খাদ্যসংকটে ইসরায়েল, কর্মের ফল পাচ্ছেন নেতানিয়াহু by রঞ্জন সলোমন
ইসরায়েলের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক পরিণতি তৈরি করেনি। এর ভেতরে–ভেতরে তৈরি হয়েছে আরেকটি গভীর সংকট, যা তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। সেটি হলো খাদ্যনিরাপত্তার সংকট।
ইসরায়েলের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে উৎপাদিত বা ব্যবহৃত মোট খাদ্যের প্রায় ৩৯ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। এটি কেবল ব্যক্তিগত অপচয় নয়, একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা।
শুধু ২০২৪ সালেই এই অপচয়ের কারণে ইসরায়েলের অর্থনীতিতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২৬ বিলিয়ন শেকেল, যা প্রায় ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান।
এই বিপুল অপচয়ের বিপরীতে বাস্তব চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক। বর্তমানে ইসরায়েলে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন; অর্থাৎ একদিকে খাবার ফেলে দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছেন না।
গত এক দশকে খাদ্যের অপচয়ের ফলে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১১ বিলিয়ন শেকেলের বেশি। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পরিবারগুলোর জীবনমান, পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সম্পদও।
অর্থনীতির ভাষায় দেখলেও সংকটটি স্পষ্ট। শুধু ২০২৪ সালেই খাদ্য অপচয় ইসরায়েলের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১ দশমিক ৩ শতাংশের সমান ক্ষতি করেছে। গড়ে প্রতিটি পরিবার বছরে প্রায় ২ হাজার ৯০০ ডলারের খাবার ফেলে দিয়েছে। এই পরিসংখ্যান দেখায়, একই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরেই অদক্ষতা ও বৈষম্য পাশাপাশি টিকে আছে।
খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা মানে শুধু না খেয়ে থাকা নয়। ইসরায়েলের স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, অপুষ্টি, মানসিক চাপজনিত অসুস্থতা এবং পরিবেশগত ক্ষতির কারণে প্রতিবছর অতিরিক্ত ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ হচ্ছে।
যুদ্ধ এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। ব্যাপক সামরিক মোতায়েন এবং ফিলিস্তিনি ও বিদেশি শ্রমিকদের ওপর বিধিনিষেধের কারণে কৃষি খাতে শ্রমিকসংকট তৈরি হয়েছে। ফল ও সবজির চাষ ও সংগ্রহ ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে দাম বেড়েছে এবং কম আয়ের মানুষের জন্য তাজা খাবার আরও নাগালের বাইরে চলে গেছে।
এই যুদ্ধের আগেও ইসরায়েলে খাদ্যের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। বাজারে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল প্রতিযোগিতা এবং সুরক্ষামূলক শুল্কব্যবস্থা এর পেছনে বড় কারণ। যুদ্ধ এই পুরোনো সমস্যাগুলোকে আরও প্রকট করেছে। ফলে দেশীয় খাদ্য উৎপাদন একদিকে নাজুক হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে আরও ব্যয়বহুল হয়েছে।
যুদ্ধের সময় সামরিক ব্যয়ের দিকেই মূলত নজর গেছে। কিন্তু সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকোচন তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। ২০২৩ সালের শেষ প্রান্তিকে ইসরায়েলের অর্থনীতি ২০ দশমিক ৭ শতাংশ সংকুচিত হয়, যা দেশটির ইতিহাসে অন্যতম বড় ত্রৈমাসিক পতন।
একই সময়ে সামরিক ব্যয় বেড়ে যায়। ২০২৩ সালের শেষে এই ব্যয় প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত যুদ্ধজনিত মোট ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। এই বোঝা ভবিষ্যতে সামাজিক খাতে ব্যয় করার সক্ষমতাকে সীমিত করে দেবে।
এর সামাজিক প্রভাব এখন স্পষ্ট। বিভিন্ন কল্যাণ সংস্থা ও নাগরিক সমাজের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইসরায়েলের এক–চতুর্থাংশের বেশি পরিবার এখন খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। আগে যা মূলত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমিত ছিল, তা এখন শ্রমজীবী পরিবার, ভাতানির্ভর মানুষ এবং মূল্যস্ফীতি ও যুদ্ধজনিত অস্থিরতায় ক্ষতিগ্রস্ত মধ্যবিত্তের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।
এই সংকট আকস্মিক নয়, সাময়িকও নয়। এটি দীর্ঘদিনের সামরিকীকরণ ও যুদ্ধনীতির অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, সরকারি সহায়তা পাওয়া প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর পর তাঁদের আর্থিক অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। একই সময়ে কম আয়ের পরিবারের খাদ্য ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
এই বাস্তবতায় খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা আর একটি প্রান্তিক সামাজিক সমস্যা নয়, এটি একটি নীতিগত ফলাফল। স্থায়ী সংঘাতের পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার নতুনভাবে সাজানো হয়। প্রতিরক্ষা ব্যয়কে প্রশ্নাতীত ধরে নেওয়া হয়, আর সামাজিক সুরক্ষা ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ে বা শর্তসাপেক্ষ হয়ে ওঠে। ক্ষুধাকে জাতীয় নিরাপত্তা নীতির অনিবার্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখানো হয়, রাজনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে নয়।
ভৌগোলিক বাস্তবতাও সংকটকে বাড়িয়ে দিয়েছে। ইসরায়েলের প্রায় ৩০ শতাংশ কৃষিজমি গাজা ও উত্তর সীমান্তের সংঘাতপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত। এসব অঞ্চলে বহু খামার পরিত্যক্ত হয়েছে, ফসল তোলার চক্র ভেঙে পড়েছে এবং দীর্ঘদিনের উৎপাদনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইসরায়েলের কৃষি খাত দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি ও অভিবাসী শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীল ছিল। যুদ্ধ এই শ্রমশক্তিকে হঠাৎ কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে দেরিতে চাষ, কম ফলন ও বাড়তি খরচ অনিবার্য হয়ে ওঠে। ঘাটতি পূরণে আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে, যা খাদ্যনিরাপত্তাকে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার সঙ্গে আরও বেশি জড়িয়ে দিয়েছে।
কম আয়ের মানুষের জন্য এর প্রভাব তাৎক্ষণিক। খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্রয়ক্ষমতা কমেছে, অথচ রাষ্ট্রীয় সহায়তা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। ফলে যা তৈরি হয়েছে, তা গণক্ষুধা নয়, বরং স্থায়ী ও কাঠামোগত ক্ষুধা। একটি ক্ষুধা, যা প্রশাসনিকভাবে সামলানো হচ্ছে, রাজনৈতিকভাবে সমাধান করা হচ্ছে না।
এখানেই ব্লোব্যাক ধারণাটি বিশ্লেষণমূলকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ব্লোব্যাক কোনো নৈতিক রায় নয়। এটি বাইরের নীতিগত সিদ্ধান্তের দেরিতে ফিরে আসা অভ্যন্তরীণ ফল। ইসরায়েলের ক্ষেত্রে দীর্ঘ যুদ্ধ ও অবরোধভিত্তিক কৌশল দেশের শ্রমবাজার, কল্যাণব্যবস্থা এবং পরিবারের টিকে থাকার বাস্তবতাকেই বদলে দিয়েছে।
একই সঙ্গে স্পষ্ট করে বলা দরকার, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ খাদ্যসংকট আর গাজায় চলমান মানবিক বিপর্যয় এক নয়। ২০২৫ সালের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো গাজাকে মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষের মুখে থাকা অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যেখানে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ চরম অনাহারে ভুগছে।
গাজার সংকট অবরোধ, খাদ্যব্যবস্থার ধ্বংস এবং মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত হওয়ার সরাসরি ফল। ইসরায়েলের খাদ্যসংকট ভেতরের নীতিগত সিদ্ধান্তের পরিণতি। একটি যুদ্ধের হাতিয়ার, অন্যটি যুদ্ধ চালানোর ফল। এই দুই সংকটকে এক করে দেখলে দায়বদ্ধতা ঝাপসা হয়, ভোগান্তি স্পষ্ট হয় না।
ইসরায়েলি সরকারের প্রতিক্রিয়া এখন পর্যন্ত মূলত প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বল্পমেয়াদি। জরুরি অনুদান, সীমিত খাদ্যসহায়তা এবং অস্থায়ী ভর্তুকির মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ। এগুলো সংকট সামলায়, কিন্তু তার মূল কারণগুলো মোকাবিলা করে না। সামরিক ব্যয়ের অগ্রাধিকার নিয়ে কোনো গভীর পুনর্বিবেচনা হয়নি। কৃষি খাতের শ্রমসংকট মোকাবিলায় কোনো সমন্বিত পরিকল্পনাও দেখা যায়নি। দীর্ঘ যুদ্ধ যে সামাজিক চুক্তিকে ক্ষয় করে, সেই স্বীকৃতিও অনুপস্থিত।
নাগরিকদের বলা হচ্ছে কষ্ট সহ্য করতে, এটিকে নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে দেখতে। আর কাঠামোগত ব্যর্থতা আড়াল করা হচ্ছে সহনশীলতার ভাষায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এতে রাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতায় চাপ তৈরি হয়। একটি রাষ্ট্র যদি বিশ্বের অন্যতম উন্নত সামরিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু তার এক–চতুর্থাংশ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী খাদ্য নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে অগ্রাধিকারের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
ইসরায়েলের এই খাদ্য সংকট কোনো ব্যতিক্রম নয়। এটি স্থায়ী সংঘাতের ওপর সমাজ গড়ে তোলার ঘরোয়া মূল্য। সামরিকীকরণ শুধু বাজেট গ্রাস করে না, সামাজিক সংহতি ও রাজনৈতিক জবাবদিহিকেও ক্ষয় করে। এটি কোনো নিয়তি নয়, কোনো নৈতিক প্রতিশোধও নয়। এটি রাজনৈতিক হিসাব। আজকের ইসরায়েলে ক্ষুধা সেই হিসাবেরই ফল।
* রঞ্জন সলোমন, গোয়াভিত্তিক রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও মানবাধিকারকর্মী
- মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজিতে থেকে অনূদিত
![]() |
| ইসরায়েলের প্রায় ৩০ শতাংশ কৃষিজমি গাজা ও উত্তর সীমান্তের সংঘাতপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত। ছবি: রয়টার্স |

No comments