মালয়েশিয়ার সঙ্গে চুক্তি, প্রটোকল সই

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে  জনশক্তি রপ্তানি, পর্যটন ও সংস্কৃতি খাতে একটি চুক্তি এবং ৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। বুধবার পুত্রজায়ায় দু’দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আনুষ্ঠানিক বৈঠক শেষে এ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে ভিসা শর্তাবলির আংশিক বিলোপন, পর্যটন খাতে সহযোগিতা, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সম্পর্কিত ২০১২ সালের প্রটোকল সংশোধন এবং সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য খাতে সমঝোতা স্মারক। মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আহাদ জাহিদ হারমিদি ও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ভিসা শর্তাবলীর আংশিক বিলোপন সমঝোতায় স্বাক্ষর করেন। শ্রমিকদের প্রটোকল সংশোধনীতে স্বাক্ষর করেন মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী দাতো সোরি রিচার্ড রাইয়ত আনাক জায়েম ও বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন। পর্যটন খাতে সহযোগিতার সমাঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন মালয়েশিয়ার পর্যটন ও সংস্কৃতি বিষয়ক ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী মোস্তফা মুহামেদ ও বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। শিল্প, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কিত সমঝোতায় স্বাক্ষর করেন মালয়েশিয়ার পর্যটন ও সংস্কৃতি বিষয়ক ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও বাংলাদেশের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। পারদানায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মোহা. নাজিব বিন তুন আবদুল রাজাকের উপস্থিতিতে এসব চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন, বেসমারিক বিমান পরিবহন, পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ও সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। চুক্তি স্বাক্ষরের আগে প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে দুই প্রধানমন্ত্রী রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক সাংবাদিকদের জানান, বৈঠকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক থাকার কথা জানিয়েছেন। তিনি এ সম্পর্ককে সর্বোচ্চ উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন। এর আগে স্থানীয় সময় বিকাল ৩টায় শেখ হাসিনা পুত্রজায়ার পারদানা স্কয়ারে পৌঁছলে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর নাজিব রাজাক তাকে অভ্যর্থনা জানান। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সেখানে লালগালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়, একটি চৌকস দল তাকে গার্ড অব অনার দেয়। তিন দিনের সফরে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মালয়েশিয়া যান। আজ তার দেশে ফেরার কথা।
বাংলাদেশে বিনিয়োগে আহবান: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের পরবর্তী প্রবৃদ্ধির অংশীদার হতে মালয়েশিয়ান বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী কুয়ালালামপুরে বুধবার গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে ‘বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের সুযোগ বিষয়ক সংলাপ’ অনুষ্ঠানে এ আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, কয়েক দশক ধরে আজকের আধুনিক মালয়েশিয়া গড়তে আপনাদের অনেকেই অবদান রেখেছেন। আমি বিশ্বাস করি, একই সুযোগের হাতছানি বাংলাদেশেও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সীমাবদ্ধতা ও নিম্নপর্যায়ের অর্থনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিনিয়োগের যে সুযোগ ও প্রণোদনা দিচ্ছে তা আপনাদের সদয় বিবেচনার দাবি রাখে।
অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়া সাউথ সাউথ এসোসিয়েশন (এমএএসএসএ)-এর প্রেসিডেন্ট আজমান হাশিম এবং মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার এ কে এম আতিকুর রহমান বক্তব্য দেন।
এছাড়া মালয়েশিয়া সরকারের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত এস সামি ভেল্লুু, মালয়েশিয়ান স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড এক্রিডিটেশন কাউন্সিল ডাটুকের চেয়ারম্যান মুস্তাফা মনসুর, এমরেইল এসডিএন বিএইচডির নির্বাহী পরিচালক ড. অরবিন্দ হরি নারায়ণ, এক্সিসজাভা গ্রুপের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর  বেন্নি হো এবং দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়ার শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগ প্রতিনিধিদল এতে অংশ নেন। ফেডারেশন অব চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অব বাংলাদেশের সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলও সংলাপ অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক আরও প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রসমূহ চিহ্নিত করেছেন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও যোগাযোগ অবকাঠামোর ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার এসব চ্যালেঞ্জকে সুযোগে রূপান্তরিত করতে পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ইতিমধ্যে বড় অঙ্কের এফডিআই রয়েছে এবং দেশের বৃহত্তর চাহিদা মেটাতে মালয়েশিয়া থেকে মানসম্পন্ন বিনিয়োগকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগের সক্ষম পরিবেশ  তৈরির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলো সম্পর্কে আমরা জানি। ফলে ১৮টি বিশেষ অর্থনৈতিক জোন তৈরির প্রক্রিয়া চলছে।
তিনি বলেন, আমি মনে করি সড়ক, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পর্যটন ও সেবা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানি সরবরাহের মতো অবকাঠামো খাতগুলো আপনাদের মনোযোগ আকর্ষণ করবে। একই ভাবে খাদ্য ও কৃষিখাতের পুরোটাই হবে উৎসাহব্যঞ্জক। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বসহ (পিপিপি) যে কোন ধরনের অংশীদারিত্বের বিষয় বিবেচনা করতে প্রস্তুত রয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের যোগাযোগ মাধ্যম বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়া এবং আরও পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। এক্ষেত্রে সার্ক, বিমসটেক ও বিসিআইএন-এর মাধ্যমে আমাদের অগ্রসরমান অর্থনৈতিক সংহতি গড়ে উঠছে।
তিনি বলেন, আমাদের সমাজ হচ্ছে অন্তর্ভুক্তিমূলক, বহুমাত্রিক ও সমজাতিক। আমরা উৎপাদনকে দায়িত্ব ও কর্ম হিসেবে গণ্য করি; যা অন্যের জীবন ও জীবনযাত্রাকে ব্যহত না করে বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রত্যাশিত মুনাফা ও শ্রমিকদের কল্যাণ বয়ে আনে। সামাজিক উন্নয়ন ও অর্থনীতি পাশাপাশিই এগিয়ে যায় এবং দীর্ঘ মেয়াদে যা সুফল বয়ে আনে বলে আমরা বিশ্বাস করি।