বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের ‘ভিসা সংকোচন নীতি’কে কাজে লাগাচ্ছে চীন

বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের ‘ভিসা সংকোচন নীতি’কে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে শুরু করেছে চীন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার সঙ্গে ‘বিবাদের’ জেরে  নতুন দিল্লি যখন ভিসার পরিমাণ হ্রাস করেছে, তখন বাংলাদেশিদের কাছে স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দিয়ে বেইজিং বার্ষিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার উপার্জনের আশা করছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, অন্তর্বর্তীকালীন বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস আগামী সপ্তাহে চীনে প্রথম সরকারি সফরে যাবেন। সেইসময়ে বাংলাদেশ ও চীন স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসা খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা করবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ব এশিয়া ডেস্কের প্রধান মোহাম্মদ নরে-আলম বলেন, ‘ইতিমধ্যেই চীনা কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশি রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার জন্য কুনমিং-এ চারটি হাসপাতাল মনোনীত করেছে। ঢাকায় চীনের অর্থায়নে একটি বড় হাসপাতাল স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা চলছে।’

আগামী ২৬ থেকে ২৯ মার্চ ইউনূস তিন দিনের সফরে চীন যাবেন। ২৮ মার্চ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। দুই মাস আগে জানুয়ারিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের প্রথম সরকারি সফরও ছিল চীনে।

বাংলাদেশের গণমাধ্যম জানিয়েছে, চীনা প্রতিপক্ষ ওয়াং ইয়ের সঙ্গে বৈঠকে হোসেন বেইজিংকে বাংলাদেশিদের চিকিৎসায় সহায়তা করতে বলেছেন। ১০ মার্চ বাংলাদেশ থেকে মেডিকেল ট্যুরিজমের জন্য একটি প্রতিনিধিদল চীনের কুনমিং শহরে যান। এর মধ্যে ছিলেন রোগী ও চিকিৎসকরাও। ঢাকা বিমানবন্দরে তাদের বিদায় জানান বাংলাদেশের কর্মকর্তারা। সেখানে ছিলেন ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন।

পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ইয়াও বলেন, ‘প্রয়োজনে একজন বন্ধুই আরেক বন্ধুর পাশে থাকে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কুনমিংয়ের চারটি শীর্ষস্থানীয় সরকারি হাসপাতালকে বাংলাদেশ থেকে রোগীদের গ্রহণ করার জন্য মনোনীত করা হয়েছিল। ঢাকা থেকে মাত্র আড়াই ঘণ্টার একটি ফ্লাইটেই সেই হাসপাতালে পৌঁছানো যাবে।’

সহযোগিতার বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানার জন্য বেনারনিউজ ঢাকার চীনা দূতাবাসের সঙ্গে ই-মেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করেছিল। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব আসেনি।

চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশিদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে যান। প্রধানত পূর্বাঞ্চলীয় শহর কলকাতায়। কারণ সেখানে সংস্কৃতি ও ভাষা বাংলাদেশের মতোই।

ভারতীয় পর্যটন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২.১২ মিলিয়ন মানুষ ভারতে গিয়েছিলেন, যা মোট বার্ষিক পর্যটকের প্রায় ২০% ছিল। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘প্রতিদিন গড়ে আড়াই লাখ বাংলাদেশি মেডিকেল ট্যুরিজমের জন্য ভারতে যান। কিন্তু গত বছর আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণ-আন্দোলনের জেরে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অপসারিত হওয়ার পর প্রতিবেশী দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখ করে ভারত সাময়িকভাবে বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা প্রদান স্থগিত করে।’

ভারতীয় সংবাদপত্র দ্য হিন্দুর ৭ মার্চের প্রতিবেদন অনুসারে, যখন নয়াদিল্লি আবার ভিসা দেয়া শুরু করে, তখন এটি শুধুমাত্র সেইসব বাংলাদেশি রোগীদের জন্যই ইস্যু করা হয় যাদের খুব প্রয়োজন ছিল। প্রতিবেদন মোতাবেক, ভারত আগস্টের আগে বাংলাদেশিদের প্রতিদিন প্রায় ৮,০০০ ভিসা দিত, কিন্তু তারপর থেকে তা এক হাজারেরও কমে পৌঁছেছে। নয়াদিল্লির দাবি, ভিসা ইস্যু কমে যাওয়ার পেছনে রয়েছে কর্মীদের ঘাটতি।

তবে একটি সূত্র দ্য হিন্দুকে বলেছে, এটি আসলে হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অবনতির ফল। কারণ হাসিনা  সরকার ভারতের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিল। সম্পর্কের অবনতির আরো একটি কারণ হলো নয়াদিল্লি ঢাকা থেকে পলাতক হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে। সেখান থেকে বসেই তিনি নানারকম উস্কানিমূলক বিবৃতি দিচ্ছেন। দ্বিতীয় বড় কারণ হল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের রক্ষক হিসেবে বিবেচিত হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে হিন্দুদের বিরুদ্ধে অপরাধের বিষয়ে ভারতের একাধিক অভিযোগ। যদিও এই অভিযোগগুলো এবং প্রতিবেদনগুলো সম্পর্কে অনুসন্ধান করে জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এবং সত্য অনুসন্ধানী সংস্থাগুলো দেখতে পেয়েছে এসব বেশিরভাগই ভুয়া।

ভিসা কমে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চেয়ে ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে ই-মেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব পায়নি। চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, ‘কুনমিংয়ে বাংলাদেশিদের জন্য হাসপাতাল নির্দিষ্ট করার উদ্দেশ্য হলো ভারতের ভিসা সংকোচনের পর স্বাস্থ্যখাতে যে সুযোগ তৈরি হয়েছে তা কাজে লাগানো।’

তিনি বলেন, ‘চীন তো আর বিনা পয়সায় আমাদের সেবা দেবে না। আবার আমাদেরও সেবা দরকার। এটি দুই দেশের জন্যই প্রয়োজন।’ বাংলাদেশের পর্যটন ও এভিয়েশন সেক্টরের একজন পর্যবেক্ষক ওয়াহিদুল আলম বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে রোগীদের আকৃষ্ট করার জন্য চীনের একটি সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা রয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষ বর্তমানে মেডিকেল ভিসা দিতে সাত দিন সময় নেয়। তারা ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে যে চিকিৎসার জন্য ভিসা প্রক্রিয়াকরণের সময় আরও কমানো হবে। উপরন্তু, অনেক চীনা এয়ারলাইন্স কুনমিং-এ প্রতিদিন ফ্লাইট পরিচালনা করে।

আলম বলেন, ‘চীনে চিকিৎসার খরচ ভারতের তুলনায় একটু বেশি। কিন্তু ব্যাংকক ও সিঙ্গাপুরের তুলনায় সস্তা। তবে তাদের পরিষেবা ভালো। চীনে  চিকিৎসার ক্ষেত্রে একটি বাধা হলো ভাষার সমস্যা। এখন হাসপাতালগুলো চীনা ভাষা জানা বাঙালিদের নিয়োগ দিয়েছে।’

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ভারত চীনের চেয়ে সস্তায় চিকিৎসা পরিষেবা প্রদান করতে পারে। কিন্তু মানুষ চীনে যাবে, কারণ তাদের চিকিৎসার প্রয়োজন। যখন চাহিদা থাকবে, তখন সরবরাহও বাড়বে।’

তবে রহমান জোর দিয়ে বলেন, ‘আমাদের দেশীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি করা উচিত। যদি আমরা আটটি শহরে আটটি বড় আধুনিক হাসপাতাল তৈরি করতে পারি, তাহলে মানুষ বিদেশে যাবে না এবং আমরা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচাতে পারব।’

সূত্র: বেনার নিউজ

mzamin


No comments

Powered by Blogger.