কেন বাংলাদেশ-পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতায় উদ্বিগ্ন ভারত?

দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে বাড়তে থাকা সম্পর্ক। বিশেষ করে সামরিক ও গোয়েন্দা যোগাযোগ জোরদার হওয়ায় বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ভারত।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আসিম মালিকের ঢাকা সফর এই আলোচনাকে নতুন মাত্রা দেয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এই প্রথম কোনো আইএসআই প্রধান বাংলাদেশ সফর করলেন। দুবাই হয়ে ঢাকায় পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুহাম্মদ ফয়জুর রহমান।

চব্বিশের গণঅভুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের কয়েক মাস পর ঢাকা সফর করেন পাকিস্তানের ওই সামরিক কর্মকর্তা। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনাকে ভারত দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি স্থিতিশীল ভরকেন্দ্র হিসেবে দেখত—বিশেষ করে সন্ত্রাস দমন ও সীমান্ত নিরাপত্তা সহযোগিতার কারণে।

তবে হাসিনার বিদায়ের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে নয়াদিল্লিতে।

ভারতের শীর্ষ দৈনিক দ্য ইকোনমিক টাইমস জানিয়েছে, আইএসআই প্রধানের ঢাকা সফরের মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়ানো। প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার বিদায়ের পর দুই দেশের সামরিক যোগাযোগ গতি পেয়েছে, যা ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।

সামরিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ছে
২০২৪ সালের পর থেকে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে শুধু সামরিক নয়, বেসামরিক যোগাযোগও বেড়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ঢাকা সফর করেন—যা ছিল ১৩ বছর পর পাকিস্তানের কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর। একই বছরে পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রীও বাংলাদেশে এসে বাণিজ্য সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন।

সামরিক যোগাযোগও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাকিস্তান সফর করে। অক্টোবরে পাকিস্তানের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যান জেনারেল সাহির শামশাদ মির্জা ঢাকা সফর করেন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

ডিসেম্বরে কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে। এই আলোচনা আসে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরিত কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তির পর, যেখানে এক দেশের ওপর হামলাকে অন্য দেশের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করার অঙ্গীকার করা হয়েছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম সিএনএন-নিউজ১৮ জানিয়েছে,  সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তির খসড়া তৈরিতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান একটি যৌথ কাঠামো গঠন করেছে। একই সঙ্গে পাকিস্তান বাংলাদেশকে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান বিক্রির আলোচনাও চালাচ্ছে।

ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি ও সন্দেহ
ভারতের সাবেক সেনা কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) দীপেন্দ্র সিং হুডা মনে করেন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তি হলে তা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে তিনি মনে করেন, আসন্ন নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকার এমন সিদ্ধান্ত নেবে না।

তার মতে, বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলও ভারতের বিরুদ্ধে ধরা পড়তে পারে—এমন কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তিকে সমর্থন করবে না।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কিছুটা চাপে রয়েছে। সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে অভিযোগ এবং ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ মানচিত্র বিতর্ক সম্পর্ককে আরও সংবেদনশীল করেছে।

সম্পর্কের বাস্তব সীমা
কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নূর আহমদ বাবা মনে করেন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে সৌদি-পাকিস্তান চুক্তির মতো কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবসম্মত নয়। তার মতে, এ ধরনের চুক্তির জন্য গভীর আস্থা প্রয়োজন, যা দুই দেশের মধ্যে এখনও গড়ে ওঠেনি।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পরই মূলত দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবস্থানে নেই।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক শীতল হওয়ায় পাকিস্তানের সঙ্গে ঢাকার ঘনিষ্ঠতা ভারতের কূটনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ভারতের অবস্থান
সম্প্রতি ঢাকা সফর শেষে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেন, ভারতের প্রতিবেশী নীতি সহযোগিতা ও দৃঢ়তার সমন্বয়। তিনি জানান, ভারত উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও যৌথ প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতিবেশীদের পাশে থাকতে চায়, তবে সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দিলে সে ক্ষেত্রে ভিন্ন বার্তা যাবে। বাংলাদেশের নির্বাচন শেষে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে—এমন আশাবাদও প্রকাশ করেন তিনি।

https://mzamin.com/uploads/news/main/201941_bdf.webp

No comments

Powered by Blogger.