সংবিধান-'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি' by সৌমিত চন্দ জয়দ্বীপ

'৭২-এর সংবিধানের বিকল্প নেই। এবং তা যদি কোনো বাণী দিয়ে শুরু করতেই হয়, তবে 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি' দিয়ে শুরু হওয়াটাই বোধকরি উত্তম সংবিধান নিয়ে হচ্ছেটা কী, সেটা সাধারণ মানুষের বোঝার বাইরে! সরকারি দল একভাবে চায়, বিরোধী দল আরেকভাবে।


প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি, '৭২-এর সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতেও সেটা ছিল। কিন্তু তারা হাঁটল উল্টোপথে। যে পথটা অতিপ্রিয় সাম্প্রদায়িক দলগুলোর। 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম', 'রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম' রয়ে গেল। এবং সংবিধানের পূর্বকার চার মৌল নীতিও স্থান পেল একই সঙ্গে। একই সংবিধানে! এর চেয়ে বড় সাংবিধানিক সংকট আর কী হতে পারে? অথচ সেই সংবিধানেই কিন্তু বলা আছে, মৌলনীতির পরিপন্থী কোনো আইন করা যাবে না। সংবিধানের চতুর্থ, পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী সেহেতু অগ্রহণযোগ্য। মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে স্ববিরোধী ধারা ও ওই সংশোধনীগুলোকে অবৈধ ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু স্ববিরোধী এসব ধারা নিয়েই সংবিধান মুদ্রণে মনোযোগী হয়ে উঠল আইন মন্ত্রণালয়! তালগোল পাকিয়ে ফেলে তারা এখন আলোচনার বাইরে। বল এখন সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটির কোর্টে। গত ২৪ এপ্রিল থেকে তারা বিভিন্ন দলের সঙ্গে আলোচনা করেছে। তারা কি পারবে আমাদের সাংবিধানিক সংকট থেকে মুক্তি দিতে? উচ্চ আদালতের রায় কি যথাযথ পূর্ণতা পাবে? আমরা স্বপ্ন দেখছি!
সংবিধান কোনো একটা ধর্মের মূল চেতনা দিয়ে শুরু করতে হবে কেন? কোনো ধর্মেরই বা সাংবিধানিক স্বীকৃতির প্রয়োজন কেন? প্রশ্নগুলোর নিরসন বর্তমান সরকারকে খুব সাহসের সঙ্গে করতে হবে। কমিটির কাছে প্রস্তাবনায় আওয়ামী লীগ প্রতিশ্রুত বাক্য থেকে সরে এলো (হয়তো) ভবিষ্যতে বিশেষ রাজনৈতিক ফ্যাসাদে পড়বে বলে। এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠরা 'ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার দায়ে' (হয়তো) আওয়ামী লীগের ওপর নাখোশ হবে বলে। দুঃখজনক হলেও সত্য, তারা মুক্তিযুদ্ধ-চেতনার '৭২-এর সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠায় মত দিল না। দিলে এতে নিদ্বর্িধায় জোরেশোরে বিরোধিতা করত ধর্মীয় উগ্রবাদী সাম্প্রদায়িক কাঠমোল্লাদের দলগুলো। যারা আগাগোড়া আওয়ামী লীগ ও প্রগতিশীল দলগুলোর সঙ্গে আদর্শিক দিক থেকেই বিরোধী। কিন্তু ওদের তো রাজনৈতিকভাবেই মোকাবেলা করতে হবে আওয়ামী লীগকে। আওয়ামী লীগের বক্তব্যই কি সরকারের সিদ্ধান্ত? আমরা অপেক্ষায় রইলাম। তবে শান্তিকামী মানুষের ওপর অন্তত এই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের বিশ্বাস রাখা উচিত। না রাখলে আওয়ামী লীগ যে ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোকে অনেক সময় 'ধর্ম ব্যবসায়ী' বলে সেটা কিন্তু আর ধোপে টিকবে না। ধর্মকে পুঁজি করে উভয় কুল রক্ষার দায়ে তখন কিন্তু কোনো বিশেষ সম্প্রদায় নয়, হয়তো পুরো জাতিই আওয়ামী লীগের শেষটা দেখে ছাড়বে! তারাই তো চলমান সরকারকে ক্ষমতায় এনেছে, যারা এদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির ক্ষমতায়ন দেখতে চাননি। চেয়েছিল নিশ্চয়ই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দেখতে, ইশতেহারি স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক সংবিধান দেখতে। চেয়েছিল রাষ্ট্রিক মর্যাদাসম্পন্ন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ।
এজন্য '৭২-এর সংবিধানের বিকল্প নেই। এবং তা যদি কোনো বাণী দিয়ে শুরু করতেই হয়, তবে 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি' দিয়ে শুরু হওয়াটাই বোধকরি উত্তম।
sc.joydip@gmail.com