শিক্ষা- সরকারি কলেজ না দরকারি কলেজ by মাহফুজুর রহমান মানিক

সরকারি কলেজগুলোর আগের ঐতিহ্য আর নেই। মেধাবী শিক্ষার্থীদের টানতে পারছে না এগুলো। বর্তমান শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ আরেকটা বিষয় হলো নতুন পদ সৃষ্টি।
নতুন পদ সৃষ্টি করে বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে তা পূরণ করা যায়
শিরোনামটা লোকমুখে প্রচলিত কথা থেকে ধার করা। কথাটা এরকম_ 'এটা সরকারি না দরকারি'। মানে সরকারি বিষয়গুলো বেদরকারি বা অগুরুত্বপূর্ণ অন্য সব দরকারি। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা থেকেই হয়তো এ কথার অবতারণা। ঢালাওভাবে এমন মুখস্থ কথায় (প্রেজুডিস) বিশ্বাস না করলেও, সরকারি কলেজ সম্পর্কে সমকালের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো আমাদের সেদিকেই ধাবিত করছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি সমকালের প্রধান প্রতিবেদন 'সরকারি কলেজের একি হাল!'। এর বাইরেও পত্রিকাটি ওইদিনই সরকারি কলেজ নিয়ে এক পৃষ্ঠার বিশেষ আয়োজন করে। পরেরদিন সম্পাদকীয় ছাড়াও ৩ মার্চ লোকালয়ে ১৯ নম্বর পাতাজুড়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে সমকাল। প্রতিবেদনগুলো কোনোটাই সুখবর নয়। শিরোনামই তা বলে দেয়_ 'আবাসিক সুবিধাবঞ্চিত ৯০ ভাগ শিক্ষার্থী, খণ্ডকালীন শিক্ষকই ভরসা, ক্লাস করতে হয় বারান্দায় দাঁড়িয়ে, ২২০ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক' ইত্যাদি। এখানকার মোট ১৯টি প্রতিবেদনই বাংলাদেশের ২৫৩টি সরকারি কলেজের নাজুক অবস্থা একনজরে দেখার জন্য যথেষ্ট।
কলেজগুলোর সমস্যার তালিকায় প্রথমই আসবে শিক্ষক। শিক্ষক সংকটের তীব্রতা কলেজ সংক্রান্ত সরকারি 'এনাম কমিটি'র হিসাব মতে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি ৪৫ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক থাকার কথা। সেখানে ঢাকা কলেজে ১৫ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক আছেন ২৪২ জন, গড়ে ৬২ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক। সরকারি তিতুমীর কলেজে ৪৫ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক আছেন মাত্র ১৬৫ জন, গড়ে ২৭২ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক। ইডেন মহিলা কলেজে এ হার ১৯৩-এর বিপরীতে এক।
কলেজগুলোয় এ সংকটে খণ্ডকালীন শিক্ষকরা ক্লাস নিচ্ছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এসব কলেজে এত সংকট থাকা সত্ত্বেও গড়ে প্রত্যেক কলেজের ২৫-৩০ জন শিক্ষক ওএসডি হয়ে আছেন। সরকারি হিসাব মতে, সারাদেশে কলেজগুলোতে চার হাজার শিক্ষকের পদ খালি আছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে বর্তমান কর্মরত শিক্ষকের সংখ্যা দেওয়া আছে ১০ হাজার ৯৬২ জন। সরকারি কলেজে শিক্ষক সংকটের সঙ্গে আবাসন ও অবকাঠামো সমস্যা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এ সংক্রান্ত মোটাদাগে কয়েকটি প্রতিবেদনের শিরোনাম এরকম_ আবাসিক সুবিধাবঞ্চিত ৯০ ভাগ শিক্ষার্থী, ক্লাস করতে হয় বারান্দায় দাঁড়িয়ে, আবাসন ও শিক্ষক সংকটে বিঘি্নত হচ্ছে লেখাপড়া ইত্যাদি। পুরনো বড় কলেজ ছাড়া অধিকাংশ কলেজেরই নিজস্ব কোনো আবাসিক সুবিধা নেই। যেসব কলেজের আবাসিক সুবিধা আছে তা খুবই অপ্রতুল। এ ক্ষেত্রে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের কথা বলতেই হবে। নগরীর হাজী মুহসীন কলেজের ১০ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে আবাসন সুবিধা পাচ্ছে মাত্র ১৬৮ শিক্ষার্থী। এ ছাড়া চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের ১৮ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে আবাসন সুবিধা পাচ্ছে ৫৬৭ শিক্ষার্থী। রাজধানীর চিত্রও বেশ ভালো নয়। ইডেন মহিলা কলেজে ৩৫ হাজার ছাত্রীর মধ্যে ৩ হাজার ছাত্রীর আবাসনের ব্যবস্থা আছে। কষ্টের বিষয় হলো, যারা আবাসিক সুবিধা পাচ্ছে তারাও খুব ভালোভাবে থাকতে পারছে না। থাকছে গাদাগাদি আর ঠাসাঠাসির মধ্যে।
অনেক কলেজেই পর্যাপ্ত শ্রেণী কক্ষ নেই। বারান্দায় দাঁড়িয়ে ক্লাস করছে শিক্ষার্থীরা। বগুড়ার সরকারি আযিযুল হক কলেজে এমনিতেই শ্রেণীকক্ষ সংকট, তার ওপর অনুষদভিত্তিক আলাদা কোনো ভবন না থাকায় ক্লাস রুমই ব্যবহার হচ্ছে বিভাগীয় অফিস হিসেবে। কোনো কোনো কলেজে দুই শিফটে ক্লাস হচ্ছে। বেসরকারি সংস্থাগুলো প্রায় ছয় হাজার শ্রেণীকক্ষ সংকটের কথা বলেছে। কলেজগুলোর অবকাঠামোতে শ্রেণীকক্ষ ছাড়াও প্রশাসনিক ভবন, পাঠাগার, গবেষণাগার, খেলার মাঠ, ক্যান্টিন এমনকি টয়লেটের সমস্যাও আছে।
কলেজগুলোর শিক্ষার্থীদের শিক্ষক, আবাসন যেমন সোনার হরিণ, তেমনি দুর্লভ যানবহন। নামে কয়েকটা কলেজের নিজস্ব যানবাহন ব্যবস্থা থাকলেও, কার্যত খুবই সামান্য। দূরের শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত ক্লাস করতে এসে ভোগান্তির শিকার হয়। কলেজের এত সমস্যায় উদ্বেগজনক হারে কমে গেছে শিক্ষার মান।
সরকারি কলেজের শিক্ষক সমস্যার কথা বলাটা হবে চর্বিতচর্বণ। তবে বর্তমানে যারা আছেন তারা পাঠদানে কতটা মনোযোগী তা দেখার বিষয়। আজকের শিক্ষকরা বাণিজ্যমুখী। তারা কোচিং করাবেন, গাইড লিখবেন, নাকি শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখবেন। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের ভাষায়_ শিক্ষকরা ঢাকার বাইরে যেতে চান না। সবাই ঢাকায় থাকতে চান। সে ক্ষেত্রে বাইরে কারা পড়াবে! আবার সরকারও শিক্ষকের বিষয়ে কতটা মনোযোগী তা বলা মুশকিল। বিসিএসের অন্যান্য ক্যাডারের তুলনায় শিক্ষা ক্যাডারে শিক্ষকদের মর্যাদা পিছিয়ে। তাদের মান, সুযোগ-সুবিধাও কম।
সরকারি কলেজগুলোর আগের ঐতিহ্য আর নেই। মেধাবী শিক্ষার্থীদের টানতে পারছে না এগুলো। বর্তমান শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ আরেকটা বিষয় হলো নতুন পদ সৃষ্টি। নতুন পদ সৃষ্টি করে বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে তা পূরণ করা যায়। অবকাঠামোগত উন্নয়নে ৭১টি সরকারি কলেজের জন্য একটি প্রকল্প সরকারের হাতে আছে। তা দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি। সন্দেহ নেই, সরকারি কলেজগুলোর বর্তমান সংকট সরকারের অগোচরে নয়। এ কথা ঠিক, বহু বছরের পুঞ্জীভূত সংকট রাতারাতি সমাধান দুঃসাধ্য।

মাহফুজুর রহমান মানিক
শিক্ষার্থী, আইইআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়