নিত্যজাতম্-সম্পদ কখনোই মানুষের চরিত্র নিয়ন্ত্রণ করে না by মহসীন হাবিব

বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত এবং বিশেষ করে নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা নিজেদের অর্থকষ্ট ঢাকতে অনেকটা যেন বিষ গলায় তোলেন। ঘরের দৈন্যদশা যাতে মানুষ না বুঝতে পারে সে জন্য কেউ কেউ বাইরে কিছু অপ্রয়োজনীয় খরচপাতিও করে থাকেন। সমাজে এ চল অনেক দিন ধরেই আছে। ধরুন, ঘরে একটি কানাকড়িও নেই।


হঠাৎ দুজন অতিথি এলেন। তাড়াহুড়ো করে পাশের বাড়ি থেকে অথবা দোকান থেকে বাকি নিয়ে চা-বিস্কুট আনা হয়। অতিথি চা-বিস্কুট খেতে না চাইলেও জোর করে খাওয়ানো হয়। তরুণরা যখন সিগারেট খেতে শেখে তখন সিগারেট কেনার পয়সাটা দেয় অপেক্ষাকৃত দরিদ্র ঘরের ছেলেটিই। অনেকটা যেন দরিদ্র অবস্থা লুকানোর জরিমানা। আবার অনেক সময় দৈন্যতা ঢাকতে মানুষকে পারিবারিক বিত্তবৈভবের মিছে গালগল্প দিতেও দেখা যায়। এমন বহু বন্ধু বা পরিচিতজনের সামনে আমরা প্রায়ই পড়ে থাকি। যেমন- মাছের চেয়ে যখন মাংসের মূল্য বেশি ছিল তখন অনেকে বলার জন্য অস্থির হয়ে থাকত, 'আমাদের বাসায় তো মাংস ছাড়া কিছু খেতেই পারে না। এমন মুশকিল! এভাবে মাংস কিনে পোষায়?' অর্থাৎ তিনি বলতে চাইতেন, প্রতিদিন আমাদের কিন্তু মাংস কেনার সামর্থ্য আছে। অতি সম্প্রতি আর্থসামাজিক পরিবেশে একটি পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। এখন সাধারণ মানুষের খাবার হয়ে পড়েছে ব্রয়লার মুরগি এবং গরুর মাংস। যে ইলিশ মাছ ছিল গরিবের মাছের ভরসা, সেই ইলিশ এখন সবচেয়ে দামি খাবার। পরিষ্কারভাবেই সাধারণ মানুষ ইলিশ মাছের দাম জিজ্ঞেস করতে ভয় পায়। চাষের মাছ ছাড়া এখন আর শহরগুলোতে বিত্তবান মানুষ ছাড়া কেউ বোয়াল, মাগুর, কৈ মাছ খেতে পারে না। তাই গালগল্পেও ইদানীং এসেছে পরিবর্তন। অনেকে এখন বলে থাকেন, কালকে আব্বা একটা ইলিশ মাছ এনেছিলেন। এত্তটুকু মাছ, বাপরে, কী দাম!
আরেকটি শ্রেণী ছিল এবং এখনো আছে যাঁরা পারিবারিক ঐতিহ্যের গল্প করে মজা পান। আমার দাদাবাড়ি যত দূর চোখ যায় তত দূর জমি ছিল। অবশ্য এখন আর নেই। অনেক জমি নষ্ট হয়ে গেছে, দাদা বা বাবা কেউ নজর রাখেনি। একজনকে দেখেছি তিনি প্রায়ই অত্যন্ত দৃঢ় হাসি দিয়ে মাথা নাড়িয়ে বলতেন, 'আমার বাপ-চাচা তো কোনো দিন ঘোড়াকে ঘাস খেতে দিত না। ঘোড়ার জন্য সব সময় জিলাপি অর্ডার দেওয়া থাকত। ময়রার দোকান থেকে সকালবেলায়ই ঝাঁকা ভরে জিলাপি দিয়ে যেত।...' এখন বুঝি, ঘোড়া ঘাস না খেয়ে অব্যাহতভাবে জিলাপি খেলে নিশ্চিত হার্টের রোগী হয়ে যেত। আরেকটি শ্রেণী এখনো আছে। তারা গভীর অর্থপূর্ণ হাসি হাসি মুখ করে বলেন, 'আমরা তো এখানকার না। আমরা বোগদাদি। আমার দাদার বাপ এখানে এসে থেকে গেছেন।'
এসব গালগল্প আমাদের দীর্ঘকালের সংস্কৃতিরই অংশ। এতে খুব দোষের কিছু দেখি না। যে গল্প কাউকে ক্ষতি না করে নিজেকে তৃপ্ত করে তাকে বলা যায় হোয়াইট লাই, অর্থাৎ সাদা মিথ্যা। মনের ভেতরে ওই কাল্পনিক বিত্ত গল্পকারকে একটি তৃপ্তি দেয়, আর যিনি শোনেন তার মধ্যে একটি ঈর্ষামিশ্রিত সুখ তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া ব্রডকাস্টিং সিস্টেমের (সিবিএস) সফল পুরোধা ছিলেন উইলিয়াম এস প্যালে। তিনি বলেছিলেন, White lies always introduce others of a darker complexion. এমন মানসিকতা থেকেই হয়তো আমাদের সমাজে বিত্তবৈভব নিয়ে মিথ্যা গালগল্পের জন্ম।
তবে চিরকাল ব্যতিক্রম দেখা গেছে আমাদের রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে। উপমহাদেশের রাজনীতিবিদদের অধিকাংশ নেতাই সচ্ছল ঘরের সন্তান ছিলেন। কেউ কেউ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন তালুকদারি, জমিদারি এমনকি মন্ত্রিত্বও। জওহরলাল নেহরু, জুলফিকার আলী ভুট্টো, খাজা নাজিমুদ্দিন এমনকি বিশ্বরাজনীতির প্রাণপুরুষ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীও দরিদ্র ঘরের সন্তান ছিলেন না। বাপুজির পিতা করমচাঁদ ছিলেন গুজরাটের পরবন্দর স্টেটের দেওয়ান। দেওয়ান পদকে আজকের দিনে তুলনা করতে হলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবের সঙ্গে তুলনা করা যায় (বোঝেন ঠেলা!)। যদিও পরবন্দর স্টেট খুব বড় ছিল না। সীমান্ত গান্ধীখ্যাত খান আবদুল গাফফার খানের পিতা বেহরাম খান ছিলেন পেশোয়ারের ভূস্বামী। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীও কিন্তু মজলুম ঘরের সন্তান ছিলেন না। তাঁর পিতা ছিলেন হাজি শরাফত আলী খান। এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। ব্যতিক্রম আছে নিশ্চয়ই, তবে আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, হতদরিদ্র অবস্থা থেকে অসংখ্য অদ্বৈত মল্ল বর্মণ বের হয়েছেন; কিন্তু অসংখ্য রাজনীতিবিদ বের হননি। রাজনীতিবিদদের মধ্যে অনেকের অবস্থা এত ভালো ছিল যে ভাবতে ইচ্ছে করে, কেন তিনি সুখের জীবন ছেড়ে রাজনীতিতে এসে জেল-জুলুম আর সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশার সঙ্গে নিজেকে একাকার করেছিলেন? মজার ব্যাপার হলো, এসব নেতা ভাষণ দিতে গিয়ে, প্রচারমাধ্যমের সামনে কথা বলতে গিয়ে অথবা আত্মজীবনী লিখতে গিয়ে কখনোই তাঁদের বাড়ির সচ্ছল অবস্থার কথা বলে অন্যের মুখের রং পাল্টে দিতে চাননি। নিজেদের সত্যি জমিদারি গল্প করে কষ্ট দিয়ে তৃপ্তি ভোগ করেননি।
ইদানীং আমরা এর ব্যতিক্রম দেখতে পাচ্ছি। গত সপ্তাহে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলোচনাকালে তাঁর বিরুদ্ধে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে একপর্যায়ে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সিলেটি ভাষায় বলে ফেললেন, আমি কি ফকিন্নির পুত? গত সপ্তাহেই মিরপুরের ১৪ নম্বর আসন থেকে নির্বাচিত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এমপি আসলামুল হক তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ব্যাপারে আদালতের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাঁর উকিল আদালতে বলেছেন, তিনি একজন বিত্তশালী ব্যক্তি। আসলামুল হক বলেছেন, তাঁর নানা গাবতলীর জমিদারের বংশধর।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বাংলাদেশের একজন অত্যন্ত সম্মানপ্রাপ্ত রাজনীতিবিদ। আসলামুল হক এমপির সম্মানও সাধারণ্যের ঊধর্ে্ব। সেনগুপ্ত অর্থ কেলেঙ্কারির সঙ্গে আছেন কি না, আসলামুল হক এমপি বাঙলা কলেজের জায়গা দখল করেছেন কি না তা তদন্তের বিষয়। হয়তো করেননি। যতক্ষণ দোষ প্রমাণ কেউ না করতে পারবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের চোখে অবশ্যই তাঁরা নির্দোষ; কিন্তু অর্থ কেলেঙ্কারি বা জমি দখল করতে হলে ফকিন্নিই হতে হবে, এ কথা কে বলল? জমিদারের বংশধর বা বিত্তশালী মানুষ কেউ জমি দখল করতে পারেন না- এ ধারণা আমরা গ্রহণ করি কিভাবে? বরং উল্টোটাই কিন্তু বহুকাল ধরে দেখে আসছি। বরীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'দুই বিঘা জমি' কবিতাটি লিখেছিলেন বাংলা ১৩০২ সনে। এখন থেকে ১১৭ বছর আগে। সেই সমাজব্যবস্থা দেখে তিনি তাঁর এই বিখ্যাত কবিতায় লিখেছিলেন, 'এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি/রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।'
আমরা কিন্তু চিরকালই সম্পদশালীদের মধ্যে অধিক ক্ষুধা লক্ষ করেছি। এ প্রসঙ্গে ভারতের সাবেক ক্রিকেট তারকা মোহাম্মদ আজহার উদ্দিনের কথা মনে আসছে। তিনি অত্যন্ত কৃতী ক্রিকেটার হিসেবে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই শত শত কোটি টাকার মালিক বনে যান। কোকাকোলা কম্পানি তাঁর কয়েক সেকেন্ডের একটি বিজ্ঞাপনের জন্য সর্বাধিক পরিমাণ সম্মানী প্রদান করত। মধ্যপ্রাচ্যের আমিররা মোহাম্মদ আজহার উদ্দিনকে পেট্রোডলার দিয়ে পরিপূর্ণ করে তোলেন। আজহার উদ্দিনের ঘড়ি এবং দামি গাড়ির শখ ছিল। তাঁর সংগ্রহে তখনই পাঁচ হাজার অতি মূল্যবান ঘড়ি ছিল। তিনি পাকিস্তানের হাবিব ব্যাংকে পাঁচ কোটি রুপি রেখেছিলেন, যে টাকার কথা তিনি নাকি ভুলেই গিয়েছিলেন। এই আজহার উদ্দিনই মাত্র ১৫ লাখ ডলার ভাগাভাগি করেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন অধিনায়ক হানসি ক্রনিয়ের সঙ্গে (সে আরেক কাহিনী)। সুতরাং এসব কথা একেবারেই অনুপযোগী যে কে কোন ঘরের সন্তান। ব্যক্তি মানুষের স্বভাব তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। কে ফকিন্নির পুত এবং কার মাতৃকুল জমিদার সে প্রশ্ন একেবারেই অবান্তর, অপ্রয়োজনীয় এবং অপ্রাসঙ্গিক।
লেখক : সাংবাদিক
mohshinhabib@yahoo.com