ঐশীই বাবা-মায়ের খুনি

পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (পলিটিক্যাল শাখা) ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমানের মেয়ে ঐশী রহমান নিজেই তার বাবা-মাকে খুন করেছে বলে ডিবি পুলিশের এক ব্রিফিংয়ে জানানো হয়েছে।
ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, বাবা মাহফুজুর রহমান ও মা স্বপ্না রহমানকে হত্যার আগে দুই ধরনের ৬০টি চেতনানাশক ট্যাবলেট খাইয়ে পরে ছুরি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে ঐশী।

তবে আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে এ হত্যাকাণ্ডের দায় ঐশী স্বীকার করেছে কিনা, তা জানা যায়নি। আদালতের জবানবন্দির কপি এখনো না আসার কারণে সেটি বলা যাচ্ছে না। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পরোক্ষভাবে জড়িত একজনকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম শনিবার বিকেলে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত জনাকীর্ণ এক সংবাদ সম্মেলনে এ সব কথা বলেন।

এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) জাহাঙ্গীর আলম মাতুব্বর এবং মিডিয়া সেন্টারের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান।

গোয়েন্দা পুলিশের শীর্ষ এই কর্মকর্তা বলেন, ‘১৪ আগস্ট রাতে নির্মম ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ঐশী নিজেই অংশ নেয়। প্রায় ৬০টি দু’ধরনের চেতনানাশক ট্যাবলেট কফির মধ্যে খাইয়ে বাবা-মাকে অচেতন করে। এরপর প্রথমে সে মা ও পরে বাবাকে ছুরি (খঞ্জর) দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে।’

মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘হত্যার সময় তার ভাই ঐহী রহমান ঘুম থেকে জেগে উঠলে তাকে বাথরুমের মধ্যে আটকে রাখা হয়। হত্যাকাণ্ড শেষে কাজের মেয়ে সুমিকে ঐশী জাগিয়ে তোলে। এরপর লাশ সরানোর সহযোগিতায় তাকে বাধ্য করে।

Oishiঐশী ও সুমি এক সঙ্গে লাশ দু’টিকে বাথরুমের মধ্যে নিয়ে যাওয়া ও রক্ত ধোয়া-মোছার কাজ করে। পরে লকার খুলে টাকা-পয়সা, স্বর্ণালঙ্কার ও পরনের জামা-কাপড় নিয়ে সকালে বাড়িতে থেকে বের হয়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘লাশ উদ্ধারের পর আমরা জানতে পারি, পুলিশ কর্মকর্তার মেয়ে ঐশী রহমান, ছেলে ঐহী রহমান ও কাজের মেয়ে সুমি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ রয়েছে। পরে ঘটনার আলামত দেখে তাকে সন্দেহ করি।

এক পর্যায়ে লাশ উদ্ধারের পরের দিন দুপুরে ঐশী পল্টন থানায় আত্মসমর্পণ করে। পরে তার দেওয়া তথ্যে কাজের মেয়ে সুমি ও তার বন্ধু মিজানুর রহমান রনিকে আটক করা হয়।’

যে কারণে খুন:
গোয়েন্দা কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ঐশীর অবাধ চলাফেরায় বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে ঘটেছে। ঐশীকে অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে ভর্তির পর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে পরে আবার অক্সফোর্ড স্কুলে ভর্তি করা হয়।’

তিনি বলেন, ‘ঐশী রহমান মাদকাসক্ত ও তার অবাধ চলাফেরায় বাধা দেওয়ার কারণে সে হত্যাকাণ্ড ঘটনার কিছুদিন আগে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। এরপর তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু জনি এক ভাড়া বাসায় তোলে।

পরে মা-বাবা বিষয়টি জানার পর সেখান থেকে নিয়ে আসেন। এরপর গত ১ আগস্ট থেকে ঐশী মূলত বাসায় গৃহবন্দি অবস্থায় ছিল। তার মোবাইল ফোনও বাবা-মা নিয়ে নেয়। এ কারণেই ঐশী তার বাবা-মাকে হত্যার পরিকল্পনা করে।’

মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘ঐশী গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের জানায়, বাবা-মা না থাকলে সে অবাধ চলাফেরা করতে পারবে। তার স্বাধীনতায় কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এ কারণে সে হত্যার পরিকল্পনা করে। এ জন্য সে চেতনানাশক ট্যাবলেট কেনে। কফির সঙ্গে মিশিয়ে প্রথমে তার মাকে খাওয়ায়, পরে বাবাকে।

এরপর রাত দুইটার দিকে সে ছুরি দিয়ে প্রথমে তার মাকে ও পরে বাবাকে হত্যা করে।’

তিনি জানান, ঐশী নিজেও ঘুমের ট্যাবলেট খেতো। এতে সে আসক্ত ছিল। ওভার ডোজের কারণে একবার তার পেট ওয়াশও করতে হয়।

মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘হত্যার পর আমরা বেশকিছু আলামত সংগ্রহ করি। এর মধ্যে ঐশীর রক্তমাখা জামা-কাপড়, চেতনানাশক ট্যাবলেটের খোসা উদ্ধার করা হয়। এমনকি যে দোকান থেকে ওষুধ কেনা হয়, তার মালিকের সঙ্গেও আমরা কথা বলেছি।’

ঐশীর রক্তমাখা কাপড়ের ডিএনএ টেস্ট করা হবে বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘হত্যার পর সমস্ত কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ঐশীর দেওয়া বক্তব্যে আমরা খুনের সময় তৃতীয় কোনো ব্যক্তি থাকার আলামত পাইনি। তবে পরোক্ষভাবে জড়িত আমরা একজনকে খুঁজছি। তাকে আটক করতে পারলে আরো বেশকিছু তথ্য পাওয়া যাবে।’

এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এখনো শেষ হয়ে যায়নি। আমরা এখনো তদন্ত কাজ অব্যাহত রেখেছি। পরোক্ষভাবে জড়িতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।’

যে কারণে রিমান্ডে রনি:
তদন্ত কাজে আরো বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেতে রনিকে আবার রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে বলে জানান মনিরুল ইসলাম।Roni

তিনি বলেন, ‘মাহফুজুর রহমান ও স্বপ্না রহমান হত্যাকাণ্ডে পরোক্ষভাবে রনির জড়িত থাকার প্রমাণ আমরা পেয়েছি। তার কাছ থেকে আরো তথ্য পেতেই রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।’

যে কারণে বয়স পরীক্ষা:
মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘ঐশীকে আটক করে রিমান্ডে নেওয়ার পর তার বয়স নিয়ে বিতর্ক ওঠে। তা অবসানের লক্ষে এ বিষয়ে আমরা আদালতের অনুমতি নিয়ে পরীক্ষা করেছি। তবে তাকে যে শিশু বলা হচ্ছে, তা ঠিক নয়। কারণ, ১৯৭৪ সালে শিশু আইনে ১৬ বছরের নিচে শিশু ধরা হয়। কিন্তু, ঐশীর বয়স ১৭। তবে আমাদের কাছে তার বয়সের দালিলিক প্রমাণপত্র না পাওয়ার কারণে বয়স পরীক্ষার জন্য আমরা হাসপাতালে পাঠাই।

এছাড়াও খুলনার বেসরকারি একটি ক্লিনিকে ঐশীর জন্ম নেওয়ার কাগজপত্র আমরা সংগ্রহ করেছি।’

উল্লেখ্য, গত ১৬ আগস্ট সন্ধ্যায় রাজধানীর চামেলীবাগের ভাড়া বাসা থেকে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (পলিটিক্যাল শাখা) পরির্দশক (ইন্সপেক্টর) মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

পরে তদন্তে ঘটনার সঙ্গে তাদের মেয়ে ঐশী রহমানের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। পরের দিন দুপুরে ঐশী রহমান পল্টন থানায় আত্মসমর্পণ করে।

এরপর পুলিশ ওই বাসার কাজের মেয়ে সুমি ও ঐশীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু মিজানুর রহমান রনিকে আটক করে। শনিবার ঐশী ও সুমি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়।