গতি হারাচ্ছে আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা by এস বাসু দাশ

দেশের তিন পার্বত্য জেলাসহ বিভিন্ন জেলায় আদিবাসী শিশুদের জন্য মায়ের ভাষায় শিক্ষা অর্জনে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা মাঠপর্যায়ে কার্যকর হচ্ছে না। ফলে গতি হারাচ্ছে আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা অর্জনের স্বপ্ন।
আদিবাসী বম ও মারমা শিশুদের জন্য দু’টি ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার ১২ হাজার বই প্রকাশ করা হলেও তা মাঠ পর্যায়ে যথাযথভাবে বিতরণ করা হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় বান্দরবান জেলা পরিষদ ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র যৌথ সহযোগিতার ভিত্তিতে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমে আদিবাসীদের মাতৃভাষায় পাঠ্যসূচি সংযোজনের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।

২০০৬ সালের নভেম্বরে মারমা ও বম শিশুদের জন্য তাদের মাতৃভাষায় ‘আমার বই প্রথম পাঠ’ নামে ১২ হাজার বইও ছাপা হয়। পরে বেসরকারি সংস্থা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উদ্যোগে বের করা হয় ম্রো ভাষার বই।

বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অবহেলায় প্রকাশিত বইগুলো দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর ধরে বান্দরবান ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনিস্টিটিউট গুদামে পড়ে থাকায় নষ্ট হয়ে গেছে অনেক বই।

২০১০ সালের ১৮ আগস্ট জেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে এক সভায় ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনিস্টিটিউটকে বইগুলো বিতরণের নির্দেশ দেয় জেলা পরিষদ।

এরপর আদিবাসীদের শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা গ্রাম উন্নয়ন সংস্থা (গ্রাউস) ও স্থানীয় ব্যক্তিদের বিচ্ছিন্নভাবে কিছু বই বিতরণ করা হয়।

বান্দরবানের ক্ষুদ্র ও নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনিস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মংনু চিং বলেন, ‘বইগুলো জেলা পরিষদের। কিছু বই অনেকে নিয়ে গেলেও বেশির ভাগ বই এখনো আমাদের এখানে পড়ে আছে।’

আদিবাসী শিশুদের শিক্ষা উন্নয়নে উক্ত সভায় মারমা, ম্রো ও বম মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের জন্য প্রাক-প্রাথমিক আরও নতুন বই প্রকাশের জন্য জেলা পরিষদ সদস্য অং প্রু ম্রোকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয় বলে জানা যায়।

অন্যদিকে, বর্তমানে আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদানে বান্দরবানে কাজ করছে বেসরকারি উন্নয়নসংস্থা কারিতাস, গ্রাউস, বিএনকেএস, সিসিডিবি।

কারিতাসের কর্মকর্তা জয় বাংলানিউজকে জানান, ‘আমরা বান্দরবান জেলা সদর ছাড়া অন্য উপজেলাগুলোতে কাজ করছি।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান ক্য শৈ হ্লা। কিন্তু বান্দরবানে ১১ ভাষাভাষী আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর বসবাস হলেও শিক্ষা কার্যক্রমে বইগুলোর অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি।

এদিকে, বইগুলোতে বাংলা ও ইংরেজিতে উচ্চারণ বর্ণিত না থাকায় বেশ কয়েকজন শিক্ষক মনে করেন, প্রকাশের আগে বিষয়টির দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন ছিল। এছাড়া আদিবাসী ভাষায় বই প্রকাশের সময় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘তৈমু’র বিরুদ্ধে অন্তত ৪টি বর্ণমালা বাতিল করার অভিযোগ করেন মারমা আদিবাসীরা।

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য সাধুরাম ত্রিপুরা মিল্টন বাংলানিউজকে বলেন, ‘আদিবাসীরা যেখানে এখনো ভূমি অধিকার পায়নি সেখানে কীভাবে তাদের মাতৃভাষা গুরুত্ব পাবে।’

অন্যদিকে, বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা তাদের শিক্ষা কার্যক্রমে বইগুলো কাজে লাগাতে চাইলেও জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না থাকায় বইগুলো বিতরণ আর পাঠদানে সমস্যা হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বলিপাড়া নারী কল্যাণ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক হাচিংনুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা আদিবাসী শিশুদের শিক্ষা অর্জনের জন্য কাজ করছি; কিন্তু পাহাড়ে আর কারা কাজ করছে তা আমাদের জানা নেই।’

মাঠপর্যায়ে আদিবাসী ভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম সক্রিয় রাখতে প্রকাশিত বইগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের ব্যবস্থা গ্রহণ ও এ বিষয়ে এনসিটিবির অনুমোদনেরও প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।