হচ্ছে না, তা নয়। সরকার শুধু নয়, দোষের ভাগী হচ্ছে দলও। সরকারে গেলে আওয়ামী লীগ জনগণকে পক্ষে রাখতে পারে না, এমন বিশ্লেষণও করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ গণমানুষের দল, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধে দেশের মানুষকে সংগঠিত করেছে। এর পরও কেন যেন ক্ষমতায় গেলে দলটি সাধারণ মানুষ থেকে দূরে সরে যায়। আগেরবার যখন আওয়ামী লীগ দেশ শাসনের দায়িত্ব নিয়েছিল, তখন তো উন্নয়নকাজ কম করেনি। এবার তো দেশের মানুষ আওয়ামী লীগ তথা মহাজোটকে ভূমিধস বিজয় এনে দিয়েছে। কৃতিত্ব জনগণেরই। জনগণ যখন সব ক্ষমতার উৎস, তখন জনগণই তো আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করে ২০০৮ সালের নির্বাচনে।
পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই কেন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে মানুষ। গত চার বছরে প্রবৃদ্ধির হার আশা জাগাচ্ছে। রানা প্লাজার মতো দুর্ঘটনার পরও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক বিদেশে সমাদৃত। জিএসপি বাতিলের পরও বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নেওয়া দূরের কথা, নতুন আগ্রহের খবর পাওয়া যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিবাচক খবর পাওয়া যাচ্ছে। যে বাংলাদেশকে কয়েক বছর আগে জঙ্গিবাদের তীর্থ ভাবা হতো, সেই বাংলাদেশ আজ সেই ভাবমূর্তি থেকে বেরিয়ে এসেছে। দেশে প্রচুর উন্নয়নকাজ হয়েছে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। বেড়েছে যোগাযোগ দক্ষতা। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু ছোট হয়ে এসেছে আওয়ামী লীগের পক্ষে জনসমর্থন। কমে যাচ্ছে কেন? দক্ষ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা এর কারণ বিশ্লেষণ করেছেন। সে বিষয়ে যাওয়ার আগে একটি গল্প বলে নেওয়া যাক।
সেই সোনার ডিম পাড়া হাঁসের গল্প তো সবারই জানা আছে। এক কৃষক বাজার থেকে একটি হাঁস কিনে আনল। সেই হাঁস প্রতিদিন একটা করে সোনার ডিম দিত। আমাদের গল্পের এই কৃষক একদিন হাঁসটাকে ধরে সেটার পেট ফেড়ে ফেলল। কৃষকের আশা ছিল সব সোনার ডিম সে একদিনে পেয়ে যাবে। সেগুলো বিক্রি করে অনেক টাকার মালিক হবে সে। আওয়ামী লীগের কোনো কোনো সহযোগী সংগঠন কিংবা মূল সংগঠনের নেতা-কর্মীর আচরণ গত সাড়ে চার বছরে ছিল ওই লোভী কৃষকের মতো। সোনার ডিম পাড়া হাঁসটাকে একবারে জবাই করে ফেলা হয়েছে। ফলে হাঁসটার মৃত্যু হয়েছে, অর্থাৎ দলকে অজনপ্রিয় করে ফেলা হয়েছে। কিন্তু কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। দলকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে খাদের কিনারে, যেখান থেকে উদ্ধারের কোনো পথই আর পাওয়া যাচ্ছে না। চক্রব্যূহে ঢুকে গেছেন দলনেত্রী নিজে। সেখান থেকে তাঁর বেরিয়ে আসার আপাতত কোনো পথ নেই।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা আওয়ামী লীগের এই জনবিচ্ছিন্নতাকে যেভাবে বিশ্লেষণ করেন, তা আরেকটি গল্পের ভেতর দিয়ে তুলে ধরা যায়। এ গল্পটিও অনেকের জানা।
কোনো গ্রামে ছিল এক গাছি। গাছি শব্দটার সঙ্গে আজকের প্রজন্ম হয়তো ততটা পরিচিত নয়। কিন্তু গ্রামে এককালে এই গাছিদের পাওয়া যেত। এখনো পাওয়া যায়। শীতকালে এই গাছিদের কাজ ছিল খেজুরগাছ কাটা। সেই খেজুরের রস থেকে ঝোলা গুড় কিংবা পাটালি গুড় তৈরি করা। গাছিরা খেজুর গাছ থেকে রস নিয়ে বাড়িতে গেলে অনেকের স্ত্রী গুড় তৈরির কাজটি করত। তো এমনই এক গাছির স্ত্রীর খুব হাতযশ ছিল। তার গুড় এলাকায় খুব নাম করে। গাছি সেই গুড় বিক্রি করে অনেক টাকা পায়। টাকা পেলেই সে আরেকটা বিয়ে করে। এই স্ত্রীকে পিটিয়ে বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। আবার শীতকাল এলে সে বউকে নিয়ে আসে। এভাবেই চলছিল। কিন্তু একবার ঘটনা ঘটল উল্টো। সেবার গাছি অনেকগুলো গাছ নিয়েছে। অনেক টাকার কাজ। অনেক গুড়ের অর্ডার পাওয়া গেছে। কিন্তু বউকে তো সে বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে। গাছি আবার গেল বউকে আনতে। গিয়ে দেখে বউটা মরে গেছে। সে জানতেও পারেনি।
অনেকে বলেন, নতুন নতুন (কারো কারো ভাষায় হাইব্রিড) আওয়ামী লীগারের ভিড়ে আওয়ামী লীগের জনসমর্থন মরে গেছে, এটা বুঝতে পারেনি দলটি।
লেখক : সাংবাদিক
habib.alihabib@yahoo.com