‘ফাইট করে বাঁচতে হবে’ by মানসুরা হোসাইন

ছেলে মোহাম্মদ বিন আলীম ও মেয়ে
চিরশ্রী জামানের সঙ্গে জয়শ্রী জামান
‘যারা আত্মহত্যা করার কথা চিন্তা করে তারা বুঝতে পারে না সামনের দিনগুলো সুন্দর হতে পারে। আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়। মরে গেলে এই পৃথিবীর কারও কিছু এসে যায় না। তাই ফাইট করে বাঁচতে হবে।’ —কথাগুলো দুই সন্তানহারা মা জয়শ্রী জামানের।
গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর তাঁর ছেলে মোহাম্মদ বিন আলীম ও মেয়ে চিরশ্রী জামান একসঙ্গে আত্মহত্যা করে। দুই সন্তানকে হারিয়ে জীবন থেকে হারিয়ে যাননি জয়শ্রী। আত্মহত্যা প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরিতে গড়ে তুলেছেন ‘ব্রাইটার টুমোরো’ নামের একটি সংগঠন। তিনি সংগঠনটির আহ্বায়ক। চলতি বছরের ২৮ মে ছেলে মোহাম্মাদের জন্মদিনে এ সংগঠনের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে।
আগামী ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসকে সামনে রেখে আজ মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন করেছে সংগঠনটি। সংগঠনটির মূল উদ্দেশ্য, এই পৃথিবীতে আর কোনো মায়ের সন্তান আত্মহত্যা করবে না।
সংগঠন চালানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস) নিয়মিত অফিস করাসহ বিভিন্নভাবে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এই জয়শ্রী জামান।
গতকাল সোমবার জয়শ্রীর সঙ্গে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয়। জয়শ্রী বলেন, তাঁর ছেলে মেয়েরা মূলত তাদের বাবার ওপর অভিমান করে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। তিনি বলেন, গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর তাঁর ছেলে ও মেয়ে একসঙ্গে আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যা করার সময় মেয়ে চিরশ্রী জামানের বয়স ছিল ১৯ বছর। আর ছেলে মোহাম্মদ বিন আলীমের বয়স ছিল সাড়ে ১৪ বছর। জয়শ্রী জামান ওদের আদর করে ডাকতেন মনো-বিজু।
জয়শ্রী জামান বলেন, ‘আমার মনো-বিজু কই গেল? আশ্চর্য লাগে ওরা আমার কাছে নেই। ওরা মাকে ছেড়ে আছে কীভাবে? প্রতি সেকেন্ডেই তো ওদের মাকে লাগত। ওরা অল্প কয়েকটা দিন অপেক্ষা করলেই ওদের আর কোনো কষ্ট থাকত না। কিন্তু ওরা অপেক্ষা করল না। ওরা আসলে মনে হয় আমাকে ভালোবাসেনি। ভালোবাসলে এভাবে কষ্ট দিতে পারত?’
দুই সন্তানহারা মাকে কি কোনো প্রশ্ন করা যায়? তাই শুধুই মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা। জয়শ্রী জামানের মনে অনেক কথা। কিন্তু কথা বলতে গেলেই বুকের ভেতরের কষ্টে তাঁর নাক মুখ লাল হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু দুই ছেলে মেয়েকে নিয়ে যে অনেক স্মৃতি। জয়শ্রী জামান বলেন, ‘ওদের আত্মহত্যার আগের দিন পিৎজা এনে খাওয়ালাম। ঘটনার দিন সকালে রান্না করলাম। ছেলে লেমন জুস খেতে পছন্দ করত। তাও বানালাম। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে, ঘুমন্ত মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে বের হলাম। তারপর...। সেই দিনের পর থেকে শরীরের কোথায় যেন ব্যথা হচ্ছে, কিন্তু ব্যথার জায়গাটা খুঁজে পাই না।’
ক্যানসারে বাবা মারা যাওয়ার পর জয়শ্রী জামানের মা মারা যান। বিয়ের ১৪ বছরের মাথায় স্বামী তালাক দেন। দুই ছেলেমেয়ে এক সঙ্গে আত্মহত্যার ঘটনা সব মিলে জয়শ্রী জামানের পৃথিবীটা অন্য রকম হয়ে গেছে। তবে তিনি মুষড়ে যাননি বা থেমে যাননি।
আজ সোমবার সকালে মোহাম্মদপুরে জয়শ্রীর বোনের বাসাতেই কথা হয় তাঁর সঙ্গে। বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে সংগঠনের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন জয়শ্রী জামান। তারপরও সময় দিলেন।
জয়শ্রী জামান বলেন, ‘মা ধমক দিল, কিংবা কোনো ছেলেকে ভালো লাগার পর তাকে পাওয়া গেল না-এ ধরনের কারণে ছেলে মেয়েরা দুম করে মরে যাচ্ছে। তারা একবারও ভাবছে না তারা এভাবে মরে গেলে তাদের আশপাশের মানুষগুলোর কতটা কষ্ট হয়। আত্মহত্যা করা এক ধরনের স্বার্থপর চিন্তা। মানুষের আবেগ, ভালোবাসা এত হালকা হবে কেন?’
জয়শ্রী জামান জানালেন, মাত্র সাড়ে আট বছর বয়সে ছেলে আর মেয়ের ১৩ বছর বয়সে ওদের বাবা ওদের ছেড়ে চলে যান। এর আগ পর্যন্ত অন্য আট দশটা শিশুর মতোই ওরা বেড়ে উঠেছে। বাবার আদর পেয়েছে। তারপর এক সময় ওদের জীবনটা পাল্টে গেল। ওদের বাবার ফেসবুকে দেখত অন্য স্ত্রী ও সন্তানের ছবি। বাবা টাকা পাঠাত। তবে সেখানেও ছিল বৈষম্য।
জয়শ্রী জামান বলেন, ‘আত্মীয় বা কোথাও গেলে ছেলে মেয়েদের অন্যরা বাজে কথা শোনাবে সে ভয়ে ওদের নিয়ে কারও বাসায় যেতাম না। ওদের কোনো বন্ধু ছিল না। ওদের একটু ভালো রাখার জন্য নিজের চাকরি, তারপর অন্যান্য কাজ করে টাকা রোজগারে ব্যস্ত হয়ে যাই। ছোট মানুষ দুটো এসব অবহেলা, বিশেষ করে বাবার অবহেলা মেনে নিতে পারেনি। প্রায়ই বলত, “চলো বাবাকে পানিশমেন্ট দেওয়ার জন্য আমরা তিনজন একসঙ্গে সুইসাইড করি। ” ছেলে বলত-মরে গেলেই তো সব কষ্ট থেকে বাঁচা যাবে। তখন বুঝতে পারিনি, ওরা আসলেই এসব নিয়ে ভাবছে। ওদের মনে ক্ষোভ জমতে জমতে এ পর্যায়ে চলে গেছে। ওদের মৃত্যুর পর বিষয়গুলো বুঝতে পেরেছি। এখন মনে হয়, ওদের যদি একটু সময় দিতাম, ওদের যদি পৃথিবীর বাস্তবতার সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে দিতাম, একটু শাসন করতাম তাহলে এমন হতো না। ওরা টাকা পয়সার অভাব তেমন বুঝতে পারেনি বা বুঝতে দিইনি, তবে ওরা চারপাশ থেকে আদর পায়নি।’
ছেলে মেয়ের সব ধরনের আবদার পূরণ করার পরও তারা তাদের মাকে কেনো বুঝতে পারল না নিজেই নিজেকে সে প্রশ্ন করছিলেন জয়শ্রী জামান। এখন আত্মহত্যা নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে জানতে পারছেন অনেক কিছু। আবেগপ্রবণ সন্তানদের জন্য বাবা মায়েদের কী করা উচিত, কীভাবে বড় করে তুলতে হবে-এই কথাগুলো কেন আগে জানতে পারেননি তা নিয়ে আফসোস করছিলেন।
জয়শ্রী জামান আত্মহত্যা প্রতিরোধে সংগঠন গড়ে তোলার সংগ্রাম সম্পর্কে বলেন, আত্মহত্যা এমন একটি বিষয়, বলতে গেলে বিজ্ঞানও তার পুরোপুরি ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। এটি প্রতিরোধে সচেতনতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। বাংলাদেশসহ অনুন্নত বিশ্বে বছরে ৬ লাখের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করছে। আত্মহত্যা প্রবণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। এই মানুষগুলোকে বাঁচাতে রাষ্ট্রকেই মূল দায়িত্ব নিতে হবে। আর এ ধরনের কাজে অনেক বেশি অর্থেরও প্রয়োজন নেই। শুধু প্রয়োজন সদিচ্ছা ও গুরুত্ব দিয়ে কাজটি করা। আর আত্মহত্যা প্রতিরোধে কাজটি শুরু করতে হবে পরিবার থেকেই।