বাংলাদেশের বৌদ্ধদের প্রলুব্ধ করছে মিয়ানমার -এএফপি’র রিপোর্ট

রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ফেলে আসা ভূখণ্ডে বাংলাদেশি বৌদ্ধদের যাওয়ার জন্য প্রলুব্ধ করছে মিয়ানমার। প্রধানত এমন প্রলোভন দেখানো হচ্ছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বাংলাদেশি উপজাতি পরিবারগুলোকে। বার্তা সংস্থা এএফপি’র এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। সোমবার একাধিক কর্মকর্তা এএফপিকে এ তথ্য জানিয়েছেন। রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত পার্বত্য অঞ্চল থেকে আনুমানিক ৫০টি পরিবার ইতিমধ্যে রাখাইন রাজ্যে পাড়ি জমিয়েছে। তাদের জমি আর খাবারের প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যেসব স্থান থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্মম অভিযানে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম পালাতে বাধ্য হয়েছে সেখানেই তাদের স্থান দেয়া হচ্ছে। স্থানীয় কাউন্সিলর মুই শৈ থুই এএফপিকে জানিয়েছেন, বান্দরবান পার্বত্য জেলা থেকে মারমা ও মোরো উপজাতি গোষ্ঠীর ২২টি পরিবার গত মাসে সাঙ্গু ফরেস্ট রিজার্ভ এলাকার গ্রামগুলো থেকে চলে গেছে। তিনি বলেন, এই পরিবারগুলোর মধ্যে প্রধানত বৌদ্ধ বেশি। কিছু খ্রিস্টান রয়েছে। রাখাইনে জমি, নাগরিকত্ব আর পাঁচ বছরের জন্য বিনামূল্যে খাবার দেয়ার প্রলোভনে তাদের প্রলুব্ধ করছে মিয়ানমার। তিনি আরো বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের ফেলে আসা জমিগুলোয় তারা বসতি গড়বে। তারা অত্যন্ত দরিদ্র।’ রাখাইনে গত আগস্ট থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কঠোর অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে আনুমানিক ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। এ অভিযানকে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ কর্মকর্তারা জাতিগত নিধনযজ্ঞ আখ্যা দিয়েছেন।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে হওয়া সমঝোতায় একজন শরণার্থীও এখনো ফেরত যায়নি। রোহিঙ্গা নেতারা বলছেন, রোহিঙ্গাদের নিজ গ্রামে যাওয়ার সুযোগ দেয়া না হলে তারা ফেরত যাবেন না। অস্থায়ী পুনর্বাসন ক্যাম্পে থাকবেন না। উল্লেখ্য, রোহিঙ্গাদের বহু গ্রাম আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে।
দুই কর্মকর্তার তথ্যমতে এখন পর্যন্ত বান্দরবান থেকে ৫৫টি উপজাতি পরিবার রাখাইনে গেছে। সরকারি জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বিনামূল্যে বাড়িঘর, সাত বছরের জন্য বিনামূল্যে খাবারের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। এমন প্রলোভনে কিছু পরিবার সেখানে স্থানান্তর হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, এসব উপজাতি গোষ্ঠীর অনেকের স্বজন রয়েছে রাখাইনে। তাদের ব্যবহার করেই বাংলাদেশি উপজাতিদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। এদের সঙ্গে মিয়ানমারের নিবাসীদের ধর্মীয় ও ভাষাগত মিল রয়েছে। তাদের পূর্বপুরুষের অনেকে সেখানে গিয়ে স্থায়ী হয়েছে। আলী কায়সার নামের আরেক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, কয়েকদিন আগে আলিকদম শহর থেকে মিয়ানমারে যেতে গিয়ে উপজাতি এক ব্যক্তি মাইন বিস্ফোরণে মারা যান। এছাড়া পরিবারের কয়েকজন সদস্য এতে আহত হন।
কর্মকর্তারা বলছেন, এই অভিবাসনের নেপথ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলে তারা আশঙ্কা করছেন। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমার ধারণা মিয়ানমার হয়তো এদের নিয়ে কিছু সংবাদ প্রচার করতে চায় যে- বাংলাদেশে বৌদ্ধরা নির্যাতিত ও নিপীড়িত হচ্ছে। আর সে কারণে তারা দেশ ছেড়ে গেছে।’
বাংলাদেশি এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা এএফপিকে জানিয়েছেন, পুনর্বাসন প্রকল্প ব্যবহার করে হাজারো বৌদ্ধকে রাখাইনে পুনর্বাসন করেছে মিয়ানমার। ওই পুনর্বাসন প্রকল্পে বিনামূল্যে খাবার, বাড়ি, গবাদিপশু ও নগদ অর্থের প্রলোভন রয়েছে। মুই শৈ থুই জানান, গেল তিন বছরে তার এলাকা থেকে শতাধিক উপজাতি পরিবার মিয়ানমার গেছে। পরিদর্শকরা বলছেন, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের অনুপস্থিতিতে উত্তর রাখাইনে সুপরিকল্পিতভাবে সামাজিক দৃশ্যপট পাল্টানোর প্রকল্প চালাচ্ছে। সরকার ও সেনাবাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় এবং বেসরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এসব নানা প্রকল্প ওই এলাকার চেহারাই পাল্টে দিচ্ছে।