চারু শিল্প- নৈঃশব্দ্যের ছবি by মোবাশ্বির আলাম মজুমদার

অলিয়ঁস ফ্রসেজের গ্যালারি জুমের স্বল্প পরিসরে ১৫টি ছবি আমাদের দেখাল বিষয়-বৈচিত্র্যের আলোকচ্ছটা। প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘দ্য সাইলেন্ট ওয়ার্ড’।
বাংলায় যাকে বলা যাবে, নিঃশব্দ। প্রদর্শনীর শিল্পী সাবেকুন নাহার নিজে প্রকৃতিগতভাবে নির্বাক। তাই ছবির মধ্যেই খুঁজে পাওয়া গেল তাঁর যত শব্দ ও ভাষা।

১৫টি শিল্পকর্মের সব কটি কাগজের ওপর জলরঙে আঁকা। যত্ন আর নিখুঁত তুলির ছাপ আছে প্রতিটি ছবিতেই। এ ছাড়া এ শিল্পীর বিষয় ও অঙ্কন-পদ্ধতিতেও রয়েছে ভিন্নতা। জ্যামিতির ব্যবহার, বাস্তব রীতির প্রয়োগ, গল্পভিত্তিক চিত্র নির্মাণের প্রতি ঝোঁক কাজগুলোয় স্পষ্ট। কয়েকটি কাজের মধ্যে পরিলক্ষিত হয় পিকাসোর প্রথম জীবনের আঁকা জ্যামিতিক রীতির প্রভাব। তবে মানুষের মুখ আঁকতে গিয়ে জ্যামিতির আশ্রয় নিয়ে শিল্পী ছবিতে নিজস্ব ধরনও গড়তে চেয়েছেন।

তরুণ এই শিল্পী এর মধ্যেই বুলবুল ললিতকলা একাডেমী থেকে চিত্রকলার ওপর চার বছরের ডিপ্লোমা করেছেন। রঙের ব্যবহারের পাশাপাশি রেখা প্রয়োগে রয়েছে তাঁর দক্ষতা। ফলে পিকাসোর কিউবিজমের ছায়ায় গড়া সাবেকুনের কাজ শেষতক এক স্টাইলের হয়ে থাকেনি।

রঙের উজ্জ্বলতার প্রতি সাবেকুনের নজরদারি বেশি। যে কারণে তাঁর কাজে উজ্জ্বল-উষ্ণ রঙের প্রয়োগ দর্শকমনে সাড়া জাগায়। চিত্রকলার পরম্পরাগত অনুসরণ রীতির বালাই কাজগুলোয় নেই বলেই হয়তো এসব চিত্রকর্মকে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে আনা অসম্ভব মনে হতে পারে। তবু একজন শিল্পীর রং-তুলির ভাষাকে আমরা দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগের ভাষাও তো বলতে পারি।

প্রদর্শনীর ছবিগুলোর কোনো শিরোনাম নেই। তাই শিল্পীর উল্লেখযোগ্য কাজের আলোচনায় তাঁর শিরোনামহীন নামকরণহীন ছবির বিষয়ই আমাদের একেকটি শিরোনাম তৈরি করে দেয়। উলম্ব দুটি আকৃতির মধ্যে অতি সরল ভঙ্গিতে আঁকা মুখোমুখি দুজন মানব-মানবীর মুখ। রং ব্যবহারের ক্ষেত্রে এ ছবিটি দুই রকম রং ধারণ করেছে—গাঢ় ও একেবারে শীতল রং।

অন্য এক ছবিতে পানসি নৌকার যাত্রী রাজা নিজেই। মোগলরীতির সাজপোশাকে বিষয়ের সঙ্গে এ ছবির জমিনে জ্যামিতির বিন্যাস সুন্দর বৈপরীত্য তৈরি করেছে।

আরেকটি ছবিতে আছে তিন নারীমুখ। এখানে তিন নারীমুখ শিল্পী এঁকেছেন বটে তবে তিন মুখের চাহনি তিন রকম। যুগপৎভাবে বিষণ্ন ও আনন্দের উপস্থিতি আছে ছবিটির ক্যানভাসে।

আবার জলরঙে বুলবুল ললিতকলা একাডেমী ভবনের বাস্তবধর্মী ছবি এঁকে তিনি তুলে এনেছেন এ নগরের পৌরাণিক দালানের চিহ্ন।

সাবেকুন নাহারের মনে ছায়াপাত করা বিচিত্র বিষয়কে প্রকাশ করে তাঁর শিল্পকর্ম। তাঁর ছবিগুলো শেষ অবধি যেন প্রবল নৈঃশব্দ্যের ভাষায় কথা বলে, হয়ে ওঠে নিঃশব্দের ছবি। নিজের বাকহীন জীবনকেই কি শিল্পী প্রকাশ করলেন তাঁর চিত্রকর্মে? গত ২৫ অক্টোবর শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী চলবে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত।