বিশ্ব সংস্থার শ্রেয়তর বিকল্প নেই-জাতিসংঘ দিবস by সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ

খন থেকে ৬৬ বছর আগে এক প্রলয়ঙ্করী যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর জন্ম নিয়েছিল জাতিসংঘ। কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব, শিশুসহ লাখ লাখ মানুষের খাদ্যের জন্য হাহাকার, ধ্বংসপ্রায় নগর-বন্দর, স্বজনহারাদের করুণ আর্তি পৃথিবীর বাতাসকে ভারী করে তুলেছিল। সমাজকে ছিন্নভিন্ন ও অর্থনীতিকে দেউলিয়া করে দেওয়া এ যুদ্ধ আর নয়_ এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে মিত্রশক্তির নেতারা বিশ্ব ঐকমত্য গড়ার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছিলেন যুদ্ধ চলাকালেই।


১৯৪১-এর আন্তঃমিত্রশক্তি ঘোষণা ও আটলান্টিক সনদ, '৪২-এর জাতিসংঘ ঘোষণা, '৪৩-এর মস্কো ও তেহরান ঘোষণা, '৪৪-এ ওয়াশিংটনের ডাম্বারটন ওয়াক্সে মার্কিন-সোভিয়েত-ব্রিটেন-চীন বৈঠক, '৪৫-এর ইয়াল্টা শীর্ষ বৈঠক ইত্যাদি দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ১৯৪৫ সালের ২৬ জুন সানফ্রানসিসকোতে ৫০ দেশের বৈঠকে গৃহীত হয় জাতিসংঘ সনদ। ২৪ অক্টোবর দেশগুলোর সনদ অনুসমর্থনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় জাতিসংঘের পথচলা।
জাতিসংঘের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যৎ বংশধরদের যুদ্ধের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা; সব মানুষের সমঅধিকার ও সমমর্যাদা প্রদান; ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ব্যাপকতর স্বাধিকারের মাধ্যমে সামাজিক অগ্রগতি সাধন এবং জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন। এ জন্য জাতিসংঘের কার্যক্রমে প্রাধান্য পায় শান্তি ভঙ্গের কারণ ও হুমকি দূর করে শান্তি সংরক্ষণ। এর জন্য অপরিহার্য ছিল জাতিগুলোর সমমর্যাদা, ন্যায়বিচার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আলোচনা-সহযোগিতার মাধ্যমে সব বিরোধের নিষ্পত্তি।
জাতিসংঘের সাংগঠনিক বিকাশও ঘটেছে দ্রুত। বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকের মধ্যেই এর সদস্যসংখ্যা ৯০ অতিক্রম করে, আশির দশকের মধ্যে দেড়শ'। বর্তমানে এর সদস্যসংখ্যা দুইশ' ছুঁই ছুঁই। সাধারণ পরিষদ, নিরাপত্তা পরিষদ, সচিবালয় ছাড়াও জাতিসংঘের রয়েছে অন্তত আরও অর্ধশত বিশেষায়িত সংস্থা, কর্মসূচি, কমিশন প্রভৃতি।
তবে এই বিপুল সাংগঠনিক কাঠামো এবং বিশাল কর্মসূচি নিয়েও জাতিসংঘ কোনো বিশ্ব সরকার নয়। জাতিসংঘে তা-ই ঘটে যা এর সদস্য দেশগুলো চায়। শক্তিধর ও দুর্বল, ধনী ও দরিদ্র, ভিন্ন ভিন্ন রাজনীতি ও সমাজ ব্যবস্থাসম্পন্ন বিভিন্ন দেশ সমান মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে এর নীতিনির্ধারণে অংশ নেয়। সদস্যদের ঐকমত্য বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক বা দেশীয় প্রেক্ষাপটে বিধানাবলি বা নীতিমালা প্রণয়ন করে। আন্তর্জাতিক আইন সাধারণভাবে কোনো রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু জাতিসংঘের কোনো সদস্য দেশ যখন সেটি অনুসমর্থন করে, তখন তা কার্যকর করা তার জন্য প্রতিশ্রুতির অংশ হয়ে যায়। এভাবে অধিকার ও নীতিমালার একটি সাধারণ মান রক্ষার দায়িত্ব অনেক সময় নাগরিকের নানামাত্রিক মর্যাদা লাভ ও অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিরোধে সহায়ক নয়।
জাতিসংঘের গত ৬৫ বছরের জীবনের দিকে তাকালে নানা উজ্জ্বল ঘটনা চোখে পড়ে। এ সময় এশিয়া ও আফ্রিকার অর্ধশতেরও বেশি দেশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হয়েছে, যেখানে এখন পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ বাস করে। এই বি-উপনিবেশকরণে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছে জাতিসংঘ। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপকে পুনর্গঠনে পঞ্চাশের দশকে যে মানবিক সাহায্য কার্যক্রম শুরু হয়েছিল, তা এখন বিস্তৃত হয়েছে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায়। প্যালেস্টাইনসহ নানা অঞ্চলে নানা সময়ে প্রায় ১০ কোটির বেশি শরণার্থীর জীবনধারণের ব্যবস্থা শরণার্থীদের জন্য যেন জিয়নকাঠি। এর বাইরেও পৃথিবীর মধ্য-আয় ও দরিদ্র দেশগুলোতে শিশুমৃত্যু রোধসহ স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়, নিরক্ষরতা দূরীকরণে ও শিক্ষার অন্যান্য ক্ষেত্রে, খাদ্য ও পানীয় জলের ব্যবস্থা ইত্যাদি ক্ষেত্রে মানবিক সাহায্যে জাতিসংঘ কার্যক্রম এখন সুপরিচিত।
দেশে দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নে জাতিসংঘ এখন অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী। প্রায় পৌনে দুইশ' দেশে পাঁচ হাজারের বেশি উন্নয়ন প্রকল্পে জাতিসংঘের অংশগ্রহণ এখন সেসব দেশের মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। প্রতি বছর উন্নয়ন কার্যক্রমে জাতিসংঘ প্রায় ৫০০ কোটি ডলার ব্যয় করে থাকে। জাতিসংঘ অর্থনৈতিক সহযোগিতার যে ধরন তৈরি করেছে তাতে সহজ হয়েছে আন্তর্জাতিক ডাক বা বিমান চলাচল, আবহাওয়া-বার্তা প্রদান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বা সমুদ্রসীমা নির্ধারণের মতো বিষয়। ক্রমবর্ধমান বিশ্ব উষ্ণতার হুমকির মুখে জলবায়ু পরিবর্তনকে বিপরীতগামী করা, নারী, শিশু বা প্রতিবন্ধীর অধিকার সংরক্ষণ অথবা প্রায় শ'পাঁচেক আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়ন_ এসবই জাতিসংঘ কার্যক্রমের উজ্জ্বল প্রান্ত।
কিন্তু এই উজ্জ্বলতা জাতিসংঘকে এমন এক অবয়ব দিতে পারে যাতে মনে হতে পারে যে, জাতিসংঘ কোনো সমাজকল্যাণ বা উন্নয়ন সহযোগী কিংবা আইন-প্রণেতা সংস্থা। তাতে জাতিসংঘের প্রকৃত ভাবমূর্তি ঢাকা পড়ে যায়। এটা সত্য যে, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পরও পৃথিবীতে প্রায় দুইশ' নানা মাত্রার যুদ্ধ হয়েছে। এটাও সত্য যে, অন্তত শ'খানেক যুদ্ধ জাতিসংঘের ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে শুরুতেই বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনগুলো বহু দেশে বিবদমান পক্ষগুলোকে যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত রেখেছে; এমনকি নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায়ও ভূমিকা রেখেছে। তৃতীয় মহাযুদ্ধ ও পারমাণবিক যুদ্ধ থেকে আমরা এখনও দূরে থাকতে পেরেছি মূলত জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামের তৎপরতার কারণে।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নিত্য ঘটে চলেছে। তাতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ব্যর্থতাও অনস্বীকার্য। অনেক সময় এসব ক্ষেত্রে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর পক্ষপাতমূলক দৃষ্টিভঙ্গি ও দ্বৈতমান আমাদের পীড়া দেয়। অন্যদিকে বর্ণবাদের অবসানসহ মানবাধিকারের বেশ কিছু ইস্যুতে জাতিসংঘের কার্যক্রম নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
শুধু কাগুজে প্রস্তাব গ্রহণ, জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের আমলাতান্ত্রিক মনোভাব, ব্যয়ের ক্ষেত্রে বিলাসিতা, শক্তিধর কিছু রাষ্ট্রের কোনো কোনো সময় জাতিসংঘ ফোরামকে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে অপব্যবহার ইত্যাদি অভিযোগ একেবারে ভিত্তিহীন নয়। লক্ষণীয়, সত্তর ও আশির দশকে যেসব শক্তিধর দেশ জাতিসংঘের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিল, সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পতনের পর তারাই এখন জাতিসংঘকে ব্যবহার করছে নিজেদের স্বার্থে।
জাতিসংঘের সংস্কার নিয়ে কিছুদিন ধরে বিস্তর আলাপ-আলোচনা চলছে। কাঠামোগত ও প্রশাসনিক পরিবর্তন, কার্যক্রমের পুনর্বিন্যাস, ভেটো পদ্ধতি পুনর্গঠন_ এ রকম বেশ কিছু ইস্যু এতে উঠে এসেছে। কিন্তু জাতিসংঘের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ নিবারণ ও শান্তিরক্ষায় কেন্দ্রীয় সংস্থা হিসেবে নিজের অবস্থানকে ধরে রাখা। জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো যদি সামরিক জোটের মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধ ও মানবাধিকার রক্ষার নামে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে থাকে, তাহলে জাতিসংঘের রূপান্তর ঘটবে সমাজকল্যাণভিত্তিক এজেন্টে। আর সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ধনী দেশগুলো প্রতিশ্রুত সাহায্য না দিলে উন্নয়ন সহযোগী হিসেবেও জাতিসংঘ সংকটে পড়বে। জাতিসংঘের এখন কোনো শ্রেয়তর বিকল্প নেই। তাই এর নিষ্ক্রিয়তা বা অবলুপ্তির বলি হবে বিশ্বশান্তি, ন্যায়বিচার ও কোটি কোটি দরিদ্র মানুষ। সে আশঙ্কা যেন অমূলক হয়।

সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাবি ও সাবেক মহাপরিচালক
বাংলা একাডেমী