দায় স্বীকার করা বার্তাগুলো এসেছে চট্টগ্রাম থেকে!

নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়
ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় হত্যার দায় স্বীকার করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে যে ই-মেইল বার্তাগুলো এসেছে, তা চট্টগ্রাম থেকে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। এই বার্তা প্রেরক ও হত্যাকারীরা আদৌ একই গোষ্ঠীর কি না, তা নিশ্চিত নন পুলিশের কর্মকর্তারা। ব্লগার হত্যার তদন্ত নিয়ে রোববার ডিবির সঙ্গে আলোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এফবিআই) তিনজন প্রতিনিধি। এদিকে নীলাদ্রির শেষকৃত্য গত শনিবার রাতে তাঁর গ্রামের শ্মশানে সম্পন্ন হয়েছে। এ হত্যা মামলায় গতকাল রোববার পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। গত শুক্রবার রাজধানীর গোড়ানের ভাড়া বাসায় ব্লগার নীলাদ্রিকে কুপিয়ে হত্যা করেন চারজন। এ নিয়ে চলতি বছরে চারজন ব্লগারকে একইভাবে হত্যা করা হলো। এর আগে ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অভিজিৎ রায়, ৩০ মার্চ তেজগাঁওয়ের দক্ষিণ বেগুনবাড়ীতে ওয়াশিকুর রহমান এবং ১২ মে সিলেট নগরের সুবিদ বাজারে অনন্ত বিজয় দাশ খুন হন।
গতকাল দুপুরে মিন্টো রোডে ডিবির কার্যালয়ে যান এফবিআইয়ের তিনজন প্রতিনিধি। ডিবির কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁরা ব্লগার হত্যার তদন্ত নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁদের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম, ডিবির চারজন উপকমিশনার ও মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার।
ওই বৈঠকের পর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে ডিবির উপকমিশনার (পূর্ব) মাহাবুব আলম বলেন, অভিজিৎ হত্যার বিষয়ে এফবিআইয়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত বৈঠক ছিল এটি। বৈঠকে নীলাদ্রি হত্যার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এফবিআই কারিগরি সহায়তা করতে চেয়েছে। কোন বিষয়ে সহায়তা নেওয়া যেতে পারে, ডিবির পক্ষ থেকে তা বলা হয়েছে।
জানতে চাইলে উপকমিশনার মাহাবুব বলেন, অভিজিৎ হত্যার বিষয়ে এফবিআই কী সাহায্য করল, সেটা এখনই বলা ঠিক হবে না। তাঁরা কিছু কারিগরি সহায়তা দিয়েছে। আর যে ১১টি আলামত এফবিআইয়ের পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছিল, তার প্রতিবেদন এখনো পায়নি ডিবি। ওই প্রতিবেদনগুলো দ্রুত পাঠানোর জন্য এফবিআইয়ের প্রতিনিধিদের বলা হয়েছে।
মাহাবুব আলম বলেন, নীলাদ্রি হত্যার দায় স্বীকার করে গণমাধ্যমে যে ই-মেইলগুলো এসেছে, তা বাংলাদেশ থেকেই পাঠানো হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে হত্যাকারী ও ই-মেইলের প্রেরক একই গোষ্ঠীর কি না, তা নিশ্চিত নয়। সেসব নিয়ে তদন্ত চলছে। তিনি বলেন, মামলার প্রাথমিক পর্যায়ের তদন্ত চলছে। অপরাধস্থল থেকে পাওয়া আলামত পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে যে পোশাক ও গামছা পাওয়া গেছে, সেগুলো হত্যাকারীদের বলে তাঁরা নিশ্চিত হয়েছেন। প্রযুক্তিগত তদন্তের বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করছে ডিবির কয়েকটি দল।
ডিবির একজন কর্মকর্তা গতকাল বলেন, চট্টগ্রাম থেকে ওই বার্তাগুলো এসেছে বলে তাঁরা নিশ্চিত হয়েছেন। এখন বার্তা প্রেরককে খোঁজা হচ্ছে।
শেষকৃত্য সম্পন্ন: মঠবাড়িয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধি জানান, শনিবার রাতে পিরোজপুরে সদর উপজেলার চলিশা গ্রামে পারিবারিক শ্মশানে নীলাদ্রির শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে।
এর আগে ঢাকা থেকে একটি অ্যাম্বুলেন্স শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে নীলাদ্রির মরদেহ নিয়ে গ্রামে পৌঁছে। এ সময় তাঁর বাবা তারাপদ চট্টোপাধ্যায় বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। ছেলের মৃত্যুর খবর শোনার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। নীলাদ্রির মা অপর্ণা চট্টোপাধ্যায় ও বোন জয়শ্রী চট্টোপাধ্যায়ের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। সান্ত্বনা দিতে আসা প্রতিবেশীদের চোখও ভিজে যায়।
পরে রাত সাড়ে ১১টার দিকে শেষকৃত্যের জন্য নীলাদ্রির মরদেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার আগে তাঁর মা অপর্ণা চট্টোপাধ্যায় শেষবারের মতো ছেলের মুখ দেখেন। রাত সোয়া ১২টার দিকে দাহ শুরু হয়। গতকাল ভোর চারটার দিকে তা শেষ হয়।
নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়ের লাশ দাহ করতে নিয়ে যাওয়ার আগে ছেলের মুখটা শেষবারের মতো দেখে নিচ্ছেন মা অপর্ণা চট্টোপাধ্যায়। গত শনিবার রাতে পিরোজপুর সদর উপজেলার চলিশা গ্রাম থেকে তোলা ছবি l প্রথম আলো