বাজেট এবং উত্তরাঞ্চলবাসীর প্রত্যাশা by ড. তুহিন ওয়াদুদ

ব্রিটিশদের ২০০ বছরের শোষণ আর পাকিস্তানি শোষকের করাল থাবা থেকে মুক্ত হওয়া বাংলাদেশের উন্নয়ন সব অঞ্চলে সমানভাবে হয়নি। প্রান্তিক অঞ্চল রংপুরের মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন না হওয়াটা কার্যকারণ সূত্রে গাঁথা। যমুনা সেতু হওয়ার আগে পর্যন্ত রংপুর অঞ্চলের মানুষ খুব বেশি বিপদে না পড়লে রংপুরের বাইরে যেত না।


জনসংখ্যা বিবেচনায় অতীতের সব বাজেটে রাজশাহী বিভাগ ছিল বৈষম্যের শিকার। প্রান্তিক জেলা হিসেবে রংপুর-দিনাজপুরের মানুষ এখনো কৃষিনির্ভরতার মধ্যেই আছে। রংপুর বিভাগের মানুষ নৃতাত্তি্বক কারণে অলসতাপ্রবণ; তার ওপর সরকারের বাজেট-বৈষম্য আরো পশ্চাৎমুখী করে তুলেছে।
রংপুর বিভাগ সম্পর্কে অভাববিষয়ক অনেক কথাই শোনা যায়, কিন্তু অভাব থেকে স্থায়ী সমাধানের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় না। রংপুর বিভাগে বছরে দুটো সময়ে প্রায় তিন মাস খাদ্য ঘাটতি হয়। আশ্বিন-কার্তিক এবং চৈত্র মাস। কৃষিতে শ্রমের প্রয়োজন হয় না বলে উপার্জনহীন হয়ে পড়ে প্রায় ভূমিহীন মানুষ। আসন্ন বাজেটে রংপুর বিভাগের কথা বিশেষভাবে বিবেচনা করে বাজেট প্রণয়ন করা জরুরি।
রংপুরকে বিভাগীয় কাঠামোতে দাঁড় করানোর লক্ষ্যে সরকার নিশ্চয়ই প্রয়োজনীয় বাজেট প্রণয়ন করবে। রংপুর বিভাগের কাজ উল্লেখযোগ্য হারে শুরু হয়নি। রংপুর বিভাগের কাজ প্রকৃত অর্থে শুরু করতে হলে সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রয়োজন। নির্বাচিত প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা থাকলে আসন্ন বাজেটে তারা নিশ্চয়ই প্রয়োজনীয় বাজেট উপস্থাপন করত, যা রংপুর বিভাগের কাজ ত্বরান্বিত করতে সহায়ক হতো। রংপুর অঞ্চলের মানুষের দারিদ্র্য বিমোচনে যে রিলিফ প্রদান করা হয়, তা বন্ধ করা প্রয়োজন। রিলিফের মাধ্যমে কর্মবিমুখ করার পরিবর্তে কর্মের মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক। সে জন্য কাজের ক্ষেত্র তৈরি করা প্রয়োজন।
রংপুর বিভাগের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের বৈষম্য দূর করা প্রয়োজন। ধারাবাহিকভাবে রাজশাহী বিভাগের জন্য জাতীয় বাজেটে অর্থ কম বরাদ্দ রেখে প্রান্তিক অঞ্চলকে উন্নয়নের ধারায় পশ্চাৎমুখী করে তোলা হয়েছে। দেশের অনুন্নত রংপুর বিভাগ জাতীয় খাদ্য উৎপাদনে যে ভূমিকা রাখে তা দৃষ্টান্তযোগ্য। এ বিভাগে প্রয়োজনীয় বার্ষিক খাদ্যের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ খাদ্য উৎপাদিত হয়। অথচ সম্পদের অসম বণ্টন ভূমিহীনদের খাদ্যহীন করে তুলছে। সরকারি খাস জমিগুলো লিজ ব্যবস্থাপনায় পুঁজিবাদীদের দখলে। শুধু তা-ই নয়, নিম্নাঞ্চলে জলাভূমিগুলো পর্যন্ত একইভাবে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
একই ভৌগোলিক সীমার ভেতরের অসম ব্যবস্থা দূরীকরণের দায়িত্ব বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের। রংপুর অঞ্চলের স্থায়ী উন্নয়নের নিমিত্তে সরকারের সুনির্দিষ্ট বিবেচনাপ্রসূত বাজেট প্রয়োজন। শিল্প-কলকারখানা সব কিছুই রাজধানীকেন্দ্রিক হওয়া সত্ত্বেও ঢাকার মানুষের অনটন দূর হয়নি। দূর করাটা দুঃসাধ্য ব্যাপারও। কিন্তু রংপুর অঞ্চলের মানুষের অনটন তিন মাস। এ তিন মাসের অভাব দূর করার ক্ষেত্রে এ অঞ্চলের তুলনামূলক স্বল্প ব্যয় যথেষ্ট ভূমিকা রাখা সম্ভব।
রংপুর বিভাগে বেশ কিছু ছোট শিল্প-কারখানা রয়েছে। এ শিল্প-কারখানাগুলোর দিকে সরকারের সুদৃষ্টি প্রয়োজন। রংপুরের শতরঞ্চি শিল্প সরকারি সহযোগিতা পেলে প্রসার লাভের সুযোগ পাবে। রংপুরের ঐতিহ্য বেনারসি শিল্পকে ঘিরে প্রচুর জনবল স্বাবলম্বী হতে পারে। তাঁতশিল্প নকশিকাঁথার ন্যায় শিল্পগুলোও সরকারি অনুদান প্রয়োজন। আখ চাষের জন্য রংপুরের মাটি খুবই উপযোগী। চিনি শিল্পের বিকাশের লক্ষ্যে কৃষকদের আখ চাষে উৎসাহী করতে প্রয়োজনে ভর্তুকি দেওয়া দরকার। রংপুরের আলু সংরক্ষণের জন্য সরকারিভাবে হিমঘর নির্মাণ করা প্রয়োজন। এ সবকিছু করলে রংপুরের ঐতিহ্যকে যেমন বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব তেমনি আর্থসামাজিক দৃশ্যও বদলে যাবে। রংপুর অঞ্চলের অভাব দূর করার লক্ষ্যে শিল্প-কারখানা গড়ে তুললে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব। রেল যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা প্রয়োজন। এতে স্বল্প ব্যয়ে যাত্রী এবং মালামাল পরিবহন অনেক সহজ হবে। একসময় লালমনিরহাট হয়ে রেল যোগাযোগের মাধ্যমে ভারত পর্যন্ত যাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। সেই ব্যবস্থা পুনঃ স্থাপনের কথা ভাবা যেতে পারে। কুড়িগ্রামের সোনাহাট স্থলবন্দর গড়ে তুলতে পারলে এবং বুড়িমারী স্থলবন্দর সক্রিয় করলে তা উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আওয়ামী লীগ সরকার বিগত শাসনামলে সোনাহাট স্থলবন্দরের কথা বিবেচনা করে ধরলা সেতুর ওপর দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ করলেও স্থলবন্দরকে সক্রিয় করা হয়নি। ব্রহ্মপুত্র নদে চিলমারীর বন্দর আবার চালু করা প্রয়োজন। আসাম ও বাংলাদেশের মুখ হিসেবে চিলমারীর বন্দর হতে পারে আন্তর্জাতিক নদীবন্দর। দ্রুত পচনশীল পণ্য ব্যতীত অন্যান্য পণ্য নৌপথে রাজধানীসহ দেশের সর্বত্র স্বল্প ব্যয়ে পেঁৗছানো সম্ভব। এতে এলাকার উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্যে অধিক মুনাফা সঞ্চয় করা সম্ভব। আবার পরিবহন খরচ কম হবে, ফলে নৌপথে অন্য সব পণ্য ক্রয় করা সম্ভব। রংপুরকে শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনে শিল্প মালিকদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় আকৃষ্ট করা প্রয়োজন। রংপুর বিভাগে শিল্পায়নের কথা ভাবলে গ্যাস-বিদ্যুতের কথাও আসে। পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস রংপুরে দিতে হবে। দিনাজপুরের কয়লাখনি থেকে কয়লা উত্তোলন করে রংপুর বিভাগে রাখা প্রয়োজন। গ্যাস এবং বিদ্যুৎ সাধ্যের মধ্যে থাকলে নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপন সহজ হবে। রাজশাহী বিভাগের জন্য বিগত বাজেটে মাথাপিছু বরাদ্দ কম দেওয়ায় এবং রংপুর অঞ্চলের মানুষ সেই বৈষম্য নিজ চেষ্টায় দূর করতে না পারার কারণে সৃষ্ট কৃত্রিম অনটন রোধ করার দায়িত্ব সরকারের নিতে হবে। আসন্ন বাজেটে রংপুর অঞ্চলের মানুষ ন্যায়সঙ্গতভাবে তাই রংপুরকে বিশেষ অঞ্চল হিসেবে দেখার দাবি জানায়। রংপুরের মানুষকে সব কিছুই নিতে হয়েছে আন্দোলন করে। বিশ্ববিদ্যালয়, বিভাগ আন্দোলনের ফসল। ভবিষ্যতে হয়তো গ্যাস, কয়লা থেকে প্রাপ্ত বিদ্যুৎসহ অন্যান্য কোনো কিছুর জন্য আন্দোলন আর করতে হবে না। বর্তমান সরকারের প্রতি রংপুরবাসী সেই আস্থা রাখতে চায়। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ৯ বছর, খালেদা জিয়া সরকারের পাঁচ বছর এবং চারদলীয় জোট সরকারের পাঁচ বছর রংপুরের উন্নয়ন চরমভাবে বিঘি্নত হয়েছে। বর্তমান সরকার রংপুরের উন্নয়নে যৌক্তিকভাবে এগিয়ে আসবে। রংপুরের তথা উত্তরাঞ্চলের মানুষ এবারের বাজেটের দিকে তাকিয়ে আছে বড় আশা করে_ মানুষের অনটন দূরীকরণ উপযোগী বাজেট হবে হবে এই ভরসায়।
লেখক : শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়
wadudtuhin@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.