বেগম রোকেয়ার এয়ুটোপিয়া by সলিমুল্লাহ খান

মরা এক্ষণে যাঁহাকে 'বেগম রোকেয়া' নামে ডাকিতেছি তাঁহার বাল্যনাম ছিল রোকেয়া খাতুন। বিবাহ সম্বন্ধ করিবার পর তাঁহার পরিচয় দাঁড়ায় মিসেস [রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ওরফে] আর. এস্. হোসেন। যখন তিনি পত্রপত্রিকায় লেখা প্রকাশ করিতেছিলেন তখন সকলে তাঁহাকে 'মিসেস আর. এস্. হোসেন' নামেই ডাকিতেন। কালক্রমে তিনি 'বেগম রোকেয়া' নামেই সমধিক প্রসিদ্ধ হইয়াছেন।


\বাংলাদেশের মুসলমান সমাজে সাধারণ বিচারে যাঁহারা অভিজাত বা সম্ভ্রান্ত ভদ্রমহিলা তাঁহাদের নামেই বেগম বা খানম শব্দ ব্যবহারের রীতি। মিসেস আর. এস্. হোসেনও সেই কথাটি বিলক্ষণ জানিতেন। 'সুলতানার স্বপ্ন' নামক সুন্দর গল্পের বাংলা সংস্করণে তিনি ইহার প্রমাণ রাখিয়া গিয়াছেন। লিখিয়াছেন, 'ভারতে যে সকল বেগম খানম প্রমুখ বড় ঘরের গৃহিণীরা রন্ধনশালার ত্রিসীমানায় যাইতে চাহেন না, তাঁহারা এমন কেন্দ্রীভূত সৌরকর পাইলে আর রন্ধনকার্যে আপত্তি করিতেন না।' [রোকেয়া-রচনাবলী, আবদুল কাদির সম্পাদিত, দ্বিতীয় মুদ্রণ, ১৯৮৪, পৃ. ১৪৭]।
রোকেয়া খাতুন তো ছোটখাটো জমিদার পরিবারে জন্মিয়াছিলেন। সুতরাং তাঁহাকে বেগম বলিতে দোষ নাই। তিনি নিজেও তো 'মিসেস' পূর্বাধি ব্যবহার করিয়াছেন। এই রকম ওজর অনেকেই দিয়া থাকিতেন। তবু আমার মনে হয় ইহাতে কোথাও কি একটা অন্যায় আছে।
অনেক মনীষী বলিতেছেন রোকেয়ার দান বিবিধ এ কথা মিথ্যা নহে। কিন্তু তাঁহার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি নারীমুক্তি আন্দোলন করিয়াছেন, আন্দোলনে প্রেরণা দিয়াছেন। আমার ধারণা যাঁহারা এই জাতীয় উক্তি করেন তাঁহারা রোকেয়ার সাহিত্য সাধনা বা সাহিত্যকর্মকে খানিক ছোট করিয়াই দেখেন। যেমন মহাত্মা গোলাম মুরশিদ লিখিয়াছেন, 'সুলতানার স্বপ্ন' গল্পে রোকেয়া যে নারীস্থান [এবং নারীর আধিপত্য] কল্পনা করিয়াছেন তাহা 'অভিনব অথবা মৌলিক' নহে। মুরশিদ গ্রিক নাট্যকার আরিস্তোফানেস হইতে শুরু করিয়া ঊনবিংশ শতাব্দীর ইংরেজি সাহিত্য অবধি আসিয়াছেন। বলিয়াছেন, 'উপন্যাসে এ ভাবের প্রতিফলন ঊনবিংশ শতাব্দীর ইংরেজি সাহিত্যে একেবারে অনুপস্থিত নয়।' [গোলাম মুরশিদ, রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া। ১৯৯৩, পৃ. ১৪২]
কাজের কথা হইতেছে, রোকেয়া প্রকৃত প্রস্তাবে কী লিখিয়াছেন তাহার বিচার করা। এই বিচার করিতে না পারার ফল হইয়াছে বিষময়। 'পদ্মরাগ' উপন্যাসের কথা তুলিতে না তুলিতে মুরশিদ বলিয়াছেন, রোকেয়ার ভাষাও খানিকটা বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষার মতন। দোষের মধ্যে একটা : 'তবে প্রবন্ধ আর উপন্যাসের মধ্যে ভাষার যে পার্থক্য থাকে, রোকেয়া অবশ্য তা বজায় রাখতে পারেননি।' [মুরশিদ, ওই, পৃষ্ঠা ১৫২]
ইচ্ছা করিলে পাঠিকা এই রকম অপরিণত সমালোচনার আরও উদাহরণ ঢের আহরণ করিতে পারিবেন। ইহাতে শুদ্ধ প্রমাণ পাই, লোকে রোকেয়ার লেখা সত্য সত্যই পড়িয়া দেখেন নাই। না পড়িয়াই লিখিয়াছেন। নহিলে গোলাম মুরশিদ কি স্রোতের সঙ্গে গা ভাসাইয়া বলিতেন, 'সুলতানার স্বপ্ন' নামে স্বপ্ন, 'উচ্চতর কোনো দাবি বা ভানও নেই লেখিকার'? উচ্চতর দাবি বলিতে কি বুঝায়? তাহা বিশদ করার দরকার আছে।
আমরা সবিনয়ে নিবেদন করিব রোকেয়ার 'সুলতানার স্বপ্ন' সত্য সত্যই উচ্চতর মর্যাদার দাবিদার। স্যার টমাস মোরের 'এয়ুটোপিয়া' জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ। তাহার সহিত তুলনা করিলেও রোকেয়ার 'সুলতানার স্বপ্ন' উচ্চতর মর্যাদা দাবি করিতে পারিবে_ ইহাই আমার প্রতিপাদ্য।

\ ২ \
প্রথমেই বলিয়া রাখি, রোকেয়ার 'সুলতানার স্বপ্ন' প্রথমে ইংরেজিতে লেখা হইয়াছিল। 'মতিচূর' দ্বিতীয় খণ্ডের বিজ্ঞাপনে [১৯২১] রোকেয়া জানাইলেন : 'ইংরাজি অনভিজ্ঞা পাঠিকা ভগিনীদের আগ্রহাতিশয্যে উহার বাংলা করা গিয়াছে।' কিন্তু একটা কথা রোকেয়া গোপন করিয়াছেন : বাংলা সংস্করণে তিনি অনেক নূতন কথা ঢুকাইয়াছেন। দুই ভাষার দুই সংস্করণ মিলাইয়া পড়িলেই পাঠিকা তাহা ধরিতে পারিবেন। রোকেয়ার ভাব বুঝিতে হইলে তাহার প্রয়োজনও আছে।
প্রমাণ হিসাবে আমরা শুদ্ধ একটি কি দুইটি প্রস্তাব তুলিয়া দেখাইব। ১৯০৮ সালে প্রকাশিত দ্বিতীয় ইংরেজি সংস্করণে গল্পের প্রস্তাবনা লেখা হইয়াছিল এই রকম
One evening I was lounging in an easy chair in my bed-room and thinking lazily of the condition of Indian womanhood. I am not sure whether I dozed off or not. But, as far as I remember, I was wide awake. I saw the moonlit sky sparkling with thousands of diamond-like stars, very directly. . [রোকেয়া রচনাবলী, পৃ. ৫৭৫]
এক্ষণে ১৯২১ সনে প্রকাশিত 'সুলতানার স্বপ্ন' বাংলা সংস্করণ মিলাইয়া দেখিবেন। লেখা হইয়াছে :
'একদা আমার শয়নকক্ষে আরাম কেদারায় বসিয়া ভারত-ললনার জীবন সম্বন্ধে চিন্তা করিতেছিলাম,_ আমাদের দ্বারা কি দেশের কোন ভাল কাজ হইতে পারে না?_ এইসব ভাবিতেছিলাম। সে সময় মেঘমুক্ত আকাশে শারদীয় পূর্ণিমার শশধর পূর্ণগৌরবে শোভমান ছিল; কোটি লক্ষ তারকা শশীকে বেষ্টন করিয়া হীরক প্রভায় দেদীপ্যমান ছিল। মুক্ত বাতায়ন হইতে কৌমুদীস্নাত উদ্যানটি স্পষ্টই আমার দৃষ্টিগোচর হইতেছিল। এক একবার মৃদুসি্নগ্ধ সমীরণ শেফালি-সৌরভ বহিয়া আনিয়া ঘরখানি আমোদিত করিয়া দিতেছিল। দেখিলাম, সুধাকরের পূর্ণকান্তি, সুমিষ্ট কুসুমের সুমিষ্ট সৌরভ, সমীরণের সুমন্দ হিল্লোল। রজতচন্দ্রিকা, ইহারা সকলে মিলিয়া আমার সাধের উদ্যানে এক অনির্বচনীয় স্বপ্নরাজ্য রচনা করিয়া ফেলিয়াছে। তদ্দর্শনে আমি আনন্দে আত্মহারা হইলাম_ যেন জাগিয়াই স্বপ্ন দেখিতে লাগিলাম! ঠিক বলিতে পারি না আমি তন্দ্রাভিভূত হইয়াছিলাম কি না; কিন্তু যতদূর মনে পড়ে, আমার বিশ্বাস আমি জাগ্রত ছিলাম।' [রোকেয়া রচনাবলী, পৃ. ১৩৩]
ইহার পরের প্রস্তাব ইংরেজিতে লেখা আছে :
অষষ ড়হ ধ ংঁফফবহ ধ ষধফু ংঃড়ড়ফ নবভড়ৎব সব; যড় িংযব পধসব রহ, ও ফড় হড়ঃ শহড়.ি ও ঃড়ড়শ যবৎ ভড়ৎ সু ভৎরবহফ, ঝরংঃবৎ ঝধৎধ.
আর বাংলায় পড়িবেন :
সহসা আমার পাশর্ে্ব একটি ইউরোপীয় রমণীকে দণ্ডায়মান দেখিয়া বিস্মিত হইলাম। তিনি কি প্রকারে আসিলেন বুঝিতে পারিলাম না। তাঁহাকে আমার পরিচিতা 'ভগিনী সারা' [ঝরংঃবৎ ঝধৎধ] বলিয়া বোধ হইল।
রোকেয়া 'মাই ফ্রেন্ড' কথার বাংলা করিয়াছেন 'আমার পরিচিতা' আর 'এ লেডি' কথার তর্জমাস্বরূপ 'একটি ইউরোপীয় রমণী' লিখিয়া ক্ষান্ত হয়েন নাই। 'বিফোর' শব্দের মানে লিখিয়াছেন 'পাশর্ে্ব'। কিন্তু এই সকল বাহিরের কথা। অন্তরের কথা আরো। বিবরণের যে কৌশল রোকেয়া প্রয়োগ করিয়াছেন তাহা সিদ্ধ। পহিলা তিনি জাগিয়া আছেন কি ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন, স্থির নাই। দ্বিতীয়, যাহাকে 'ভগিনী সারা' বোধ হইল তিনি একটু পরেই প্রমাণিত হইবেন মোটেও ভগিনী সারা নহেন। অপরিচিতা বা অন্য নারী। রোকেয়ার নায়িকা লিখিতেছেন : 'ক্রমে বুঝিতে পারিলাম, আমার সঙ্গিনী যে দার্জিলিংবাসিনী ভগিনী সারা নহেন_ ইহাকে আর কখনও দেখি নাই।' [রোকেয়া রচনাবলী, পৃ. ১৩৩৪]
এই অপরিচিতার সহিতই তিনি কিনা বাহিরে চলিয়া আসিলেন। প্রথমে নিজের শয়নকক্ষের বাহিরে। পরে দেখিলেন এক নূতন দেশে। অপরিচিতা অভয় দিতেছেন এই বলিয়া : 'আপনার ভয় নাই_ এখানে আপনি কোন পুরুষের সম্মুখে পড়িবেন না। এ দেশের নাম নারীস্থান। এখানে স্বয়ং পুণ্য নারীবেশে রাজত্ব করেন। [রোকেয়া রচনাবলী, পৃ. ১৩৫]
\ ৩ \ রোকেয়ার বেশিক্ষণ না যাইতেই মনে পড়িল কলিকাতার কথা। নারীস্থানের রাজধানী দেখিয়া এই তুলনা আসাটা স্বভাবধর্মের বিরুদ্ধ কাজ নহে। সুলতানা যখন বলিলেন, 'সমস্ত নগরখানি একটি কুঞ্জ ভবনের মত দেখায়! যেন ইহা প্রকৃতি রাণীর লীলা কানন! আপনাদের উদ্যান-রচনা-নৈপুণ্য অত্যন্ত প্রশংসনীয়।' তখন অপরিচিতা বলিয়াই ফেলিলেন, 'ভারতবাসী ইচ্ছা করিলে কলিকাতাকে ইহা অপেক্ষা অধিক সুন্দর পুষ্পোদ্যানে পরিণত করিতে পারেন!' [রোকেয়া রচনাবলী, পৃ. ১৩৫]।
বেগম রোকেয়ার প্রথম ব্রত এই মন্তব্যের মধ্যে হাজির হইয়াছে। পুরুষজাতি যেমন অলস তেমন বাকপটু। 'তাঁহাদিগকে অনেক গুরুতর কার্য করিতে হয়। তাঁহারা কেবল উপবনের উন্নতিকল্পে অধিক সময় ব্যয় করা আবশ্যক মনে করিবেন।' উত্তরে অপরিচিতা জানাইলেন, 'ইহা ছাড়া তাহারা আর কি বলিতে পারেন? জানেন এ অলসেরা অতিশয় বাকপটু হয়।'
এই জায়গায় আমরা ধরিয়া লইতে পারি নারী ও প্রকৃতির সম্বন্ধ নিবিড় বলিয়া দেখাইতেছেন তিনি। প্রশ্নে উঠিবে আদিতেই_ 'প্রকৃতি' বলিতে কি বুঝায়। নারীস্থান নামক নূতন দেশ হইতে যে সন্দেশ সংগ্রহ করা গিয়াছে তাহাতে দেখা যায় প্রকৃতির সংজ্ঞা উল্টাইয়াছে। অপরিচিতা সাক্ষ্য দিতেছেন :'নরনারী উভয়েই একই সমাজ দেহের বিভিন্ন অঙ্গ,_ পুরুষ শরীর, রমণী মন।' [রোকেয়া রচনাবলী, পৃ. ১৪৯]
দান উল্টাইয়া গিয়াছে।
রোকেয়া নূতন দেশের নাম যে 'নারীস্থান' রাখিয়াছেন তাহাতেও এই ইঙ্গিত আছে। বাংলা সংস্করণের মধ্যে পাদটীকাযোগে লেখা দেখিতেছি :'পরীস্থান' শব্দের অনুসরণে 'নারীস্থান' বলা হইল। ইংরাজিতে 'লেডীল্যান্ড' বলা গিয়াছে।' [রোকেয়া রচনাবলী, পৃ. ১৩৫]
নারীস্থান পরীস্থান বটেই। যদি জানি 'পরীস্থান' কি বস্তু তাহাতে জানি আরো! পরী মানে শুদ্ধ নারী নহে, পরনারীও বটে। পরীস্থান মানে পরের দেশও বৈকি! পুরুষজাতির প্রথম পর 'নারী'। তাই নারীর অপর নাম 'পরী'। রোকেয়ার সে কালের দেশ ভারতবর্ষ যে পুরুষস্থান তাহা এইভাবে প্রকাশ করিলেন তিনি। সুলতানা তো একত্রে গুছাইয়া বলিয়াছেন : 'জানেন, ভগিনী সারা! সামাজিক বিধিব্যবস্থার উপর আমাদের কোন হাত নাই। ভারতে পুরুষজাতি প্রভু, তাহারা সমুদয় সুখ-সুবিধা ও প্রভুত্ব আপনাদের জন্য হস্তগত করিয়া ফেলিয়াছে, আর সরলা অবলাকে অন্তঃপুর রূপ পিঞ্জরে রাখিয়াছে।' [রোকেয়া রচনাবলী পৃ. ১৩৭]
রোকেয়ার প্রথম ব্রত তাই দাঁড়াইয়াছে ভারতের তথা পুরুষস্থানের নারীরা যেমন অন্তঃপুরে থাকেন, নারীস্থানের পুরুষজাতিও যেন তেমনই গৃহাভ্যন্তরে অবরুদ্ধ থাকেন। শুনিয়া সুলতানা প্রাণে বড় আরাম পাইলেন : 'পৃথিবীতে অন্তত এমন একটি দেশও আছে, যেখানে পুরুষজাতি অন্তঃপুরে অবরুদ্ধ থাকে! ইহা ভাবিয়া অনেকটা সান্ত্বনা অনুভব করা গেল!' [রোকেয়া রচনাবলী, পৃ. ১৩৬]
নারীজাতিকে অবরুদ্ধ রাখা যে কি পরিমাণ অন্যায় কর্ম তাহা বুঝিতে হইলে একবার অন্তত পুরুষজাতিকেও অবরুদ্ধ রাখিবার প্রয়োজন রহিয়াছে। কারণ 'যতদিন না হইবে তোমার অবস্থা আমার সম ততদিন...'। দুঃখেরও ন্যায় আছে।
নারীরা যদি অন্তঃপুরের বাহিরে থাকেন তবে তাহাদের নিরাপদ থাকা সম্ভব হইবে কি? এই প্রশ্নের উত্তরে অপরিচিতা যে যুক্তি দিয়াছেন তাহাও ভাবিবার কথা। পুরুষজাতি যতদিন বাহিরে থাকিবে ততদিন নারীজাতি নিরাপদ থাকিবে না। অতএব পুরুষকে বন্দি করিলে নারীর বাহিরে আসিবার বিরুদ্ধে আর কোনো যুক্তি থাকে কি? আর কোনো ওজর থাকার কথা তো নহে।
অপরিচিতা বলিলেন, 'মনে করুন, কতকগুলি পাগল যদি বাতুলাশ্রম হইতে বাহির হইয়া পড়ে, আর তাহারা অশ্ব, গবাদি_ এমনকি ভাল মানুষের প্রতিও নানা প্রকার উপদ্রব উৎপীড়ন আরম্ভ করে, তবে ভারতবর্ষের লোকে কি করিবে?' সুলতানা বলিলেন, 'তবে তাহারা পাগলগুলিকে ধরিয়া পুনরায় বাতুলাগারে আবদ্ধ করিতে প্রয়াস পাইবে।' [রোকেয়া রচনাবলী পৃ. ১৩৬-৩৭]
তবে প্রশ্ন থাকিয়াই যাইতেছে। ভারতবর্ষের নারীজাতি কেন অবরুদ্ধ অবস্থায় রহিয়াছে? দোষ পুরুষের, অথচ নারী বন্দি। ইহার ব্যাখ্যা কী?
যাঁহারা বলেন 'যাহার বল বেশি সেই স্বামিত্ব করিবে' নারীস্থানের মুখপাত্রী তাহাদের অনুরাগী নহেন। তিনি বলেন, 'সিংহ কি বলে বিক্রমে মানবাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ নহে? তাই বলিয়া কি কেশরী মানবজাতির উপর প্রভুত্ব করিবে?' [রোকেয়া রচনাবলী, পৃ. ১৩৭]
অপরিচিতার ভর্ৎসতা এই যে ভারতের নারীজাতির কর্তব্যে
কোথাও বা ত্রুটি হইয়াছে। তাঁহারা সমাজের উপর কর্তৃত্ব ছাড়িয়া একাধারে নিজের উপর অত্যাচার আর অন্যাধারে স্বদেশের অনিষ্ট করিয়াছেন। সমাজের অনুন্নতির ইহাই প্রকৃত কারণ-নির্দেশ করিয়াছেন তিনি।
\৪\
রোকেয়ার দ্বিতীয় ব্রত তাহা হইলে দাঁড়াইতেছে, পুরুষ জাতিকে অন্তঃপুরে বন্দি করা। কিন্তু তাহা কী করিয়া সম্ভব? নারীস্থানের দৃষ্টান্ত এক্ষণে সম্মুখে আসিতে পারে। কথায় বলে উদ্দেশ্য থাকিলে উপায় হয়। রোকেয়াও প্রথমে উদ্দেশ্য আর পরে উপায় দেখাইয়াছেন।
'সুলতানার স্বপ্ন' নিছক বহি নহে। ইহার গভীর ছক আছে। এই ছকে দেখা যাইতেছে ভারতবর্ষের পরাধীন অবস্থার জন্যও পুরুষজাতির শাসনই দায়ী। তবে নারীর হাতে সমাজের কর্তৃত্বভার ছাড়িয়া দিলে দেশের স্বাধীনতা ফিরিয়া আসিতে পারে। এখানে এক কোপেই রোকেয়া দুই ঘা মারিয়াছেন। একবার প্রতিবেশী কোনো দেশ কোনো কারণে নারীস্থান আক্রমণ করে। কিন্তু পুরুষ সেনাবাহিনী যুদ্ধে হারিয়া যায়। দেশের স্বাধীনতা বিপন্ন হয়। এমন সময় নারীজাতির প্রতিনিধিরা বাহুবলে নহে, বুদ্ধি ও বিজ্ঞানবলে দেশ রক্ষা করিতে সমর্থ হয়েন। সেই সময় হইতে নারীস্থান শাসনের ভার পুরুষজাতির হাত হইতে বদল হইয়া নারীজাতির হেফাজতে গিয়াছে। এই বিপ্লব কেমন করিয়া সম্ভব হইল রোকেয়া তাহার বিস্তারিত বর্ণনা লিখিয়াছেন। আমরা স্থানাভাবে নারীস্থান পুরা ভ্রমণ করিতেছি না। সংক্ষেপে লিখিতেছি। এই বিপ্লবটি অনেকখানি রাশিয়ার ১৯১৭ সালের বিপ্লবের সদৃশ। রশিয়ায় মজুরশ্রেণী ক্ষমতা হাতে লইয়াছিল আর এখানে নারীজাতি। পার্থক্যের মধ্যে ইহাই। যুদ্ধ শুরু হইয়াছে। 'কেবল বেতনভোগী সেনা কেন, দেশের ইতর-ভদ্র_ সকল লোকই যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হইলো। এমনকি ৬০ বৎসরের বৃদ্ধ হইতে ষোড়শবর্ষীয় বালক পর্যন্ত সমরশায়ী হইতে চলিল। কতিপয় প্রধান সেনাপতি নিহত হইলেন; অসংখ্য সেনা প্রাণ হারাইল; অবশিষ্ট যোদ্ধাগণ বিতাড়িত হইয়া পৃষ্ঠপ্রদর্শনে বাধ্য হইল। শত্রু এখন রাজধানী হইতে মাত্র ১২/১৩ ক্রোশ [মানে ২৫ মাইল] দূরে অবস্থিত। আর দুই চারি দিবসের যুদ্ধের পরেই তাহারা রাজধানী আক্রমণ করিবে।' [পৃ. ১৪৩]
এমতাবস্থায় দেশরক্ষার ভার বাধ্য হইয়া নারীজাতির একটি বাহিনী হাতে লইল। তাহারা যুদ্ধে যাইবার আগে শর্ত দিল, 'স্বদেশ ও স্বাধীনতার অনুরোধে পুরুষদের অন্তঃপুরে থাকিতে হইবে।' [পৃ. ১৪৫]
তাহাতে কাজ হইল। রোকেয়া লিখিয়াছেন, 'অবলার যুদ্ধযাত্রার কথা শুনিয়া ভদ্রলোকেরা প্রথমে হাস্য সম্বরণ করিতে পারিলেন না। পরে ভাবিলেন মন্দ কি? তাঁহারা আহত এবং অত্যন্ত ক্লান্ত শ্রান্ত ছিলেন_ যুদ্ধে আর রুচি ছিল না, কাজেই মহারাণীর এই আদেশকে তাঁহারা ঈশ্বর প্রেরিত শুভ আশীর্বাদ মনে করিলেন। মহারাণীকে ভক্তি সহকারে নমস্কার করিয়া তাঁহারা বিনাবাক্য ব্যয়ে অন্তঃপুরে আশ্রয় লইলেন।' [পৃ. ১৪৫]
তখন হইতে অন্তঃপুরের নাম 'জেনানা' স্থলে 'মর্দানা' হইল। বিপ্লব আর কাহাকে বলিব?
নারীবাহিনী কীভাবে দেশরক্ষা করিলেন? করিলেন বিদ্যার জোরে। তাঁহাদের আবিষ্কৃৃত সৌরকরের সাহায্যে শত্রুবাহিনী পরাজিত, পলায়নপর হইল। নারীমুক্তির প্রথম সোপান শিক্ষা_ রোকেয়ার ব্রত এইভাবে প্রতিষ্ঠালাভ করিল। বিজ্ঞান বলে নারী শুধু যুদ্ধই জয় করিল না, দেশসুদ্ধ ভাবের বিপ্লবও আনিল। সুলতানা শুনিলেন, 'নারীর হস্তে একটি লোকেরও মৃত্যু হয় নাই_ একবিন্দু নরশোণিতেও বসুন্ধরা কলঙ্কিত হয় নই_ অথচ শত্রু পরাজিত হইল।' [পৃ. ১৪৬]
এদিকে বিপ্লব দীর্ঘজীবী হইল। রাজ্যশাসনের ব্যাপারেও আর পুরুষের সাহায্য প্রয়োজন হইল না। পুরুষ জাতি অন্তঃপুরে ছিলেন, সেইখানেই থাকিলেন। অপরিচিতা জানাইলেন, 'যতদিন মর্দানা প্রথা প্রচলিত হইয়াছে, তদবধি এদেশে কোন প্রকার পাপ কিংবা অপরাধ হয় নাই। সেই জন্য আসামি গ্রেফতারের নিমিত্ত আর পুলিশের প্রয়োজন হয় না_ ফৌজদারী মোকদ্দমার জন্য ম্যাজিস্ট্রেটেরও আবশ্যক নাই।' [পৃ. ১৪৭]
আমাদের দেশের অনেক বীর বিচারক রোকেয়ার 'সুলতানার স্বপ্ন'কে নিছক নারীমুক্তির এশতেহার ধরিয়া পড়িতেছেন। তাহাতে দোষ নাই। কিন্তু এই সত্য অর্ধসত্য মাত্র। রোকেয়ার ব্রত অধিক গিয়াছে। তিনি পরাধীনতার দায় চাপাইয়াছেন 'জেনানা' প্রথা তথা পুরুষজাতির শাসনব্যবস্থার ঘাড়ে।
এই অবস্থায় দেশোন্নতির পথ নারীর হাতে ন্যস্ত করিলে বেশ হয়। সুলতানা বলিতেছেন, 'জানেন ভগিনী সারা। ভারতবাসীর বুদ্ধি সুপথে চালিত হয় না_ জ্ঞান বিজ্ঞানের সহিত আমাদের সম্পর্ক নাই। আমাদের সব কার্যের সমাপ্তি বক্তৃতায়, সিদ্ধি করতালি লাভে! কোন দেশ আপনা হইতে উন্নত হয় না, তাহাকে উন্নত করিতে হয়।' সুলতানা পুঁছিলেন, 'নারীস্থানে কখনও স্বর্ণবৃষ্টি হয় নাই কিম্বা জোয়ারের জলেও মণিমুক্তা ভাসিয়া আইসে নাই?
অপরিচিতা উত্তরিলেন 'না'। [পৃ. ১১৮]
সুলতানা স্বীকার করিলেন, নারীস্থান একটা নগণ্য দেশ ছিল। ত্রিশ বছরে সুসভ্য হইয়াছে। শুধু কি তাহাই? প্রকৃতপক্ষে দশ বৎসরেই দেশটি স্বর্গতুল্য পুণ্যভূমি হইয়া দাঁড়াইয়াছে। সে দেশে বিদ্যুৎ-সাহায্যে চাষের কাজ হয়। চপলা তাহাদের অনেক কাজ করিয়া দেয়। ভারী বোঝা উত্তোলন ও বহনের কাজ তাহার মধ্যে। তাহাদের বায়ু শকটও তাহা দ্বারাই চালিত হয়। সে দেশে 'রেল-বর্ত্ম পাকা বা বাঁধ সড়ক নাই, কেবল পদব্রজে ভ্রমণের পথ আছে।' [পৃ. ১৪৮]
ফলে রেলওয়ে দুর্ঘটনার ভয় নাই। রাজপথেও লোকে শকটচক্রে পেষিত হয় না। 'যে সব পথ আছে, তাহা ত কুসুম-শয্যা বিশেষ।' সুলতানা জানিতে পারিলেন, দশ-এগার বছর হইতে সেই দেশে অনাবৃষ্টিতে কষ্ট পাইতে হয় না। অপরিচিতা বলিলেন, 'আবশ্যক মত সমস্ত শস্যক্ষেত্রে জলসেচ করা হয়। আবার জলপ্লাবনেও আমরা ঈশ্বর কৃপায় কষ্ট ভোগ করি না। ঝঞ্ঝাবাত এবং বজ্রপাতেরও উপদ্রব নাই। ' [পৃ. ১৪৮]
সুলতানা বলিয়া উঠিলেন, কেয়া বাত কেয়া বাত, "তবে ত এদেশ বড় সুখের স্থান। আহা মরি! ইহার নাম 'সুখস্থান' হয় নাই কেন?" [পৃ. ১৪৮]
বাস্তবিকই নারীস্থানের অপর নাম সুখস্থান হইবে। গ্রিক ও লাতিন ভাষা মিশাইয়া স্যার টমাস মোর এয়ুটোপিয়া নামক যে শব্দটি প্রচার করিয়াছেন তাহার অর্থও পণ্ডিতজনে, দুই কায়দায় নিষ্পন্ন করিয়া থাকেন। এক অর্থে এয়ুটোপিয়া মানে 'সুখস্থান'। আর অর্থে এয়ুটোপিয়া অর্থ নায়িস্তান, অর্থাৎ যে স্থান ভুবনে নাই_ কেবল স্বপ্নলোকে প্রাপ্ত স্থানের নাম নাই-স্থান।
কথাটা রোকেয়া গোড়াতেই পাড়িয়া রাখিয়াছিলেন। একদা তাঁহার শয়নকক্ষে আরাম কেদারায় বসিয়া ভারত-ললনার জীবন সম্বন্ধে চিন্তা করিতে করিতে তিনি দেখিয়াছিলেন তাহার বাটির চারিপাশের প্রকৃতির নানা উপাদান মিলিয়া তাহার সাধের উদ্যানে একটি অনির্বচনীয় স্বপ্ন রাজ্য রচনা করিয়া ফেলিয়াছে।
শুধু 'সুলতানার স্বপ্ন' নহে মতিচূর দ্বিতীয় খণ্ডে 'জ্ঞানফল' ও 'মুক্তিফল' নামে রোকেয়ার আরও দুই প্রস্ত আখ্যায়িকা আছে যাহাতে এই স্বপ্নরাজ্য আরও প্রসারিত হইয়াছে। সোনিয়া আমিন ইঁহাদের একটির আলোচনা করিয়াছেন। [আমিন, 'এম্পায়ার রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড জেন্ডার', ১৯৯৯]
রোকেয়ার সমালোচনা শুধু পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধেই থামিয়া থাকে নাই। তিনি পরাধীনতার সহিতও লড়াইটা চালাইয়া গিয়াছেন। সুলতানার জবানিতে সেই প্রবন্ধ শুনিতে পাইতেছি : 'আর আমরা একটা সুসভ্য রত্নগর্ভা দেশকে ক্রমে উন্নত করিব দূরের কথা,_ বরং ক্রমশঃ তাহাকে দীনতমা শ্মশানে পরিণত করিতে বসিয়াছি।' [রোকেয়া রচনাবলী, পৃ. ১৪৮]
একটা দেশ দশ বৎসরে স্বর্গতুল্য পুণ্যভূমি বা সুখস্থান হয়। আর দেশ একটা উন্নতি করিবে দূরের কথা, কেবল অবনতির পথে বসে, বসিতে বসিতে দীনতমা শ্মশান হইতে চলিয়াছে। অপরিচিতা বলিলেন, 'পুরুষের কার্যে ও রমণীর কার্যে এই প্রভেদ।' আমরাও বুঝিলাম, নারী যাহা দশ বৎসরে করিতে পারে পুরুষ তাহা শত শত বর্ষেও করিতে অক্ষম। [রোকেয়া রচনাবলী, পৃ. ১৪৮]
এই প্রভেদের অপর নাম পরাধীনতা ও স্বাধীনতা বৈ নহে।

No comments

Powered by Blogger.