নতুন নোটিশ জারিঃ চট্টগ্রামের কারখানায় সপ্তাহে তিন দিন গ্যাস সরবরাহ

ট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় গ্যাস সংযোগ বন্ধের নোটিশ জারির ২০ ঘণ্টা পর সেটি বাতিল করা হলো। কিন্তু বাতিলের ৫ ঘণ্টা পর আবার নতুন নোটিশ জারি করা হয়। এতে বলা হয়, চট্টগ্রামে শিল্পকারখানায় সপ্তাহে মাত্র তিন দিন গ্যাস সরবরাহ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক মোহাম্মদ নাজমুল ইসলামের উপস্থিতিতে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রাম চেম্বার কার্যালয়ে এর আগে জারি করা নোটিশ বাতিলের ঘোষণা দেন কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সানোয়ার হোসেন চৌধুরী। ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম কালের কণ্ঠকে বলেন, 'চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক। তিনি ঢাকার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে কর্ণফুলী গ্যাস কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চেম্বারে ডেকে এনে নোটিশ প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।'
নোটিশ প্রত্যাহারের ঘোষণায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এলেও ৫ ঘণ্টা পরে নতুন নোটিশ জারি করে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি লিমিটেড। সন্ধ্যায় জারি করা নতুন নোটিশে বলা হয়, সপ্তাহে মাত্র তিন দিন কারখানা খোলা রাখার জন্য গ্যাস সরবরাহ করা হবে। বাকি চার দিন পণ্য উৎপাদন বন্ধ থাকবে। কর্ণফুলী গ্যাস কর্তৃপক্ষের অফিস থেকে এই নোটিশ জারির আগেই দ্রুত খবর ছড়িয়ে পড়ে। এ খবরে শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ফের হতাশা দেখা দেয়।
দেশের অন্যতম ভোজ্য তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান এস এ গ্রুপের চেয়ারম্যান শাহাবউদ্দিন আলম হতাশা প্রকাশ করে কালের কণ্ঠকে বলেন, 'প্রথমে বন্ধ করা হলো, তারপর সেই নোটিশ প্রত্যাহার করে এখন নতুন নোটিশে বলা হচ্ছে সপ্তাহে তিন দিন মিল-কারখানা খোলা রাখা যাবে। এই অবস্থায় আমরা কোথায় যাব, কার কাছে অভিযোগ জানাব? এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে নিত্যপণ্যের স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন দেখা দিতে বাধ্য। এই সংকটের প্রভাব শুধু শিল্পপতিদের ওপর নয়, পড়বে সাধারণ ভোক্তাদের ওপরও।'
গ্যাস ব্যবহারের অনুমতি পেয়ে শিল্পকারখানার মালিকরা খুশি হলেও লাগাতার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় গ্যাস সরবরাহকারী সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কোনো ঘোষণা ছাড়া কোরবানির ঈদের আগে হঠাৎ গ্যাস বন্ধ করে দেওয়ার পেছনে কেজিডিসিএলের কর্মকর্তাদের কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলেও ধারণা করছেন ব্যবসায়ীরা। সরবরাহ বন্ধ করে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা অথবা সরকারকে বেকায়দায় ফেলার কোনো অভিপ্রায় তাঁদের থাকতে পারে বলে অনেক ব্যবসায়ী সন্দেহ পোষণ করছেন। অনেকে এ ঘটনার তদন্ত করে দোষীদের খুঁজে বের করার দাবি জানিয়েছেন।
কর্ণফুলী গ্যাস কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীদের এসব সন্দেহের ব্যাপারে তাঁর মতামত জানা সম্ভব হয়নি।
এ প্রসঙ্গে দেশের অন্যতম শিল্প প্রতিষ্ঠান বিএসআরএমের নির্বাহী পরিচালক তপন সেনগুপ্ত কালের কণ্ঠকে বলেন, 'এ ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে পণ্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে।' তিনি জানান, বুধবার রাতে নোটিশ পাওয়ার পর থেকে তাঁরা চট্টগ্রামের ফৌজদারহাট ও নগরীর নাসিরাবাদ এলাকার দুটি কারখানার উৎপাদন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন।
আবুল খায়ের গ্রুপ, পিএইচপি গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ, কেডিএস গ্রুপ, এসএ গ্রুপ, টিকে গ্রুপ, নূরজাহান গ্রুপ ও মোস্তফা গ্রুপসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, বাড়বকুণ্ড, ফৌজদারহাট, নাসিরাবাদ ও কালুরঘাট শিল্প এলাকায় অবস্থিত এসব কারখানায় সিমেন্ট, ঢেউ টিন, রড, চিনি, ভোজ্য তেল, গুঁড়ো দুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদিত হয়।
পিএইচপি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইকবাল হোসেন চৌধুরী গতকাল সন্ধ্যায় ক্ষোভ প্রকাশ করে কালের কণ্ঠকে বলেন, 'পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ, শ্রমিকের বেতন-বোনাস, সরকারের রাজস্ব আয়, বাজারে পণ্যের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত রাখার মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত। সময় না দিয়ে এভাবে হঠাৎ গ্যাস বন্ধ করে দেওয়ার কারণে সাময়িকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে শিল্পকারখানার উৎপাদন।
এদিকে, গ্যাস সরবরাহ বন্ধের নোটিশ প্রত্যাহারের দাবিতে গতকাল দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার। আগ্রাবাদের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে সহসভাপতি এ এম মাহবুব চৌধুরী বলেন, 'চট্টগ্রামে যখন গ্যাসের চাহিদা বেড়েছে, তখন সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার অর্থ হলো_চট্টগ্রামকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। যারা চায় না চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী হোক, তারাই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।'
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন আগ্রাবাদ হোটেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাকিম আলী ও মেট্রোপলিটন চেম্বারের সিইও এম সোলায়মান।