এটি কি শান্তিমঞ্চ নাকি ‘সম্রাট’ ট্রাম্পের দরবার by জুলিয়ান বোরগার
গত নভেম্বরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব ২৮০৩ পাস হয় ১৩–০ ভোটে; রাশিয়া ও চীন ভোটদানে বিরত ছিল। এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য ছিল ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় গাজায় একটি যুদ্ধবিরতিকে জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া। ১৮ নভেম্বর ভোটের আগে আলোচনা ও প্রস্তাবের ভাষা—সবই ছিল গাজা সংকটকে কেন্দ্র করে।
কিন্তু এখন সামনে আসছে ভিন্ন বাস্তবতা। গাজাকে দুই বছরের জন্য একটি ট্রাম্প-নিয়ন্ত্রিত ‘বোর্ড’-এর হাতে তুলে দেওয়ার এই ধারণা জাতিসংঘের মৌলিক নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও উপনিবেশবিরোধিতার মতো নীতির সঙ্গে এর কোনো সামঞ্জস্য নেই। উপরন্তু, আধুনিক ইতিহাসে জাতিসংঘের কোনো শান্তিরক্ষা প্রস্তাব এতটা অস্পষ্ট আগে কখনো ছিল না।
তারপরও আরব বিশ্ব ও ইউরোপীয় দেশগুলো প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেয়। কারণ, ভাষায় অন্তত ভবিষ্যৎ সার্বভৌম ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের কথা উল্লেখ ছিল—যদিও তা ছিল মূলত প্রতীকী। কূটনীতিকদের যুক্তি ছিল, ট্রাম্পকে গাজা প্রশ্নে যুক্ত রাখার এটিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উপায়। কিন্তু মাত্র দুই মাসের মধ্যেই সেই আশার ভিত্তি ভেঙে পড়ে।
জাতীয় রাজধানীগুলোতে পাঠানো ‘বোর্ড অব পিস’-এর চার্টার বা সনদে গাজার নাম পর্যন্ত নেই। সেখানে বোর্ডকে একটি স্থায়ী বৈশ্বিক কাঠামো হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যার কাজ হবে ‘বিশ্বজুড়ে শান্তি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা’। বলা হয়েছে, এটি হবে ‘বাস্তববাদী’, ‘ফলাফলমুখী’ এবং এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যা ‘ব্যর্থ হয়ে যাওয়া পদ্ধতি ও প্রতিষ্ঠান’ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। সনদে কোথাও বলা হয়নি এই ‘ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান’ আসলে কোনগুলো। কিন্তু ইঙ্গিতটি স্পষ্ট—এটি সরাসরি জাতিসংঘের দিকেই ছোড়া।
ট্রাম্পের এই সনদের পুরো নথির বড় অংশজুড়ে আছে ক্লাবের নিয়মকানুন। সেখানে চেয়ারম্যান ডোনাল্ড ট্রাম্প সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। তিনিই সদস্য নির্বাচন করবেন, তিনিই বরখাস্ত করবেন, তিনিই ঠিক করবেন বোর্ড কখন বসবে ও কী নিয়ে আলোচনা হবে। এমনকি এককভাবে সিদ্ধান্ত বা প্রস্তাব জারি করার ক্ষমতাও তাঁর। নথিতে ‘চেয়ারম্যান’ শব্দটি এসেছে ৩৫ বার। এটাই ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রকৃত চিত্র।
অন্য সদস্যদের অবস্থান অনিশ্চিত—যদি না তারা এক বিলিয়ন ডলার নগদ দিয়ে আজীবন সদস্যপদ কিনে নেয়। তাতেও ট্রাম্প চাইলে কাউকে বাদ দিতে পারবেন না—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের বৈষম্যমূলক কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত। বিশেষ করে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার পরিষদকে কার্যত অচল করে রেখেছে। কিন্তু ‘বোর্ড অব পিস’ এই বৈষম্য দূর তো করেই না, বরং আরও নগ্ন এক ব্যবস্থা দাঁড় করায়—যেখানে সদস্যপদের স্থায়িত্ব কিনতে হয় অর্থ দিয়ে, আর ট্রাম্প একাই সর্বময় ভেটোর অধিকারী।
চার্টারে গাজার উল্লেখ না থাকলেও বোর্ডের অধীনে থাকবে একটি সাধারণ নির্বাহী বোর্ড, একটি গাজা নির্বাহী বোর্ড এবং ‘গাজার প্রশাসনের জন্য জাতীয় কমিটি’। এই কাঠামোর সর্বনিম্ন স্তরেই কেবল ফিলিস্তিনিদের অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি থাকবে একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (আইএসএফ), যার তত্ত্বাবধানে থাকবেন একজন মার্কিন মেজর জেনারেল।
তাত্ত্বিকভাবে এই কাঠামো যুদ্ধবিরতি কার্যকর ও পুনর্গঠনের সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এর লক্ষ্য জাতিসংঘের ঐতিহ্যগত সংস্থাগুলোকে সরিয়ে দিয়ে যুদ্ধ-পরবর্তী অঞ্চলগুলোতে লাভভিত্তিক বেসরকারি উদ্যোগ বসানো বলেই মনে হচ্ছে।
গাজায় বোর্ডের প্রস্তাবিত ‘হাই রিপ্রেজেনটেটিভ’ নিকোলাই ম্লাদেনভ একজন অভিজ্ঞ জাতিসংঘ কূটনীতিক। কিন্তু স্টিভ উইটকফ, জ্যারেড কুশনারসহ বিভিন্ন বিলিয়নিয়ার ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর চাপে তাঁর পক্ষে জাতিসংঘের কেন্দ্রীয় ভূমিকা ধরে রাখা কঠিন হবে।
বাস্তবে গাজার বোর্ডের কাঠামো শিগগির কার্যকর হবে বলেও মনে হয় না। কারণ, ইসরায়েল সরকার যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপের যেকোনো পদক্ষেপের বিরোধিতা করছে—যে ধাপে ফিলিস্তিনি শাসন গাজায় ফিরতে পারে বা অন্য কোনো দেশ ভূমিকা পেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে আইএসএফে তুরস্ক বা কাতারের অংশগ্রহণও তারা নাকচ করতে চায়।
এই ঝুলে থাকা অবস্থা ইসরায়েলের জন্য সুবিধাজনক। তারা জিম্মিদের ফিরিয়ে এনেছে, জাতিসংঘের সংস্থাগুলো গাজা থেকে সরানো হচ্ছে, অথচ পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের খরচ ছাড়াই তারা যেকোনো সময় হামলার সুযোগ রাখছে।
কিন্তু ২০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনির জন্য এটি এক অসহনীয় নরকযন্ত্রণা। তাঁদের সামনে এখনো অবিরাম বোমাবর্ষণের আশঙ্কা এবং খোলা আকাশের নিচে বা অস্থায়ী তাঁবুতে জীবন।
ভ্লাদিমির পুতিনের মতো নেতাকে সদস্য হিসেবে বিবেচনা করা কোনো ‘বোর্ড অব পিস’ ইউক্রেনে রক্তপাত থামাতে পারবে—এমন আশা করাও অবাস্তব। এই বোর্ডের সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিণতি হলো, এটি ট্রাম্পের আত্মপ্রচারমূলক এক প্রকল্প হয়ে থাকবে।
* জুলিয়ান বোরগার, দ্য গার্ডিয়ান-এর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বিশ্লেষক
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ সারফুদ্দিন আহমেদ
![]() |
| যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প |

No comments