জাতির সূর্যসন্তান মুক্তিযোদ্ধা-আর কত বঞ্চনা সইতে হবে তাঁদের

তাঁরাই কি দেশের সূর্যসন্তান, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ? এমন কঠিন প্রশ্নই করা যায় বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের দুর্বিষহ জীবনযাপনের চিত্র দেখে। মুক্তিযোদ্ধারা ১৯৭১-এ জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন, যাঁদের অসীম ত্যাগের ফলে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের জন্ম হয়েছিল, সেই স্বাধীন দেশেই মুক্তিযোদ্ধাদের অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটে।
বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হয়, গরুর জোয়াল নিতে হয় নিজের কাঁধে কিংবা ঘানির বলদ সাজতে হয়। বৃদ্ধ বয়সে বাদাম বেচতে হয় কিংবা দিনমজুরি করতে হয়। অথচ মৃত্যুর পর তাঁদেরই মৃতদেহকে জানানো হয় রাষ্ট্রীয় সম্মাননা। এ যেন এক প্রহসনের নামান্তর। তার পরও আমরা মুখে বলি, তাঁরাই হলেন এই দেশের সূর্যসন্তান, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ।
অথচ নৈতিক কারণে, বিবেকের কারণে, ঐতিহাসিক প্রয়োজনে এসব মানুষের সুখে-শান্তিতে বসবাসের ব্যবস্থা করার কথা রাষ্ট্রের। কেন ব্যবস্থা হচ্ছে না সেটুকুর? কত টাকা প্রয়োজন দুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের একটু শান্তি দেওয়ার জন্য? রাষ্ট্রীয় তহবিলে কি টান পড়বে তাঁদের চিকিৎসা, আহার, বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে গেলে? মোটেও না। দুস্থ মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কত? দুর্ভাগ্য আমাদের, সরকারি খাতায় এর কোনো পরিসংখ্যান নেই। বলার সুযোগ আছে, সার্টিফিকেটবিহীন মুক্তিযোদ্ধাদের তো হিসাবে আনা সম্ভব নয়। নাই বা হলো তাঁদের ব্যবস্থা। নাগরিক হিসেবে স্বাভাবিক প্রাপ্তি তাঁদের জন্য নিশ্চিত করে সার্টিফিকেটধারী দুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের সুব্যবস্থা করা কি কঠিন কিছু? পরিসংখ্যান না থাকলেও বলা যায়, তাঁদের সংখ্যা সারা দেশেও ১০ হাজার হবে না। এই ১০ হাজার মানুষ তো একটি দেশ এনে দিতে বিশাল অবদান রেখেছে। এই দেশ কি তাঁদের জন্য এগিয়ে আসবে না? গড়ে যদি দুই লাখ টাকা ব্যয় করে রাষ্ট্র, তাহলেই তাঁদের জীবনরূপ বদলে যাবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা অবশ্যই কর্তব্য। সেই কর্তব্যটি পালন করছে না সরকার। অথচ আমরা বলছি, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার এখন ক্ষমতায়। সত্যিই তো মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটিই এখন সরকারে আছে। এই সরকারের তাই দায় অনেক।
কালের কণ্ঠ অবহেলিত সূর্যসন্তানদের বর্তমান চিত্র তুলে ধরেছে বিজয়ের মাসে। মাত্র ৩৫ জনের জীবনকাহিনীতেই যা পাওয়া গেছে, তাকে জাতির জন্য লজ্জাজনক বললেও কম বলা হবে। এই লজ্জা থেকে মুক্তির পথ বের করতে হবে আমাদের। যদিও প্রধানমন্ত্রী প্রকাশিত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন; কিন্তু আমরা জানি না, এমন আরো যেসব মুক্তিযোদ্ধা বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে আছেন, তাঁদের জন্য কিছু করা হবে কি না। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পবিরারগুলোর জন্য কিছু করা হবে কি না। আমরা চাই সব মুক্তিযোদ্ধা সম্মান নিয়ে জীবন ধারণের সুযোগ পান। রাষ্ট্র নিজ উদ্যোগে তাঁদের সেই সম্মানটুকু নিশ্চিত করুক। সামাজিকভাবেও তাঁরা যাতে সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারেন, সে রকম উদ্যোগ নিতে হবে।