সহিংসতায় পাকিস্তানে বাড়ছে মানসিক রোগী

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন রিফাত রমজান। চোখে শূন্য দৃষ্টি। তাঁকে দেখলে বোঝা যায়, মনের সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছেন তিনি। এই লড়াই তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুকে হারানোর ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার। আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীর ফাঁদে পড়ে নিহত হন রমজানের বন্ধু নোমান। এ ঘটনায় রমজান যে মানসিক আঘাত পান, কয়েক সপ্তাহ পরও তা কাটিয়ে উঠতে পারছেন না। নোমানের রক্ত এত দিনে মিশে গেছে মাটিতে, কিন্তু তাঁর শোকে আহত রমজানের রক্ত বুকের গভীরে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরছে।
রমজানের জীবন-যাপনেও এসেছে পরিবর্তন। এখন তিনি বালিশের নিচে একটি আগ্নেয়াস্ত্র রেখে ঘুমান। হরদম তাঁকে এই ভয় তাড়া করে ফেরে—পাকিস্তানে চলমান সহিংসতা বুঝি তাঁর প্রাণও কেড়ে নেবে।
বন্ধু নিহত হওয়ার ঘটনা সম্পর্কে রমজান জানান, একজন লোক এসে নোমানকে তাঁর মোটরসাইকেলে করে থানায় পৌঁছে দিতে অনুরোধ করে। নোমান এতে সাড়া দেন। লোকটিকে নিয়ে তিনি যেই থানায় পৌঁছান, সঙ্গে সঙ্গে লোকটি তাঁর দেহে লুকিয়ে রাখা বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে নোমানসহ ১০ জন নিহত হন।
পাকিস্তানে তালেবান জঙ্গি ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সহিংস ঘটনায় এভাবে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার লোক নিহত হচ্ছে। আহতের সংখ্যাও কম নয়। তবে সহিংস ঘটনাগুলো যাঁদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করছে, মনোরোগ চিকিৎসক ছাড়া কেউ তাদের খোঁজ জানে না। রমজানের মতো যাঁরা রক্তপাতের ঘটনা সহজে মেনে নিতে পারছেন না, পাকিস্তানের বিভিন্ন হাসপাতালে তাঁদের সংখ্যা বাড়ছে দিন দিন।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নাজাম ইউনুস বলেন, কিছু লোকের মানসিক আঘাত এতই গুরুতর যে তাঁরা কোনো কাজ করতে পারছেন না। অন্যরা উদ্বেগ, মানসিক অবসাদের মতো সমস্যায় ভুগছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, সংবাদ মাধ্যমে ছোটখাটো সংঘর্ষের শিরোনাম শুনেই অনেকে ঘুমানোর বড়ি আনতে চিকিৎসকের কাছে ছোটেন। চিকিৎসকেরা বলছেন, মানসিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে পারিবারিক সমর্থন ও সহযোগিতা একটি বড় বিষয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের বাড়ি ফিরে যাওয়া নিরাপদ হয় না।
পেশোয়ারের সরহাদ মনোরোগ হাসপাতালটি এমন জায়গায় অবস্থিত, যেখানে একই সীমানার ভেতর একটি কারাগারও রয়েছে। হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক মুহাম্মদ তারিক বলেন, প্রতিদিন ১০-১৫ জন করে নতুন মানসিক রোগী আসে তাঁর কাছে। এর মধ্যে অনেকেই তাঁদের ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারিয়েছেন।
হাসপাতালে ছেলের চিকিৎসা করাতে আসা বৃদ্ধ মুহাম্মদ ইখতিয়ার বলেন, সহিংসতা দেখে তাঁর ছেলে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। একটি ইসলামি দাতব্য প্রতিষ্ঠান তাঁর ছেলে চিকিৎসার খরচ দিচ্ছে। তিনি বলেন, তাঁর ছেলে কখনো তালেবান ও সেনাদের ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। আবার কখনো সে নিজেকে তালেবান নেতা বা সেনা অধিনায়ক মনে করে।