হত্যা মামলায় মুক্ত, অগি্নসংযোগ মামলায় কারাগারে খোকন-নরসিংদীতে বিএনপির বিক্ষোভ :কর্মসূচি ঘোষণা by প্রীতিরঞ্জন সাহা,

রসিংদী পৌর মেয়র লোকমান হত্যাকাণ্ডের ৯ দিন অতিবাহিত হলেও এজাহারভুক্ত কোনো আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। এদিকে জেলা বিএনপির সভাপতি ডাকসুর সাবেক জিএস খায়রুল কবীর খোকনকে গতকাল বুধবার আদালতে হাজির করা হলে হত্যার সন্দেহে ৫৪ ধারায় আটকের মামলাটি খারিজ করে দেওয়া হয়। তবে অন্য দুটি মামলায় খায়রুল কবীর খোকনকে গ্রেফতার দেখিয়ে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।


গতকাল খায়রুল কবীর খোকনকে আদালতে আনার নির্ধারিত দিনে ভোর থেকেই কোর্ট ভবনে প্রবেশের বিভিন্ন সড়কে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে বিএনপির নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে কোর্ট চত্বরের বাইরের রাস্তায় জমায়েত হতে থাকে। সকাল পৌনে ১১টায় জেলা বিএনপির সভাপতি খায়রুল কবীর খোকনকে নরসিংদীর চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিতাই চন্দ্র সাহার আদালতে হাজির করা হলে শুনানি শুরু হয়। দীর্ঘ শুনানির পর বিজ্ঞ আদালত হত্যার সন্দেহে ৫৪ ধারায় আটকের মামলা এবং পুলিশের রিমান্ড আবেদন খারিজ করে দেন। তবে ভৈরব জিআরপি থানায় নরসিংদী রেলস্টেশন মাস্টার মরণ চন্দ্র দাসের দায়ের করা স্টেশন ভাংচুর ও অগি্নসংযোগের মামলা এবং নরসিংদী সদর মডেল থানায় জেলা কালেক্টরেটের ভারপ্রাপ্ত নাজির শাহরিয়ার আহমেদের দায়ের করা সার্কিট হাউস ভাংচুর ও অগি্নসংযোগের মামলায় খায়রুল
কবীর খোকনকে গ্রেফতার দেখিয়ে তাকে পুনরায় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত থেকে বেরিয়ে খায়রুল কবীর খোকনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, যে দুটি মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে সে মামলার এজাহারে তার নাম নেই। শুধু রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে তাকে একের পর এক মামলা দিয়ে কারাগারে আটক রাখা হচ্ছে। খায়রুল কবীর খোকনের পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া, অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার, অ্যাডভোকেট ইকবাল হোসেন, অ্যাডভোকেট খোরশেদ মিয়া আলম, অ্যাডভোকেট শওকত আলী পাঠান, অ্যাডভোকেট আবদুল বাছেদ ভূঞা, অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ, অ্যাডভোকেট আবদুল কাদের টিটু, অ্যাডভোকেট আবদুল হান্নান প্রমুখ। এদিকে খোকনকে পুনরায় কারাগারে পাঠানোর খবরে নরসিংদী সদর উপজেলা মোড় থেকে কোর্ট ভবন, সার্কিট হাউস হয়ে জেলখানার মোড় পর্যন্ত রাস্তায় বিএনপি নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল করে।
খোকনকে আদালত থেকে জেলখানায় নেওয়ার পথে হাজার হাজার লোক বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এ সময় পুলিশের লাঠির আঘাতে ১০-১২ জন আহত হয়।
মিছিল শেষে নরসিংদী প্রেস ক্লাবের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বিএনপির কেন্দ্রীয় গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মাস্টার, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আলহাজ জামাল আহমেদ চৌধুরী প্রমুখ। এর আগে গত মঙ্গলবার নরসিংদী জেলা বিএনপি সভাপতি খায়রুল কবীর খোকনের মুক্তি দাবি করে সংবাদ সম্মেলন করেন দীর্ঘদিন রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে দূরে থাকা নরসিংদী সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আলহাজ মনজুর এলাহী। সংবাদ সম্মেলনে অবিলম্বে খায়রুল কবীর খোকনের মুক্তি দাবি করে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জাসাস জাতীয় নির্বাহী কমিটির আবৃত্তি বিষয়ক সম্পাদক এবিএম আজরাফ টিপু, বিএনপি নেতা আতাউল ইসলাম বাবুল, আক্তার চৌধুরী খাবির, নরসিংদী পৌরসভার কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র-২ আজিজুর রহমান আক্তার, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ভিপি আপেল প্রমুখ।
অপরদিকে একই দিন বিকেলে নরসিংদীর বাজির মোড়ে খায়রুল কবীর খোকনের মুক্তির দাবিতে নরসিংদী শহর বিএনপির প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। নরসিংদী শহর বিএনপির সভাপতি একেএম গোলাম কবির কামাল সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন। পরে খোকনের নিজ বাসভবনে বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাদের এক যৌথ সভায় অবিলম্বে খোকনের মুক্তি দাবি এবং মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে চার দিনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।
১০ নভেম্বর প্রতি উপজেলায় বিক্ষোভ সমাবেশ, ১১ নভেম্বর প্রতি ইউনিয়নে বিক্ষোভ, ১২ নভেম্বর নরসিংদী শহরের বাজির মোড়ে প্রতিবাদ সমাবেশ ও ১৩ নভেম্বর জেলা জজ আদালতের সম্মুখে বিক্ষোভ সমাবেশ।
একজন আটক
এদিকে লোকমান হত্যা মামলায় সন্দেহজনকভাবে টঙ্গী থেকে সেলিম নামে একজনকে আটক করা হয়েছে। তাকে নরসিংদী থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পুলিশ বলেছে, জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
লোকমান স্মরণে শোকসভা
মঙ্গলবার বিকেলে নিহত মেয়র লোকমান হোসেনের বাড়িতে বাসাইল এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে শোকসভা ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। সৈয়দ আলি মোল্লার সভাপতিত্বে শোকসভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন লে. কর্নেল (অব.) নজরুল ইসলাম হিরু বীরপ্রতীক এমপি, আলহাজ জহিরুল হক মোহন এমপি, ডা. আনোয়ারুল আশরাফ খান দিলীপ এমপি, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জোবায়ের আহমেদ জুয়েল, নিহত মেয়রের ছোট ভাই ও লোকমান হত্যা মামলার বাদী কামরুজ্জামান কামরুল, জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ভিপি শামীম নেওয়াজ, সাবেক কমিশনার পীরজাদা মোহাম্মদ আলী প্রমুখ। মেয়রের বাড়িতে অনুষ্ঠিত এ শোকসভায় ব্যাপক জনসমাগম ঘটে। সভায় উপস্থিত তিন এমপি লোকমানের পরিবারের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন এবং তারা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশমতো লোকমান হত্যায় জড়িতদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আশ্বাস দেন। তারা বলেন, হত্যাকারীরা যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, তাদের বিচার করা হবে।
এদিকে ঈদের আগের দিন (৬ নভেম্বর) দুপুর দেড়টায় মেয়র লোকমান হোসেনের বাড়ি থেকে ৫০০ গজ দূরে দেয়ালবেষ্টিত পরিত্যক্ত খালি জায়গায় ৪টি বোমাসদৃশ বস্তু পাওয়া গেছে। খবর পেয়ে সদর থানার ওসি আনোয়ার হোসেন ঘটনাস্থলে পেঁৗছে এগুলো উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যান। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পুলিশ জানায়, এগুলো বোমা নয়।
কাইয়ুমকে গুলি করার হুমকি
অপরদিকে একই দিন রাত ১১টায় নিহত মেয়র লোকমান হোসেনের ঘনিষ্ঠ সহচর নরসিংদী কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস এসএম কাইয়ুম ৭-৮ জন সঙ্গী নিয়ে লোকমানের বাড়ি থেকে নিজ বাড়িতে আসার সময় প্রধান সড়কে ওঠা মাত্র একটি মাইক্রোবাসে থাকা লোকজন তাকে জোরপূূর্বক তাদের গাড়িতে তুলে নেওয়ার চেষ্টাকালে ধস্তাধস্তির সময় ছাত্রলীগ নেতা শিয়াব ও বাবুল আহত হন। এ সময় পিস্তল ঠেকিয়ে কাইয়ুমকে গুলি করার হুমকি দেওয়া হয়। এ ব্যাপারে কাইয়ুম বাদী হয়ে নরসিংদী সদর মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। অবশ্য পুলিশ এ ঘটনাটি মিথ্যা বলে জানায়।
এদিকে পুলিশ সুপারের দায়িত্ব পালনকারী অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুব্রত হালদার জানান, তিনি নরসিংদীতে যোগদানের পর থেকেই লোকমান হত্যা মামলায় জড়িতদের গ্রেফতারে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।
নিহত লোকমান হোসেনের ছোট ভাই নরসিংদী সরকারি কলেজের ভিপি ও জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম নেওয়াজ বলেন, 'আমার ভাই লোকমান হোসেন নরসিংদী তথা সারাদেশের একজন শ্রেষ্ঠ মেয়র ছিলেন। তাকে হত্যার ৯ দিনেও এজাহারভুক্ত কোনো আসামি গ্রেফতার হয়নি। তাতে আমরা উদ্বিগ্ন।'