বীর মুক্তিযোদ্ধা-তোমাদের এই ঋণ শোধ হবে না

৩৫৭ স্বাধীনতার চার দশক উপলক্ষে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ধারাবাহিক এই আয়োজন। শহীদ মো. আবুল কাশেম ভূঁইয়া, বীর বিক্রম যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদ এক তরুণ যোদ্ধা মো. আবুল কাশেম ভূঁইয়া ১৯৭১ সালে ছিলেন এসএসসি পরীক্ষার্থী। টগবগে তরুণ। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারেননি।


দেশমাতৃকার ডাকে শত্রু পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে। প্রতিরোধযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে স্বল্প প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধ করতে থাকেন। মে মাসের প্রথমার্ধে তিনি ছিলেন কুমিল্লার বিবিরবাজারে। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে মো. আবুল কাশেম ভূঁইয়া শহীদ হন।
এ যুদ্ধের বিবরণ আছে মেজর খালেদ মোশাররফের (বীর উত্তম, পরে মেজর জেনারেল) এক বয়ানে। তিনি বলেন, ‘...কুমিল্লার বিবিরবাজার (মুক্তিবাহিনীর) পজিশনের ওপর পাকিস্তান বাহিনী প্রচণ্ড আক্রমণ করে। অনেক ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে কুমিল্লা শহরের সন্নিকটে দেড় মাইল পূর্ব দিকে তারণ্যপুর শত্রুরা দখল করতে সমর্থ হয়। আমি ইপিআরের একটি কোম্পানি এবং কিছুসংখ্যক বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেনা দিয়ে বিবিরবাজার প্রতিরক্ষাব্যূহ আরও শক্তিশালী করি। প্রতিরক্ষা অবস্থানে শত্রুরা বারবার আক্রমণ চালাতে থাকে।
‘এই অবস্থানের ওপর পাকিস্তানি সেনাদের লক্ষ্য এ জন্য ছিল যে প্রতি রাতে এখান থেকে আমার ছোট ছোট কমান্ডো পার্টি গোমতী নদী অতিক্রম করে কুমিল্লা শহরে পাকিস্তানি অবস্থানের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে ব্যতিব্যস্ত করত। আমরা অনেক সময় তাদের অবস্থানের ওপর মর্টার হামলাও চালাতাম। এতে প্রায়ই পাকিস্তানি সেনাদের অনেক লোক হতাহত হতো।
‘অবশেষে পাকিস্তানি বাহিনী এক দিন সন্ধ্যার সময় অতর্কিতে এ পজিশনের ওপর ৩৯ বালুচ রেজিমেন্টের সাহায্যে গোলন্দাজ বাহিনী এবং ট্যাংকের সাহায্যে প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। প্রথমে শত্রুসেনা পূর্ব দিকে আক্রমণ চালনা করে। এই আক্রমণ আমার সেনারা নস্যাৎ করে দেয় এবং শত্রুদের অনেক লোক নিহত ও আহত হয়। এরপর শত্রুসেনারা দক্ষিণ দিক থেকে আমাদের পজিশনের ওপর পেছনে বাম পাশে ট্যাংক ও ৩৯ বালুচ রেজিমেন্টের সাহায্যে আক্রমণ চালায়। চার-পাঁচ ঘণ্টা ধরে যুদ্ধ হয়। ট্যাংক ও গোলন্দাজ বাহিনীর প্রচণ্ড গোলাবর্ষণে এবং পেছন দিক থেকে আমরা ঘেরাও হওয়ার আশঙ্কায় আমাকে বাধ্য হয়ে এই অবস্থান ছাড়তে হয়।
‘এ যুদ্ধে ইপিআরের জওয়ানরা যথেষ্ট সাহসের পরিচয় দিয়েছে। বিশেষ করে মনে পড়ে এক নায়েকের কথা। সে শত্রুদের গুলি করতে করতে এত উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল যে তাদের নিহতের বিপুলসংখ্যা দেখে একপর্যায়ে “জয়বাংলা” হুংকার দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। সেই সময় দুর্ভাগ্যবশত তাঁর মাথায় গুলি লাগে এবং মারা যায়।
‘যুদ্ধে আমার ছয়জন সেনা মারা যায় এবং ৮-১০ জন আহত হয়। আহতদের পেছনে নিয়ে আসি। কিন্তু তাঁদের চিকিৎসার বন্দোবস্ত করতে পারিনি। এ রকম একজন আহত তরুণ ছাত্রের কথা মনে পড়ে, যাঁর পেটে গুলি লেগেছিল। কিন্তু তৎক্ষণাৎ অপারেশন করার ব্যবস্থা না থাকায় সে মারা যায়।’
এই আহত তরুণই ছিলেন মো. আবুল কাশেম ভূঁইয়া। মুক্তিযোদ্ধারা পরে তাঁর মরদেহ সমাহিত করেন ভারতের মাটিতে।
মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্বের জন্য মো. আবুল কাশেম ভূঁইয়াকে মরণোত্তর বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী, তাঁর বীরত্বভূষণ নম্বর ১৪২।
শহীদ মো. আবুল কাশেম ভূঁইয়ার পৈতৃক বাড়ি চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলার ভড়ুয়া গ্রামে। অবিবাহিত ছিলেন। তাঁর বাবার নাম আফাজউদ্দীন ভূঁইয়া। মা শরিয়তের নেছা। শহীদ মো. আবুল কাশেম ভূঁইয়ার ছবি পাওয়া যায়নি।
সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র, নবম খণ্ড এবং স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা, মো. আবদুল হান্নান।
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
trrashed@gmail.com