দূর দেশ-ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে আবারও মার্কিন ভেটো? by আলী রীয়াজ

স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের পথে ফিলিস্তিনিদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে এবং এই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকোর পূর্ণ সদস্যপদ পেতে পারে তারা। ৫ অক্টোবর ইউনেসকোর নির্বাহী পরিষদ তাদের সম্মতি দিয়েছে।


ইউনেসকোর সাধারণ পরিষদের ১৯৩ সদস্যদেশের দুই-তৃতীয়াংশের ভোট পেলে ফিলিস্তিন সংস্থার পূর্ণ সদস্যপদ পাবে। ১৯৭৪ সালে সংস্থায় দেশটি পর্যবেক্ষণের আসন লাভ করে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এই নিয়ে ভোটাভুটি স্থগিত রাখা হলে তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। কেননা, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে হুঁশিয়ার করেছে, ফিলিস্তিন ইউনেসকোর সদস্যপদ পেলে যুক্তরাষ্ট্র ইউনেসকোকে অর্থ দেওয়া বন্ধ করে দেবে। সংস্থার মোট বাজেটের ২২ শতাংশ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। প্রায় ১৫ বছরের পুরোনো যুক্তরাষ্ট্রের দুটি আইনে বিধান রাখা হয়েছে যে ফিলিস্তিনকে সদস্যপদ দেওয়া হলে যুক্তরাষ্ট্র এই সংস্থায় কোনো অর্থ দেবে না। যদিও প্রেসিডেন্ট ওবামা ও মার্কিন সরকার এই মুহূর্তেই ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘে সদস্যপদ দেওয়ার ঘোরতর বিরুদ্ধে, প্রশাসন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চেষ্টা করছে কী করে ইউনেসকোকে অর্থ প্রদান অব্যাহত রাখা যায়। এসব আইনে এমন ব্যবস্থা নেই যে প্রেসিডেন্ট কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী রেয়াত দিতে পারেন।
ইউনেসকোকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ সংস্থান বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা ঘটলে সেটা অবশ্য নতুন কিছু হবে না। ১৯৮৪ সালে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইউনেসকো থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়ে সব অর্থ প্রদান বন্ধ করে দিয়েছিল। যদিও রিগান প্রশাসন সে সময় ইউনেসকোর সংস্কারের দাবি তোলে এবং ইউনেসকোতে যথেষ্ট দুর্নীতির ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ করে সরে এসেছিল। আসল কারণ ছিল অন্যত্র এবং তা খুব লুকানো ঘটনাও ছিল না। সত্তর ও আশির দশকে যোগাযোগ ও সাংবাদিকতার জগতে একটা বড় রকমের বিতর্কের সূচনা হয়েছিল যে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সঠিকভাবে তুলে ধরে না। গোটা বিশ্বের তথ্যপ্রবাহকে কয়েকটি দেশ ও প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করার ফলে উন্নয়নশীল দেশ সম্পর্কে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুল ও নেতিবাচক ভাবমূর্তি প্রচারের অভিযোগ ওঠে। তথ্যপ্রবাহকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে পশ্চিমা দেশগুলো শুধু যে অর্থই লুটে নিচ্ছে তা নয়, তারা দেশে দেশে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালাচ্ছে বলে তথ্যপ্রমাণাদিসমেত অভিযোগ ওঠে। ১৯৭৪ সালে নয়া আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার যে দাবি উঠেছিল, তারই আলোকে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামে নতুন তথ্য ও যোগাযোগব্যবস্থার দাবি ওঠে। এই পটভূমিতেই ইউনেসকোর পক্ষ থেকে ১৯৭৭ সালে ১৬ সদস্যের একটি কমিশন নিয়োগ করা হয়। আইরিশ নোবেল বিজয়ী সন ম্যাকব্রাইডের নেতৃত্বাধীন কমিশন ১৯৮০ সালে তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ‘মেনি ভয়েসেস ওয়ান ওয়ার্ল্ড’ (অনেক কণ্ঠস্বর, এক পৃথিবী) নামের এই প্রতিবেদনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিযোগ সমর্থিত হয় এবং তাতে নতুন আন্তর্জাতিক তথ্য ও যোগাযোগব্যবস্থা তৈরির জন্য আহ্বান জানানো হয়। গণযোগাযোগের গবেষক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য অবশ্যপাঠ্য এই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন ইউনেসকো ত্যাগ করে ১৯৮৮ ও ১৯৮৫ সালে। ব্রিটেন ইউনেসকোতে ফিরে আসে ১৯৯৭ সালে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ২০০৩ সাল পর্যন্ত ইউনেসকোর বাইরেই থেকেছে।
প্রায় ২০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র সংস্থায় কোনো অর্থ না দিলেও ইউনেসকো বড় ধরনের কোনো আর্থিক বিপর্যয়ে পড়েনি। তবে তখন গোটা বিশ্বে মন্দাও চলছিল না। যুক্তরাষ্ট্র ইউনেসকো ত্যাগ করলে সংস্থাটির জন্য সমস্যা হবে ঠিকই, কিন্তু তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হবে যুক্তরাষ্ট্রের। স্মরণ করা যেতে পারে, ২০০৩ সালে বুশ প্রশাসন ইউনেসকোতে প্রত্যাবর্তন করতে রাজি হয়েছিল এই কারণে যে পৃথিবীজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে নেতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে, তা বদলে দেওয়া। সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে তারা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। এখন ইউনেসকো ত্যাগ করা বা অর্থ দেওয়া বন্ধ করা মোটেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লাভজনক হবে না।
ওবামা প্রশাসন এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হোক, তা চাইছিল না। কিন্তু রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদ ওই সব আইন বদলে দেবে—এমন আশা করা বাতুলতা মাত্র। প্রথমত, ওবামা প্রশাসনের জন্য ভালো হবে এমন কিছু রিপাবলিকানরা করতে মোটেই রাজি নন। দ্বিতীয়ত, রিপাবলিকান পার্টির নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির ব্যাপারে খুব উৎসাহী নন।
ইউনেসকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার কতটা ক্ষতিকারক হবে, তার খানিকটা ধারণা দিয়েছেন ইউনেসকোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা। ওয়াশিংটন পোস্ট-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি বলেন, ইউনেসকো যেসব কাজে জড়িত রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ; যেমন—আফগানিস্তানের জাতীয় পুলিশের সদস্যদের মধ্যে সাক্ষরতা অভিযান, আফগানিস্তানের ১৮টি প্রদেশে ছয় লাখ শিক্ষার্থীকে শিক্ষাদান। ওবামা প্রশাসন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চেষ্টা করছে, ইউনেসকোর সাধারণ পরিষদে আসন্ন এই ভোট বিলম্বিত করা যায় কি না। কিন্তু তার সম্ভাবনা খুব বেশি আছে বলে মনে হয় না। ইউনেসকোর নির্বাহী পরিষদে ফিলিস্তিনের সদস্যপদের পক্ষে ভোট পড়েছিল ৪০টি, বিপক্ষে চারটি, অনুপস্থিত থেকেছে ১৪টি দেশ। সাধারণ পরিষদেও ভোটের সংখ্যা এই অনুপাতে হবে বলেই মনে হয়।
ইউনেসকোতে সদস্যপদ লাভের জন্য ফিলিস্তিনিদের আগ্রহের কারণ প্রধানত দুটি। প্রথমত, তারা জাতিসংঘে তাদের সদস্যপদের বিষয়টি নিয়ে চাপ অব্যাহত রাখতে চাইছে। দ্বিতীয়ত, ইউনেসকোর সদস্যপদ পেলে তারা বিশ্ব-ঐতিহ্য কনভেনশনের অংশীদার হবে, যার সূত্রে তারা ফিলিস্তিনের বেশ কিছু শহরকে ‘বিশ্ব-ঐতিহ্য’-এর তালিকাভুক্ত করতে পারবে। তবে ফিলিস্তিনিদের জন্য ইউনেসকোর সদস্যপদ লাভই শেষ কথা নয়। এখানে সাফল্য লাভ করা সম্ভব হলে তারা অন্যান্য সংস্থা, যেমন—বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ইত্যাদিতে সদস্যপদ চাইবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইতিমধ্যে এসব আইন বদল করতে না পারে, তবে একে একে সব সংস্থায়ই তারা একঘরে হয়ে পড়বে এবং সেগুলো ত্যাগ করতে বাধ্য হবে। এ জন্যই যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, ইউনেসকো ফিলিস্তিনের সদস্যপদ না দিক।
ফিলিস্তিনি নেতাদের এই কৌশল এক অর্থে খুব জরুরিও হয়ে পড়েছে। কেননা, জাতিসংঘের সদস্যপদের জন্য ফিলিস্তিনিদের আবেদনের পর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা যতটা জোরদার হবে বলে আশা করা হয়েছিল, ততটা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও রাশিয়ার সমন্বয়ে গঠিত কোয়ার্টেট ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সরাসরি আলোচনা শুরু করতে পারবে বলে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ২৩ অক্টোবরের মধ্যে আলোচনা শুরু করার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত কোয়ার্টেট আলাদা করে দুই পক্ষের সঙ্গেই কথা বলছে। তারা আগামী ৯০ দিনের মধ্যে একটি নতুন প্রস্তাব দেবে বলেও বলছে, কিন্তু ২০১২ সালের অক্টোবরের মধ্যে চুক্তির যে কথা গত সেপ্টেম্বরে বলা হয়েছিল, তা নিয়ে ফিলিস্তিনি নেতারা এখন আশাবাদী নন। আলোচনা শুরু করার বড় ব্যাখ্যাটি মোটেই নতুন নয়—অধিকৃত এলাকায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপন অব্যাহত রাখা। বসতি স্থাপন বন্ধ না করলে ফিলিস্তিনিরা আলোচনায় বসতে মোটেই রাজি নয়। ২০০৩ সালে এই চার পক্ষ বা কোয়ার্টেট যে শান্তি প্রস্তাব দিয়েছিল, তাতেও বসতি স্থাপন বন্ধ করার কথা ছিল; যা ইসরায়েল কখনোই অনুসরণ করেনি। ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এখন দক্ষিণপন্থী দলের প্রভাব বেড়েছে বলে বসতি স্থাপনে সাময়িক বিরতির প্রস্তাবও ইসরায়েলি সরকার গ্রহণ করতে পারছে না।
এই পটভূমিকায় ইউনেসকোতে ফিলিস্তিনের সদস্যপদ নিশ্চিত হলে ইসরায়েল যেমন এক ধরনের চাপের মুখে পড়বে, ঠিক তেমনি সেখানকার দক্ষিণপন্থীরা আরও বেশি সরব হওয়ার সুযোগ পাবে। তার প্রতিক্রিয়া কী হবে, সেটা অনুমান করা কঠিন নয়। কিন্তু এই অচলাবস্থাও বেশি দিন অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে না। ইউনেসকোর সদস্যপদ লাভের চেষ্টা যে কারণেই এক অর্থে ইতিবাচক। কিন্তু এক কদম এগোনোর পর দুই কদম পিছিয়ে পড়তে হয় কি না, সেটাই আশঙ্কার বিষয়।
ইলিনয়, যুক্তরাষ্ট্র
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

No comments

Powered by Blogger.