শ্রদ্ধাঞ্জলি-মায়ার মানুষ by উজ্জ্বল মেহেদী

‘ও-বা মাত আছে...!’ ব্যস্ততার মধ্যে এ কথা বলে ইশারায় কাছে টানলেন। কাছে যেতেই ‘এখন না, আগে কাজ সামলাও, পরে...!’ বলে আবার ব্যস্ততার দিকে ঠেলে দিলেন। গত ১০ ডিসেম্বর সিলেটের একটি রেস্তোরাঁয় প্রথম আলোর যুগপূর্তির অনুষ্ঠানে শুধু এ দুটো কথা হয়েছিল তাঁর সঙ্গে। কিন্তু কী ‘মাত’ (কথা) তা আর জানা হলো না।


গত ২২ জানুয়ারি হঠাৎ করে অসুস্থ আর ২৯ জানুয়ারি সকালে চিরবিদায়। সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির সবার প্রিয় মুক্তিযোদ্ধা আবদুল খালিক মায়ন এভাবেই চলে গেলেন পরপারে। রেখে গেলেন তাঁর মায়ার ভুবন।
প্রথম আলোর যুগপূর্তির ওই অনুষ্ঠানই ছিল তাঁর জীবদ্দশায় বড় পরিসরে কোনো অনুষ্ঠানে সর্বশেষ উপস্থিত থাকা। ২৯ ডিসেম্বর আকস্মিক হূদরোগে আক্রান্ত হলে তাঁকে ঢাকা জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউটে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। সুস্থ হলে বিয়ানীবাজারে ফিরে গিয়ে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে আগের মতোই যোগদান শুরু করেছিলেন। ২২ জানুয়ারি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতেই হূদরোগের এনজিওগ্রামের জন্য স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। দুই দিন পর শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও ২২ জানুয়ারি হঠাৎ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
মায়ন ভাই সত্যিকার অর্থেই ছিলেন একজন মায়ার মানুষ। সদা হাস্যময় ব্যবহার আর এক চেনাতেই আপন করে নেওয়ার সম্মোহনী শক্তি ছিল তাঁর। রাজনীতির মূলধারায় নিজেকে ব্যস্ত রেখেও তিনি তাঁর মতো করে চলতেন। সমাজের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ধারায় নিজেকে একীভূত করে ফেলতেন। যা পছন্দ, সরাসরি তা-ই বলতেন। স্পষ্টবাদী এ মানুষটিকে আপন করে পেয়েছিল বিয়ানীবাজারবাসী।
রাজনীতিতে সোচ্চার ছাত্রজীবন থেকেই। ১৯৬৭ সালে সিলেট এমসি কলেজে পড়াকালীন একজন সুবক্তা ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বৃহত্তর সিলেট জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব তিনি পর্যায়ক্রমে একাধিকবার পালন করেন। ছাত্রনেতা থাকাকালীন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। স্বাধীন দেশে এবার ছাত্রজীবনের পাট সমাপ্তির দিকে ধাবিত হয়। সিলেট এমসি কলেজ থেকে বিএ পাস করে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগে যোগ দিয়ে সিলেট জেলা যুবলীগের সভাপতির দায়িত্বে আসীন হন। ওই সময় একজন যুবনেতা হিসেবে বার্লিনে বিশ্ব যুব উৎসবে যোগদান করেন।
সৎ, ত্যাগী ও আদর্শিক রাজনীতিক হিসেবে মায়ন ভাই ছিলেন নেতা-কর্মীদের কাছে একজন আদর্শ রাজনীতিবিদ। নিজ দল ছাড়াও প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের কোনো নেতা বা কর্মী মায়ন ভাইয়ের ব্যবহারে অসন্তুষ্ট হয়েছে—এমন কোনো নজির নেই। সবাইকে আপন করে নেওয়ার অসম্ভব গুণাবলি তাঁর ছিল। এ জন্য তিনি যুবলীগের নেতৃত্ব থেকে সরাসরি মূল দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আসেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সিলেট জেলা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন মায়ন ভাই।
রাজনীতি নিয়ে জীবনভর সোচ্চার থাকলেও কখনো ভোটে দাঁড়াননি। দাঁড়ালেন ২০০৯ সালে এসে। নিজেকে জননেতা নয়, জনগণের কর্মী ভাবতেন। এই ভাবধারা থেকে ২০০৯ সালের ২২ জানুয়ারি মায়ন ভাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে জীবনের প্রথম নির্বাচন করলেন।
বিয়ানীবাজারবাসী মায়ন ভাইয়ের মায়ার প্রতিদান দিল। বিপুল ভোটে নির্বাচিত হলেন মায়ন ভাই। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের একজন নেতা হয়েও উপজেলা চেয়ারম্যানদের ক্ষমতায়ন নিয়ে তিনি সোচ্চার ছিলেন।
বাংলাদেশের বড় রাজনৈতিক দলের একজন সামনের সারির নেতা আর ভোটে নির্বাচিত একটি উপজেলার চেয়ারম্যান হয়ে মায়ন ভাইয়ের তো আরও ব্যস্ত হয়ে ওঠার কথা। কিন্তু না, দেখা গেল এ ব্যস্ততার ফাঁকে চিরচেনা সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে সেই আগের মতোই তাঁর সরব উপস্থিতি। দেশে বা দেশের বাইরের কোনো সাংস্কৃতিক ব্যক্তি সিলেট শহরে এলে জিন্দাবাজারের সৃজনশীল বইয়ের দোকান ‘বইপত্রে’ একবার যাওয়া অঘোষিত একটা রুটিন হয়ে আছে।
ব্যাপারটি মায়ন ভাইয়ের ভালো করে জানা ছিল। তিনিও বইপত্রে যেতেন। তাঁদের মধ্যে পরিচিত কেউ হলে মায়ন ভাই সঙ্গে যেতেন। জনপ্রতিনিধি হওয়ার পর নিয়মিত যাওয়াটায় ছেদ পড়ে তাঁর। গত ১০ আগস্ট বইপত্রে বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের বই দেখতে যাওয়া সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সাংসদ আসাদুজ্জামান নূরের সঙ্গে তিনিও ছিলেন। বলছিলেন, ‘যত ব্যস্ত হই, বই থেকে বিমুখ হতে মন চায় না।’
ছাত্রজীবন থেকে একজন পড়ুয়া স্বভাবের মানুষ ছিলেন মায়ন ভাই। এ স্বভাবের কারণে প্রথম আলোকে কখনো শুধু একটি সংবাদপত্র বলে ভাবতেন না। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিনাটি সবই পড়তেন। প্রায়ই বলতেন, ‘এটি শুধু পত্রিকা নয়, একটি আন্দোলন। শক্তিশালী একটি সামাজিক বন্ধন।’ তাই যখনই প্রথম আলোর কোনো কর্মসূচি, শত ব্যস্ততার মধ্যে ছুটে আসতেন।
রাজনীতিবিদ হিসেবে অনেক দেশভ্রমণ হয়েছে তাঁর। গত আগস্ট মাসে জনপ্রতিনিধি হিসেবে প্রথম বিদেশযাত্রা ছিল। যুক্তরাজ্য যাওয়ার প্রাক্কালে বিমানবন্দর থেকে রাতের বেলা ফোন করলেন মায়ন ভাই। দেশ ছেড়ে যাওয়ার বিদায় নয়, জানতে চাইলেন—এ মাসে প্রথম আলোর কোনো অনুষ্ঠান আছে কি না। কেন? বলতেই সহাস্যে বললেন, ‘আমারে তো পাইতায় নায়। এক মাস পরে পাইবায়...!’ এ কথা বলার সময় মায়ন ভাইয়ের ভাষা থেকে যেন অন্য রকম এক মায়া ঝরে পড়ছিল।
মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পরপরই কানে ভাসল প্রথম ওই কথাটিই। সিলেটের রাজনীতি থেকে শুরু করে ঘরোয়া কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার অনিবার্য অতিথি; প্রিয় মায়ন ভাই এখন একেবারেই ‘পাইতায় নায়’ হয়ে গেলেন। তাঁর প্রতি রইল অকৃত্রিম শ্রদ্ধাঞ্জলি।