গুলশান হামলার মাস্টারমাইন্ড তামিমসহ পাঁচ জঙ্গি ভারতে

গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলার পর র‌্যাবের করা নিখোঁজ তালিকার অন্তত পাঁচজন সন্দেহভাজন জঙ্গি ভারতে আত্মগোপন করেছে বলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেশটিকে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে গুলশান হামলার ‘মাস্টারমাইন্ড’ তামিম আহমেদ চৌধুরীও রয়েছে। নয়াদিল্লিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে বৃহস্পতিবার ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা হয় বলে জানিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া। বৈঠকে এই বিষয়ক আলোচনা ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ছিল বলেও পত্রিকাটি জানায়।
পাঁচ সন্দেহভাজন জঙ্গির মধ্যে তামিম চৌধুরী ছাড়া অন্য চারজন হলেন- ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাইফুল্লাহ ওজাকি, লক্ষ্মীপুরের এটিএম তাজউদ্দিন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের মেরিন ইঞ্জিনিয়ার নজিবুল্লাহ আনসারী ও কুমিল্লার জুন্নুন শিকদার। এসব জঙ্গি সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে- এমন তথ্য পাওয়ার পরপরই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তা ভারতকে অবহিত করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ওই সফরে ছিলেন পুলিশের এমন এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, পাঁচজন নয়, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সাতজন পলাতক জঙ্গির বিষয়ে ভারতকে তথ্য দেয়া হয়।
নয়াদিল্লি সফর শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল শনিবার দেশে ফিরেছেন। বৈঠক প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুই দেশের বৈঠকে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে ঘুরেফিরে পুরনো অনেক ইস্যু এসেছে। সীমান্ত হত্যা, ফেনসিডিলসহ মাদক চোরাচালান বন্ধ ও জঙ্গি নির্মূলে দুই দেশ একযোগে কাজ করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে পাঁচ জঙ্গির বিষয়ে আলোচনা ছাড়াও দেশটিতে গ্রেফতার সন্দেহভাজন জেএমবি সদস্য নুরুল হক মণ্ডল ওরফে নাইমকে ফেরত দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) পক্ষ থেকে জঙ্গিদের ওই তালিকাটি ভারতের গোয়েন্দাদের দেয়া হয়। এর মধ্যে পাঁচজনই জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সদস্য বলে জানিয়েছে র‌্যাব। এ জঙ্গিরা কি বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রবেশ করেছে না কি অন্য দেশ হয়ে ভারতে গেছে, তা স্পষ্ট নয় টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে।
পাঁচ জঙ্গির মধ্যে সিলেটের তামিম আহমেদ চৌধুরী একজন কানাডিয়ান বাংলাদেশী যাকে গুলশান হামলার ‘মাস্টারমাইন্ড’ বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তামিম চৌধুরী আবু ইব্রাহিম আল হানিফ চৌধুরী নামেও পরিচিত। গোয়েন্দারা তাকে জেএমবি নেতা বলে দাবি করলেও আইএসের ম্যাগাজিন ‘দাবিক’-এর বরাত দিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর আসে, তামিম আইএসের বাংলাদেশ শাখার প্রধান। কানাডার উইন্ডসরের বাসিন্দা ৩০ বছর বয়সী তামিম ২০১৩ সালে দেশটি থেকে নিখোঁজ হয় বলে বলা হচ্ছে। সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার দুবাগ ইউনিয়নের বড়গ্রামের প্রয়াত আবদুল মজিদ চৌধুরীর ছেলে শফি আহমদ চৌধুরীর ছেলে তামিম। মজিদ চৌধুরী একাত্তরে শান্তি কমিটির সদস্য ছিল বলে স্থানীয়রা জানায়। তামিমের বাবা শফি আহমদ জাহাজে চাকরি করতেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি সপরিবারে কানাডায় পাড়ি জমান।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ ওজাকি ওরফে সুজিত দেবনাথ জাপানি বাংলাদেশী। ২০০২ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য জাপানে যায় সাইফুল্লাহ ওজাকি। সেখানেই সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। ২০১১ সালে পিএইচডি শেষ করে কিয়োটোর রিৎসুমিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ অব ইন্টারন্যাশনালে শিক্ষকতা শুরু করে। তার স্ত্রী একজন জাপানি নাগরিক। ২০১৫ সালে পরিবার নিয়ে ইউরোপে পাড়ি জমায় সাইফুল্লাহ। এরপর থেকেই তার খোঁজ মিলছে না। রিৎসুমিকান বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, গত জানুয়ারি থেকে অনুমতি ছাড়াই সে প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত ছিল। এ কারণে তাকে বরখাস্ত করা হয়। তার বাবা কাপড় ব্যবসায়ী জনার্দন দেবনাথ সাইফুল্লাহর নিখোঁজের বিষয়ে নবীনগর থানায় একটি জিডি করেন।
আরেক সন্দেহভাজন লক্ষ্মীপুরের এটিএম তাজউদ্দিন নামের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনারত অবস্থায় অস্ট্রেলিয়া থেকে নিখোঁজ হয়। চলতি মাসের শুরুর দিকে লক্ষ্মীপুর সদর পুলিশ স্টেশনে তাকেও নিখোঁজ দেখিয়ে জিডি করা হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাসিন্দা নাজিবুল্লাহ আনসারী মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করতে মালয়েশিয়া গিয়েছিল। গত বছর আইএসে যোগ দিতে ইরাকে যাওয়ার কথা জানিয়ে ভাইকে চিঠি লেখার পর চট্টগ্রাম পুলিশ স্টেশনে তাকে নিখোঁজ দেখিয়ে জিডি দায়ের করা হয় পরিবারের পক্ষ থেকে। জুনুন শিকদারের বাড়ি কুমিল্লায়। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় ২০০৯ সালে জুনুন গ্রেফতার হয়। পরে ঢাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞানে অধ্যয়নরত অবস্থায় ২০১৩ সালে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেফতার হয় সে। পরে জামিন নিয়ে মালয়েশিয়ায় চলে যায় জুনুন।
গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলায় ঘরছাড়া তরুণ-যুবকদের জড়িত থাকার তথ্য প্রকাশের পর আইনশৃংখলা বাহিনী নিখোঁজ ১০ জনের যে প্রথম তালিকা দিয়েছিল, তাতে এই পাঁচজনের নাম ছিল। টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে আরও বলা হয়, সম্প্রতি নিখোঁজ বাংলাদেশীদের সংশোধিত ৬৮ জনের একটি তালিকা তৈরি করে র‌্যাব, যাদের সবার বয়স ১৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। এদের অন্তত পাঁচজন গুলশান হামলার পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও মেঘালয়ে পালিয়ে গিয়ে থাকতে পারে। পত্রিকাটির খবরে আরও বলা হয়, দুই মাস আগে আসাম পুলিশ রাজ্যের চিরাং জেলায় একটি জেএমবি ঘাঁটির সন্ধান পায়, যেখানে স্থানীয় যুবকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। দুই বাংলাদেশী জঙ্গিকে তুরস্কে যেতে সহায়তা করেছিল সাইফুল্লাহ ওজাকি : সন্দেহভাজন জঙ্গি বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত জাপানের নাগরিক সাইফুল্লাহ ওজাকি বাংলাদেশ থেকে দুই জঙ্গিকে তুরস্কে যেতে সহায়তা করেছিল বলে সন্দেহ করছে জাপানের পুলিশ। স্থানীয় পুলিশের বরাত দিয়ে জাপানের সংবাদমাধ্যম জাপান টাইমস জানায়, ওজাকি তাদের জাপান হয়ে তুরস্কে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছিল। এর আগে এক প্রতিবেদনে অসমর্থিত সূত্রের বরাত দিয়ে সাইফুল্লাহ ওজাকির তুরস্কে যাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টার কথা জানিয়েছিল দেশটি। জাপান টাইমসের শনিবারের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর দুই জঙ্গি সিরিয়ায় আইএসের সঙ্গে যোগ দিতে জাপানকে স্টপিং পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করেছিল বলে ধারণা করছে জাপানের পুলিশ। বাংলাদেশ থেকে জাপান, এরপর তুরস্ক হয়ে সিরিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিল তারা। আর এ কাজে ওজাকির সহযোগিতা ছিল বলে মনে করছেন তারা। নিউইয়র্ক টাইমসের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ওজাকিসহ তিন ব্যক্তি বাংলাদেশের জঙ্গি ও দেশের বাইরের সংগঠকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার কাজ করত।